জিম করবেট হলেন জঙ্গলের বিজ্ঞানী। জঙ্গলের প্রতি পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে মৃত্যু, জিাঘংসা, কূটিলতা। সে সব শুধু সুনিপূণ ভাবে আবিষ্কারই করেনি করবেট, রীতিমত জঙ্গলের আইন তৈরি করে উত্তরসুরিদের জন্য একটা সুনির্দিষ্টি পথনির্দেশনা রেখে গেছেন। জঙ্গল আজ বিলুপ্তির মুখে, তাই করবেটের ‘‘জাঙাল লোর’’ কতদিন কাজে লাগবে তা নিয়ে সন্দিহান আমরা। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চার যাদের রক্তে মিশে আছে, তারা কী থেমে যাবেন। না, তাই কি হয়! শিকারের নেশা মানুষ কমাতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু দিন দিন বেড়ে চলে পর্বতের হাতছানি। এক হিমালয়ই ভুলিয়ে ভালিয়ে তার বুকে ডেকে নিয়ে শত শত পর্বতারোহীর প্রাণ কেড়ে নেয়। হিমালয় যেন মায়াবী ঘাতক--সে এভারেস্টই হোক আর কাঞ্চনজঙ্ঘা কিংবা অন্নপূর্ণা। কিন্তু এর মায়ডাকও তো উপেক্ষা করার মত নয়। তাই পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি উপেক্ষা করে, তুষারের বুকে অগ্নির উপাখ্যান রচনা করতে নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো চূড়ার দিকে অগ্রসর হন অদম্য প্রাণ অভিযাত্রীকেরা।


এড ভিশ্চার্য

করবেটকে যদি জঙ্গলের বিজ্ঞানী বলা যায়, এড ভিশ্চার্যকে পর্বতের বিজ্ঞানী বলতে কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়। পর্বতের প্রতিটা ধাপে, বরফের পরতে ঘাপটি মেরে থাকে বিভীষিকাময় মৃত্যু। তুষার ঝড়, তুষার ধ্বস--এসব তো আছেই। এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করে কীভাবে সামিটে শেষ পেরেক ঠুকতে হয় তার অনুপুঙ্খ বর্ণনায় ঋব্ধ এই বই।
বইটিতে যদি ঢালাওভাবে পর্বত আরোহণের কৌশল টাইপের বর্ণণা থাকত তাহলে পাঠক ধরে রাখতে ব্যর্থ হত নিশ্চিত। এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা, করবেটের মতো তিনিও হাত বাড়িয়েছেন তাঁর দীর্ঘ মাউন্টেনার জীবনের রোমান্সকর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। সেখান থেকে একে একে তুলে এনেছেন কীভাবে তীলে তীলে নিজেকে মাউন্টেনার হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে একটা দলকে নেতৃত্ব দিতে হয়, কীভাবে প্রতিটি পদচিহ্ন পর্বতের বুকে আঁকতে হয়, কী ভাবে বিপদগ্রস্ত সঙ্গিকে সহযোগিতা করতে হয়, কীভাবে পর্বতে রোপ ফিক্সড করতে হয়, কখন সামিটের প্রস্তুতি নিতে হয়, কখন সামিট থেকে ফিরে আসতে হয়? তুষার ঝড় কিংবা বরফ ধ্বসে কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়--তাও হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন এড ভিশ্চার্য।


মূল ইংরেজি বই

১৯৯৬ সালের এভারেস্ট বিপর্যয়ের চাক্ষুষ বর্ণণা আপনাকে টানটান উত্তেজনায় ঠাসা থৃলারের স্বাদ পাইয়ে দেবে। কিন্তু কিংবদন্তি পর্বতারোহী রব হল, গ্রে বল, কিংবা শঁতাল মাদুইয়ের নির্মম মৃত্যুতে দুফোঁটা চোখার জল সংবরণ করা সাধ্যাতিত।

একটা কথা ভাবতে অবাক লাগে, এই বই যিনি অনুবাদ করেছেন, তাও এমন ঝরঝরে অনুবাদ--তিনি নিজেই কেন পাহাড়ের কাছে পরাজিত হলেন! তাঁর কী মনে ছিল না ভিশ্চার্যের কিংবদন্তি বাণী--“পর্বতারোহীদের পর্বতের মন বুঝতে হয়” কিংবা “সামিট করা বাধ্যতামূলক নয়, ফিরে আসা বাধ্যতামূলক।”


সজল খালেদ

বন্ধুরা, বলছিলাম অকাল প্রয়াত পর্বতারোহী সজল খালেদের কথা। এড ভিশ্চার্যের এই বিখ্যাত বইটির অনুবাদ শেষ করেই তিনি পাহাড়ের বুকে নিজের জীবনকে সপে দিয়েছেন। বইটি পড়তে গিয়ে রব হল, গ্রে বল, কিংবা শঁতাল মাদুই যেমন আপনাকে কাঁদাবে, পুরো বইটা পড়ার সময় সজল খালেদ নামটাও পাথর চাপা দিয়ে আপনার বুকটা ভারী করে রাখবে। 

আমরা যারা ঘরকুনো বাঙালী, বইটি তাদের কল্পনার ভেলার ভাসিয়ে একটানে নিয়ে যাবে হিমালয়ের দুলঙ্ঘনীয় ১৪ টি ৮০০ মিটার পর্বতের শিখরে।
“পাহাড়ের নেশায় অদম্য প্রাণ” বইটা বাংলায় প্রকাশ করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। তবে এর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তী প্রিয় কাজিদা অর্থাৎ কাজী আনোয়ার হোসেনের ভূমিকা। বইটির দাম ৪০০ টাকা।

ছবি: