ফেসবুক জগতটার সাথে তখন নতুন পরিচয় হয়েছে, দেশ-বিদেশের নানা মানুষের তোলা ছবি দেখি, তাদের শখের, রুচির প্রতিফলন দেখি ভার্চুয়াল জগতে। বিশাল সেই মহাসাগরের নানা মুখী স্রোতে আলতো ভাবে কারো কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায়, সেটা সময়ের সাথে আরও গাঢ় সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়। শিশুকাল থেকে ডাকটিকেট সংগ্রহ করতাম, মূল কারণ ছিল নানা দেশের অধিবাসী এবং তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা। পরে ভিউকার্ড থেকে পত্রবন্ধু হয়ে যখন বইয়ের জগতের কানাগলি হাতড়ে ফিরছি, তখনও সেই একই উদ্দেশ্য- নানা দেশের মানুষ সম্পর্কে জানা। উত্তরের দেশে প্রথমবার পাড়ি জমানোর পর বছর তিনেক একটানা বাংলার কাদা-মাটি-জল থেকে দূরে থাকার সময় বুঝতে পারলাম এত সব ডাকটিকেট-ভিউকার্ড-মুদ্রা-বই সংগ্রহ যতই করি না কেন, তারচেয়েও ভাল হয় কোন এলাকার মানুষের সাথে বন্ধুত্ব হলে, এরপর চেয়ে কোন জনপদ সম্পর্কে জানার কোন ভাল উপায় নেই, হতেও পারে না, আর সেই সাথে আছে বিশ্বে সেরা সম্পদ লাভ- বন্ধুত্ব।

কিন্তু বন্ধুত্ব এমন একটা জিনিস যা বেছে বেছে জোর করে করা যায় না, সেটা আপনা থেকেই হয়। খুব বিপরীত ব্যক্তিত্বের মানুষের সাথেও হয়, আবার আহারে-বিহারে-রুচিতে-অরুচিতে চরম মিল তাদের সাথেও হয়ে হয়ে কী যেন একটা ফাঁক থেকেই যায়। এই ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত নীতি হচ্ছে- পথ চলতে থাকো, যার সাথে বন্ধুত্ব হয় হবে, রাজাকার তোষণকারি ছাড়া কাউকে শত্রু বানানোর দরকার নেই।

এমন ভাবেই ফেসবুকে পরিচয় তুরস্কের মেয়ে ফুলিয়া আনলিরের সাথে, বাড়ি তাঁর সুদুর ইস্তাম্বুল শহরে। ইস্তাম্বুল শুনলেই বসফরাসের লোনা হাওয়া ঘুরে ওঠে অস্তিত্বের চারপাশে, বাইজেন্টাইন ইতিহাস ঝলকে ওঠে সুরম্য সব শিল্পকর্মে, পায়রার ঝাঁকের সাথে অটোম্যান সুলতানদের স্থাপিত নিখুঁত সব মসজিদের মিনার আর প্রাসাদ যেন গ্রাস করে নেয় আদিগন্ত মহাবিশ্ব। খুব যেতে ইচ্ছে করে সময়কে আটকে রাখা এই জাদুনগরীতে, যেখানে সময়ের পথ বেয়ে ইতিহাস আজও বর্তমান আধুনিক তুরস্কের হাত ধরে।

এমন কথা শুনেই ফুলিয়া বলে উঠল, “ঘুরে যাও ইস্তাম্বুল।নিজে সাথে থেকে ঘুরে ঘুরে দেখাব তোপকাপি প্রাসাদে রাখা পীরি রইসের ম্যাপ, বসফরাসের গোল্ডেন হর্ণের কাছের গালাথা টাওয়ার, ওরহান পামুকের মহল্লা, সবই!”

