লেখা ও ছবিঃ  আহমাদ ইশতিয়াক  

চাঁদপুরে ভ্রমণে সাধারণত আমরা রাতের লঞ্চে ভ্রমণে গিয়ে সকালে চাঁদপুরের আশপাশ ঘুরে চলে আসি। কিন্তু চাঁদপুরে একদিনের ভ্রমণে অনেককিছুই আমরা ঘুরতে পারি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা তেমনই দিয়েছিলাম এক দিনের চাঁদপুর ভ্রমণ।

সবমিলিয়ে খরচ পড়েছে মাত্র ৮০০ টাকা।

এই প্ল্যানে আমরা যা দেখেছি এবং আপনি যা দেখবেন 
রূপসা জমিদার বাড়ি, শোল্লা রাজবাড়ি, লোহাগড়া মঠ, বড়কূল জমিদার বাড়ি, বলাখাল জমিদার বাড়ি। 
সঙ্গে শহরের তিন নদীর মোহনা ও হাজীগঞ্জ বড় জামে মসজিদ ও লঞ্চ ভ্রমণ ফ্রি।

যেভাবে দেখবেন- প্রথমে ঢাকা থেকে চাঁদপুরের রাত সাড়ে বারোটার লঞ্চে উঠে পড়ুন। সোজা লঞ্চের ছাদে চলে যাবেন। জোসনা রাত হলে তো খাপে খাপ, অন্যদিন হলেও সমস্যা নেই। বাকিরাত টুকু রাতের নিস্তব্ধ নদী আর আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকুন তারাভরা আকাশ।
ভোরে লঞ্চ থেকে নেমে নাস্তা করে চলে যাবেন চাঁদপুর বড় স্টেশন। এখান থেকে নৌকায় উঠে নদীতে দেখবেন তিন নদীর মোহনা। দুই দিকে স্রোতের আকৃতি ভিন্ন।
ফিরে আসুন এবার। চলে আসুন বাস স্ট্যান্ডে। উঠে পড়ুন ফরিদগঞ্জ উপজেলার বাসে। ফরিদগঞ্জ এসে রোডের বাঁ পাশে রূপসা বাজারের লোকাল সিএনজি পাবেন। সিএনজি জমিদার বাড়ির গেইটের পাশেই নামিয়ে দিবে। 
বাংলাদেশের জমিদারদের জন্য এক আদর্শের নাম রূপসার জমিদার।

এখন থেকে প্রায় আড়াইশ’ বছর পূর্বে রূপসার খাজুরিয়া এলাকা সিংগেরগাঁও নামে পরিচিতি ছিলো। সেখানে বাইশ সিংহ পরিবার নামে এক হিন্দু পরিবার বসবাস করতো। সেই সিংহ পরিবারের জমিদারির পরিসমাপ্তি ঘটলে আহম্মদ রাজা চৌধুরী রূপসা জমিদার বাড়িতে জমিদারি শুরু করেন।
আর তার মাধ্যমেই রূপসায় জমিদারি শুরু হয়। তারপর এ জমিদারি দায়িত্ব এসে পড়ে মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর উপর। মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী ছিলেন দানশীল ব্যক্তি। মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী রূপসায় জমিদারির সময়ে এলাকার অসহায়দেরকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। তার মৃত্যুর পর রূপসার জমিদারি ভার গ্রহণ করেন তারই পুত্র আহমেদ গাজী চৌধুরী।

রূপসা জমিদার বাড়ি দেখে ফের সিএনজিতে যাবেন শাল্লা রাজবাড়িতে। এটাও ফরিদগঞ্জেই। তবে রূপসা থেকে কাছে। শাল্লা বাজারেই। সেখান থেকে ফিরে আসুন ফরিদগঞ্জ বাজারে। টমটমে উঠে আউয়ালের মিষ্টির দোকানে এসে নামাতে বলুন। দোকানের নাম আউয়াল সুইটস। এক মিষ্টি খেয়ে চোখ বন্ধ করে বলবেন দেন, আর বিল দেয়ার সময় খেয়াল করবেন, কোন ফাঁকে খেয়ে ফেলেছেন দশটা আস্ত! ফরিদগঞ্জ গিয়ে আউয়ালের মিষ্টি না খাওয়া মানে মহাপাপ করা। এবার মূল সড়কি এসে উঠে পড়ুন লোহাগড়া মঠের দিকে। 
প্রায় চার থেকে সাত শতাব্দী পুরাতন প্রাচীন এই মঠ ফরিদগঞ্জ উপজেলার লোহাগড় গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাশে অবস্থিত।
লোহাগড় গ্রামের লোহাগড় মঠ লৌহ এবং গড় নামে দুজন জমিদারের নামানুসারে এলাকাটির নাম রাখা হয় লোহাগড়। জমিদারদের নামানুসারে গ্রামের সাথে মিল রেখেই তাদের স্থাপত্যশৈলিরও নাম রাখা হয় লোহাগড় মঠ।


