৬ নভেম্বর। হাইক্যাম্প। ১৭২০৫ ফুট।
আজকের পথটা বেশ লম্বা ও কঠিন। সাতটার মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে সবাই কিচেন তাবুতে এলাম। সবাই একত্রে বসে সকালের নাস্তা করে নিলাম। পলিপ্যাকে দুপুরের জন্য শুকনো খাবারও নিয়ে নিলাম। পথে কোথাও খেয়ে নেবো। খাবার শেষে আমরা পাঁচজন ও দু’জন শেরপা হাই ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ছায়াবিথী ও রিনি আপু আমরা না আসা পর্যন্ত বেসক্যাম্পেই থাকবে। তাদের সাথে আছে বাবুর্চি বুসন ও তার সহযোগি। তারা চারজন এখানে থাকবে। 

হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগ মূহুর্ত পাঁচ পর্বতারোহী হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগ মূহুর্ত পাঁচ পর্বতারোহী 

আমরা পাহাড় ঘেরা সেই সমতল মাঠের উপর দিয়ে হেঁটে চলছি। যতক্ষণ আমাদের দেখা গেছে বেসক্যাম্প থেকে ছায়াবিথী ও রিনি আপু আমদের দেখছেন দাঁড়িয়ে। আমরাও ফিরে ফিরে দেখছি তাদের। একটা সময় তারা দৃষ্টিসীমার বাইরে মেঘের আড়ালে চলে গেলো। 
ফিরে আসার আগ পর্যন্ত একদম যোগাযোগ বন্ধ। তাই একটু কষ্টও লাগলো। এই কয়দিনে কতো আপন হয়ে গেছি একে অপরের। যেন জন্ম থেকেই আপন আমরা। 

কঠিন পাথুরে খাড়া ঢাল উঠছিকঠিন পাথুরে খাড়া ঢাল উঠছি

কঠিন পাথুরে ও বরফের খাড়া ঢাল উঠছিকঠিন পাথুরে ও বরফের খাড়া ঢাল উঠছি

লম্বা সমতল মাঠ পার হয়ে আমরা কঠিন পাথুরে খাড়া ঢাল উঠছি। ছোট বড় পাথরের বোল্ডার। আলগা আলগা বোল্ডার। পা দিলেই গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। ভালো ভাবে পা রাখা যায় না। আবার উপর থেকেও পাথরের টুকরো পড়ছে। প্রতিটা মুহূর্ত বিপদজনক। যে কোনো সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিটা পায়ের স্টেপ সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে ফেলতে হয়। 
হাইক্যাম্পে আমাদের কোনো বাড়তি জিনিস নেওয়া হচ্ছে না। এমন কি খাবারও। সেখানে আমাদের শুধু তরল খাবার খেতে হবে। কোনো প্রকার ভারী খাবার নেই। আমাদের অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে আমাদের কিচেন বয় ও কিলি পেম্বা চলে গেছেন আমাদের আগেই। 
উপরে যেসব জিনিসের তেমন প্রয়োজন নেই সেগুলো বেসক্যাম্পে রেখে এসেছি। শুধু সাথে নিয়ে এসেছি মিটন, তিন সেট গ্লাভস, চার জোড়া মোজা ও এক জোড়া সামিট মোজা, ক্র্যাম্পন, হার্নেস সেট, হেলমেট, সান-গ্লাস, শীতের টুপি ও চকলেট। আইস বুট, ডাউন জ্যাকেট, উইন্ড প্রুফ জ্যাকেট ও ট্রাউজার, ফ্লিচ জ্যাকেট পড়েই এসেছি। 

 পেছনে মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখর দেখা যাচ্ছে পেছনে মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখর দেখা যাচ্ছে

আমরা পাথরের কঠিন চড়াই উঠে এসেছি। কিন্ত এখান থেকেই শুরু হলো বরফের রাস্তা। এখন বরফের কঠিন ঢাল নামছি। আবহাওয়া মূহুর্তেও মধ্যেই খারাপ হয়ে গেলো। মেঘ এসে চারপাশ হোয়াইট আউট করে দিলো। ঠান্ডা বাতাসও যেন পাল্লা দিয়ে ছুটে চলছে। কয়েক’শ ফুট দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার খুব পিচ্ছিল। পা রাখাই যাচ্ছে না। তবু আস্তে আস্তে নিচে নামছি আমরা। প্রতি মূহূর্তে দুর্ঘটনার আশংকা। 

বরফের কঠিন ঢাল নামছিবরফের কঠিন ঢাল নামছি

নূর ভাই ক্যামেরা নিয়ে আমাদের সমনে চলে গেলেন। আমাদের নিচে নামার ভিডিও করার জন্য। আমার একটি পা পিছলে যাচ্ছিলো কোনো ভাবেই আটকে রাখতে পারছিলাম না। তারপর বসে পড়ে হাত দিয়ে বরফের খাজে ধরে পতন রোধ করি। বিপদজ্জনক এই পথ নেমে আসতে আমাদের কিছুটা সময় লেগে যায়। আবহাওয়া খারাপ থেকে আরো বেশি খারাপ হতে শুরু করছে। 