বাহ, শুনেই তো দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু থাকব কোথায়? ফুলিয়ার সরল উত্তর- তোমার ইচ্ছে। চাইলে ইউরোপ-এশিয়ার যেখানে মিলনরেখা সেখানের কোন হোটেলে, বা আমার বাসায়। 
বাসায় কে থাকে?
“বাবা, মা আর পড়ায় সমবয়সী ছোট ভাই ফাতিহ”।
তোমার বাসায় কোন সময় অন্য দেশের বন্ধু এসে ছিল?
“নাহ, এই জন্যই একটা সমস্যা হবে, আমরা কিন্তু কেউই ভাল ইংরেজি বলতে পারি না, তখন মাঝে মাঝে লিখে লিখে একে অন্যকে বুঝতে হবে।”

তখন কেবল এক মাস ফুটবল বিশ্বকাপ দেখে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরেছি, চিন্তা ভাবনা ছিল সারাকে (এখন পর্যন্ত দেখা আমার সেরা ট্রাভেলমেট এবং সেই সময়ের গার্লফ্রেন্ড, জীবনের ৫টা বছর আমরা একসাথে ছিলাম, পাহাড়ে চড়েছি, সাগরে ডুবেছি, দেখেছি আসমুদ্রহিমাচল একইসাথে) নিয়ে এশিয়ান কোন দেশে যাবার। বিশেষ করে ইতিহাসের ছোঁয়া আছে অলিতে গলিতে এমন জায়গায়। সে তো ইস্তাম্বুলের কথা শুনে মহা খুশি, তার উপর যখন স্থানীয় সদ্য পরিচিত বন্ধু ফুলিয়ার কথা বললাম, উৎসাহের যেন বান ডাকল! কারণ, এর আগেও একাধিক বার নানা দেশে ভ্রমণে আমার স্থানীয় মেয়েবন্ধুরা দারুণ করে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে আমাদের।এশিয়া এক আলাদা পৃথিবী তার কাছে, সেখানে পরিচিত কেউ থাকলে মন্দ হয় না। বললাম, রসো , রসো! তুর্কি মুসলিম পরিবারের মেয়ে, আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবে সে এক জিনিস আর আমরা তার বাসায় উঠব সে দিল্লী দূর অস্ত। আগে জিজ্ঞাসা করেই দেখি।

দিন দুই পর ফুলিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তো ইস্তাম্বুল আসবই, কিন্তু সাথে আমার প্রেমিকাও আসবে, সে ফিনল্যান্ডের অধিবাসী, তার নিজের কোন অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস নেই, অন্যের বিশ্বাসেও নাক গলায় না। তাতে তার পরিবারের কোন সমস্যা হবে কিনা? সেই রকম হলে আমরা অন্য কোথাও উঠে, বরং তাদের সাথে দেখা করব চায়ের আড্ডায় একবেলা, এমনটাও বললাম। কিন্তু ফুলিয়ার এক কথা, “তোমরা আমাদের বাড়িতেই উঠবে, আমি নিজের বিমানবন্দর যেয়ে তোমাদের নিয়ে আসব, তবে সাথে একটু ভাল ইংরেজি জানে এমন বন্ধুকে নিয়ে যাব। আর হ্যাঁ, বিমানবন্দরে আমি লাল জ্যাকেট পরে থাকব।”

২০১০এর ডিসেম্বরের শেষ দিকে শীতের দুপুরে ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরের হরেক ধরনের ছিল-ছাপ্পরের চক্কর শেষে অবশেষে দেখা মিলল নতুন বন্ধুর, লাল জ্যাকেট পরে মৃদু হাসি নিয়ে অপেক্ষারত। সাথে আরেক তুর্কি তরুণী জুলাল। মহা সমারোহে হৈ হৈ করে নিয়ে গেল তাদের বাসায়, শুধু কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করল যেন ইংরেজি একটু আস্তে আস্তে থেমে থেমে বলি।

(তুরস্কের প্রথম সন্ধ্যায় আড্ডারত ফুলিয়া, সারা, জুলাল )

আতাখেন্ত এলাকার এক বিশাল অট্টালিকায় তাদের ফ্ল্যাটবাড়ী, বাবা রিজাহ আনলির তুর্কিশ এয়ারের সিনিয়র প্রকৌশলী, মা ফিলিজ শখের চিত্রকর, ফুলিয়া নিজে নৃতত্ত্ব নিয়ে পড়ে আর জগতের যত কুকুর-বেড়াল-খরগোশ-পাখির যত্ন আত্তি করে বিশেষ করে মালিক পরিত্যক্তদের।ভাই ফাতিহ পড়ে কলেজে আর বাস্কেটবল খেলে, আর আছে খরগোশ দুমান। তুর্কি ভাষায় দুমান মানে ধোঁয়া, তাই তার দেখা না মিললেই আমরা বলতাম যে- ধোঁয়া খরগোশ আসলেই ধোঁয়া হয়ে গেছে। এই হচ্ছে সংক্ষেপে আনলির পরিবার, যারা সেই প্রথম দেখাতেই পরিণত হয়ে গেলে আমার একান্ত আপনার জনে, ইস্তাম্বুলের আশ্রয় হিসেবে।

