৫ নভেম্বর। বেসক্যাম্প। 
সকাল সাতটা। ঘুম ভাঙলো মুহিত ভাইর ডাকে। তিনি তার তাবুর ভেতর থেকেই সবাইকে ডাকছেন। আজ একটু শীত অন্য দিনের চেয়ে বেশি। রোদ আসতেও দেরি করছে। কারণ চারপশে উচু উচু পাহার দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাহাড়ের আড়াল কাটিয়ে রোদ আসতে একটু দেরি হয়। বেসক্যাম্পটা বিশাল খেলার মাঠের মতো। ঘাসও আছে। নদীর পানির উপরের এক অংশ জমে বরফ হয়ে আছে। সেই বরফের ভেতর দিয়ে ঠান্ডা পানির স্্েরাত বয়ে চলছে। 
সকালে একটা সমস্যা হয় সবার। তা হলো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে টয়লেটে যাওয়া। আমরা রাতে যখন ঘুমাতে যাই তখন বোতলে গরম পানি নিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে রাখি। যেন রাতে খেতে পারি আর টয়লেটের পরে ব্যবহার করা যায়। আজ আমার পানি রাতেই শেষ। এমনেতেই শীত মাইনাসের ঘরে। বিপ্লব ভাইর বোতল থেকে পানি নিয়ে টয়েলেটের দিকে পা বাড়ালাম। 
আটটার সময় সকালের খাবার খেতে ডাইনিং তাবুতে এলাম। প্রথমেই এক মগ গরম গরম চা। তারপর রুটি, মাখন, জেলি। আমাদের প্রতিদিনের খাবার এই। আবার এক মগ কফি। আমাদের প্রতিদিন প্রায় ৩/৪ লিটার এই সব তরল খাবার খেতে হয়। যত বেশি তরল খাবার খাওয়া যাবে তত বেশি এক্লামাটাইজ হবে শরীর। তাই অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এসব খেতে হয়। 

কিচেন তাবুর ভেতরে, বেসক্যাস্পকিচেন তাবুর ভেতরে, বেসক্যাস্প

  
খাবার শেষে আমরা আমাদের তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে নদীর জমাট বাঁধা পানি দেখছি। নূর ভাই পায়ের গোড়ালী দিয়ে আঘাত করে সেই জমাট বাঁধা পানি ভাঙলেন। ভেতরের পানি ছিটকে উপরে উঠে এলো। 
আমাদের তাবু থেকে কিছু দূরে আরো দুইটি আরোহী দল তাবু করেছে। দুই দলই হাইক্যাম্পে আছে। গতকাল এক দল কেয়াজো রি সামিট করেছে। তারা আজ বেসক্যাম্পে নেমে আসবে। আর অপর দল আজ সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। দুইটি দলই বেশ বড়। অনেকগুলো তাবু করেছে তারা। সেখানে শুধু কিচেন স্টাফই দেখা যাচ্ছে। 
আজ আমরা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে কেয়াজো রির পথে কিছু দূর উঠবো। ছায়াবিথী আপু ও রিনি আপুর উদ্দেশ্যে ছিলো এই বেসক্যাম্প পর্যন্ত। যেহেতু তারা সুস্থ্য এবং শারীরিক ভাবে ফিট আছে তাই তারাও আমাদের সাথে হাইকিং-এ যাবে। সাড়ে নয়টার সময় আমরা হাইকিং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। 

কঠিন পাথুরে চড়াইয়ে হাইকিং করছিকঠিন পাথুরে চড়াইয়ে হাইকিং করছি


নদীর পাশ দিয়ে হেঁটে চলছি।  কখনো নদীর এপার ওপার। সমতল বিশাল মাঠ। ঘাসও শুকিয়ে গেছে। অন্য সেই দুই দলের তাবুর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছি। বাবুর্চিরা ছাড়া আর কেউ নেই। সামনে দেখা যাচ্ছে কেউ নেমে আসছে। উচু পাথুরে পাহাড়ের পাথরের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে তাদের। একই পথে উপরের দিকে যাচ্ছি আমরা। 
আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফ্রান্সের একটি যৌথ দল মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট করে নেমে আসছে। দলটি বেশ বড়। সামিটের আনন্দ তাদের চোখে মুখে খেলা করছে। একে একে নেমে আসছে। তাদের দেখে এবং তাদের জয়ে আমারাও একটু আনন্দ করলাম। 
এই দলের শেরপা গাইড কিলিপেম্বা শেরপার সাথে পথে দেখা হলো। তার সাথে কথা হলো। তিনি আমাদের সাথে কাল উপরে যাবেন। আমাদেরো শেরপা গাইড তিনি। আমরা আস্তে আস্তে উপরে উঠছি। ছোট বড় পাথরের বোল্ডারের পাশ ঘেঁসে, উপর দিয়ে। বড় একটি পাথরের খাঁজে উঠে এলাম।  ১৫৫৩০ ফুট উচ্চতায়। 

১৫৫৩০ ফুট উচ্চতার এই স্থানটি পর্যন্ত আমরা হাইকিং করি ১৫৫৩০ ফুট উচ্চতার এই স্থানটি পর্যন্ত আমরা হাইকিং করি 


