কিসের টানে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে পর্বতারোহীরা কেন পর্বতে যান? কোন ভবিষ্যত আছে? এই প্রশ্নের সম্মুখীন পর্বতারোহীদের সব থেকে বেশি হতে হয়। আমাকেও কম শুনতে হয়নি। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পর্বত অভিযান। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাব থেকে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেলাম মাউন্ট কেয়াজো-রি অভিযানের। 
নামচে বাজারের দক্ষিণে সলো খুম্বু অঞ্চলে হিমালয়ের সারিবদ্ধ পর্বতমালা চলে গেছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের চৌ-য়্যু পর্যন্ত। পশ্চিমে থামে ভ্যালী আর পূবে গোকো ভ্যালী রেখে দক্ষিন রিজের সবচেয়ে উঁচু শীর্ষবিন্দুটিই হচ্ছে মাউন্ড কেয়াজো-রি। ৬,১৮৬ মিটার/ ২০,২৯৫ ফুট। পর্বতটি বেশ আকর্ষণীয়, খাড়া চূড়া। যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে পর্বতারোহীদের সামনে দিগন্ত জুড়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে। খুব বেশি পর্বতারোহীরা এখনো এখানে ভিড় করেনি। ফলে যারা এই পর্বত সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তারা পর্বতের সেই কাঙ্খিত নিস্তব্ধতা উপভোগ করার দারুণ সুযোগ পেয়ে যান। নিঃসঙ্গ বিশাল বিস্তৃত ভ্যালীতে অপূর্ব সুন্দর এর বেসক্যাম্প। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও পর্বতারোহীদের টেকনিক্যাল দক্ষতা কতটা সেটা ভালোই পরখ করে নেয় মাউন্ট কেয়াজো-রি। নেপাল পর্যটন মন্ত্রনালয় ২০০২ সালে মাউন্ট কেয়াজো-রিকে পর্বতারোহীদের আরহণের জন্য খুলে দেয়। সেই বছরই একটি ফ্রাঙ্কো-বৃটিশ টিম প্রথম মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট করে। তারা মাচ্ছেরমো হয়ে এগিয়ে গিয়ে কেয়াজো গ্লেসিয়ার ট্রাভার্স করে দক্ষিন-পশ্চিম রিজ ধরে সামিট করে। এরপর ফ্রান্স, আমেরিকা, ডাচ, অস্ট্রেলিয়া নানা দেশের পর্বতারোহীরা মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট করেছেন। আর বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বারের প্রচেস্টায় প্রথম সামিট সম্পন্ন হলো ২০১৫ সালে। 
একটু হাঁটার পর পর দঁড়িয়ে দম নিতে হচ্ছে। হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। ছোট বড় পাথরের টুকরো পায়ের নিচে নাড়াচাড়া করছে। আবার উপর থেকে পাথরের টুকরো নিচের দিকে গড়িয়ে পরছে। কখনো কখনো পাথরের টুকরোগুলো পাশ ঘেঁসে নিচে পড়ে যাছে বিকট শব্দে। এই বুঝি গায়ে লেগে নিচে ফেলে দিচ্ছে। আর নিচে পড়ে গেলেই হলো। যম দেবতা সাদরে গ্রহণ করে নিবে। প্রতি মূহূর্তে দুর্ঘটনার আশংকা। আমার একটি পা পিছলে যাচ্ছিলো কোনো ভাবেই আটকে রাখতে পারছিলাম না। তারপর বসে পড়ে হাত দিয়ে বরফের খাজে ধরে পতন রোধ করি। বিপদজ্জনক এই পথ নেমে আসতে আমাদের কিছুটা সময় লেগে যায়। আবহাওয়া খারাপ থেকে আরো বেশি খারাপ হতে শুরু করছে। আবহাওয়াও আর ভালো হচ্ছে না। এ এক ভয়ংকর আনন্দে সামনে এগিয়ে চলছি। চড়াই শেষ হচ্ছ না। হৃদস্পন্দন এতই বেড়ে গেছে যে দম নিতে পারছি না।  হৃদপিন্ডটা বের হয়ে যেতে চাইছে।  তবু থেমে নেই। সামনে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। তাই সামনে যেতেই হবে। 
