দশ তারিখ সকালে খাবার খেয়ে নয়টার সময় নামচে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আজকের পথ বেশি লম্বা না। বার্জ, পাইন গাছের আলো ছায়া পথে নামচে বাজার নেমে এলাম। দুপুর একটার সময় আমরা নামচে বাজার চলে এলাম। আগে যে লজে ছিলাম আজো সেই লজেই উঠলাম। 
দুপুরের খাবার শেষে কিছুসময় বিশ্রাম নিয়ে আমরা নামচে বাজার ঘুরে দেখলাম। এভারেস্ট ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে আমাদের সামিট কেক অর্ডার দিয়ে লজে ফিরে এলাম। 
সন্ধ্যায় দা কিপা সেই কেক নিয়ে এলেন। আমরা লজের ডাইনিং-এ সবাই একত্রে কেক কাটলাম। কিছু সময় আমরা আনন্দ করলাম। রাতের খাবার শেষে সবাই যার যার রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম।

সবাই সামিট কেক কাটছিসবাই সামিট কেক কাটছি

দলনেতা এমএ মুহিত লেখককে কেক খাওয়াচ্ছেনদলনেতা এমএ মুহিত লেখককে কেক খাওয়াচ্ছেন

দুই শেরপা গাইড দাকিপা ও কিলি পেম্বার সাথে লেখকদুই শেরপা গাইড দাকিপা ও কিলি পেম্বার সাথে লেখক

এগারো তারিখ সকালে নাস্তা করে আমরা ফাকদিনের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। মুহিত ভাইকে রেখেই আমরা চলে আসছি। এখান থেকে মুহিত ভাই আবার মাউন্ট আমাদাব-লাম নামক আর একটি পর্বত অভিযানে যাবে। তাই তিনি এখান থেকে দা কিপা শেরপাকে নিয়ে অভিযান শুরু করবেন। 
আমাদের সাথে কিলি পেম্বা শেরপা ও বাবুর্চি বুসন থামেল পর্যন্ত যাবে। বিকেল ৩টার সময় আমরা ফাকদিনে এসে পৌছলাম। এখানে আমরা এভারেস্ট লজে আজকের রাত্রিবাস করবো। 
বারো তারিখ সকাল ৮টায় আমরা লুকলার উদ্দেশে রওনা হলাম। আমরা ছ’জন ও কিলি পেম্বারা তিনজন হাঁটছি। দুপুর দেড়টার সময় আমরা লুকলা এসে পৌছলাম। সেই নম্বুর হোটেলে উঠলাম। এখানেই দুপুরের খাবার খেলাম। সারা বিকেল ওনো খেলে পার করলাম। রাতটাও বেশ কাটলো। তবে মুহিত ভাই অনেক মিস করছি। 
তেরো তারিখ ভোর ছ’টার সময় আমরা লুকলা এয়ারপোর্টে ঢুকে পরলাম। হোটেলর মালিক আমাদের বিমানের টিকিট কেটে রেখেছিলেন। তিনি আমাদের টিকিট বুঝিয়ে দিলেন। সকাল আটটার সময় তারা এয়ারের ফ্লাইটে করে ৪৫ মিনিটের আকাশ পথ পারি দিয়ে কাঠমন্ডু চলে এলাম। এয়ারপোর্টের বাইরে আমাদের জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিলো। সেই গড়ি করে হোটেল ব্লু-হরিজোনে এসে উঠলাম।  
দেওয়ালী থাকায় থামেলের মার্কেট, হোটেল সব বন্ধ। আমরা দুপুরের খাবার খাবো কিন্তু কোথাও খাবার হোটেল খোলা পাচ্ছি না। অবশেষে একটি হোটেল খোলা পেলাম। সেখানে খাবার খেয়ে আমাদের বাজেটের বেশি খরচ হয়ে গেলো। রাতে খাবারের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণের টাকা নেই। 

খাবারের অপেক্ষায়, থামেলখাবারের অপেক্ষায়, থামেল

রাতে ড্রিমার্স ডেস্টিনেশন এর প্রধান মিংমা শেরপা ফোনে জানালেন যে তিনি আমাদের সাথে নিয়ে আজকের ডিনার করবেন। রাত আটটার সময় মিংমা, ফুরবা, পুরবা হোটেলে চলে এলেন। খাবার হোটেল খুঁজতে খুঁজতে একটি কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। সেখানে আমরা কোরিয়ান খাবার খেলাম। তাদের সাথে সন্ধ্যাটা অনেক ভালো কটলো। 

