৭ নভেম্বর। সামিট
রাত ১০.৩০ মিনিট। দা কিপা আমাদের ডেকে উঠালেন। যদিও কথা ছিলো রাত ১২  টার সময় আমরা ঘুম থেকে উঠে সামিটের জন্য প্রস্তুতি নেবো। দা কিপা ভেবে ছিলেন আমাদের উঠার সময় হয়েছে। তাই তিনি আমাদের ডেকে উঠিয়েছেন। এমনিতেই আমার ঘুম হয়নি। নানান ভাবনা জাগিয়ে রেখেছে আমাকে। দা কিপা আমাদের তাবুতে এসে চা দিয়ে গেলেন। তাবুর জিপার খুলে দেখি আবহাওয়া খুব ভালো। আকাশে তারায় ভরে গেছে। বাইরে খুব শীত। ঠান্ডা বাতাসও বইছে। আমরা স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে বসে বসেই চা পান করছি। চায়ের স্বাদ এতই ভয়ংকর ছিলো যে গলা দিয়ে নামছেই না। পেটের ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবুও গিলতে হচ্ছে। কাপের নিচে একটু রাখলেই নূর ভাই তাবুর ভেতর থেকে মুহিত ভাইকে ডেকে বলেন যে শাকিল একটুও খাচ্ছি না। আর মুহিত ভাই তার তাবুর ভেতর থেকে আমাকে ডেকে সবটুকু খেতে আদেশ করেন। আমিও জীবনের শেষ খাবার মনে করে খেয়ে ফেলছি। 
সবাই প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি। রাত ১২.৩০ মিনিটে তাবুর বাইরে সবাই বের হলাম। হেটলাইট, আইচ বুট, হারনেস পরে নিলাম। রাতের তাপমাত্রা ২০ (মাইনাস) ডিগ্রি। তাই গরম থাকার জন্য কয়েক স্তরের পোশাক পরতে হয়। তবু শীতের কারণে দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর। ঠান্ডা বাতাসও অনেক বেশি। দা কিপা ও কিলি পেম্বা আমাদের আরোহণের জিনিসগুলো ভালো ভাবে দেখে নিচ্ছেন। 

সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুতিসামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুতি

ঠিক রাত ১টার সময় আমরা সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। চারদিকে অন্ধকার। প্রথমেই হাইক্যাম্প থেকে বরফের ঢাল বেয়ে নিচে নামলাম। চারপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধুমাত্র সামনের জনের পায়ের স্টেপ দেখে এগিয়ে চলছি। একটি লেকের কিনার দিয়ে এগিয়ে চলছি। লেকের পানি জমে বরফ হয়ে আছে। সেই বরফের উপর দিয়েই হেঁটে চলছি। নেই পতা ঝড়া শব্দ, কোনো পাখি কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। শুধু আমাদের পায়ে বরফের কচকচ শব্দ। 
কিলি পেম্বা সবার সামনে তারপর মুহিত ভাই, বিপ্লব ভাই, আমি, শামীম ভাই, নূর ভাই ও সবার শেষে দা কিপা শেরপা। এই একই তালে এগিয়ে চলছি অমোগ এক অনিশ্চয়তার দিকে। এখনো ক্র্যাম্পন লাগাইনি। তাই মাঝে মাঝে পা পিছলে যাচ্ছিলো। 
ঘন্টাখানেক হাঁটার পর আমাদের চড়াই শুরু হয়। অন্ধকার থাকায় পাশের ভয়ংকর খাদ কিংবা বরফের ফাটল দেখতে পারছি না। দেখতে না পাওয়াটাও ভালো। এর কারণ পাহাড়ের একদম পাড় ঘেঁসে হাঁটার সময় ভয়ের বিষয় থাকে না। 

রাতের অন্ধকারে হেডলাইটের আলোতে দুর্গম পথে এগিয়ে চলছিরাতের অন্ধকারে হেডলাইটের আলোতে দুর্গম পথে এগিয়ে চলছি

আকাশে মেঘ নেই। এত সুন্দর আকাশ আগে কখনো দেখিনি। আকাশ ভরা তারা মিটমিট করে জ্বলছে। শ্বেত শুভ্র পুতপবিত্র বরফের পাহাড়গুলো তাদের রূপ রাতের অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে। কোনো শিল্পীর তুলি পারবে না এই সৌন্দর্য্য ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলতে। কোনো ভাষাতেও প্রকাশ করা সম্ভব না। 
ক্লান্ত রাতটাও পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। আর আমরা ছোটবড় পাথরের বোল্ডারের উপরে দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছি। পাথরগুলো খুব নড়বড়ে ছিলো। ভূমিকম্পের কারণে রাস্তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছিলো। তাই রাতের সেই অন্ধকারেই খুবই সতর্কতার সাথে সামনে এগিয়ে চলতে হচ্ছে। এই পাথুরে ও বরফের খাড়া ঢাল বেয়ে প্রায় ১৬০০ ফুট উঠে একটি ৯০ ডিগ্রি খাড়া দেয়ালের নিচে এসে কিছু সময় বিশ্রাম নেই। তারপর এখানেই আমরা ক্র্যাম্পন পড়ি। 