সবাই প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি। রাত ১২.৩০ মিনিটে তাবুর বাইরে সবাই বের হলাম। হেটলাইট, আইচ বুট, হারনেস পরে নিলাম। রাতের তাপমাত্রা ২০ (মাইনাস) ডিগ্রি। তাই গরম থাকার জন্য কয়েক স্তরের পোশাক পরতে হয়। তবু শীতের কারণে দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর। ঠান্ডা বাতাসও অনেক বেশি। দা কিপা ও কিলি পেম্বা আমাদের আরোহণের জিনিসগুলো ভালো ভাবে দেখে নিচ্ছেন। ঠিক রাত ১টার সময় আমরা সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। চারদিকে অন্ধকার। প্রথমেই হাইক্যাম্প থেকে বরফের ঢাল বেয়ে নিচে নামলাম। চারপাশের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধুমাত্র সামনের জনের পায়ের স্টেপ দেখে এগিয়ে চলছি। একটি লেকের কিনার দিয়ে এগিয়ে চলছি। লেকের পানি জমে বরফ হয়ে আছে। সেই বরফের উপর দিয়েই হেঁটে চলছি। নেই পতা ঝড়া শব্দ, কোনো পাখি কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। শুধু আমাদের পায়ে বরফের কচকচ শব্দ। এই একই তালে এগিয়ে চলছি অমোগ এক অনিশ্চয়তার দিকে। অন্ধকার থাকায় পাশের ভয়ংকর খাদ কিংবা বরফের ফাটল দেখতে পারছি না। দেখতে না পাওয়াটাও ভালো। এর কারণ পাহাড়ের একদম পাড় ঘেঁসে হাঁটার সময় ভয়ের বিষয় থাকে না। আকাশে মেঘ নেই। এত সুন্দর আকাশ আগে কখনো দেখিনি। আকাশ ভরা তারা মিটমিট করে জ্বলছে। শ্বেত শুভ্র পুতপবিত্র বরফের পাহাড়গুলো তাদের রূপ রাতের অন্ধকারেও জ্বলজ্বল করছে। কোনো শিল্পীর তুলি পারবে না এই সৌন্দর্য্য ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে। কোনো ভাষাতেও প্রকাশ করা সম্ভব না। 
একই দড়িতে আরোহণ করে আমাদের আগে আরো তিনটি দল সামিট করেছে। তাই দড়িটি পুরোনো হয়ে গেছে। আইস পিটনগুলোও নড়বড়ে হয়ে গেছে। সেই দড়িতে আমরা সাতজন ঝুলে আছি। কী এক মৃত্যুময় আনন্দে মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে উপরের দিকে জুমারিং করছি। জুমারিং করার সময় দড়ি নিচের দিকে ঝুলে। তখন ভয়ে গা শিউরে উঠে। এই বুঝি দড়ি ছিঁড়ে নিচে পরে যাচ্ছি। কোনো ভাবে এখান থেকে পড়ে গেলে হাজার ফুট নিচের পাথরের বোল্ডার স্বাগত জানাবে মৃত্যুর দুয়ারে পৌছে দিতে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই ঝুলে আছে। এক পা দু’পা করে স্টেপ দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে। আমারও একই অবস্থা। নিচে শামীম ভাই ও নূর ভাইও একই ভাবে ঝুলে আছে। সামিটের খুব কাছে আমরা দড়িতে ঝুলছি। আমার ডান পায়ের ক্র্যাম্পন বারবার খুলে যাচ্ছিলো। ফলে শক্ত বরফের গায়ে পা রেখে দাঁড়াতে পারছিলাম  না। এ এক নির্বাক ভয়ংকর আনন্দ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম আল্লাহ যদি চায় আজ সামিট করেই ফিরবো। দেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়াবই। সামিটের ২০/২৫ ফিট নিচ থেকে হাতের বামে যেতে হয়। এই ২০ ফুট রাস্তা খুবই বিপদজ্জনক। সরু নাইফ রিজ। মনে হচ্ছে যেকোন মূহুর্তে ভেঙে পরতে পারে। 
৭ নভেম্বর নেপালি সময় সকাল ১১.২৯ মিনিটে বিপ্লব ভাই প্রথম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বিজয়ী পদচিহ্ন ফেললেন। তারপর একেএকে মুহিত ভাই ও আমি উঠে আসি চূড়ায়। দুই শেরপাসহ আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি আকাশ ছুঁয়ে কেয়াজো-রির শিখরে। জীবনের প্রথম কোনো পর্বতের চূড়ায় পা রাখার আনন্দের  সুখ পেলাম। মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি স্বপ্ন জয়ের বহিঃপ্রকাশ করলো। বাকশূণ্য হয়ে শুধু চারপাশ দেখছি। সকল কষ্ট মূহুর্তেই ভুলে গেলাম। আবার মনে পড়লো সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা-‘একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ।’

এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইটি ছায়াবিথী প্রকাশনী ,স্টল নং- ২২১ এ পাওয়া যাচ্ছে।

বইটি ধারাবাহিক পর্ব আকারে অনুভ্রমনে প্রকাশিত হয়েছে।