‌বাংলাদেশের আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে প্রাচীন সভ্যতা। মসজিদের শহর হিসাবে বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর অনেক খ্যাতি। কিন্তু ক'জন মানুষ জানে এর বাহিরেও একটা প্রাচীন শহর আছে। যার অস্তিত্ব এখনও জানান দিচ্ছে কালের সাক্ষী হিসাবে।

প্রাচীন শহরপ্রাচীন শহর

প্রাচীন এই শহর মোহাম্মদাবাদের ইতিহাস অনেক পুরানো। ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার। প্রায় তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখানে আছে প্রাচীন শহর মোহম্মদাবাদ। বর্তমানের ঝিনাইদহের বারবাজার এলাকা প্রাচীন কালে ছাপাইনগর হিসাবে খ্যাতি ছিল। রাজত্ব চলতো এখানে বৌদ্ধ হিন্দু রাজাদের। খান জাহান আলী তার বারজন সহচর নিয়ে আসেন এই ছাপাইনগর। সেখান থেকেই এর নাম বারোবাজার। যুদ্ধ কিংবা মহামারিতে ছাপাইনগর ধ্বংস হয়ে যায়। থেকে যায় প্রাচীন ইতিহাস।

পীরপুকুর মসজিদপীরপুকুর মসজিদ

১৯৯৩ সালের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে বের হয়ে আসে ১৫টি স্থাপনা যার বেশির ভাগই প্রাচীন মসজিদ। এগুলো হচ্ছে সাতগাছিয়া মসজিদ, ঘোপের ঢিপি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম প্রত্নস্থান, গোড়ার মসজিদ, পীর পুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, খড়ের দিঘি কবরস্থান, পাঠাগার মসজিদ ও বাদেডিহি কবরস্থান।

পীরপুকুর মসজিদপীরপুকুর মসজিদ

এত ছোট জায়গার মধ্যে কত গুলা প্রত্নস্থান। জোড়বাংলা মসজিদ খননের সময় একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে পুসাইন ৮০০ হিজরি। এ থেকে আন্দাজ করা যায় স্থাপনা গুলো প্রায় ৬৫০ বছর পুরানো। ‌এ স্থাপনার গুলার মধ্যে সবচেয়ে আর্কষণীয় মসজিদ হচ্ছে গোড়ার মসজিদ। এ মসজিদের বাহিরের দিকে রয়েছে টেরাকোটার অপূর্ব কাজ।

টেরাকোটার অপূর্ব কাজটেরাকোটার অপূর্ব কাজ

এর খানিকটা দূরেই রয়েছে গলাকাটা মসজিদ। জনশ্রুতি আছে সে সময়ের এক অত্যাচারী রাজা প্রজাদের বলি দিয়ে এই মসজিদের দীঘির মধ্যে লাশ ফেলে দিত। সে অনুযায়ী এর নাম হয়েছে গলাকাটা মসজিদ। এর পর বলা যায় এই শহরের সবচেয়ে বড় মসজিদের কথা। সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ। প্রায় ৭৭ ফুট লম্বা ও ৫৫ ফুট চওড়া মসজিদের ভেতরে আছে ৪৮টি পিলার। পশ্চিম দেয়ালে লতা-পাতার নকশা সমৃদ্ধ তিনটি মিহরাব আছে।

গলাকাটা মসজিদগলাকাটা মসজিদ

সর্বপ্রথম গ্রামবাবাসী এই মসজিদটিকে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করে। এরপর বিশেষ ভাবে বলা যায় নুন গোলা, শূকর মল্লিক মসজিদের কথা। এই শহরের সবচেয়ে বড় এবং ছোট এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ হচ্ছে যথাক্রমে নুনগোলা ও শূকর মল্লিক।

পীরপুকুর মসজিদ

১৯৯৩-৯৪ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই স্থানে খনন করে একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। মসজিদের গম্বুজগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু চারপাশের দেয়ালগুলো কয়েক ফুট উচ্চতা পর্যন্ত বিদ্যমান। [২][৩] প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা মসজিদটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। 

পীরপুকুর মসজিদপীরপুকুর মসজিদ

নামকরণ

ঢিবিটির পাশে রয়েছে একটি বড় দিঘী, যার নাম পীরপুকুর। এই পীরপুকুরের নামে ঢিবিটির নামকরণ করা হয় পীরপুকুর ঢিবি ও পাশে মসজিদটি পীরপুকুর মসজিদ নামে পরিচিত।

গোরার মসজিদ

গোরার মসজিদটি আকৃতিগতভাবে বর্গাকৃতির। মসজিদের পূর্বে রয়েছে একটি বড় ঘাটবাঁধানো পুকুর যদিও বর্তমানে পুকুর ঘাটটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। মসজিদটিতে মাত্র একটি গুম্বজ রয়েছে। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে বারোবাজারে প্রত্নতত্ত্বের সন্ধানে খনন কাজ শুরু হলে আরও বেশ কয়েকটি মসজিদের সাথে এই মসজিদটিও আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কারের পরপরই এ মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রকাশিত প্রত্নতত্ত্ব তালিকাতে স্থান করে নেয়।

