নবাব আলীবর্দ্দি’র জামাতা অর্থাৎ নবাব সিরাজুদ্দোউলার খালুজান নবাব নওয়াজিস মহম্মদ সে সময় ঢাকার শাসন কর্তা ছিল। তিনি তার স্ত্রী মেহেরুননেসা’র (ঘষেটি বেগম) বসবাসের জন্য অপূর্ব সুন্দর একটি ত্রিতল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল দিয়ে প্রাসাদটি ঘেরা ছিল। নাম ছিল “সাংহী দালান”। সেই ঝিলে মোতির চাষ করা হতো।

একসময়ের জমজমাট আলোঝলমলে বিলাসবহুল প্রাসাদ হারিয়ে যায় কালের আবর্তে, যতটুকু বেচে থাকে তাও হয়ে পড়ে জৌলুসহীন। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পর অবশেষ ভারত সরকারের সুনজরে পড়ে মোতিঝিল সংলগ্ন এলাকা সংস্কার করে মোতিঝিল পার্ক তৈরি করা হয় ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা হয়। ২০১৫ তে উন্মুক্ত করা হয় দর্শনার্থীদের জন্য। 

সাংহী দালানের প্রবেশপথের তোরণ জরাজীর্ণ ছিল। ইতিহাসবিদদের পরামর্শ নিয়ে সেই কালের স্থাপত্যের আঙ্গিকে নতুন তোরণ গড়া হয়েছে। মুঘল গার্ডেন, ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেন তৈরির সময়েও ইতিহাসকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রায় সাত হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি করা রয়েছে ফলের বাগান। সেখানে ৪৩টি প্রজাতির আমের গাছ ও বিভিন্ন  ফলের গাছ রয়েছে। প্রজাপতি আকর্ষণ করবে এমন ফুল ও ফলের গাছ রয়েছে প্রজাপতি আকারের বাটারফ্লাই গার্ডেনে। প্রায় ২৫৫ একর জমির নিয়ে গড়ে ওঠা অশ্বক্ষুরাকৃতি ঝিল রেলিং দিয়ে ঘেরা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার তৈরি হচ্ছে। লোকগান ও লোকনৃত্য পরিবেশনের জন্য খোলা আকাশের নিতে মুক্তমঞ্চ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ন’টি বিলাসবহুল কটেজ। ফুড কোর্টের পাশাপাশি থাকছে ক্যাফেটেরিয়াও। 

 

রাতের মোতিঝিলরাতের মোতিঝিল

 

 

নবাব সিরাজ তার খালার প্রাসাদটি খুব পছন্দ করতো। সেই মোতাবেক সেও “হিরাঝিল” নামে পরবর্তীতে অপরুপ একটি প্রাসাদ গড়েছিল। “সাংহী দালান” সংলগ্নে ১৭৫০ খ্রীঃ একটি মসজিদও নির্মাণ করেছিল নওয়াজিস। মসজিদ টি “কালা” মসজিদ নামে বিখ্যাত। কথিত আছে, এই মসজিদে সিরাজদ্দৌলার দাদু আলিবর্দি খাঁ নিয়মিত নমাজ পড়তে আসতেন। দাদুর হাত ধরে ছোট্ট সিরাজও মতিঝিল মসজিদে আসতেন। 

সেখানে পৌঁছাতেই, মাগরিবের আজান শুনতে পেলাম। নামাজ আদায় করলাম সে মসজিদেই।

কালা মসজিদ কালা মসজিদ

মসজিদের বাইরে ছোট্ট সমাধি ক্ষেত্র রয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি সমাধির পাশে সিরাজের অনুজ একরামউদৌল্লা ও নবাব নওয়াজিস মহম্মদের সমাধিও রয়েছে।

আলিবর্দির বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম ছিলেন নিঃসন্তান। সিরাজের ছোট ভাই এক্রামুদ্দৌলাকে দত্তক নিয়ে তিনি সন্তান স্নেহে পালন করতেন। অল্প বয়সে বসন্ত রোগে মৃত্যু হয় এক্রামুদ্দৌলার। মতিঝিল মসজিদ চত্বরেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। এক্রামুদ্দৌলার মৃত্যুর শোক সামলাতে না পেরে শোথরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ঘসেটি বেগমের স্বামী নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ। মতিঝিল মসজিদ চত্বরে পাশাপাশি দুজনেরই সমাধি রয়েছে।

মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রাচীরবেষ্টিত চারটি সমাধি আছে। ২টি শ্বেতপাথরের, ১টি কালো পাথরের ও ১টি ইটের তৈরি। শ্বেত পাথরের সমাধি দুটি নওয়াজেস মহম্মদ খাঁ ও এক্রামুদ্দৌলার সমাধি। কালো পাথরের সমাধিটি এক্রামুদ্দৌলার শিক্ষকের। আর ইটের সমাধিটি এক্রামুদ্দৌলার ধাত্রীর। এছাড়াও প্রাচীরের বাইরে একটি ইটের সমাধি আছে, সেটি নওয়াজেস মহম্মদ খাঁর সেনাপতি সমসের আলি খাঁর সমাধি। বর্তমানে মসজিদটি ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দ্বারা সংরক্ষিত।

সন্ধ্যায় মোতিঝিলের বিশাল জলরাশির ভেতর থেকে, প্রচুর জলচর পাখির কলরব শোনা যাচ্ছিল। তবে পাখিদেরকে দেখা যাচ্ছিল না। 

সম্রাট অনুজের সমাধিক্ষেত্র সম্রাট অনুজের সমাধিক্ষেত্র

বর্তমানে আবার প্রায় তিনশো বছর আগের নবাবি আমলের ঐতিহাসিক মোতিঝিলের শুক্তিতে মোতি বা মুক্তকে ফেরানোর সেই কর্মযজ্ঞ শুরুও হয়েছে। মুক্তো চাষের সম্ভবনা খতিয়ে দেখতে গত জুন মাসে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ’ (আইসিএআর) এর অধীনে থাকা ‘সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অব ফ্রেস ওয়াটার অ্যাকোয়া কালচার’ (সিআইএফএ)-এর বিজ্ঞানীরা মোতিঝিল ঘুরে গিয়েছেন। 

প্রথম বার  সিআইএফএ-এর বিজ্ঞানীরা মোতিঝিলে নিজেরাই মুক্তচাষ করবেন। তারপর এখানকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নিজেরা চাষ করবেন। জয়ন্তবাবু বলেন, ‘‘নবাবি আমলে মোতিঝিলে মারগরিটিফেরা প্রজাতির ঝিনুকে মুক্তোচাষ হত। এখন সেই প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এখানে এখন মুক্তোচাষ করা হবে ল্যামিলিডেনস প্রজাতির ঝিনুকে।

দেখা যাক, সম্মিলিত প্রচেষ্টা মোতিঝিলের হারানো দিন ফিরিয়ে আনতে পারে কিনা!