তুর্কি সংস্কৃতির অন্যতম অংশ অতিথি আসলেই টেবিল ভর্তি খাবার রেখে (যেখানে কহা কহা মুল্লুকের ছাগলের দুধের চীজ থেকে শুরু করে কুর্দিস্তানের তরমুজ, এজিয়ান সাগরের দ্বীপ থেকে আনা জলপাই, কৃষ্ণসাগর তীরের উৎপাদিত চা সবই উপস্থিত থাকে) অতিথির উপরে মমতার ষ্টীম রোলার চালানো।

তার ঠেলাতে প্রথম রাতেই বেড়াল মারার মত প্রথম চা-পানের আড্ডাতেই বললাম ”আমরা এসেছি ইস্তাম্বুল ঘুরতে, এবং এখানে এন্তার কাবাব, শরবত সবই খাব কিন্তু বাড়িতে রান্না করে সময় নষ্ট করা যাবে না, রেস্তোরাঁয় খাব। শহরটাও দেখা হল, আর সেখানের রাঁধুনিদের দক্ষতাও জেনে নিলাম তেল-ঝাল-মশলা মেশানোর। আর হ্যাঁ, বিল কিন্তু আমরাই দিব”।

ঐ বলা পর্যন্তই সার! পরের যে কয় দিন থাকলাম ইস্তাম্বুলে সবসময়ই গাড়ি নিয়ে ফুলিয়ার বাবা রিজাহ আনলির আমাদের নিয়ে গেছে নানা দূর-দূরান্তের গন্তব্যে। কোন সময়ই পকেটে হাত ঢুকোবার সুযোগটা পর্যন্ত দেন নি, রেস্তোরাঁতে দূরে থাক, একাধিক বার বই কিনতে যেয়ে তুর্কি ভাষায় দামাদামি করতে বললে সুন্দর করে দামাদামি সেরে একেবারে বইটি কিনে এনে হাতে দিয়ে বলত, বইটি পড়তে পড়তে আমাদের মনে কর ভবিষ্যতে!

আর ব্যাপারটা মোটেও অর্থের সাথে জড়িত নয়, অবাক হয়ে আনন্দের সাথে দেখেছিলাম কত খোলা মনের মানুষ তারা। মেয়ের আমন্ত্রণে অজানা অচেনা বাংলাদেশের তরুণ এসেছে শ্বেতাঙ্গীনী প্রেমিকা নিয়ে তাদের বাসায়, তাদের মেয়ের ঘর ছেড়ে থাকতে দিয়েছেন আমাদের। দূরের পিকনিকে যাবার সময় খাবার তৈরি করে দিয়েছেন ভোর বেলাতেয় পরম মমতায়। ভাষার সমস্যা তো ছিলই, প্রায়ই দেখা গেছে পাশাপাশি তিন ল্যাপটপে বসে আমরা লিখে চলেছি কে কী বোঝাতে চাই, তার ৫ মিনিট পর সবাই ওহ, আই সি বলে একমত হয়ে বা হৈ হুল্লোড় করে তর্ক করেই চলেছি। খানিক পরেই ফের ল্যাপটপের সাহায্য আবার পরস্পরকে বোঝার জন্য!

ফুলিয়া আর ফাতিহর মাধ্যমে পরিচয় ঘটল আরও একগাদা তুর্কি বন্ধুর সাথে,

যাদের সাথে বন্ধুত্বও আজ অটুট আছে, যোগাযোগ হয় কালেভদ্রে।

দেখতে দেখতে নতুন পরিবারের সাথে থাকার সময়ের সলতে পুড়তে থাকে দ্রুত, বিমানবন্দরে আমাদের গাড়ি চালিয়ে পৌঁছে দেন আনলির দম্পতি, সেই সাথে প্যাকেট করে দেন চমৎকার কয়েকটি তুর্কি স্যুভেনির, আর পইপই করে বলে দেন তাদের বাড়িকে যেন নিজের বাড়ি মনে করে যখন ইচ্ছা চলে আসি ফের।

তাইই ফিরলাম, এই সেদিন, দেশে ফেরার পথে এজিয়ান সাগর তীরের বুরশা শহরে হাচল বন্দনার সাথে দেখা করে তার সাথে ট্রয় নগরী ঘুরে, বসচাদা দ্বীপ ছুঁয়ে মাওলানা নৃত্য দেখে টাটা বাই বাই বলে একা ফের ইস্তাম্বুলের পথে বাসে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝে ভোর ৫ টার ইস্তাম্বুল খুব সুখকর কিছু নয় মোটেও বিশেষত সাথে এক মণ বাক্সপেটরা থাকলে। তাই নিয়েই ট্যাক্সি চেপে চললাম ইস্তাম্বুলের বাড়ি আতাখেন্তে। দরজা খুলেই ঘরের ছেলে ফিরে আসার আনন্দ নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন রিজাহ এবং ফেলিজ, চোখ মটকে ফুলিয়া জানালো “শেষ দেখা হবার পর প্রায় ৫ বছর চলে গেছে বুড়ো পৃথিবীর পথে পথে!”

আসলেই?

তাইই তো! আজ যাব, তো কাল যাচ্ছি, রুমির সমাধি কনিয়াতে যাব, নাকি বিশ্বের প্রথম উপাসনাগৃহ গোবেকলে-তেপিতে, আর্মেনিয়ার যাবার সেরা সময় কোনটা এই সুলুক সন্ধান করতে যেয়েই ৫ বছর চলে গেছে। যদিও অভিভাবকদের কোন ভ্রু-ক্ষেপই নেই, যেন এক উইকএন্ড বাহিরে কাটিয়ে ঘরে ফিরেছে চলে এমন স্বাভাবিক চালচলন!

(মা আনলির ফিলিজের সাথে ৫ বছর পর ফের দেখা, বেড়ালটির সাথে আগে দেখা হয় নি)

আবার এলো এন্তার নাস্তা, ঠাণ্ডা বৃষ্টির কাঁপুনি দূর করতে কড়া কফি আর জলে ভাসা পদ্মের মত টলটলে চোখের অধিকারিণী এক জীবন্ত ভাস্কর্য, নাম তার এজে। সে ফুলিয়ার বন্ধু এবং আজকের দিনের গাড়ির ড্রাইভার ও গাইড! যে তরুণীর জন্য নতুন করে ট্রয়ের যুদ্ধ হতে পারে যে কোন দিন সে কোন আমাকে গাড়িতে ঘুরাবে? তার বদলে সারা জীবন গাড়ি চালালে কেমন হয় এমন দুষ্টুমি করতেই এজে জানাল” আগে দেখই তো গাড়ি কতটা ভাল চালাতে পারি!” কথায় কথায় জানা গেল সে স্থানীয় এক ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল আবার হ্যান্ডবল লিগেও খেলে। একজন মানুষ ক্যামনে এত প্রতিভার অধিকারি হবার পরও ঘুমায় কে জানে!

(৫ বছর পর দেখা ফুলিয়ার সাথে, আর এজের সাথে প্রথমবার)

তাদের সাথে প্রথমেই গেলাম ইস্তাম্বুলে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া কুকুরদের আশ্রমে, তারপর পর পামুকের জাদুঘর, গালাথা টাওয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সেই গল্প অন্য পোস্টে হবে। আজ সেই তুর্কি পরিবারের কথা চলুক, যারা এক সমুদ্র ভালবাসা দিয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর পারের এক বঙ্গসন্তানকে নিজেদের পরিবারের একজন হিসেবে ঠাই দিয়েছে।

এবার ফেরার পথে যখন ফুলিয়া আর এজে নামিয়ে দিয়েছিল বিমানবন্দরে, বলেছিলাম “জলদি দেখা হচ্ছে”।

(গালাথা টাওয়ারে আমরা)

জলদিটা কত জলদি সেটাই এক দেখার বিষয় এখন! তবে যত দেরীই হোক, জানি ইস্তাম্বুলে আমার তুর্কি পরিবারের কেউ না কেউ থাকবেই দুয়ার খুলে দেবার জন্য।