সামিটের খুব কাছে আমরা দড়িতে ঝুলছি। এক নির্বাক আনন্দ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম আল্লাহ যদি চায় আজ সামিট করেই ফিরবো। দেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়াবই। সামিটের ২০/২৫ ফিট নিচ থেকে হাতের বামে যেতে হবে। এই ২০ ফুট রাস্তা খুবই বিপদজ্জনক। সরু নাইফ রিজ। মনে হচ্ছে যেকোন মূহুর্তে ভেঙে পরতে পারে। 

সামিটের শেষ ভয়ংকর বিপদজ্জনক সরু নাইফ রিজসামিটের শেষ ভয়ংকর বিপদজ্জনক সরু নাইফ রিজ

নেপালি সময় সকাল ১১.২৯ মিনিটে বিপ্লব ভাই প্রথম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বিজয়ী পদচিহ্ন ফেলেন। তারপর একেএকে মুহিত ভাই ও আমি উঠে আসি চূড়ায়। দুই শেরপাসহ আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি আকাশ ছুঁয়ে কেয়াজো-রির শিখরে। জীবনের প্রথম কোনো পর্বতের চূড়ায় পা রাখার আনন্দের  সুখ পেলাম। মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি স্বপ্ন জয়ের বহিঃপ্রকাশ করলো। বাকশূণ্য হয়ে শুধু চারপাশ দেখছি। সকল কষ্ট মূহুর্তেই ভুলে গেলাম। আবার মনে পড়লো সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা-একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী, চরাচরে তীব্র নির্জনতা। আমার কণ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না। আমি শুধু দশদিককে উদ্দেশ্য করে বলবো, প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা, এখানে আমার কোনো অহঙ্কার নেই। এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে।”

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে পতাকা হাতে লেখকমাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে পতাকা হাতে লেখক

মাউন্ট কেয়াজো-রি এর চূড়া খুবই সরু। দাঁড়ানোর মতোও তেমন জায়গা নেই। আমরা আমাদের কোমরের হার্নেসের সাথে ফিক্সড দড়ির সাথে এ্যাংকার করে আগ-পিছ করে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ একত্রে দাঁড়ানোও যাচ্ছে না। কিলি পেম্বা শেরপা আমাদের ছবি তুললেন। আমাদের পৃষ্ঠপোষক কোম্পানী বার্জার পেইন্টস, এপেক্স ফুটওয়্যার, জনতা ব্যাংক, শাহ সিমেন্ট ও বিজিএমইএ এর লোগো নিয়ে ছবি তোললাম। এবং আমাদের বিএমটিসি ও লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ছবি তোললাম। আকাশ পবিষ্কার তাই চারপাশের অপরূপ সৌন্দর্য্য দেখতে একটুও কষ্ট হলো না। মুহিত ভাই আমাদের দূরে মাউন্ট এভারেস্টসহ বেশ কয়েকটি পর্বত দেখালেন। 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে তিন পর্বতারোহীমাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে তিন পর্বতারোহী

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে দেশের পতাকা হাতে তিন পর্বতারোহীমাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে দেশের পতাকা হাতে তিন পর্বতারোহী

মাউন্ট কেয়াজো-রি চূড়া থেকে দেখা মাউন্ট এভারেস্টমাউন্ট কেয়াজো-রি চূড়া থেকে দেখা মাউন্ট এভারেস্ট

বাতাস বইছে। মেঘ উড়ছে। রোদও শরীর পুড়াচ্ছে। কঠিন ও ভয়ংকর সুন্দরে দু’চোখ ভরে গেলো এবং সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। প্রায় আধ ঘন্টা কেয়াজো-রির শিখরে থাকার পর আমরা ফেরার পথ ধরলাম। ডিসেন্ডারের মাধ্যমে দড়ি দিয়ে র‌্যাপেল ডাউন করে নেমে এলাম কোলে। এই কোলেই নেমে এসে নূর ভাই ও শামীম ভাই আমাদের জন্য  অপেক্ষা করছে। 
আমরা এখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। আমাদের তিনজনের সাথে খাবার ছিল না। খাবার নূর ভাইর কাছে। পেট ক্ষুধায় পুড়ে যাচ্ছে। শরীরে শক্তিও শেষের চরম পর্যায়ে। শরীর কাঁপছিলো ক্ষুধায়। তাই এখানে খেজুর, বাদাম, ম্যাংগোবার খেলাম। খাবার শেষে আবার নামা শুরু করলাম। 
সন্ধ্যা ৫টার সময় আমরা হাইক্যাম্পে ফিরে এলাম। তাবুর ভেতরে ঢুকেই স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। দু’দিন হয়ে গেলো চা, স্যুপ, চকলেট ছাড়া আর কোনো খাবার কপালে জুটছে না। শরীর খুব ক্লান্ত। 
কিলি পেম্বা শেরপা আমাদের তাবুতে এসে গরম একমগ করে স্যুপ দিয়ে গেলেন। বরফ গলিয়ে পানি গরম করে এক মুঠো ভুট্টা দিয়ে স্যুপ। লবণ মরিচ কিছুই নেই। পৃথিবীর সেরা অখাদ্যের একটি খাচ্ছি। ক্ষুধায় শরীর কাঁপছে তবু গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তারপরও খেতে হলো। না খেলে সকালে আবার নিচে নামার শক্তিও থাকবে না। স্যুপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। 

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১১তম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১০ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৯ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৮ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)