বছর দেড়েক আগে টাইম পত্রিকায় বিশ্বের সেরা বাঘ বিশেষজ্ঞ এক মার্কিন জীববিদের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম, বাঘের অতীত, বর্তমান, ম্রিয়মাণ ভবিষ্যৎ, চোরাশিকার ইত্যাদি নিয়ে বিশদ বর্ণনার পরে উনি সবাইকে চমকে দিয়ে ২টি তথ্য দেন,

১) উনি জীবনে কোন দিন বুনো বাঘ দেখেন নি !
২) উনার বাঘে অ্যালার্জি আছে!

এবং তারপরও উনিই বিশ্বের সেরা বাঘ বিশেষজ্ঞ। সেই সাক্ষাৎকারের সুত্র ধরে বিবিসির বাঘ চোরাশিকার নিয়ে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ডকুমেন্টরি দেখে ফেলি যেখানে একেবারে গোয়েন্দাদের মত অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেল যে বাঘের চোরাকারবারের পিছনে অন্যতম কারণ পূর্ব এশিয়ার কিছু রাষ্ট্র বিশেষ করে চীনের মানুষদের যৌনক্ষমতা বৃদ্ধি সহ অন্যান্য কিছু আশায় বাঘের বিশেষ বিশেষ অঙ্গের চাহিদা এবং চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে তারই অধীনের একটি অংশ তিব্বতের বিপুল সংখ্যক মানুষের হাতে কাঁচা টাকা আসার ফলে তারা অতি মর্যাদা সম্পন্ম বাঘের চামড়া চোরাইপথে কেনার জন্য নগদ অর্থের ছড়াছড়ি। পরবর্তীতে স্বয়ং দালাই লামা যে কোন ধরনের বুনো প্রাণীর চামড়া বা অঙ্গ সংগ্রহের বিরুদ্ধে সরাসরি ভাষণ দিলে হাজার হাজার তিব্বতি তাদের শখের বাঘের, তুষার চিতার, চিতাবাঘের চামড়া পুড়িয়ে ফেলে। আশা করা যায় অন্তত তিব্বতের অধিবাসীদের চাহিদা কমার কারণে বাঘের মৃত্যুর হার কিছুটা হ্রাস পাবে।

এই সময়ে হাতে আসল Reaktion books সিরিজের বাঘ নিয়ে লেখা সুসি গ্রিনের বইখানা, এই সিরিজের ব্যপক ভক্ত আমি, পিপড়ে থেকে শুরু করে নীলতিমি পর্যন্ত তারা যা নিয়েই বই প্রকাশ করেছে তাই-ই সেই প্রাণী নিয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা গবেষণালদ্ধ তথ্যে ঠাসা হয়েছে। বিশেষ করে সেই বিশেষ প্রাণীটির সাথে মানুষের সম্পর্ক, মানুষের চিত্রকলা, সাহিত্য, লোকগল্প এবং মানস জগতে প্রাণীটির কী পরিমাণ প্রভাব তা তুলে ধরা হয়েছে অসংখ্য পেইন্টিং, ভাস্কর্য, প্রাচীন ছাপচিত্র ইত্যাদির ছবি দিয়ে, সেই সাথে ছড়া, কবিতা, পুরাণ, লোকগল্প, ইতিহাস তো আছেই! মানে একটি বিশেষ প্রাণীর শুধু যে বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ কথাবার্তা তা নয়, বরং মানুষ ও সেই প্রাণী কিভাবে কতটা জড়িত তা নিয়েই এগিয়েছে চমৎকার বইগুলো।

প্রথমেই বাঘের শ্রেণী বিন্যাস করা হয়েছে, জীবজগতের মাংসাশীদের মাঝে তার ঠাই, আজ হতে ৬০ মিলিয়ন বছর আগের পৃথিবীতে মাংসাশীদের আবির্ভাব ঘটে, যদিও বিখ্যাত খড়গদন্তী বাঘ (Sabor-toothed Tiger) যে আদতে বাঘই ছিল না সেটা বলার পরে বাঘের বিবর্তন, আদি বাঘের বিচরণক্ষেত্র, শিকার ইত্যাদি ইত্যাদি ।

