দার্জিলিং; সমুদ্র সমতল থেকে ৭০০০ ফুট উচ্চতায় পাইনের ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত এক মায়াবী উপত্যকা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ অঙ্গরাজ্যের এই জেলা শহরটি অনেক আগে থেকেই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত এবং পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। Darjeeling নামটির উৎপত্তি Dorje এবং Ling শব্দ থেকে যার অর্থ বজ্রপাতের শহর। বর্ষাকালে ঘন ঘন বজ্রপাত এই নামের সার্থকতা প্রমাণ করে। এই শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। ভারতের সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন ঘুম এই শহরেই অবস্থিত। ৮০০০ ফুট উচ্চতার টাইগার হিল থেকে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট দেখা যায়। কেবল কাঞ্চঞ্জঙ্ঘার টানেই প্রতিবছর লাখো পর্যটক দার্জিলিং ঘুরতে আসেন। এছাড়াও সুপ্রাচীন বৌদ্ধ উপাসনালয় এবং জাপানিজ মন্দির এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। বিখ্যাত দার্জিলিং চায়ের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ কে হারাতে চায়? ক্যাবল কারে চড়ার উত্তেজনা কিংবা প্যারাগ্লাইডিং এডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তো রয়েছেই। সর্বোপরি, বিভিন্ন জাতি, ধর্ম এবং বর্ণের লোকজনের জীবনযাপন সামনাসামনি দেখার এবং তাঁদের সুখ-দুঃখের অনুভূতির সাথে একাত্ম হওয়ার চমৎকার সুযোগ দার্জিলিং এ পাওয়া যাবে। "আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি" দার্জিলিং এর এক জীবন্ত আখ্যান। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এক চমৎকার যুগলবন্দী।

বইটিতে ১১ টি অধ্যায় আছে। প্রথম অধ্যায় “পশ্চিমবঙ্গে স্বাগতম”। অধ্যায়টি শুরু হয়েছে বাংলাদেশ থেকে যাত্রার বর্ণনা দিয়ে। লেখকের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের উত্তেজনাকর অনুভূতির প্রকাশ পাওয়া যায় প্রথম পর্বে। পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের বর্ণনা দিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। দ্বিতীয় পর্ব “রোড টু দার্জিলিং” এ আছে ভ্রমণ পথের বর্ণনা। সমতল থেকে ৭০০০ ফুট উচ্চতায় উঠার পথে আবহাওয়া এবং প্রকৃতির পরিচয় বিধৃত হয়েছে এই পর্বে।

পরের পর্বগুলো দার্জিলিং শহর এবং এর চারপাশের দর্শনীয় স্থানের বর্ণনায় ভরপুর। লেখক শুধু নির্দিষ্ট স্থানের ব্যাপারে দুই একটি লাইন লিখে কিংবা ছবি দিয়েই ক্ষান্ত হন নি। যখন যেই জায়গায় গিয়েছেন সেই স্থানের পুরো ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। ফলে বইটি ভ্রমণ কাহিনীর পাশাপাশি হয়ে উঠেছে ইতিহাসের এক প্রাঞ্জল সাক্ষ্য। এই যেমন তৃতীয় পর্ব “শুভ সকাল দার্জিলিং”এ সেই ব্রিটিশ আমলেরও আগে থেকে দার্জিলিং শহরের পুরো ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। কিভাবে নেপাল এবং সিকিমের দ্বন্দ্বর সুযোগ নিয়ে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দার্জিলিং দখল করে নিয়েছিল সেই ইতিহাস গল্পচ্ছলে বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে আছে শহর দার্জিলিংএর ঘুম থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠার বৃত্তান্ত।

চতুর্থ পর্বে দার্জিলিং এর বিখ্যাত মন্দির এবং প্যাগোডার বর্ণনা রয়েছে। সেই সাথে ইতিহাসের মিশ্রণ তো আছেই। বৌদ্ধ মন্দিরের প্রবেশমুখে সবসময় কেন সিংহমূর্তি থাকে সেটির এক প্রাঞ্জল বর্ণনা পাওয়া যাবে এই পর্বে। চায়ের জন্য জগৎবিখ্যাত দার্জিলিং। দার্জিলিং এর চা-বাগানের সৌন্দর্য বিধৃত হয়েছে পঞ্চম পর্বে। সেই সাথে আছে সুপরিচিত রক গার্ডেনের সচিত্র বর্ণনা।

ক্যাবল কারে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ। যে না চড়েছে সে এই আনন্দ কিছুতেই বুঝতে পারবে না। ষষ্ঠ পর্বে আছে ক্যাবল কারে চড়ে দার্জিলিং দেখার বর্ণনা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এইখান থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাওয়া যায়। সপ্তম পর্বে আছে বিখ্যাত ঘুম রেলস্টেশনের গল্প। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৪০৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই রেলস্টেশনটি ভারতের উচ্চতম এবং পৃথিবীর ১৪তম সর্বোচ্চ রেলস্টেশন এবং জাতিসংঘের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। সেখান থেকে একটু দূরেই বাতাসিয়া লুপ যেখানে বিখ্যাত দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে প্রায় ২৭০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এই রেলপথে বিখ্যাত কিছু সিনেমার শুটিং হয়েছে। কোন কোন সিনেমার জানেন কি?

