লেখা- আহমাদ ইশতিয়াক 

ঠাকুরগাঁও থেকে আটোয়ারিতে থাকবেন আগে থেকে ঠিক করে রাখা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে। ভোরে উঠে যাবেন মির্জাপুরে। আটোয়ারি থেকে মির্জাপুরের গাড়ি পাবেন। এখানেই ঐতিহাসিক মির্জাপুর জামে মসজিদ। মির্জাপুর শাহী মসজিদটি ১৬৫৬ সালে নির্মাণ করা হয়েছে। তবে মসজিদটি কে নির্মাণ করেছেন এটি নিয়ে ঐতিহাসিক মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, মালিক উদ্দিন নামে মির্জাপুর গ্রামেরই এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মালিক উদ্দিন মির্জাপুর গ্রামও প্রতিষ্ঠা করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দোস্ত মোহাম্মদ নামে জনৈক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। তবে প্রত্নতত্ত্ববিদগণ ধারণা করেন, মুঘল শাসক শাহ সুজার শাসনামলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো।

 

মির্জাপুর শাহী মসজিদ মির্জাপুর শাহী মসজিদ


মির্জাপুর শাহী মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। মসজিদটির সামনের দেওয়ালে চিত্রাঙ্কন ও বিভিন্ন কারুকার্য রয়েছে যেগুলো একটি অপরটি থেকে আলাদা। মসজিদটিতে একই সারিতে তিনটি গম্বুজ রয়েছে। প্রতিটি গম্বুজের কোণায় একটি করে মিনার রয়েছে। মসজিদটিতে ফারসি ভাষার একটি শিলালিপি রয়েছে যেটা থেকেই ধারণা করা হয় এটি মুঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল।
কিংবদন্তী অনুসারে, একটি ভূমিকম্পে মসজিদটির কিছু অংশ ভেঙ্গে যায় এবং ইরান থেকে মসজিদটি সংস্কারের জন্য লোক নিয়ে আসা হয়।

আটোয়ারি থেকে ফিরে আসুন পঞ্চগড় শহরে। এখান থেকে সোজা উঠবেন অমরখানার সিএনজিতে। দেখতে যাচ্ছি মহারাজার দিঘিতে আর সঙ্গে সুপ্রাচীন ভিতরগড় দূর্গনগরীতে। 
পৃথু রাজা এই দিঘীটি খনন করেন। কথিত আছে পৃথু রাজা পরিবার-পরিজন ও ধনরত্ম সহ ‘কীচক’ নামক এক নিম্ন শ্রেণীর দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে তাদের সংস্পর্শে ধর্ম নাশের ভয়ে উক্ত দিঘীতে আত্মহনন করেন। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে এই দিঘির পাড়ে মেলা বসে। দিঘির পাড় থেকে চা বাগান দেখতে পাবেন। ঘুরতে পারেন ওখানেও।

দিঘির পাশেই ভিতরগড় দুর্গনগরী। 
এটি মধ্যযুগের একটি দুর্গ নগরী। সম্পূর্ণ এলাকার আয়তন ২৫ বর্গ কিলোমিটার। 


পুরো দুর্গটি কয়েকটি স্তরে চারটি আবেষ্টনী দেওয়াল দিয়ে বিভক্ত ও এর উত্তর দিকের দেওয়াল এবং পূর্ব-পশ্চিম দেওয়ালের কিছু অংশ ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় পড়েছে। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে বুকানন হ্যামিল্টন ভিতরগড় পরিদর্শন শেষে লিখেছিলেন যে, “ভিতরগড় নগরীটি চারটি আভ্যন্তরীক গড়ের সমবায়ে গঠিত। গড়গুলির একটি অপরটির অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত। রাজার প্রাসাদ অবস্থিত ছিল সবচেয়ে ভিতরের গড়ে। সবচেয়ে ভিতরের এবং মধ্যবর্তী নগরীর উপবিভাগ ছিল। প্রতিটি নগরী সুইচ্চ দুর্গপ্রাচীর ও সুবৃহৎ পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল যার প্রস্থ প্রায় ৫০ ফুট এবং গভীরতা ১০ থেকে ১৫ ফুট। দুর্গর প্রাচীর মাটি ও ইটের মিশ্রণে তৈরী ছিল। দুর্গ নগরীটি কয়েকটি ক্ষুদ্র নগরীতে বিভক্ত ছিল। পূর্ববাহুর সবচেয়ে বাইরের নগরীতে নিম্নবর্গীয় মানুষজন বসবাস করতো এবং স্থানটির নাম ছিরৎল হরিরঘর।”

খননকাজ চলছে ভিতরগড় এ (ছবি- bangla tribune) খননকাজ চলছে ভিতরগড় এ (ছবি- bangla tribune)