১৯০০ সালে পর্যন্ত পৃথিবীতে ৮ ধরনের বাঘ ছিল যাদের মধ্যে কাস্পিয়ান বাঘ, বালি বাঘ, জাভা বাঘ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে মানুষের কারণে, দক্ষিণ-চীনে বাঘও সম্ভবত বিলুপ্ত, সবচেয়ে বড় বেড়াল জাতীয় প্রাণী সাইবেরিয়ান বাঘ টিকে আছে ৪০০র মত, ইন্দোচীনা বাঘ ১৫০০, সুমাত্রা বাঘ ৪০০ এবং রয়েল বেঙ্গল বাঘ হয়ত সাকুল্যে ২৫০০ ! এই হচ্ছে বাঘের অবস্থান, দেখা যাচ্ছে বাঘ কেবল এশিয়াতেই আছে।

২০০০ বছরেরও আগে ইতিহাসবিদ প্লিনির প্রাকৃতিক ইতিহাসের ৮ নং ভলিউমে লিপিবদ্ধ আছে যে বাঘ সবসময়ই মানুষকে এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে। যদিও গত কয়েকশ বছরে মানুষ সেধে যেয়ে হানা দিয়েছে বাঘের ডেরায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাপুরুষের মত মনের খেয়ালে হত্যা করতে। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায় অনেক ব্রিটিশই এক হাজারের উপর বাঘ খুন করেছে শিকারের নেশায় বা খ্যাতির লোভে। যেখানে ১৬০০ সালে এক লক্ষ বাঘ ছিল, সেখানে ১৯০০ সালে তার অর্ধেক হয়ে পঞ্চাশ হাজার এবং ১৯৭০ সালে আড়াই হাজারে নেমে আসে!

বাঘ কখনই প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিকার করে না, খুনের আনন্দে শিকার করে না, কেবল দিনের প্রয়োজন মেটানো হলেই সে সন্তুষ্ট। তবে একেক বাঘের খাদ্যাভাস একেক রকম, কেউ এক বসাতেই ২৭ কেজি মাংস খেয়ে চলে জায়,আর ফিরেও আসে না শিকারের কাছে, আবার কেউ কেউ এক টানা কয়েক দিন ধরে খেতে আসে, বিশেষ করে যারা পচে নরম হয়ে যাওয়া মাংস পছন্দ করে। বাঘ সাধারণত একাকীই শিকার ও খাওয়া সারে, যদিও বাঘিনী বাচ্চাদের নিয়ে খায়, আর প্রজনন মৌসুমের মিয়াঁ-বিবি অনেক সময় একসাথেই ভোজনপর্ব সমাহার করে।

মিলন মৌসুমে সাধারণ ৫ দিন যৌন অভিযান চলে, এবং মাঝে মাঝে তারা দিনে ৫০ বার সঙ্গম করে। বাঘিনী সাধারণত ২ থেকে ৩ টি বাচ্চা প্রসব করলেও বিবর্তনের আপাত রহস্যময় কারণে বাঘের সংখ্যা পড়তির দিকে থাকলে একেকবারে ৭টি বাচ্চাও প্রসব করে! অন্ধ অবস্থায় জন্ম নেওয়া বাঘের বাচ্চার প্রথম খাদ্য তাদের মায়ের দুধ। পরবর্তীতে তারা মায়ের সাথে যেয়েই শিকার করতে শেখে।