হাইক্যাম্পের পথে হাইক্যাম্পের পথে 

আমরা হেঁটে চলছি গ্লেসিয়ারের মধ্য দিয়ে। লম্বা বরফের সমতল ভূমির উপর পা টিপে টিপে কচ্ছপ গতিতে হাঁটছি। দা কিপা, মুহিত ভাই ও নূর ভাই কিছুটা সামনে চলে গেছে। আমি, শামীম ভাই ও বিপ্লব ভাই পেছনে। শামীম ভাইর হাঁটার গতি কিছুটা কমে গেছে। শামীম ভাই শারীরিক ভাবেও কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়েছেন। তার শরীরের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে পারছিলো না। মুহিত ভাই সামনে থেকে এসব লক্ষ্য করলেন। আমাদের জন্য তারা দাঁড়ালেন। কাছে আসার পর মুহিত ভাই শামীম ভাইকে সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলেন। যদি বেশি সমস্যা হয় তাহলে তাকে নিচে নেমে যাওয়ার কথা বললেন। কারণ উপরে গেলে আরো শরীর খারাপ হতে পারে। কিন্তু শামীম ভাই জানালেন উপরে যাওয়ার মতো সুস্থ্য আছেন তিনি। 

ঘাইক্যাম্পের পথে শেষ কঠিন পাথুরে খাড়া ঢাল উঠছিঘাইক্যাম্পের পথে শেষ কঠিন পাথুরে খাড়া ঢাল উঠছি

সাথে আনা প্যাক লাঞ্চ এখানেই বরফের উপর বসে দুপুরের খেয়ে নিলাম। একটা কমলা, সেদ্ধ ডিম ও সিঙগারা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু। বরফে পাথরের ছোট বড় বোল্ডার। এই পথেই এখন চড়াই। পথ আর সহজ হচ্ছে না।  আস্তে আস্তে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আবহাওয়াও আর ভালো হচ্ছে না। এ এক ভয়ংকর আনন্দে সামনে এগিয়ে চলছি। চড়াই শেষ হচ্ছ না। হৃদস্পন্দন এতই বেড়ে গেছে যে দম নিতে পারছি না।  হৃদপিন্ডটা বের হয়ে যেতে চাইছে।  তবু থেমে নেই। সামনে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। তাই সামনে যেতেই হবে। 

হাইক্যাম্পের পথে একটু বিশ্রাম  হাইক্যাম্পের পথে একটু বিশ্রাম  

হাইক্যাম্প ও মাউন্ট কেয়াজো-রিহাইক্যাম্প ও মাউন্ট কেয়াজো-রি

বিকেল ৩ টার সময় আমরা এই কঠিন চড়াই উঠে আসি। এখানেই আমাদের হাইক্যাম্প করা হয়েছে। আজকের মতো হাঁটা শেষে তাই একটু দম ফিরে পেলাম। দা কিপাও আমাদের কিছু সময় আগেই এখানে চলে এসেছেন। আমরা আসার আগেই দা কিপা ও কিলি পেম্বা এখানে তাবু তৈরী করে ফেলেছে। আর দেরি না করে তাবুর ভেতরে ঢুকে গেলাম। এখানে তিনটি তাবু করা হয়েছে। আমরা সাতজন মানুষ তিনটি তাবু। তাই একটি তাবুতে নূর ভাই, শামীম ভাই ও আমি থাকছি। পাশের তাবুতে মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই। শেরপাদের তাবু আমাদের একটু উপরে। 
কয়েক মিনিটের মধ্যেই দা কিপা আমাদের তাবুতে এসে গরম চা দিয়ে গেলেন। এক মগ চা। ছোট গ্যাস স্টোভে বরফ গলিয়ে গরম পানি করে চায়ে লিকার দিয়ে চা বানানো হয়েছে। চিনি ছাড় চা খেতে যেমন হয় তেমনি হয়েছে। তবু খেতে হচ্ছে। চা শেষ হতে না হতেই আবার দা কিপা স্যুপ দিয়ে গেলেন। কয়েকটি গাজর কেটে ও ভুট্টা দিয়ে স্যুপ বানানো হয়েছে। তাও আবার লবণ ছাড়া। মরিচ ছাড়া। তবু খেতে অমৃতের মতো লাগছে। লাগবেই না কেন? পেটে যে ক্ষুধার বদ্ধভূমি। এই সব খাবার ছাড়া আর কোনো খাবার নেই। বেসক্যাম্পে নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এসবই খেতে হবে। 
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা আজ হাইক্যাম্পেই রাত কাটাবো। কাল কেয়াজো-রির কোলে গিয়ে ক্যাম্প-১ স্থাপন করবো। তারপর সেখান থেকে আমরা সামিটের উদ্দেশ্যে আরোহণ করবো।  