বরফের কঠির পথে হাঁটার জন্য আইস বুটে ক্র্যাম্পন পড়ছি বরফের কঠির পথে হাঁটার জন্য আইস বুটে ক্র্যাম্পন পড়ছি 

দিনের বেলায় হাঁটার চেয়ে রাতে হাঁটার গতি বেশি থাকে এবং ক্লান্তিও কম লাগে। সেই কারণে আমরা খুব দ্রুতই কেয়াজো-রির কোলে পৌছাই। কোলের উঠে আসার আগেই সেই দেয়াল ফিক্সড রোপের মাধ্যমে জোমারের সাহায্যে উপরে উঠে আসি। 
কোলে উঠার পর কিছুটা অন্ধকার কেটে দিনের আলো দেখা দিচ্ছে। ভোরের প্রথম আলোয় চারপাশ এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছে। দূর পুব আকাশে পর্বতের আড়াল থেকে সূর্য তার আগমনি বার্তা দিচ্ছে। আকাশটাও লাল হয়ে উঠেছে। উচু উচু পর্বতের চূড়ায় সূর্যের আলো পড়েছে। তাই চূড়াগুলোও লাল হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে নাটকের মঞ্চে নির্দিষ্ট স্থানে আলো ফেলা হচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে একে একে সবাই উপরে উঠে এলো। 

দিনের প্রথম আলোয় কঠিন বরফের ঢাল আরোহণ করছিদিনের প্রথম আলোয় কঠিন বরফের ঢাল আরোহণ করছি

কিলি পেম্বা তার ব্যাগ থেকে একটি দড়ি বের করলো। সেই দড়িতে আমরা সাতজন গ্রুপ রোপিং করে প্রায় ৪৫ ডিগ্রী খাড়া ঢাল উঠছি। বরফের দেয়াল। কোথাও শক্ত বরফ যেখানে ক্র্যাম্পনও ভালো ভাবে আটকানো যাচ্ছে না। আবার কোথাও নরম তুষার। আইস বুট সম্পূর্ন বরফের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগলো আমাদের এই বরফের ঢাল উঠতে। তারপর আবার পাথরের দেয়াল ও বড় বোল্ডার। 
সাড়ে ছ’টার সময় আমরা এই পাথরের দেয়ালের কাছে এলাম। এখান থেকেই সামিট পর্যন্ত ফিক্সড রোপ লাগানো আছে। এখান থেকেই আমাদের সামিট পর্যন্ত জুমারিং করে উপরে উঠতে হবে। আমাদের কোমরে লাগানো হার্নেস দড়িরর সাথে জুমার ও ক্যারাবিনার দিয়ে আটকে নিলাম। 
আইস বুটের নিচে ক্র্যাম্পন থাকায় পাথরে পা রাখা যাচ্ছে না। বার বার পা পিছলে যাচ্ছে। আমাদের শরীরে এমনিতেই কোনো শক্তি নেই। এই পাথরের দেয়াল উঠতে খুব কষ্ট করতে হয়েছে ও ঝুঁকি নিতে হয়েছে। অনেক কষ্টের ও পরিশ্রমের পরে কিলি পেম্বা, মুহিত ভাই, বিপ্লব ভাই, আমি, শামীম ভাই, নূর ভাই ও সবার শেষে দা কিপা একে একে উপরে উঠে আসি। এখানে বসে একটু বিশ্রাম নিলাম। ফ্লাক্সে আনা গরম পানি ও চকলেট খেলাম। আকাশে মেঘে নেই। এখনো আবহাওয়া অনেক ভালো। রোদও চলে এসেছে। এখান থেকে সামিট দেখা যাচ্ছে। আমাদের থেকে সামিট প্রায় ১৫০০ ফুট উপরে। কিন্তু পথ অনেক কঠিন। কোথাও ৮০/৮৫ ডিগ্রী আবার কোথাও ৬০ ডিগ্রী খাড়া ঢাল। কঠিন ব্লু আইস তো আছেই। 

কঠিন শক্ত বরফের খাড়া চড়াই উঠছি দড়ির সাহায্যে জুমারিং করেকঠিন শক্ত বরফের খাড়া চড়াই উঠছি দড়ির সাহায্যে জুমারিং করে

এই পথে এবং একই দড়িতে আরোহণ করে আমাদের আগে আরো তিনটি দল সামিট করেছে। তাই দড়িটি পুরোনো হয়ে গেছে। আইস পিটনগুলোও নড়বড়ে হয়ে গেছে। সেই দড়িতে আমরা সাতজন ঝুলে আছি। কী এক মৃত্যুময় আনন্দে মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে উপরের দিকে জুমারিং করছি। জুমারিং করার সময় দড়ি নিচের দিকে ঝুলে। তখন ভয়ে গা শিউরে উঠে। এই বুঝি দড়ি ছিঁড়ে নিচে পরে যাচ্ছি। কোনো ভাবে এখান থেকে পড়ে গেলে হাজার ফুট নিচের পাথরের বোল্ডার স্বাগত জানাবে মৃত্যুর দুয়ারে পৌছে দিতে। 
উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই ঝুলে আছে। এক পা দু’পা করে স্টেপ দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে। আমারও একই অবস্থা। নিচে শামীম ভাই ও নূর ভাইও একই ভাবে ঝুলে আছে। 