এর পরপরই সুসান আলোকপাত করেছেন মানবজাতির সুদীর্ঘ ইতিহাসে বাঘের ভুমিকার কথা, বাঘের শক্তি, ক্ষিপ্রতার প্রতি মানুষের মুগ্ধতার কথা, যে কারণে দেশে দেশে বাঘকে ঈশ্বর জ্ঞানে, নিদেন পক্ষে ঈশ্বরের বাহন হিসেবে পূজা করা হয়। প্রাচীন চীনের বেশ্যালয়ে বাঘের জননাঙ্গের স্যুপ কামোত্তেজক এবং রতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হত এবং এখনো হয়, অথচ এর পক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি, কিছু গণ্ডমূর্খ এককালে মনে করত, আরে বাঘ এত শক্তিশালী প্রাণী, বাঘের পেনিসের স্যুপ খেলে মনে হয় বাঘের মত শৌর্য বীর্য নিয়ে সঙ্গম করতে পারব, অথচ সত্যি কথা হচ্ছে বাঘ সঙ্গম করে বাঘের হিসেবে, মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য! আবার আধুনিক বিশ্বে যৌনশক্তি বর্ধনের সবচেয়ে নামকরা ঔষধটির নাম ভায়াগ্রা যা এসেছে বাঘের সংস্কৃত নাম ব্যাঘ্র থেকে। মানে বাঘের কল্পিত গুণ বেচতে পিছিয়ে নেই কেউ-ই!

এসেছে চীনে কবিরাজি ঔষধে বাঘের হাড়ের চাহিদা, আমজনতার কাছে বাঘের চামড়ার আবেদন ( নানা দেবদেবীরা বাঘ ছাল গায়ে দিয়ে অথবা বাঘের চামড়ার উপরে বসেই গুলতানি করে )। এসেছে সত্যিকারের বাঘ শিকারি মুঘল বাদশাহদের কথা, বাবুর শব্দের মানেই ছিল বাঘ, আকবর প্রায়ই একটি মাত্র ধনুক এবং তীর সঙ্গী করে বাঘ শিকার করতে যেত, ৮৬টি বাঘ হত্যা করা জাহাঙ্গীর প্রায়ই পায়ে হেঁটে বাঘ শিকার করার চেষ্টা করত, এবং মাঝে মাঝে বাঘের সাথে সত্যিকারের মল্লযুদ্ধে মেতে উঠত।

বিখ্যাত শিকারি, পরিবেশবাদী, লেখক জিম করবেট সম্পর্কেও সামান্য আলোকপাত করেছেন সুসি, যদিও তার মতে করবেট ঝুঁকিহীন অবস্থায় থেকে বাঘকে গুলি করতেন। এসেছে আমাদের বাদাবনের কিংবদন্তী গাজী পীর এবং দক্ষিণ রায়ের পুরাণকথা। যদিও আজ পর্যন্ত ইতিহাসের যে শাসক বাঘকে সবচেয়ে বেশী মূল্যায়ন বা ব্যবহার করেছেন তিনি মহিশুরের টিপু সুলতান। টিপু শব্দের অর্থ বাঘ। উনার সিংহাসন ( বাঘ্রাসন) ছিল বাঘের আদলে তৈরি, প্রায় সব অস্ত্রে সোনালী বাঘের ছাপ থাকত, প্রাসাদের বাগানেও দুটি বাঘ শেকল বাঁধা অবস্থায় থাকত সবসময়।

রোমানদের কলোসিয়ামে যেমন বাঘ সিংহ মানুষ খুনের মোচ্ছব চলতে তেমন চলত ভারতবর্ষেও। সুরগুজার মহারাজা একাই ১৭০৭টি বাঘ হত্যা করেছিল। তারা বাঘ- সিংহকে এক খাঁচায় ছেড়ে দিয়ে দেখতে তাদের মরণপণ লড়াই।

এরপর কবিতা বিশেষ করে উইলিয়াম ব্লেকের বিখ্যাত টাইগার টাইগার, সারকাস, চলচ্চিত্র, প্রাচীন ধর্ম, জাদুবিদ্যা ইত্যাদিতে বাঘের অনিচ্ছুক অবস্থান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