আজ থেকে প্রায় সাত'শ বছর পূর্বে জমিদাররা এই এলাকাটিতে রাজত্ব করতেন। মঠের মত বিশালাকার দুটি প্রাসাদ। এই প্রাসাদেই জমিদাররা তাদের বিচারকার্য সম্পাদন করতেন। বিভিন্নত তথ্যে যানা যায় প্রতাপশালী দুই রাজা লৌহ এবং গড় ছিলেন অত্যাচারী রাজা। তাদের ভয়ে কেউ মঠ সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে যেতে শব্দ করতেন না। জনৈক এক বৃটিশ কর্তাব্যক্তি ঘোড়া নিয়ে প্রাসাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, "কেমন রাজা রে এরা বাবু রাস্তা গুলো ঠিক নেই!”। পরবর্তীতে একথা জমিদারের গোলামরা শোনে লৌহ ও গড় অবহিত করে।
কথিত আছে, ওই কর্তাব্যক্তির জন্য নদীর তীর হতে জমিদার বাড়ি পর্যন্ত সিকি ও আধুলি মুদ্রা দিয়ে রাস্তা তৈরী করা হয়। যার প্রস্ত ছিল ২ হাত, উচ্চতা ১ হাত ও দৈর্ঘ্য ২০০ হাত। পরবর্তীতে ঐ রাস্তাটিতে স্বর্ণ-মুদ্রা দ্বারা ভরিয়ে দেয়া হয় এবং যখন ঐ ব্যক্তি রাস্তাটি ধরে আসছিলো তখন এ দৃশ্য দেখে চমকে উঠেন। রাজার শীর্ষরা তার প্রতি অত্যাচার করেন।
জমিদারী আমলে সাধারণ মানুষ এদের বাড়ির সামনে দিয়ে চলাফেরা করতে পারতো না। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদীতে নৌকা চলাচল করতো নিঃশব্দে। ডাকাতিয়া নদীর কুলে তাদের বাড়ির অবস্থানের নির্দেশিকাস্বরূপ সুউচ্চ মঠটি নির্মাণ করেন। তাদের আর্থিক প্রতিপত্তির নিদর্শনস্বরূপ তারা মঠের শিখরে একটি স্বর্ণদ­ স্থাপন করেন।
জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর ওই স্বর্ণের লোভে মঠের শিখরে উঠার অপচেষ্টায় অনেকে গুরুতর আহত হয়। শুধু তা-ই নয় কেউ কেউ মৃত্যুবরন করেছে বলেও শোনা যায়।
মঠটি কে এবং কবে নির্মাণ করেছিলেন এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। তবে, কিছুসূত্র থেকে জানা যায় যে ওই দুই ভাই এই মঠটি নির্মাণ করেছিলেন। শুরুতে এখানে পাশাপাশি পাঁচটি মঠ ছিল তবে বর্তমানে এখানে মাত্র তিনটি মঠ অবশিষ্ট রয়েছে। বর্তমানে টিকে থাকা তিনটি মঠ ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতার। সবচেয়ে লম্বা মঠটি সবচেয়ে সুন্দর যেটির উপরিভাগে নিম্নভাগের চেয়ে অনেক বেশি নকশার কাজ রয়েছে। এই মঠটির উপরিভাগ দেখতে অনেকটা প্যাগোডার উপরিভাগের মত। মঠটির উপরে কয়েকটি গর্ত রয়েছে যেখানে টিয়াপাখি বাস করে।

এবার ফিরে আসুন মূল রাস্তায়। ফের চাঁদপুর শহরে যাবেন না। নামবেন ওয়ারল্যাস মোড়ে। ওখান থেকে উঠবেন হাজীগঞ্জের বাসে। এবং নামবেন বলাখাল বাজারে। হাতের ডানপাশে হেঁটে ঢুকবেন জমিদার বাড়িতে। এই জমিদার বাড়ির একাংশ এখন ভঙ্গুর। যদিও তা খুব নগন্য অংশ। বাড়ির একপাশে জমিদারের বংশধর থাকেন, অন্যপাশ লাকড়ি রাখার কাজে। স্তব্ধ হয়ে যাবেন ফটকের গায়ের নিপুণ কারুকার্যে। এই বাড়ির ঢোকার সময় পাবেন সূপ্রাচীন ঘাট সমেত পুকুর যদিও ঘাট এখন ভেঙ্গে অনেকটাই বিলুপ্ত।

সুরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী ও দেবেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী তাদের পিতা - যোগেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরী ছিলেন বলাখাল এস্টেটের জমিদার। তারা অত্যমত্ম দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। বর্তমান বলাখাল রেলস্টেশন ও বলাখাল জে এন উচ্চ বিদ্যালয় তাদের দানকৃত সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা যায়। ১২.৫২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই জমিদার বাড়ি।

