পাখির প্রতি ভালো লাগা সেই ছোটকাল থেকেই। আমার স্মৃতির পাল্লা বহুদূরে প্রোথিত। দুবছর বয়সের অনেক স্মৃতি এখনও ঠিক ঠিক মনে করতে পারি। পাখির স্মৃতিও সেই সময়ের। তখন আমার দাদা বেঁচে ছিলেন। সকালের নাস্তাটা সারতাম দাদার কোলে বসেই। দাদা উঠেনে চিড়-মুড়ি ছিটিয়ে দিতেন। ভাত শালিখ, দোয়েল ত্রস্ত পায়ে এসে ছিটানো চিড়ামুড়িতে ভোজন সারত। পাশে বসে দাদি আমাকে পাখি চেনাতেন। পাখির জন্য ভালোবাসা সেই শুরু। এরপর পাখির প্রতি আমার ভালোবাসা পাখিদের ক্ষতিই করেছে। আমাদের ঘরের ছাদ সেকেলে। চুন-সুরকির জলছাদ। কড়ি-বর্গার ওপর বসানো। কড়ি বর্গার ফাঁকে বাসা বাঁধত চড়ুই পাখিরা। সেদিকে চকচকে চোখে তাকিয়ে থাকতাম। পাখির ছানা, ডিম ভীষণ আকর্ষণীয় বস্তু। চুপি চুপি পাখির ছানা ধরতাম। মা-বাবা পাখিদের তখন কী ভিষণ চেঁচামেচি! মনে হতো আমাকে প্রচণ্ড গালিগালাজ করছে ওরা। তারপরও ছাড়তাম না। তখন পাখিদের সেই চেঁচামেচি পরিণত হতো করুণ আর্তিতে। যেন আমাকে বলছে, আমাদের ছানাদের ছেড়ে দাও ভাই!

তবুও ছাড়তাম না। কিন্তু মা টের পেয়ে যেতেন। ভীষণ বকাবকি করতেন। বলতেন মানুষের যেমন কষ্ট আছে, সুখ দুঃখ আছে, পাখিদেরও আছে। আজ যদি তোমাকে কেউ চুরি করে, তখন তোমার কেমন লাগবে বলো তো? আমারই বা কেমন লাগবে। পাখিদেরও অমন লাগে। ওদের ছানারাও মায়ের জন্য কাঁদে। 
মায়ের কথা শুনে বুকটা তখন ভারি হয়ে যেত। পাখির ছানাদের ছেড়ে দিতাম। ধীরে ধীরে যত বড় হলাম, পাখিদের সুখ দুখের কথা ততই বুঝতে লাগলাম। এরপর সপ্তম শ্রেণির বইয়ে একটা গল্প মনে ভীষণ দাগ কাটল। শ্রদ্ধেয় আলী ইমাম ভাইয়ের ‘পাখিদের নিয়ে’। ঝনিয়ামুখি পাহাড়ের ধারে ওই যে ঢ্যাঙামতো লোকটা, পাখির জন্য কী মমতা তার! ঝড়ে পড়া পাখিদের জন্য ওষুধ ব্যান্ডেজ খুঁজে বেড়ায়। লোকে তাঁকে পাগল বলে। পাখির প্রতি মমতা আর গাঢ় হলো তারপর।

এর অনেক অনেক পরে আরেকজন লোকের দেখা পেলাম। গল্পের নায়ক নন, বাস্তবের মমতাভরা মানুষ। ইনাম আল হক। মানে আমাদের ইনাম ভাই। তারেক অণুর মাধ্যমে পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে মানষটাকে চেনা। ঝনিয়ামুখি পাহাড়ের ওই মানুষটার মতোই পাখিদের প্রতি দরদ। শুনেছি শিকারিদের কাছ পাখি কিনে আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার মাঝে সুখ খুঁজে পান।

‘পাখিদেরও আছে নাকি মন’ বাংলাভাষায় এমন সুখপাঠ্য পাখির বই আছে বলে আমার জানা নেই। পাখিদের সম্পর্কে কত নতুন কিছু যে জানলাম! অপেক্ষায় ছিলাম তার পরবর্তী বইয়ের। ২০১৫-এর একুশে বইমেলায় তার অবসান ঘটল। বাংলা একাডেমি থেকে বেরুলো ‘পাখিদের সুখদুখের’ কথা। 
ছোটদের জন্য লেখা। তবে আমার বিশ্বাস পাখিপ্রেমী সববয়সী মানুষই সমান উপভোগ করবে বইটা। অত্যন্ত সহজ ভাষায় পাখিদের জীবন, সুখদুখের নানা গল্প একেঁছেন বইয়ের পাতায় পাতায়। প্রতি পাতায় একটা করে রঙিন পাখি। আর তাদের গল্প।
সব আমাদের ঘরের পাশের পাখি। এদের দেখে দেখে, এদের গান শুনতে আমরা বড় হয়েছি। মনে আছে হলদে পাখি বলত ‘একটা খোকা হোক’। নতুন বউয়েরা লজ্জায় মুখ ঢাকত।