ড্রিমার্স ডেসটিনেশন পরিবারের সাথে আমাদের ডিনার শেষেড্রিমার্স ডেসটিনেশন পরিবারের সাথে আমাদের ডিনার শেষে

কম বয়সে বেশি বার এভারেস্ট আরোহণকারী ফুরবা শেরপার সাথে লেখককম বয়সে বেশি বার এভারেস্ট আরোহণকারী ফুরবা শেরপার সাথে লেখক

চৌদ্দ তারিখ দুপুর দু’টার ফ্লাইটে বাংলাদেশ বিমানে করে বাংলাদেশে চলে আসি। এক ঘন্টা পর ফ্লাইট ছাড়ার কারণে আমরা বিকেল ৪টায় হযরত শাহ্ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে পৌছাই। 
খারাপ আবহাওয়ার কারণে মুহিত ভাইর মাউন্ট আমা-দাবলাম অভিযান মাঝ পথে বাতিল করতে হয়। তারপর তিনি ২৭শে নভেম্বর দেশে চলে আসেন। ১১ ডিসেম্বর মাউন্ট কেয়াজো-রি পর্বত জয় উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও রাশেদা কে চৌধুরী। 
সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য্য এই পর্বত। এর রূপ দেখে তৃপ্তি পাওয়া মনুষ্যজীবনে সম্ভব না। এখানে আছে ভয়ংকর অমোগ সৌন্দর্য। যার টানে মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে মানুষ ছুটে যায় তার বুকে পদচিহ্ন ফেলে। মেঘে ভেসে আলিঙ্গন করে স্বপ্নবাজ মানুষগুলো শ্বেত-শুভ্র পুতপবিত্র পর্বতকে। হে পর্বত, তোমাকে জয় করতে নয় ক্ষমা চাইতে বারবার ছুটে আসবো চূড়ায়। 

মাউন্ট কেয়াজো-রি এক্সপিডিশনের অন্যান্য সদস্যদের অভিজ্ঞতা:
কাজী বাহলুল মজনু (বিপ্লব)
২০১৪ সালে বি,এম,টি,সি এর কেয়াজো-রি পর্বত অভিযান খারাপ আবহাওয়ার কারণে ব্যার্থ হয়। ২০১৫ সালে আমরা আবার কেয়াজো-রি পর্বত অভিযানের সিদ্ধান্ত নেই, তাই অভিযানটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, ২৭ তারিখ নেপাল যাই, মুহিত ভাইর নেতৃত্ত্বে আমরা ৩০ তারিখ অভিযান শুরু করি কিন্তু আবহাওয়া খুব খারাপ ছিল অনেক লম্বা পথ পার হয়ে ৪ অক্টোবর বেসক্যাম্পে পৌছাই সাত জন অভিযাত্রির এর মধ্যে রিনি ও বিথির উদ্দেশ্য ছিল বেসক্যাম্প পর্যন্ত, বেসক্যাম্প থেকে মুহিত ভাই, আমি, নুর ভাই, শামিম, শাকিল ৬ তারিখ সকাল ৮টায় হাঁটা শুরু করে বিকালে  হাইক্যাম্পে পৌছাই। মাঝের পথ অনেক ভয়ঙ্কর, রাতে তরল কিছু খাবার খেয়ে ১টার সময় প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে চূড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি, অনেক লম্বা পথ এবং ভয়ঙ্কর সব নরবওে বোল্ডার এর উপর হাঁটতে হয়েছে। যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো, চূড়ার নিকট এসে শক্তি প্রায় শেষ হলেও ইচ্ছা শক্তির কারণে আমি, মুহিত ভাই ও শাকিল ৭তারিখ সকাল সাড়ে ১১টায় চূড়া জয় করি। অভিনন্দন শাকিলকে তার প্রথম সফল অভিযানের জন্য এবং সে টেকনিক্যালে অনেক ভালো ছিলো। ভবিষ্যতে সে আরো ভালো করবে।    