এবার ফিরে আসুন হাজীগঞ্জ বাজারে। হাজীগঞ্জ বাজারেই দেশের অন্যতম বৃহত্তম জামে মসজিদ "হাজীগঞ্জ জামে মসজিদ"। বাংলা একাদশ শতকের কাছাকাছি সময়ে হযরত মকিম উদ্দিন (রঃ) নামে এক বুজুর্গ অলীয়ে কামেল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরব ভূমি হতে স্ব-পরিবারে চাঁদপুরের বর্তমান হাজীগঞ্জ অঞ্চলে আসেন। পরবর্তীতে তারই বংশধর হাজী মুনিরম্নদ্দিন (মনাই গাজী) এর প্র-পৌত্র হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারী (রঃ) হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক জামে মসজিদের জন্য জায়গা ওয়াকফ করে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

মসজিদ দেখে সোজা চলে যান হাজীগঞ্জ বাজারের পপুলার হাসপাতালের সামনে। এখান থেকে বড়কূল বাজারের সিএনজি। 
বাজারের সামনের দিকে দেখতে পাবেন দিঘি। দিঘির পেরিয়ে একটু হাঁটলেই বড়কূল জমিদার বাড়ি।
মুক্তিযুদ্বের স্মৃতিবিজড়িত বড়কূল জমিদার বাড়ি। ১৯৭১ পাকহানাদার বাহিনী বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এখনো বাড়িটি আছে অবহেলার নিদর্শন হয়ে। গোটা বাংলাদেশে আয়তনে সর্ব বৃহত্তম জমিদার বাড়িগুলোর একটি বড়কূল জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়িতে মোট পাঁচটি স্থাপনা। ছিলো সাতটি। বাকি দুটো অবহেলায় এখন কেবল ইটের দেয়াল ছাড়া কিছুই নেই। এতোখানি অবহেলা বোধহয় আর কোন জমিদার বাড়িতে হয়নি! বাড়িটিকে স্থানীয়রা চিনে

ভাগিত্যা বাড়ি বলে। ভাগিত্যা মানে ভাগ্যবানের বাড়ি। মালিক ছিলেন জমিদার পদ্মলোচন সাহা। তিনি ছিলেন শৌখিন। বাড়িটির
ভেতর-বাইরে ঝলমলে। 
বাইরে চিনি টিকরির কারুকাজ, ভেতরে ঝাড়বাতি। পূজোর ঘর, অতিথিশালা, জমিদারের থাকার ঘর- সব
আলাদা আলাদা। প্রাঙ্গণে স্মৃতি মন্দিরও
আছে। ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে বাবা লোকনাথের মন্দির। ডান
দিকে আছে বড় একটি পুকুর। জনশ্রুতি আছে, জমিদারের মায়ের পায়ে কাদা লাগবে বলে পুকুরের তলদেশ ইট- সুরকি দিয়ে পাকা করা হয়েছিল। পুকুরের পশ্চিমপাড়ে আছে দুটি পাকা ঘাট। পুকুর পেরিয়ে সামনে এগোলে দুর্গামন্দির। ভবনগুলোর নকশায়
মোগল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
বাড়ির আয়তন প্রায় চার একর।
বাড়িতে বর্তমানে থাকেন পদ্মলোচন সাহার চতুর্থ প্রজন্মের বংশধরেরা।
বড়কুল গ্রামে আরো আছে পোদ্দারবাড়ি ও
রাধেশ্যাম সাহার বাড়ি। দেখতে পারেন এই বাড়ি গুলোও।

ফিরে আসুন হাজিগঞ্জ হয়ে চাঁদপুর শহরে। কাউকে বললেই চিনিয়ে দিবে কালীবাড়ি মোড়। আরেক অসাধারণ খাবারের দোকান। নাম ওয়ান মিনিট। এদের আইসক্রিম খুব বিখ্যাত, তবে দধি ও মিষ্টি খেয়ে দেখতে পারেন। পুরোই পয়সা উসুল হবে!

এবার ফিরে আসুন লঞ্চ ঘাটে, ঢাকায় ফেরার পালা। ব্যস্ততম ভ্রমণের দিনশেষে ক্লান্তিকর বুজে আসবে চোখ, কিন্তু আপনি জানেন এ প্রশান্তিতে! আর রাতের শেষ লঞ্চে ফিরতে চাইলে আসুন বড় স্টেশনের তিন নদীর মোহনার তীরে! প্রান্তর ভেজানো জোসনা কিংবা তারা ভরা আকাশ দেখে নিমেষেই মনের অজান্তেই বলে উঠবেন, "বাহ জীবনটা কি অপূর্ব সুন্দর"!

যেভাবে যাবেন- ঢাকা থেকে লঞ্চে চাঁদপুর।