দুর্গটি নির্মাণ করেছেন পৃথু রাজ ও এটিকে তিনি রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, ১২৫৭ সালে সুলতান মুঘিসউদ্দীন কামরূপ রাজ্যআক্রমণ করলে এটি সুলতানী শাসনে চলে আসে। ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভিতরগড় অঞ্চলটি কামরূপ রাজ্যের হোসেন শাহ শাসন করেছেন। এছাড়াও এ অঞ্চলটি একসময় গৌড় ও প্রাগজ্যোতিষপুরের অংশ ছিলো বলে মনে করা হয়। খনন কাজের সময় দুর্গটিতে দুটি প্রাচীন মন্দিরও আবিষ্কৃত হয়।

এখান থেকে সোজা যাবেন শিবগঞ্জহাট। এখানেই বিখ্যাত জামালপুর জামে মসজিদ! স্থাপত্যের নিদর্শনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদগুলোর একটি জামালপুর জামে মসজিদ। 

জামালপুর জামে মসজিদ (ছবি- poriborton.com) জামালপুর জামে মসজিদ (ছবি- poriborton.com)

তাজপুর পরগনার জমিদারবাড়ি থেকে রওশন আলী নামক এক ব্যক্তি এ অঞ্চলে আসেন এবং তাঁরই কোন বংশধর পরবর্তীতে এখানে জমিদারী পান। ১৮৬২ সালে এই জমিদারবাড়ির ভিত্তি স্থাপন করে। বাড়িটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৮৬৭ সালে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

মসজিদ অঙ্গনে প্রবেশমুখে বেশ বড় সুন্দর একটি তোরণ রয়েছে। মসজিদে উপরে বড় আকৃতির তিনটি গম্বুজ আছে। গম্বুজের শীর্ষদেশ কাচ পাথরের কারুকাজ করা আছে। এই মসজিদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর মিনারগুলো নকশা। মসজিদের ছাদে মোট আটাশটি মিনার আছে। একেকটি মিনার উচ্চতা প্রায় ৩৫ ফুট এবং প্রতিটিতে নানা নকশা করা রয়েছে। এত মিনারয়ালা কোন মসজিদে দেখতে পাওয়া বিরল ব্যপার। মসজিদটির চারটি অংশে ভাগ করা। তাহলো মূল কক্ষ, মূল কক্ষের সঙ্গে ছাদসহ বারান্দা, ছাদবিহীন বারান্দা এবং ছাদবিহীন বারান্দাটি অর্ধ প্রাচীরে বেষ্টিত হয়ে পূর্বাংশে মাঝখানে চার থামের উপর ছাদ বিশিষ্ট মূল দরজা। খোলা বারান্দার প্রাচীরে এবং মূল দরজার ছাদে ছোট ছোট মিনারের নানান নকশা রয়েছে। পুরো মসজিদটির ভিতরে ও বাইরের দেয়ালগুলোতে প্রচুর লতাপাতা ও ফুলের নকশা রয়েছে।

জামালপুর জামে মসজিদজামালপুর জামে মসজিদ

 

চলে আসুন ফের পঞ্চগড় তেঁতুলিয়া রাস্তার মাথায়। এখান থেকে সোজা তেঁতুলিয়া। এখান থেকে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো কিংবা পিকনিক কর্নার ৫ টাকা রিকশা-ভ্যান ভাড়া এবং চা বাগান ও কমলা বাগান দেখতে পারেন। এগুলো সিলেট কিংবা চট্টগ্রামের চা বাগানের মতো
টিলায় নয়, এখানে চা বাগান সমতলে। 
এ দেশে অর্গানিক ও দার্জিলিং জাতের চায়ের চাষ হয় একমাত্র তেঁতুলিয়ার বাগানগুলোতেই। চা বাগানে ঘোরা শেষ হলে যাবেন বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে। তবে আমরা যাইনি। শুনেছি ভজনপুর ও তেতুলিয়া মধ্যবর্তী বুড়াবুড়ি নামক স্থানে একটি দূর্গের ভগ্নাংশের, ভদ্রেশ্বর মন্দির, শিবমন্দির ও গ্রিক ভাস্কর্ষ রীতিতে নির্মিত দুটি সমাধিসম্ভ আছে। 
তেঁতুলিয়া থেকে বাংলা বান্ধা স্থল বন্দরে চলে আসবেন। স্থলে বন্দরে ঘোরা শেষ হলে ঢাকার পথে যাত্রা।

যেভাবে যাবেন - ঢাকা থেকে বাসে দিনাজপুর যাওয়া যায়। আর ট্রেনে যেতে চাইলে পার্বতীপুর এক্সপ্রেসে যেতে পারেন।

বি:দ্র:- প্রকৃতি ও পুরাকীর্তি আমাদের সম্পদ। দয়া করে পুরাকীর্তির গায়ে আঘাত করবেন না, প্রকৃতিতে যত্রতত্র অপচনশীল ময়লা ফেলবেন না।