৪ নভেম্বর। বেসক্যাম্প।উচ্চতা ১৪,৭০০ ফুট।
আজ অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। পথের দৈর্ঘও অনেক। সাড়ে ছ’টার মধ্যে সবাই রেডি হয়ে ডাইনিং তাবুতে চলে এলাম। গরম গরম চা পান করে শরীরটা একটু চাঙ্গা করে নিলাম। শেরপা ও ইয়াক চালকরা তাবু গুছিয়ে ফেললেন। সাতটার সময় আমাদের সকালের খাবার হলো। বাবুর্চি বুসন খাবার প্যাক দিলেন। এই প্যাক খাবার দিয়েই পথে কোথাও দুপুরর খাবার সেরে নিতে হবে। 
পৌনে আটটার সময় আমরা বেসক্যাম্পের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। মেনদে গ্রামের উপরের সেই মুনাস্ট্রির পাশ ঘেসে খাড়া চড়াইয়ের পথে হাঁটছি। এখন যত উপরে উঠছি গাছ তত ছোট হচ্ছে। চৌদ্দ হাজারের পর থেকে আর গাছ নেই। হাতে গোনা কয়েকটি বার্জ গাছ দেখা যাচ্ছে।  সেগুলোও খুব একটা বড় না।  

কঠিন চড়াই উঠছি  কঠিন চড়াই উঠছি

  
পাহাড়ের গা বেঁয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথে হেঁটে চলছি। খাড়া ঢাল। একটু হাঁটার পর পর দঁড়িয়ে দম নিতে হচ্ছে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। দাঁড়িয়ে পানির বোতল থেকে পানি পান করলাম। চকলেট মুখে নিয়ে চুষতে চুষতে আবার উপরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। 
প্রায় দশটা বাজে। আজ আবহাওয়া এখন থেকেই খারাপ হতে শুরু করছে। শীতও বেড়ে গেছে। তবে হাঁটার সময় গরম লেগে যায়। থামলেই আবার শীত। এখান থেকেই গাছ শেষ। যেগুলো আছে সেগুলোর উচ্চতা দু’ফুটের বেশি না। 

 বেসক্যাম্পের পথে বেসক্যাম্পের পথে


পাথড়ের উপরের দিয়ে হেঁটে চলছি। প্রায় তিন ঘন্টার খাঁড়া চড়াই উঠে এসে এই রিজের উপর পৌছালাম। এখন উপর থেকে মেনদে গ্রামটি দেখছি। কী সুন্দর এই ছোট্ট গ্রামটি। যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। এখানে মিনিট দশেক আমরা বিশ্রাম নিলাম। 

বিশ্রাম বিশ্রাম

যখন হেঁটে চলি তখন শীত তেমন বুঝতে পারি না। একটু দাঁড়ালেই শীত ঝেঁকে বসে। আবার যখন হাঁটা শুরু করি তখন গরম লেগে যায়। সাথে আনা গরম পানি পান করে চকলেট মুখে নিয়ে চুষতে চুষতে পাথুরে পাহাড়ের গা বেঁয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। উপরে উঠা যতটা কষ্ট নিচে নামা তত বেশি রিক্স। নামার সময়ই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। 
পাথরের খাঁজে খাঁজে সামনের জনের পায়ে পা ফেলে সামনে এগিয়ে চলছি। ছোট বড় পাথরের টুকরো পায়ের নিচে নাড়াচাড়া করছে। আবার উপর থেকে পাথরের টুকরো নিচের দিকে গড়িয়ে পরছে। কখনো কখনো পাথরের টুকরোগুলো পাশ ঘেঁসে নিচে পড়ে যাছে বিকট শব্দে। এই বুঝি গায়ে লেগে নিচে ফেলে দিচ্ছে। আর নিচে পড়ে গেলেই হলো। যম দেবতা সাদরে গ্রহণ করে নিবে। 

দুর্গম কঠিন পাথুরে পথে নেমে আসছি দুর্গম কঠিন পাথুরে পথে নেমে আসছি

এখন থেকেই পাথরের ভাঁজে ভাঁজে শুভ্রশীতল বরফ জমে আছে। সবার সামনে দাকিপা তারপর মুহিত ভাই, ছায়াবিথী আপু, আমি, রিনি আপু, শামীম ভাই, বিপ্লব ভাই ও নূর ভাই। আমরা বরফ হাতে নিলাম। ছোঁড়াছুড়ি করলাম। সামনে বরফ আর তুষারে ঢাকা পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে। 
তিন পাশে বিশাল পাহাড়ে ঘেরা। একটু খানি জায়গা সমতল। এখানে খোলা আকাশের নিচে মেঘের ভেতরে বসেই দুপুরের খাবার খাচ্ছি। পলিপ্যাকে কওে আনা খাবার। ঠান্ডা হয়ে কাঠ হয়ে আছে। একটা সেদ্ধ ডিম, কমলা, দু’টো পুরি। ডিম আর কমলা দিয়েই দুপুরের খাবার হলো। 