গোরার মসজিদগোরার মসজিদ

কিংবদন্তী অনুসারে, গোরাই নামে একজন সুফী এ অঞ্চলে এই মসজিদটিতে বসবাস করতেন। তাঁর নাম অনুসারে এ মসজিদকে গোরাই মসজিদ হিসেবে ডাকা হয়। মসজিদের পাশে আবিষ্কৃত একটি কবরকে স্থানীয়রা গোরাই দরবেশের কবর বলে মনে করেন। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ ধারণা করেন, গোরাই মসজিদটি খুব সম্ভবত হোসেন শাহ বা তার পুত্র নসরত শাহ-এর শাসনামলে তৈরি করা হয়েছে।

জোড়বাংলা মসজিদ

বারোবাজার মৌজায় এ মসজিদটি অবস্থিত। ১৯৯২-৯৩ সালে প্রত্নতত্ব বিভাগ কর্তৃক খননের ফলে আবিস্কৃত হয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি। এর পাশে কয়েকটি কবর আছে। ছোট ছোট সুন্দর পাতলা ইটে গাঁথা এ মসজিদটি ১০/১১ ফুট উচুঁ প্লাটফর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত।

জোড়বাংলা মসজিদজোড়বাংলা মসজিদ

মসজিদে প্রবেশের পথটি উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত। এ প্রবেশ পথ থেকে দীঘি পর্যন্ত ইটের তৈরী বিশাল সিঁড়ি নেমে গেছে। বর্গাকৃতি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি পুনঃ নির্মিত হয়েছে। এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। পশ্চিম দেয়ালে অর্ধবৃত্তাকারে পোড়ামাটির নক্সা ও অলংকরণে ৩টি মেহেরাব আছে। চুন বালির প্লাস্টারের কাজও লক্ষ্য করা যায় । মেহেরাবের দুই পাশেই ছোট পিলার আছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি ফুল ও লতাপাতা অংকিত ইটের তৈরী। স্থাপত্য শিল্পের সৌন্দর্য ও কারুকার্যময় এ দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি মুসলিম সভ্যতা ও উৎকর্ষের নিদর্শন।

জোড়বাংলা মসজিদজোড়বাংলা মসজিদ

সম্ভবত ৮০০ হিজরীতে শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে নুসাই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। সাদিকপুর মসজিদ, খান জাহান আলী (রাঃ) মাজার সংলগ্ন মসজিদ, ডুমুরিয়ার সারসনগর মসজিদ, অভয়নগরের শুভারাদা মসজিদ এবং বাগেরহাট বিবি কেরানী মসজিদর নির্মাণ শৈলীর সাথে এ মসজিদের সাদৃশ্য আছে।জোড়বাংলা মসজিদের উত্তরের পুকুরটি অন্ধপুকুর নামে পরিচিত। সুলতান মাহমুদ শাহের শাসনামলে মুসল্লীদের ওজু ও পানীয় জলের প্রয়োজনে সম্ভবত এ পুকুর খনন করা হয়েছিল। মসজিদের উত্তর-পূর্বের প্রবেশ দ্বার থেকে অন্ধপুকুরের তলদেশ পর্যন্ত ইট বাঁধান সিঁড়ির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ

১৯৮৩ সালে স্থানীয় জনগণ বিরাট আকারের ঢিবির কিছু অংশ খনন করে। খননের ফলে ১৬টি থাম ও পোড়ামাটির নকশাসহ ৫টি মেহরাব বিশিষ্ট এই মসজিদ আবিস্কার করে। পরে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৯০ সালে খনন করে ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির ধংসাবশেষের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। মসজিদটি খান জাহান আলী নির্মিত ষাট গম্বুজ মসজিদ ও তুঘলকি স্থাপত্যশৈলী অনুরূপ। প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীতে খান জাহান আলী তার অনুচরদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে বাংলায় আসেন। সেই সময়েই তার কোন অনুচর কর্তৃক এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে মাটি চাপা পরে।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদসাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ

নুনগোলা মসজিদ

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৯৪ সালে এই স্থানে খনন কাজ পরিচালনা করে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পায়। গম্বুজটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। চারপাশের দেয়ালগুলো টিকে আছে নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, এটি ছিল একটি বাদশাহ-কি-তখত বা রাজকীয় গ্যালারি, যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত।
 

নুনগোলা মসজিদনুনগোলা মসজিদ

নামকরণ

ঢিবিটির পূর্ব দিকে নুনগোলা দিঘী নামে একটি বড় আয়তাকৃতির পুকুর রয়েছে। এই নুনগোলা দিঘীর জন্য ঢিবিটি নুনগোলা ঢিবি ও মসজিদটি নুনগোলা মসজিদ নামে পরিচিত।

পাঠাগার মসজিদপাঠাগার মসজিদ

প্রতিটি মসজিদের আছে নিজস্ব ইতিহাস। ভাল লাগতো যদি মসজিদ গুলার ইতিহাস এর সাথে সাইনবোর্ডে লিপিবন্ধ করা হত। শূকর মল্লিক কেন মসজিদের নাম এইটা আমার মাথায় অনেকক্ষন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কে দেখে এর নামকরণ করা হয়েছে এর ইতিহাস অজানাই রয়ে গেল।