সোভিয়েত ইউনিয়ন সময়ের একেবারে শেষদিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সরকারি আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন সেই অঞ্চলে, বিশাল সেদেশে তিনি ছিল খুবই অল্প সময় এবং মাত্র ৪ জায়গায় তার যাওয়া হয়েছিল সেই স্মৃতি থেকে লিখেছিলেন সাকুল্যে ১৮০ পাতার ছোট্ট একটি বই ‘রাশিয়া ভ্রমণ’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের  ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ পড়ে যাদের ভালো লেগেছে এই বইটিও নিঃসন্দেহে ভালো লাগবে।

রাশিয়া ভ্রমণরাশিয়া ভ্রমণ

 

এটি ছিল পূর্ব ইউরোপের সুনীলের প্রথম ভ্রমণ, পশ্চিম ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ভালভাবে ঘুরে গেছেন এর আগে।  তাই রাশিয়ায় পা দেবার পরপরই বারবার ঘুরে ঘুরে  আসছিল পূর্ব এবং পশ্চিমে তুলনা -কোন দেশের নাগরিকরা অপেক্ষাকৃত ভালো আছেন,  কার বাড়িঘর ভালো, কোন দেশের দোকান মাংস বা চীজের সরবরাহ বেশি,  কোথায় নদীর জল আরেকটু  নীল এমন সব বিচিত্র চিন্তা সবসময় খেলে যাচ্ছিল লেখক মনের গহীনে।

তার নিজের ভাষায় তিনি লিখেছেন, “যে-কোনো নতুন দেশে এলেই প্রথমটায় একটা রোমাঞ্চ হয়সোভিয়েত রাশিয়া সম্পর্ক কৌতূহল, আগ্রহ পুষে রেখেছি কতদিন ধরে আমরা একটা দেশকে সবচেয়ে ভালো করে চিনি তার সাহিত্যের মধ্য দিয়েএই সেই টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি, গোর্কি, মায়াকোভস্কির দেশপৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম একটি দেশে প্রোলেতারিয়েতরা শোষণমুক্ত সমাজ-ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে, এই দেশটি দেখবার জন্য আমি অনেকদিন থেকেই ব্যগ্র হয়েছিলুম, অকস্মাৎ আমন্ত্রণ পেয়ে খুবই পুলকিত বোধ করছি

বই নিয়ে তথ্যবই নিয়ে তথ্য

 

মস্কো বিমানবন্দরে সুনীলের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তার গাইড সের্গেই, যে তাকে ভ্রমণের পুরোটা সময় সঙ্গ দিয়ে ছিল এবং নিয়ে গিয়েছিল ইতিহাসের নানা অলিগলিতে। প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিল মস্কো শহরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে মস্কভা নদী এবং তারপর সেরগেইয়ের পরামর্শমতো রেড স্কয়ার। তার মতে রেড স্কয়ার না দেখলে মস্কো শহরকে অনুভব করা যায় না।

সুনীলের বিশেষ আকর্ষণের জায়গা ছিলেন  মস্কোর রাইটার্স ইউনিয়ন, এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এখানে যে লেখকদের আড্ডা সস্তা থাকা-খাওয়া ও আলাপ আলোচনার ব্যবস্থা ছিল, যা দেখে সুনীল যথেষ্ট সুনামই করেছেন। সেইসাথে জানিয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান ভাষা ৭৭টি, প্রতিটা ভাষায় আলাদা সাহিত্য আছে, তার মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রাশান ভাষায় অনুবাদ হচ্ছে এবং রাশিয়ান ভাষা লেখা অনুবাদ চলেছে আঞ্চলিক ভাষায়! এ বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছিল দশকের পর দশক!

এর পরের গন্তব্য লেনিনগ্রাদ , যার প্রথম এবং বর্তমান নাম সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়ান সাংস্কৃতিক রাজধানী বলেই বিখ্যাত জলের উপরে গড়ে ওঠা এই অপূর্ব সুরম্য নগরী।

 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে সুনীলের প্রায় ২৫ বছর লেলিনগ্রাদে গেলেও  মিল খুজে পেলাম নামার পর তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতা নিয়ে,  “হঠাৎ এক সময় আমার শরীরে রোমাঞ্চ হলো এই সেই  সেন্ট পিটার্সবার্গ, এখানকার রাস্তা দিয়ে দস্তয়েভস্কি হেঁটেছেন! নিকোলাই গোগোল এখানে ইতিহাসের মাস্টারি করতে করতে একদিন বুঝেছিলেন, সাহিত্যই তাঁর মুক্তির পথ; পুশকিন লিখেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস, একটি নিগ্রোকে নিয়ে। সাহিত্য জগতের বিশাল বিশাল বনস্পতিদের  স্মৃতিজড়িত সেই শহরে আমি বসে আছি?

সেই সাথে ‘নেভা’ নদী  দেখে তাঁর আত্মকথন, “যেকোন নতুন নদী প্রথমবার পার হবার সময় বেশ কিছুক্ষণ নদীর সৌন্দর্য না দেখে আমার যেতে ইচ্ছা করে না, তাড়াহুড়ো করে অন্যমনস্কভাবে কোন নদী পার হওয়া উচিত নয় সমস্ত জলেরই চরিত্র আলাদা

বইয়ের ফাঁকে এক পরিচিত নাম দেখে মনে হলো অনেক চেনা  এই স্টেশন, যার নাম ফিনল্যান্ড স্টেশন, যতদূর মনে পড়ে নির্বাসন শেষে লেনিন ফিনল্যান্ড থেকে এই স্টেশনে এসে নেমেছিলেন। সেই সাথে আছে প্রিয় জাদুঘর হার্মেটেজ ভ্রমণের চকচকে স্মৃতিগুলো, অসাধারণ , অতি বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম দেখার আনন্দের প্রকাশ।