শাশুড়ি বলত ‘বউ কথা কউ’। জবাবে বউ বলত ‘চোখ গেলো’। কত উপকথা, কত কল্পগল্প শুনেছি ওদের নিয়ে। কিন্তু সত্যিকারের গল্প কেউ করেনি। দুখের কিংবা সুখের খবর দেয়নি কেউ। এনাম ভাই দিলেন সেই খবর এতদিনে। রঙিন বইয়ের মলাটে। ছেলেবেলার ‘চয়নিকা’র সেই ঘুঘু আর শিকারির গল্প আবার ফিরে পেলাম।

এবার বাড়ি গিয়ে প্রথমবারের মতো নীলকণ্ঠ পাখি (আসলে নীলকান্ত) দেখলাম। তখন বুঝিনি এই পাখি কেন একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা গাঁদাফুলের ক্ষেতের আশপাশে। ক্ষেতটাই আগুন লাগানো হয়েছিল। পরে এই বইয়ে পেলাম তার সমাধান। নীলকণ্ঠরা নাকি আগুন লাগা ভুঁইয়ের আশপাশে ঘোরে আগুনের ভয়ে ছুটে পালানো পোকাদের খাওয়ার জন্য।
ফুল চাই ফুল ঝুরি, ঠুক-ঠুক কাঠঠোকরা, টুক-টুক বসন্তের গল্প পাবে ছেলে মেয়েরা এই বইয়ে। জানবে দরদি পিতা দলপিপির মমতার কথা। ফলদ গাছে হরিয়ালদের আনাগোনা, ডোবার পাখি ডাহুকের সংগ্রাম যেমন আনন্দ দেবে, পাখি শিকারি পেরেগ্রিন আবার মন খারাপ করে দিতে পারে।

নিমপ্যাঁচার কথাই ধরুন না। কতটুকু চিনি? দেখা যাক ইনাম ভাই কীভাবে চিনিয়েছেন ওদেরকে।

বইয়ের শুরুতেই লেখক বলছেন, ‘আমাদের মতো পাখির মনেও অনেক আনন্দ। আবার কিছু দুঃখও আছে পাখির মনে। মানুষের হাতে পাখি কষ্ট পায়। অনেক সময় না জেনেই মানুষ পাখির ক্ষতি করে। তবে পাখি মানুষের বহু উপকার করে। বীজ ছড়িয়ে পাখি বন বানায়। পোকা খেয়ে এরা গাছপালা ও ফসল বাঁচায়। বর্জ্য খেয়েও দেশটাকে সাফ রাখে। তাই আমার কোনও পাখির কষ্ট দেইনে। আমরা পাখির মঙ্গল চাই। আমরা বনের পাখিকে খাঁচায় ভরি না। পাখির ডিম ও ছানা নষ্ট করি না। পাখি কখনও শিকার করি না। বুনো পারি মাংস খাই না। পাখি দেখেই আমাদের অনেক আনন্দ। পাখির ছবি তুলে তো আরও মজা। পাখির গান শুনে আমরা খুশি হই। মুক্ত পাখি উড়তে দেখে আমাদের মন ভরে যায়।’
এখানে লেখক নিজেই যেন এক শিশু। পাখিপ্রেমী শিশুর মনের কথাগুলো এভাবেই উঠে এসেছে বইয়ের পাতায় পাতায়। আরেকটা ব্যাপার লক্ষনীয়, বইয়ের ডিজাইন। ইনাম ভাই যেমন সুলেখক, অসাধারণ আলোকচিত্রী, দুঃসাহসিক অভিযাত্রিক, তেমনি অসাধারণ ডিজাইনার। পাখিদের নিয়ে করা বহু স্ট্যাম্পের ডিজাইনার তিনি। এই বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ তিনি ছাড়া অন্য কেউ করলে কতটুকু সুন্দর হত সন্দেহ আছে। বইয়ের প্রত্যেক পাতায় রঙিন ছবির ব্যবহার আমাদের যেমন মন কেড়ে নেয়, তেমনি শিশুদেরও পাখিদের রঙিন রাজ্যে হাতছানি দেবে।
বাংলা একাডেমি বইটির দাম রেখেছে ৪০০ টাকা। প্রতিটা বাবা মায়েরই উচিৎ এমন একটা বই তাঁদের ছেলেমেয়ের হাতে তুলে দেয়া। তাতে পাখিদের অজানা জগৎ সম্পর্কে যেমন জানতে পারবে, তেমনি পাখিদের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে তাদের।