ফৌজিয়া আহম্মেদ রিনি
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। স্বপ্ন দেখলে তা সত্যি হবেই। যে স্বপ্ন দেখেছিলাম এক বছর আগে তা যে এতো দ্রুত সত্যি হবে তা ভাবিনি। মাত্র সাতদিনের প্রস্তুতিতে সামিল হলাম এক ইতিহাসের। হিমালয় এক বিশালতার নাম, যা শুধু অনুভবই করা যায়। সেই বিশালতার টানেই ছুটে গিয়েছিলাম তার রূপ উপভোগ করতে। প্রথমবারের মতো হিমালয়ে, লক্ষ্য মাউন্ট কেয়াজো-রি’র বেসক্যাম্প। সদস্যদের মধ্যে পাঁচ জন শিখর জয়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ সব পর্বতারোহীদের সাথে তো যাচ্ছিই এবং সাথে আছেন দলনেতা হিসেবে দু’বারের এভারেস্ট বিজয়ী মুহিত ভাই। ভয় শঙ্কা ও উত্তেজনা নিয়ে লুকলা থেকে ট্রেকিং শুরু। সবুজের সমারোহ, নীল জলরাশি, দূরের সাদা বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ের হাতছানি সেই পথকে করেছে স্বর্গীয়। দু’দিনে পৌছালাম নামচে বাজার। একে শেরপাদের রাজধানী বলা হয়। জমজমাট একটি বাজার। এখানে সাইবারক্যাফে, দামী রেস্টুরেন্ট কি নেই? নামচে বাজার থেকে মেনদে, মেনদে থেকে বেসক্যাম্প। ভয়ানক কঠিন পথ। বড় বড় পাথরের বোল্ডার। একপাশে খাড়া পাহাড় অন্য পাশে গভীর খাদ। ক্ষুধা, ক্লান্তি নিয়ে অবশেষে যখন বেসক্যাম্পে পৌছালাম তখন আনন্দে সব ভুলে গেলাম। তখন মনে হলো স্বর্গ কি এর থেকেও সুন্দর ? হাত দিয়ে মেঘ ছুঁয়া যায়, মেঘের ভেতরে ঘুমানো যায়। রাতে তারা ভরা আকাশ। মনে হচ্ছিল, এযেনো কোন এক স্বপ্নের পৃথিবীতে এসছি। এখন সেই হিমালয়ের দিনগুলি খুব মিস করছি। হাতছানি দিয়ে আবার ডাকছে আমায় স্বপ্নে, জাগরনে। 
সামিট টিমের সদস্যদের মধ্যে সব থেকে অল্পবয়সী পর্বতারোহী ছিলো শাকিল। পুরোটা সময় তার বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় আমরা পেয়েছি। দুর্দান্ত সাহসী আর হার না মানা মনোবল তাকে প্রথম অভিযানেই সফল করেছে। পর্বতারোহণ ছাড়াও নানাবিদ তার অসধারণ প্রতিভা। খুব শীঘ্রই বড় কোন কিছু করে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দিবে এই ছোট মানুষটি। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার জন্য অনেক শুভকামনা।

শামীম তালুকদার
দ্বিতীয় বারের মতো এবারো মাউন্ট কেয়াজো-রি অভিযানে গিয়েছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিলো এবার পর্বতটি সামিট করবো। কিন্তু আমি সফল হতে পারিনি তবে আমাদের টিম সফল হয়েছে। সামিটের হাজার খানেক ফুট নিচ থেকে আমাকে নেমে আসতে হয়। নেমে আসার দু’টি কারণ ছিলো। প্রথমটি হলো আমি শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পরি। আর দ্বিতীয়টি হলো আমার আইস বুট দু’টোই ফেটে যায়। যার ফলে বুটের ভেতরে বরফ ঢুকে। তাই আমার পা দু’টো অনুভূতিহীন হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে নিচে নেমে আসতে হয়। বিশেষ করে নূর ভাইকে ধন্যবাদ। কারণ ঐ সময় তিনি আমাকে নিয়ে নিচে নেমে আসেন। আর ইনাম স্যার ও মুহিত ভাই কে ধন্যবাদ যে তারা আমাকে পর্বতারোহণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য। 
শায়লা পারভীন বিথী
হিমালয়! স্বপ্নের হিমালয়, হিমালয়ে যে কখনো যাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আর এই স্বপ্নটা যে খুব আগে দেখেছি তেমনো নয়। এই তো মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। বিএমটিসি এর সদস্য হওয়ার পর থেকেই পাহাড় পর্বত নিয়ে স্বপ্ন দেখছি। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলো ২০১৫ সালের অক্টোবরে এসে । এতো তারাতারি যে স্বপ্ন সফল হবে বুঝতেই পারিনি। আমার ও রিনির লক্ষ্য ছিলো মাউন্ট কেয়াজো-রি’র বেসক্যাম্প পর্যন্ত। যদিও শারীরিক ভাবে পুরোপুরি ফিট ছিলাম না। শুধুমাত্র মানসিক শক্তিই ছিলো সম্বল। যার জোরেই হয়তো এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে পেরেছি। এখন নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত করছি ভবিষ্যতের জন্য। 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১৩তম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১২তম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১১তম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১০ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৯ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৮ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)