সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিন। নাস্তা করে চড়ে বসবেন ঝিনাইদহের গাড়িতে। তবে ঝিনাইদহ সদরে যাবেননা। নামবেন শৈলকুপায়। কারন এখানে আমরা দেখবো শৈলকুপা জমিদার বাড়ি। 
৪০০ বিঘা জমির উপর নির্মিত একসময়ের এই অপূর্ব রাজবাড়িটির বর্তমানে ভগ্নদশা। 
একসময়ে এই জমিদার বাড়িতে কেবল কক্ষের সংখ্যাই ছিলো সাড়ে তিনশো। অজপাঁড়াগাঁয়ে সেই আমলেই রামসুন্দর শিকদার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন থিয়েটার হল। 
বর্তমানে এখন বাস করেন জমিদার রামসুন্দর শিকদারের বংশধরেরা। এখানে দেখতে পারেন সংগ্রহে থাকা পাথরের তৈরী হুঁকো, কলের গান, শাল কাঠের তৈরী দুটো মন্দির, রূপার তৈরী বেনারসি শাড়ি সহ আরো নানান স্মৃতিচিহ্ন। 


শৈলকুপা থেকে ঝিনাইদহ হয়ে সোজা আসবেন নলডাঙ্গা। এখানেই নলডাঙ্গা রাজবাড়ি।
প্রায় ৫০০ বছর আগে ফরিদপুরের তেলিহাট্টি পরগনার অধীন ভবরাসুর গ্রামে বসবাস করতেন ভট্টনারায়ণ। তারই উত্তরসুরি বিষ্ণুদাস হাজরা ঝিনাইদহের নলডাঙ্গার রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তার বাবার নাম ছিল মাধব শুভরাজ খান। বৃদ্ধ বয়সে বিষ্ণুদাস ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী হয়ে সন্ন্যাসী হন এবং ফরিদপুরের ভবরাসুর থেকে ঝিনাইদহের নলডাঙ্গার কাছে খেড়াসিং গ্রামে এসে বেগবতী নদীর তীরে এক জঙ্গলে তপস্যা শুরু করেন। ১৫৯০ সালে মোগল সুবেদার মানসিংহ নৌকাযোগে বেগবতী নদী দিয়ে রাজধানী রাজমহলে যাওয়ার পথে তার সৈন্যরা রসদ সংগ্রহে বের হন। এ সময় জঙ্গলে তপস্যারত বিষ্ণুদাস সন্ন্যাসী সৈন্যদের রসদ সংগ্রহ করে দেন। এতে সুবেদার মানসিংহ খুশি হয়ে বিষ্ণুদাস সন্ন্যাসীকে পাশের পাঁচটি গ্রাম দান করেন।

 

ভগ্নপ্রায় রাজবাড়িভগ্নপ্রায় রাজবাড়ি

 

এ গ্রামগুলোর সমন্বয়ে প্রথমে হাজরাহাটি জমিদারি এবং পরে নলডাঙ্গা রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এ এলাকাটি নলখাগড়া ও নটা উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ছিল বলে পরিচিত হয় নলডাঙ্গা নামে। এরপর প্রায় ৩০০ বছর এ বংশের বিভিন্ন শাসক রাজ্যটি শাসন করেন। ১৮৭০ সালে রাজা ইন্দুভূষণ যক্ষ্মা রোগে মারা গেলে তার নাবালক দত্তক ছেলে রাজা বাহাদুর প্রমথভূষণ দেবরায় রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন আটটি মন্দির।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহর থেকে ৩ কিলোমিটার উত্তরে নলডাঙ্গায় ১৬৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কালীমাতা মন্দির, লক্ষ্মী মন্দির, গনেশ মন্দির, দুর্গা মন্দির, তারামনি মন্দির, বিঞ্চু মন্দির, রাজেশ্বরী মন্দিরসহ সুদৃশ্য আটটি মন্দির। এরই মধ্যে স্থানীয়দের সাহায্য ও জেলা পরিষদের আর্থিক সহযোগিতায় শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, কালীমাতা মন্দির, লক্ষ্মী মন্দির, তারা মন্দির, বিষ্ণু মন্দির সংস্কার করা হয়েছে।

ঝিনাইদহের নলডাঙ্গা রাজ্য রক্ষায় এক সময় ছিল সৈন্যবাহিনী। রাজপ্রাসাদ রক্ষায় চারদিকে খনন করা হয়েছিল পরিখা। রাজার জীবন বাঁচাতে বেগবতী নদীর ভেতর তৈরি করা হয়েছিল গোপন সুড়ঙ্গ পথ। আজ তার কিছুই নেই। সব ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু নলডাঙ্গায় আটটি মন্দির এখনও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। 


নলডাঙ্গা থেকে আসবেন কালীগঞ্জ পেরিয়ে বড়বাজারে। এখান থেকে কাছেই। এখানেই বিখ্যাত গাজীকালু চম্পাবতীর মাজার। 
গাজী কালু চম্পাবতীর পরিচয় নিয়ে রয়েছে নানা রকম কাহিনি। প্রচলিত আছে বৈরাট নগরের রাজা ছিলেন দরবেশ শাহ সিকান্দর। তারই সন্তান বরখান গাজী। কালু হলেন রাজা দরবেশ শাহ সিকান্দরের পালিত পুত্র। কালুর সঙ্গে গাজীর দারুণ ভাব ছিল। কালু গাজীকে খুব ভালোবাসতেন। যেখানেই গাজী সেখানেই কালু, বিষয়টা এরকমই ছিল। চম্পাবতীর ভালোবাসার টানে গাজী ছুটে এসেছিলেন ছাপাই নগর। এই ছাপাই নগরই পরবর্তিতে বারোবাজার নামে পরিচিতি লাভ করে। পুরো কাহিনী বললে পোস্ট লম্বা হয়ে যাবে।

গাজী-কালুর কথা শোনেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জনশ্রুতি আছে গাজী কালুর আধ্যাত্মিক প্রভাবে বাঘে ও কুমির একঘাটে জল খেত! গাজী কালু এমনই স্বনামধন্য ঐতিহাসিক চরিত্র। হিন্দু ধর্মবলম্বলীরা বনদূর্গার বদলে যাদের পূজা করে তাদের মধ্যে গাজী-কালু অন্যতম। গাজী-কালুকে নিয়ে অনেক মিথ বা গল্প প্রচলিত। এখানে এলে গাজী কালু চম্পাবতীর মাজার দর্শনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রীরাম রাজার দীঘিটির সৌন্দর্যেও মুগ্ধ হবেন।

দেখতে দেখতে জানি বিকেল পেরিয়ে যাবে। এবার ফেরার পালা। চাইলে ঝিনাইদহ হয়ে ঢাকা ফিরতে পারেন। আবার চাইলে যশোর হয়েও ঢাকা ফিরতে পারেন! একদিন যদি বাড়তি থাকে তবে যশোরও ঘুরে দেখতে পারেন!

যেভাবে যাবেন- ঢাকা থেকে মেহেরপুর বাসে যাওয়া যায়। যেতে সাত থেকে আট ঘন্টার মতো সময় লাগে। শ্যামলী বা জেআর পরিবহনে ভাড়া ৪৫০ টাকা।

বি:দ্র:- প্রকৃতি ও পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। দয়া করে পুরাকীর্তির গায়ে আঘাত করবেন না, প্রকৃতিতে যত্রতত্র অপচনশীল ময়লা ফেলবেন না। আপনি যেমন সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, আপনার পরবর্তী প্রজন্ম যেন অধিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।