হাইক্যাম্পের ক্লান্ত বিকেলহাইক্যাম্পের ক্লান্ত বিকেল

কিন্তু সন্ধ্যায় কিলি পেম্বা শেরপা আজ রাতেই সামিট পুশ করার কথা বললেন। কারণ আবহাওয়াও ভালো হতে শুরু করেছে। পথে তুষারের পরিমাণ কম। কোল থেকে সামিট পর্যন্ত রোপ লাগানো আছে। আর বড় কথা আমাদের শরীরও সুস্থ আছে। মুহিত ভাই আমাদের সকলে সম্মতি নিয়ে আজ রাতেই সামিট পুশ করার সিদ্ধান্ত নেন। আর সবাইকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকতে বলেন। 
সিদ্ধান্ত হলো রাত ১২টায় সবাই চা, স্যুপ খেয়ে আরোহণের জন্য প্রস্তুতি নেবো। ঠিক রাত একটায় আমরা সামিটের উদ্দেশ্যে আরোহণ করবো। তাই মুহিত ভাইর কথা মতো সবাই তারাতারি ঘুমিয়ে গেলো। একটি মজার বিষয় হলো নূর ভাই খুব দ্রুত ঘুমিয়ে যায়। হোক বসে, হোক শুয়ে। ঘুমাতে একটু সময়ও লাগেনা তার। আমি কিছু সময় আমার ছোট নোট বুকে কলমের সঙ্গ দিলাম।  

হাইক্যাম্পে তাবুর ভেতরে নূর মোহাম্মদ ও শামীম স্যুপ খাচ্ছেহাইক্যাম্পে তাবুর ভেতরে নূর মোহাম্মদ ও শামীম স্যুপ খাচ্ছে

সবাই ক্লান্ত তাই ঘুমিয়ে পড়েছে দ্রুত। আমিও অনেক ক্লান্ত কিন্ত এক বিন্দুও ঘুম আসছে না। নানান চিন্তা মাথায় ভনভন করে ঘুরছে। মাথা ব্যাথাটাও আছে। পেটে আছে ক্ষুধা। সামনে কি হবে না হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি চিন্তা। বাড়ির কথাও মনে পড়ছে। মা বাবা ছোট ভাই তাদের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। খুব মনে পরছে তাদের। মনে পড়ছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই কবিতা-
“অনেক দিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না। আমার নিজস্ব একটা নদী আছে, সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে। কে না জানে, পাহাড়েরর চেয়ে নদীর দাম বেশী। পাহাড় স্থাণু, নদী বহমান। তবু আমি নদীর বদলে পাহাড়টাই কিনতাম। কারণ আমি ঠকতে চাই। 
নদীটাও অবশ্য কিনেছিলাম একটা দ্বীপের বদলে। ছেলেবেলায় আমার বেশ ছোট্টখাট্টো, ছিমছাম একটা দ্বীপ ছিলো। সেখানে অসংখ্য প্রজাপতি। শৈশবে দ্বীপটি ছিলো বড় প্রিয়। আমার যৌবনে দ্বীপটি আমার কাছে মাপে ছোট লাগলো। প্রবাহমান ছিপছিপে তন্বী নদীটি বেশ পছন্দ হলো আমার। বন্ধুরা বললো, ঐটুকু একটা দ্বীপের বিনিময়ে এতবড় নদী পেয়েছিস? খুব জিতেছিস তো মাইরি! তখন জয়ের আনন্দে আমি বিহ্বল হতাম। তখন সত্যিই আমি ভালোবাসতাম নদীটিকে। 
নদী আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতো। যেমন, বলো তো, আজ সন্ধেবেলা বৃষ্টি হবে কিনা? সে বলতো, আজ এখানে দক্ষিণ হাওয়া। শুধু একটি ছোট্ট দ্বীপে বৃষ্টি, সে কি বৃষ্টি, যেন একটা উৎসব। আমি আর সেই দ্বীপে যেতে পারি না। সে জানতো! সবাই জানে। শৈশবে আর ফেরা যায় না। 
এখন আমি একটা পাহাড় কিনতে চাই। সেই পাহাড়ের পায়ের কাছে থাকবে গহন অরণ্য, আমি সেই অরণ্য পার হয়ে যাবো, তারপর শুধু রুক্ষ কঠিন পাহাড়। একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী, চরাচরে তীব্র নির্জনতা। আমার কণ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না। আমি ঈশ্বর মানি না, তিনি আমার মাথার কাছে ঝুঁকে দাঁড়াবেন না। আমি শুধু দশদিককে উদ্দেশ্য করে বলবো, প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা, এখানে আমার কোনো অহঙ্কার নেই। এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে।
 

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৯ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৮ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)