লেখা- আহমাদ ইশতিয়াক

এই ভ্রমণে আমরা যা দেখেছি-

কান্তজীর মন্দির, রামসাগর , মির্জাপুর জামে মসজিদ, ভিমটিয়া শিবমন্দির, রাজভিটা, ঢোলহাট মন্দির, ভিতরগড় দূর্গনগরী, চা বাগান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর সহ আরও কয়েকটি স্থাপত্য নিদর্শন।

প্রথমে রাতের বাসে চলে যাবেন দিনাজপুর। সকালে দিনাজপুর নেমে ফ্রেশ হয়ে নিন। 
প্রথমে গন্তব্য রাম সাগর। দিনাজপুর শহর থেকে রামসাগর যাওয়ার সিএনজি পাবেন। 

 

কান্তজিউ মন্দির এর বাইরের প্রাচীন অন্য এক মন্দিরের ধ্বংসস্তুপ কান্তজিউ মন্দির এর বাইরের প্রাচীন অন্য এক মন্দিরের ধ্বংসস্তুপ

১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রচণ্ড এক খরা দেখা দিলে পানির অভাবে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে হাজার হাজার প্রজা। এসময় দয়ালু রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নাদেশ পেয়ে একটি পুকুর খনন করেন। মাত্র ১৫ দিনে এর খনন কাজ সম্পন্ন হয়।কিন্তু সেই পুকুর থেকে পানি না ওঠায় একসময় রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন যে, তাঁর একমাত্র ছেলে রামকে দীঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে। স্বপ্নাদিষ্ট রাজা, দীঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। তারপর এক ভোরে যুবরাজ রামনাথ সাদা পোষাকাচ্ছাদিত হয়ে হাতির পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন সেই দীঘির দিকে। দীঘির পাড়ে পৌঁছে যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দীঘির তলা থেকে অঝোর ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে যুবরাজ রামনাথসহ পানিতে ভরে গেল বিশাল দীঘি।


রামসাগর বাংলাদেশে মানুষের তৈরী সর্ববৃহৎ দিঘি। লম্বায় রাম সাগর ১ কিলোমিটারেরও বেশী। 
বর্তমানে রাম সাগর বাংলাদেশের একটি জাতীয় উদ্যান। 


এখান থেকে দিনাজপুর ফিরে আসুন। কারন আমাদের পরের গন্তব্য কান্তজীর মন্দির। দিনাজপুর এসে উঠে পড়ুন সিএনজি কিংবা বাসে। নামবেন দশমাইলের একটু পরে নদীর পাড়ে। এই গ্রামটির নাম কান্তনগর। এই গ্রামেই কান্তজীর মন্দির। 


উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম কয়েকটি স্থাপনার নকশার একটি হলো কান্তজীর মন্দির। 
তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তাঁর শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ করেন।

 

কান্তজিউ মন্দির কান্তজিউ মন্দির

মন্দিরের বাইরের দেয়াল জুড়ে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫,০০০-এর মতো টেরাকোটা টালি রয়েছে। উপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। মন্দিরের চারদিকের সবগুলো খিলান দিয়েই ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়। মন্দির প্রাঙ্গণ আয়তাকার হলেও, পাথরের ভিত্তির উপরে দাঁড়ানো ৫০ফুট উচ্চতার মন্দিরটি বর্গাকার। নিচতলার সব প্রবেশপথে বহু খাঁজযুক্ত খিলান রয়েছে। দুটো ইটের স্তম্ভ দিয়ে খিলানগুলো আলাদা করা হয়েছে, স্তম্ভ দুটো খুবই সুন্দর এবং সমৃদ্ধ অলংকরণযুক্ত। মন্দিরের পশ্চিম দিকের দ্বিতীয় বারান্দা থেকে সিঁড়ি উপরের দিকে উঠে গেছে। মন্দিরের নিচতলায় ২১টি এবং দ্বিতীয় তলায় ২৭টি দরজা-খিলান রয়েছে, তবে তৃতীয় তলায় রয়েছে মাত্র ৩টি করে।

নয়াবাদ থেকে চলে আসুন কাহারোল। এখান থেকে পীরগঞ্জের গাড়ি পাবেন। রাতে পীরগঞ্জে থাকবেন। পীরগঞ্জে থাকার হোটেল পাবেন। আমরা ছিলাম ডাক বাংলোতে। হোটেলে ব্যাগ রেখে এবার বেরিয়ে পড়ুন। যাবেন ভিমটিয়া বাজারে। এখানে প্রাচীন ও ভঙ্গুর শিবমন্দির আছে। এই স্থাপনা প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন। এটির এখনও উত্তর ও পশ্চিমের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণের ভেঙ্গে পড়া দেয়ালে একসময় দরজা ছিল। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে নক্শা আছে । এটির উচ্চতা প্রায় ৪০ ফুট।

ফিরে আসুন পীরগঞ্জে। সন্ধ্যার পর একটু ঘুরে দেখুন ছোট এই মফস্বলটা। রাতে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ুন। কারন আগামীকাল দেখার আছে বহুকিছু। ভোরে উঠে প্রথমে যাবেন রাজভিটায়। এটা জাবরহাটের হাটপাড়ায়। হাটপাড়ায় পর্যন্ত যাওয়ার সিএনজি পাবেন। এখানে একপাশে টাঙ্গন নদী।

রাজভিটা লম্বায় প্রায় আধা কিলো, আর পাশে তিনশো মিটার। এখানে খোঁড়ার সময় প্রাচীন কষ্টিপাথরের শিলালিপিসহ পুরনো ইটের অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছিলো আরও পাওয়া গেছে কালো পাথরের বড় বড় খন্ড। ২ ফুট ৬ ইঞ্চি ( ১ ফুট ৩ ইঞ্চি মাপের প্রাপ্ত শিলা লিপিটির ওজন আনুমানিক ১ মণ। এতে যে অক্ষর খোদাই করা রয়েছে তা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এতে যে, চিত্র খোদাই করা আছে তা উট, শূকর ও ঘোড়ার বলে ধারণা করা হয়।

এগুলো শের শাহ আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন । রাজভিটা থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে শের শাহ্ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক পূর্ণিয়া সড়ক থাকার কারণে অনেকেই রাজভিটাকে শের শাহ্ আমলের জমিদারীর নির্দশন বলে ধারণা করেন।এখানে এরপর দেখবেন থুমনিয়াতে নদীর পাড়জুড়ে বিস্তৃত শালবন। 
হযরত সিরাজউদ্দিন আউলিয়া (রঃ) মাজার ও হযরত দরবগাজী (রঃ) এর মাজার দেখবেন এরপর। 
এরপর যাবেন ঢোলহাট মন্দিরে। 
ঢোলহাট মন্দিরটি একটি লম্বা প্রাচীন উঁচু গোলাকার এক কক্ষের মন্দির।উপরে ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। একসময় এর দেয়ালে কারুকার্য ছিল তা বর্তমান জীর্ন অবস্থা দেখেও বুঝা যায়। এর অভ্যন্তরে একটি কক্ষ আছে। অভ্যন্তরে একটি বাছুর দেবতার প্রাচীন মূর্তি আছে। 
ফিরে আসুন পীরগঞ্জ হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে। ঠাকুরগাঁও থেকে আটোয়ারি। 

(চলবে...)