মাঝপথে দুপুরের খাবারমাঝপথে দুপুরের খাবার

ইয়াক ইয়াক

 
খাবার শেষে আবার চড়াই। এখন বড় বড় পাথরের বোল্ডারের উপর দিয়ে পথ। কখনো এক বোল্ডার থেকে অন্য বোল্ডারে লাফিয়ে। কখনো এক বোল্ডার থেকে নেমে অন্য বোল্ডারে উঠে এগিয়ে চলছি । বোল্ডার শেষে খাঁড়া চড়াই। ধীরে ধীরে একসময় আমরা উঠে এলাম রিজের উপরে। এর উচ্চতা ১৪,৯০০ ফুট। এটাই আজকের সবচেয়ে উচ্চাতায় উঠা। কেয়াজো রি বেসক্যাম্পের উচ্চতা ১৪,৭০০ ফুট। এখন তাই আমাদের নিচে নামতে হবে। কখনো কাঁদা কখনো ধুলো আবার কখনো বরফ আঁকাবাঁকা পথ ধরে নামছি। 

কঠিন ঢাল বেয়ে উপরে উঠছিকঠিন ঢাল বেয়ে উপরে উঠছি

বরফ গলা  নদী বয়ে চলছে আপন গতিতে। স্বচ্ছ পানির কলকল শব্দ মিশে যাচ্ছে মেঘেদের সাথে। আমরা সেই নদী পাড় হলাম পাথরের উপরে লাফিয়ে লাফিয়ে। নদীর পাশ দিয়ে সমতল ভূমির উপর দিয়ে হেঁটে চলছি। বরফ আর পাথরের উপর দিয়ে। মেঘে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। 
মেঘের ভেতর দিয়ে দূরে আমাদের তাবু দেখা যাচ্ছে। তাবু দেখার সাথে সাথে ভালো লাগছে। চলে এসেছি। এক্ষুনি বিশ্রামে যেতে পারবো। তাবুর ভেতরে ঢুকে গরম হবো। গরম গরম চা পান করবো। মুহিত ভাই ও ছায়াবিথী আপু আমাদের আগে বেসক্যাম্পে পৌছেছেন। তাদের দশ মিনিট পরে আমরা বেসক্যাম্পে পৌছাই আমরা। তখন ঘড়িতে সময় বিকেল ৩.২০ মিনিট।
নদীর পাশেই আমাদের তাবু করা হয়েছে। চারটে তাবু আমাদের। তাবুর ভেতর থেকেই পানির কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছি। একটু দূরেই টয়লেট তাবু। আমাদের তাবু থেকে দুইশত ফুট দূরেই কিচেন তাবু ও শেরপাদের দু’টো তাবু।  
বুসন আমাদের মগে করে হটলেমন দিলেন। কিছু সময় তাবুর ভেতরে বিশ্রাম নিয়ে কিচেন তাবুতে চলে এলাম। বসে বসে স্যুপ খাচ্ছি আর গল্প করছি। তাবুর ভেতরেই গ্যাসের চুলা জ্বলছে। এখানেই রান্না হচ্ছে রাতের খাবার। তাই তাবুর ভেতরে অনেক গরম। আড্ডা দিতে বেশ ভালোই লাগছে। খেজুর, কাজুবাদাম খাচ্ছি। সারাদিন অনেক পরিশ্রম হয়েছে। সবাই অনেক ক্লান্ত। তবু কারো চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। 
সাতটার সময় রাতের খাবার খেলাম। আজ খাবারে ছিলো ভাত, মুরগির মাংস, সব্জি ও ডাল। ক্ষুধাও লেগেছিলো অনেক। তাই খেয়েছিও অনেক। খাবার শেষে টিনের কৌটায় সংরক্ষিত ম্যাংগো ডেজার্ট খেলাম। তাবুতে যাওয়ার আগে এক কাপ গুড়ো দুধ গরম পানিতে নিয়ে খেয়ে নিলাম। তার পর সবাই তাবুর ভেতরে চলে এলাম।
আজ রাতে আমাদের ওনো খেলার প্লেয়ার দু’জন কম। নূূর ভাই ও ছায়াবিথী আপু। তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন। বিপ্লব ভাই, শামীম ভাই, রিনি আপু আর আমি আমাদের তাবুর ভেতরে ওনো খেলছি। মুহিত ভাই তার তাবুর ভেতরে শুয়ে গান শুনছেন। 
রাত দশটার সময় সবাই সবার তাবুতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমানোর আগে আমি আর স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে ঢুকে ছোট্ট নোট বুকে আজকের সারাদিনের গল্পটা লিখলাম। 
 
মাউন্ট কেয়াজো-রি বেসক্যাম্প      মাউন্ট কেয়াজো-রি বেসক্যাম্প

 

মাউন্ট কেয়াজো-রি টিমমাউন্ট কেয়াজো-রি টিম

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৭ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)