আমাদের সবার এই উচ্চতায় আসার অভিজ্ঞতা আছে শুধু ছায়াবিথী ও রিনি আপু ছাড়া। তাদের এই উচ্চতায় আসা এই প্রথম। তাই আমরা একটু উৎযাপন করলাম। ছবি তুললাম। সেখানে কিছু সময় থেকে পানি চকলেট খেয়ে আবার বেসক্যাম্পে ফিরে এলাম। 
বেসক্যাম্পে ফিরেই গরম চা আর খেজুর খেলাম।  এদিকে দুপুরের খাবারও তৈরি। ডাইনিং-এ সবাই খেতে বসলাম।  দাকিপা জানালেন খাবার শেষে আমাদের সবার আরোহণের জিনিসপত্র চেক করবেন।  খাবারটা ভালো হয়েছে তাই পেট পুরে খেলাম। 
সকল জিনিসপত্র বের করে রাখলাম।  আইস বুট, ক্র্যাম্পন, হারনেস, জুমার, হেলমেট ও অন্যান্য জিনিস।  দাকিপা সবগুলো এক এক করে পরীক্ষা করে দেখলেন।  সব ঠিক আছে।  এখনি আমরা আমাদের ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম।  কাল ভোরে আমরা হাইক্যাম্পে যাবো।  সেখানে একদিন থাকবো।  সেখান থেকে ক্যাম্প-১ এ যাবো। তারপর সেখান থেকে সামিটের উদ্দেশ্যে যাবো।  তাই ভালো করে সব ঠিকঠাক গুছিয়ে নিচ্ছি। ভুলে কিছু রেখে যাচ্ছি কিনা তাও দেখছি বারবার। 
রিনি আপু ও ছায়াবিথী আপু বেসক্যাম্পেই থাকবেন।  তারা আমাদের ব্যাগ গুছাতে সাহায্য করছে।  আমরা ব্যাগ গুছিয়ে আবার ডাইনং-এ এসে চা আর পপকর্ন খেলাম।  পাশের ক্যাম্পে থেকে কিলিপেম্বা শেরপা আমাদের ক্যাম্পে এলেন।  উপরের রাস্তা সম্পর্কে ধারনা দিয়ে গেলেন।  তিনি এই সিজনে তিনবার সামিট করেছেন এই কেয়াজো-রি।  আমাদের সাথে সামিট করতে পারলে চারবার হবে। আগে তিনি এই পর্বত আরো দু’বার সামিট করেছেন। 
আমরা অনেকেই ভাবী যারা পর্বতারোহীদের সাথে গাইড হিসেবে যায় তাদের শেরপা বলে।  সম্পূর্ণটাই ভুল।  শেরপা একটি জাতি বা গোষ্ঠি।  তাদের পর্বতারোহণের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ নেই।  তাদের জন্ম বেড়ে উঠা সব এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে।  পাহাড়ি পথ ও এই উচ্চতার আবহাওয়া তাদের রক্তের সাথে মিশে আছে।  আমদের দলে এখন দুই শেরপা। দু’জনই অভিজ্ঞ শেরপা। 
দাকিপা শেরপা প্রথম থেকেই সাথে আছেন। হাসিখুশি একজন মানুষ।  গায়ের রং ফর্সা। দেহের গঠনও ভালো। উচ্চতা ৫ ফুট ৫/৬ ইাঞ্চ হবে। তিনি ২০০৮ সাল থেকে এপর্যন্ত সাত বার মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণের জন্য গিয়েছেন। ৫ বার তিনি মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করেছেন।  লোৎসে ২ বার, আমাদাব-লাম-১ বার সহ আরো অনেক সাত হাজার ও ছয় হাজার মিটার পর্বত জয় করেছেন। মাউন্ট কেয়াজো-রি আমাদের সাথেই প্রথম আরোহণে এসেছেন। দশ বছর আগে তিনি বিয়ে করেছেন। আট বছরের একটি মেয়ে ও সাত মাসের একটি ছেলে শিশু আছে। 
আমাদের অপর শেরপা গাইড কিলিপেম্বা শেরপা। তিনি আমাদের সাথে কেয়াজো-রি বেসক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন। আমাদের আগে আরো তিনটি আরোহী দলকে কেয়াজো-রি সামিট করিয়েছেন। আমাদের সাথে তিনি চতুর্থ বারের মতো উপরে যাবেন।  দেহের গঠন বেশ ভালো।  উচ্চতা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি।  গায়ের রং তামাটে।  সে এ পর্যন্ত সাত বার মাউন্ট এভারেস্ট আরোহণ করেছেন।  ধউলাগিরি ২ বার, মানাসলু ২ বার, আমাদাব-লাম ৬ বার, কেয়াজো-রি ৬ বার সহ অনেকগুলো পর্বত আরোহণ করেছেন। 
সন্ধ্যায় ডাইনিং তাবুর ভেতরে বসে স্যুপ খাচ্ছি।  দলনেতা মুহিত ভাই আমাদের বিভিন্ন কিছু নির্দেশনা দিচ্ছেন।  যারা উপর যাবো তাদের কী কী করণীয় তা বুঝিয়ে দিলেন।  আর রিনি ও ছায়াবিথী আপুকে বেসক্যাম্পে থাকার বিষয়ে বুঝিয়ে দিলেন।  উপরে যেহেতু দুর্গম ও কঠিন এবং লম্বা পথ কাল আমাদের পাড়ি দিতে হবে তাই রাতের খাবারের শেষে দেরি না করে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। 

 

(চলবে)

 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৮ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)