এখানে সুনীল একাধিক লেখক এর সাথে নিঃসঙ্গ আলাপচারিতায় মগ্ন হন, নানা মানুষের সাথে কথাবার্তার অংশগুলো লিখে রেখেছেন তাঁর বইয়ের পাতায়, আকুল হয়ে জানার চেষ্টা করেছেন আধুনিক সোভিয়েত জীবনের সুবিধা-অসুবিধাগুলো।

এর পরের গন্তব্য বাল্টিক সাগরের কাছের রিগা নগরী (বর্তমানে স্বাধীন দেশ লাটভিয়ার রাজধানী), সেখানের এক  রেস্তোরাঁয় ওয়েট্রেসকে দেখে মনে মনে বলেছিলেন, “কালো গাউন পরা দীর্ঘকায় যুবতী এলো আমাদের কাছে অর্ডার নিতেতাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার প্রায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতন অবস্থা নিজে যদি এই শহরের নাগরিক হতাম তাহলে এ রেস্তোরায় নিশ্চয় রোজ কফি খেতে আসতাম!”

সুনীলের কথাসুনীলের কথা

 

রিগা শহরে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল দাঁড়িয়ে যে লেখকের কাছে তারা গিয়েছিলেন তার স্ত্রী ‘মাদাম আর্তা দুমপেই’ খুবই নামকরা একজন ভাস্কর এবং তাঁর নিজের খোদাই করা প্রমাণ সাইজের রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য আছে!

এই অঞ্চলের ঘুরেফিরে বারবার এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের আগ্রাসনের কথা । লাটভিয়ার “সালাস পিলস” কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ভ্রমণের ধূসর অভিজ্ঞতার কথা, যেখানে অন্তত এক লক্ষ নারী-পুরুষ খুন হয়েছিল নাৎসীদের হাতে ।

তারপরে যাত্রা ছিল বর্তমান ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে শহরে,  সেখানে লেনিন পুরস্কার পাওয়া ‘ওলেস হনচার’ নামের এক বিখ্যাত সাহিত্যিক  তাকে বলে ছিলেন জানালেন ইউক্রেনের মানুষ বাংলা সম্পর্কে কী জানেন, “ তেমন কিছু জানেনা তবে একটা রোমান্টিক ধারণা আছে বাংলা হল সেই সুদূর দেশ যেখানে আমাদের বুনোহাঁসেরা শীত কাঁটাতে যায়। সেই বাংলা হলো কবিদের দেশ, চির বসন্তের দেশ!”

 

মোট ১৪ দিনের সফরে এই চারটি বিশাল শহরে ঘুরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হয়তো খুব সামান্যই দেখেছেন কিন্তু জানিয়েছেন-  যতই দেখেছি তত আনন্দ পেয়েছি সেখানে। আর বিস্তারিত আলাপ আলোচনা করেছেন ব্যক্তি স্বাধীনতা নিয়ে, কমিউনিজমের ভালো এবং খারাপ দিক নিয়ে,

ভারত বর্ষ থেকে যাবার কারণে বারবার বলেছিলেন, ‘ ব্যাক্তি স্বাধীনতা কাকে বলে তা আমি জানিনা, কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কখনো ব্যাক্তি স্বাধীনতা থাকে না খেয়েপরে বেঁচে থাকার চিন্তা থেকে যারা মুক্ত হতে পারেনি তারা কোনো স্বাধীন নয়‘ স্পষ্ট লিখেছেন বইয়ের শেষ লাইনে “সোভিয়েত দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় আমি যথেষ্ট উপকৃত হয়েছি”

কেন জানি এখানে শ্রদ্ধেয় সদ্যপ্রয়াত দ্বিজেন শর্মার ‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’ বইটির কথা মনে হয়, যেখানে তিনি ৩০ বছরের মস্কো বাসের অভিজ্ঞতায় তিনি বলেছিলেন যে গরিব দেশের মৌলিক চাহিদার জন্য লড়তে থাকা  জনগণের শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখা ছাড়া আর কোন উপায় আছে কি?ত

সুনীল সে দেশে ঘুরে আসার প্রায় ৩০ বছর পরে সেখানে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের, স্বপ্নের সোভিয়েত ইউনিয়ন আজ নানা দেশে বিভক্ত, কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা যে দেশে কথা ছিল সকলের অধিকার ও সম্পদ সমান হবে,  সেই দেশে গুটিকয়েক লোকের কাছে আজ সমস্ত সম্পদ যেন বর্গা দেয়া হয়েছে! স্থানীয় মানুষ সুযোগ পেলেই দলে দলে পাড়ি দিচ্ছে অন্য দেশে,  নাগরিক অধিকার যেন আজ ‘জোর যার, মুলুক তার’ নীতিতেই চলছে।  এই রাশিয়া দেখলে সুনীল হয়তো দুঃখ পেতেন অনেক বেশি। 

 

 তবে একজন খাঁটি পর্যটকদের মতো কোনো জায়গাতেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের মতামত খুব একটা চাপিয়ে দেননি বরং বলে গেছেন তিনি কী দেখেছেন, কী ভেবেছেন। তবে অনেক সময়ই বারবার ঘুরে ঘুরে সেই দেশের সাথে ভারতবর্ষের তুলনামূলক চিত্র আঁকার চেষ্টা করছেন সেটা কিছুটা চোখে লাগে। সবশেষে  যতদূর মনে পড়ে পায়ের তলায় সর্ষে  সমগ্র এবং ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ বইতে এই কাহিনীর ছিটেফোঁটা আছে তা সত্ত্বেও বইটি পড়া জরুরি সেই সমাজের চিত্র জানার জন্য।