লেখকের দার্জিলিং ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন করা। ৮০০০ ফুট উচ্চতার টাইগার হিলে দাঁড়িয়ে তিনি কি পেরেছিলেন দেখতে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে? নাকি সূর্যোদয় দেখেই তৃপ্ত হয়েছিলেন? টাইগার হিলের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে “আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি” পর্বটিতে।

আপনি যদি পাহাড় ভালোবাসেন তাহলে আপনার মনে নিশ্চিতভাবেই অভিযানের আগ্রহ আছে ধরে নেওয়া যায়। আর হিমালয় অভিযানে আগ্রহী অভিযাত্রীদের অবশ্য গন্তব্য দার্জিলিংএর হিমালয় মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট। “হিমালয় ছোঁয়ার স্বপ্ন” পর্বটিতে আছে হিমালয় মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট এর বর্ণনা। সেখানকার মিউজিয়ামটি অসাধারণ সব সংগ্রহে ঋদ্ধ। প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং নোরগের সমাধিও আছে সেখানে। সেই সাথে বোনাস হিসাবে আছে দার্জিলিং এর চিড়িয়াখানা ঘোরার সুযোগ। অনেক দুর্লভ প্রজাতির প্রাণীর সংরক্ষণ এবং প্রজনন ঘটানো হয় এখানে।

আলাদা গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠন নিয়ে দার্জিলিং প্রায়ই উত্তপ্ত হয়ে উঠে। দার্জিলিংবাসীরা কেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা হতে চান সেই বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছেন লেখক। কেন এই আন্দোলন, কেনই বা সরকারের এত অনীহা আর কিভাবেই বা দার্জিলিংবাসীরা ব্যাপারটাকে নিচ্ছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন লেখক। তিনি কি আদৌ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন? “কালিম্পং! কালিম্পং!” পর্বটিতে বিস্তারিত লেখা হয়েছে।

কালিম্পংএ লেখক জীবনের সেরা এডভেঞ্চারটি করেছিলেন। সেটি হচ্ছে প্যারাগ্লাইডিং এর অভিজ্ঞতা অর্জন। প্রায় ১০ মিনিট আকাশে পাখির মতো উড়ার অভিজ্ঞতাটি অবর্ণনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ। উপর থেক সবকিছুই অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। দিগন্তের পাহাড়সাড়ি আর পাইনের ঘন অরণ্যে আচ্ছাদিত কালিম্পং এর সৌন্দর্য এক নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করে মনে।

মিরিক হ্রদের বর্ণনা দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে। ৫০০০ ফুট উচ্চতার এই হ্রদটির একপাশে আছে পাইনের ঘন অরণ্য। দার্জিলিং থেকে মিরিক আসার রাস্তার অসাধারণ সৌন্দর্যের বর্ণনা বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে বিদ্যমান। সেই সাথে নেপাল সীমান্তের পাহাড় থেকে সান্দাকফুর ট্রেইল দর্শনের আনন্দ তো আছেই।   

বইটি শেষ হয়েছে দার্জিলিং ভ্রমণের অনেকগুলো ছবি দিয়ে। তবে ছবি দিয়ে কি আর আসল সৌন্দর্য বোঝা যায়? সেই জন্য দার্জিলিং ঘুরে আসার বিকল্প নেই। আর দার্জিলিং ঘুরতে চাইলে এই বইটি আপনার উপকারে আসবে নিশ্চিত। কারণ দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা ছাড়াও কিভাবে জায়গাগুলোতে ঘুরতে হবে এবং কেমন খরচ পড়বে সবকিছু বিস্তারিতভাবে বইটিতে দেওয়া আছে। পড়ার আমন্ত্রণ রইল।

 

"আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি"

লেখকঃ ফাহমিদুল হান্নান রূপক

প্রাপ্তিস্থানঃ অমর একুশে বইমেলা ২০১৭

প্রকাশক # দেশ পাবলিকেশন 

স্টল নাম্বার # ৫০২-৫০৩

 

লেখকলেখক

 

লেখক পরিচিতি

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

বাবা আইনজীবী, মা গৃহিণী। জন্ম নরসুন্দার তীরে কিশোরগঞ্জ জেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসিতে স্নাতক এবং  স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। লেখালেখির হাতেখড়ি স্থানীয় সাপ্তাহিক শুরূক পত্রিকায়। শঙ্খচিলের ডানা পোষাকি নাম নিয়ে ব্লগে লেখালেখি শুরু করেন ২০১০ সালে। নাগরিক ব্লগে লেখা শুরু করলেও ইষ্টিশন ব্লগেও প্রচুর লিখেছেন। বর্তমানে ভ্রমণ কাহিনী লিখে যাচ্ছেন অনুভ্রমনে। প্রথম উপন্যাস “উত্তরাধিকার” প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের একুশে বইমেলায়। ভৌতিক থ্রিলারধর্মী উপন্যাসটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ “জলফড়িং”। বিভিন্ন ব্লগে প্রকাশিত ৮ টি গল্প এই সংকলনে স্থান পেয়েছে। এই বইটিও দেশ পাবলিকেশনের স্টলে পাওয়া যাবে।

“আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি” লেখকের প্রথম ভ্রমণ কাহিনী।  অনুভ্রমনে এটি ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছে। বই পড়া লেখকের সবচেয়ে বড় শখ। দাবা খেলতে পছন্দ করেন। পেশায় ফার্মাসিস্ট লেখকের নেশা ভ্রমণ করা। বাংলাদেশের প্রায় সবকয়টি জেলায় পা রাখার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছে। বিশেষ করে পাহাড় তাঁকে খুব টানে। খুব দ্রুতই আবারও পাহাড়ের টানে ঘর ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হিমালয় স্পর্শের অধরা স্বপ্ন কোন একদিন সত্যি হবে ভেবে আপাতত সময় কাটাচ্ছেন। সেই সাথে বাংলাদেশে ঘুরাঘুরির অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও একটি ভ্রমণ কাহিনী লেখার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে তাঁর দ্বিতীয় থ্রিলার উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছেন। সামনের বছরের বইমেলায় সেটি প্রকাশ হতে পারে।