খাড়া বরফের দেয়ালে দড়িতে ঝুলে আছি  খাড়া বরফের দেয়ালে দড়িতে ঝুলে আছি  

কঠিন খাড়া দেয়াল জুমারিং করছিকঠিন খাড়া দেয়াল জুমারিং করছি

সামিটের খুব কাছে মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই একটু দম নিচ্ছেসামিটের খুব কাছে মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই একটু দম নিচ্ছে

খাড়া বরফের দেয়াল উঠে বরফের খাজে এসে বসলাম। সবার হৃদস্পন্দন বুকের পাজরকে দ্রুত আঘাত করছে। কথা বলাই কষ্ট হচ্ছে। দম পাচ্ছি না। আমরা কিছু সময় এখানে বসে বিশ্রাম নিলাম। পানি চকলেট খেলাম।  পেটে খাবার নেই। শরীরের শক্তিও শেষ। এক পা এগোনোর পর আর এক পা দেয়ার শক্তি থাকে না। চকলেট খেয়ে শরীরে একটু হলেও শক্তি পাওয়া গেলো। সেই শক্তি পুজি করে আবার আরোহণ শুরু করলাম। 
প্রথমে বিপ্লব ভাই তারপর মুহিত ভাই, আমি, শামীম ভাই ও নূর ভাই দড়িতে ঝুলে জুমারিং করে আরোহণ করছি। রোদের তাপমাত্রাও অনেক বেশি। যেহেতু বরফের মধ্যে আছি সেহেতু রোদের তাপ তেমন টের পাচ্ছি না। তবে এটা বুঝতে দেরি হলো না যে সানবার্ন হচ্ছি। 
কিছুসময় পর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি শামীম ভাই ও নূর ভাই নেই। ভয় পেয়ে গেলাম। আমি দাঁড়িয়ে তাদের খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। না দেখাটাই স্বাভাবিক। কারণ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তার নিচে ওভার হ্যাং দেয়াল। দা কিপা উঠে এলো আমার কাছে। তার কাছে জানতে পারলাম শামীম ভাই ও নুর ভাই আর উপরে আসবেন না। তারা নিচে নেমে যাচ্ছেন। 
শামীম ভাই শারীরিক ভাবে দূর্বল হয়ে পরেন। বমি হয়। জুমারিং করার মতো শক্তিও পাচ্ছিলেন না। তার থেকে বড় কথা তার আইস বুট ফেটে ভেতরে বরফ ঢুকে যায়। তাই নূর ভাই তাকে নিয়ে নিচে নেমে আসেন। যদি তখন না নেমে আসতেন তাহলে শামীম ভাইর শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হতো। তখন দলের বড় ধরনের সমস্যা হতো। এমনকি সামিট করাও অসম্ভব হয়ে যাবে। সেই কথা মাথায় নিয়ে নূর ভাই নিজে সামিটে না গিয়ে তাকে নিয়ে নেমে এসেছেন। যদিও নূর ভাইও শারীরিক ভাবে বেশ দূর্বল হয়ে পরেছিলেন। 
দুই শেরপাসহ আমরা তিন জন সামিটের উদ্দেশ্যে আরোহণ করছি। সকাল দশটা বেঁজে গেছে। আমরা এখনো সামিট থেকে প্রায় ৪০০ ফুট নিচে আছি। শেরপারা যদিও বলেছিলো সকাল ৮টার মধ্যেই সামিট হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। 
বিপ্লব ভাই একসময় মুহিত ভাইকে বললেন, মুহিত ভাই এবারও কি সামিট না করেই ফিরে যাবো ? তিনি মানসিক ভাবে একটু দূর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। মুহিত ভাই কোনো উত্তর না করে উপরের দিকে উঠতে লাগলেন। একসময় যখন চূড়া আমাদের খুব কাছে তখন আবার সেই বিপ্লব ভাই বললেন, আজ আর সামিট না করে ফিরবো না। আমাদের শরীরের শক্তি শেষ এখন শুধু মনের শক্তিতেই এগিয়ে চলছি।
সামিটের খুব কাছে আমরা দড়িতে ঝুলছি। এক নির্বাক আনন্দ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম আল্লাহ যদি চায় আজ সামিট করেই ফিরবো। দেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়াবই। সামিটের ২০/২৫ ফিট নিচ থেকে হাতের বামে যেতে হবে। এই ২০ ফুট রাস্তা খুবই বিপদজ্জনক। সরু নাইফ রিজ। মনে হচ্ছে যেকোন মূহুর্তে ভেঙে পরতে পারে। 

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১০ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৯ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৮ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)