১৯৩৮ সালে জিম করবেটের ভাষ্যমতে বাঘের চমৎকার একটি ছবি তাকে শিকারের চেয়ে বেশী আনন্দ প্রদান করে উক্তিটি বাঘের সংখ্যাহ্রাসের ব্যাপারটি সবার সামনে নিয়ে আসে।

আর আজ বাঘের অস্তিত্ব প্রায় সম্পূর্ণ রূপে মানুষের করুণার উপর নির্ভর করছে। ৫,৫০০ বছর আগে দক্ষিণ সাইবেরিয়ার আমুর নদীর তীরে মানুষের পাথরে খোঁদাই করা বাঘের ছাপ পাওয়া গেছে, যা এখন পর্যন্ত মানুষের শিল্পে প্রাপ্ত প্রাচীনতম বাঘের অস্তিত্ব, এতটা পথ একসাথে পাড়ি দিলেও মানুষ ও বাঘ পরস্পরের শত্রুই থেকে গেছে। বাঘের চোরা শিকার, তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ব্যবসা যদি আমরা থামাতে না পারি তাহলে আর কয়েক দশকের মধ্যেই বাঘ দেখা যাবে কেবল ছবির বইয়ে এবং তথ্যচিত্রে।

আমাদের রয়েল বেঙ্গল-

সুন্দরবন হচ্ছে সমগ্র বাংলায় বাঘের থাকার জন্য সবচেয়ে জঘন্য জায়গা, যে বাঘ এক সময় সারা দেশে ছড়িয়ে ছিল , আজ মানববসতির আগ্রাসনে বাসস্থান হারাতে হারাতে তারা ঠাই নিয়েছে লোনাপানির বাদা বনে, যেখানে প্যাচপ্যাচে কাঁদার ছুরির মত ধারালো শ্বাসমূল এড়িয়ে তাদের চলাফেরা করতে হয়, স্বাদু পানির ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তারপরও বাঘ সবচেয়ে বেশী টিকে আছে সুন্দরবনেই,কারণ মানুষ এখন পর্যন্ত সুন্দরবন কব্জা করতে পারে নি, বা করতে চায় নি। এই না পারা অথবা না চাওয়া প্রলম্বিত হোক, টিকে থাকুক বাঘেরা বুনো পরিবেশ।

বাঘ রক্ষায় আমাদের সামর্থ্য মত আমরা যা করতে পারি –

বাঘ জনিত যে কোন রকম ব্যবসা থেক বিরত থাকা, এবং কাউকে সেই ব্যবসায় জড়িত দেখলে বুঝিয়ে বলা। বিশেষ করে কোন চীনা আর আরবকে যদি দেখেন বাঘের পেনিস খুঁজছে নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য বা সক্ষমতা বাড়াবার জন্য, প্রমাণ দিয়ে বুঝিয়ে দিন যে সেটা তো কোন কাজের নয়, মাঝখান থেকে তার মত অর্থব মর্ষকামীর জন্য একটা অপূর্ব প্রাণী অকালমৃত্যুর শিকার হয়েছে। আর সেইসাথে সুন্দরবন রক্ষার সাথে থাকুন- সেখানে যেয়ে হরিণের মাংস খাওয়ার মত বালখিল্যতা করবেন না, যদি ভাবেন আপনি না খেলেও অন্য কেউ খাবে, তাহলে অন্যদেরই মুড়ি ভিজাতে দিন, আপনি বিরত থাকুন। সুন্দরবন বাঘের শেষ আশ্রয় বাংলাদেশে, সেটা আমাদের জোরসে হিন্দি গান বাজিয়ে, বিরিয়ানির প্যাকেটে খাল ভরিয়ে দিয়ে পিকনিকের জায়গা না, এটুকু অন্তত মনে রাখুন, মেনে চলুন।

২৯ জুলাই বিশ্ববাঘ দিবস