পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে নমস্য প্রাণী সংরক্ষণবিদ জেরাল্ড ডারেল তার বিখ্যাত জার্সি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রের জন্য বুনো প্রাণী সংগ্রহ করতে এবং নিজ বাসভুমে তাদের ভিডিও করার নিমিত্তে দীর্ঘ আট মাস ল্যাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম দেশে আর্জেন্টিনায় ছিলেন। চষে বেড়িয়েছিলেন আমাদের গ্রহের শেষ বুনো প্রান্তর প্যাটাগোনিয়া, মিশেছিলেন স্থানীয়দের সাথে, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেই ঊষর প্রান্তরের অধিবাসী, বিরল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণিজগতের সদস্যদের সাথে। সেই সাথে তিনি চেষ্টা করেছিলেন কিছু জনপদে যেতে যেখানে শত বছর আগে গিয়েছিলেন জ্ঞানের মশালধারী এক তরুণ প্রাণীবিজ্ঞানী, মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব- চার্লস ডারউইন।

দ্য হুইসপারিং ল্যান্ডদ্য হুইসপারিং ল্যান্ড

সেই চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা নিয়ে দ্য হুইসপারিং ল্যান্ড নামের এক অসাধারণ বই আমাদের জন্য লিখে গিয়েছেন ডারেল, যার প্রতি অধ্যায়ের শুরুতেই আছে আমার সবচেয়ে প্রিয় ভ্রমণ বিষয়ক বই ডারউইনের বিগল যাত্রীর রোজনামচার কিছু লাইন, যা ডারউইন লিখেছিলেন প্যাটাগোনিয়ার আদিগন্ত প্রান্তরের মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে। এখানে তাই প্রতি অধ্যায় অনুযায়ী একটু ক্ষুদে বর্ণনা দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে গেলাম উত্তম পুরুষে, ( অনুবাদের কথা ভুলে যান, বর্ণনারস অক্ষুণ্ণ রেখে ডারেল অনুবাদ করা সম্ভব না, যেমন অসম্ভব সৈয়দ মুজতবা আলী ইংরেজি বা জার্মানে অনুবাদ করা), সেই সাথে চিত্রশিল্পী রালফ থম্পসনের অসাধারণ স্কেচগুলো সংযুক্ত করা হল, যা মূল বইতে ছিল।

 

১ম খণ্ড

In calling up images of the past, I find the plains of Patagonia most frequently cross before my eyes.Yet these plains are pronounced by all most wretched & useless. They are only characterized by negative possessions; — without habitations, without water, without trees, without mountains, they support merely a few dwarf plants. Why then, and the case is not peculiar to myself, do these arid wastes take so firm possession of the memory? - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

১ম খন্ড১ম খন্ড

 

বুয়েন্স আইরেস মহানগরী প্রস্তত হচ্ছে বসন্তের জন্য, বিশাল বরফখণ্ডের মত ঝিমানো ভবনগুলোর মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে নীল ফুলের দলেরা কিন্তু আমার বিমর্ষ মনের প্রান্তসীমা থেকে দূর দিগন্তে পালিয়ে গেছে বসন্তের আমেজ। কারণ- আর্জেন্টিনার কাস্টমস! আজ চলেছি কোন এক সিনর গার্সিয়ার সাথে দেখা করতে, গত ৩ সপ্তাহে ধরে অন্তত ১৪জন সিনর গার্সিয়ার সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের জন্তু সংগ্রহের অনুমতিপত্র নিয়ে, কাজের কাজ কিছুই হয় না, কেবল একজন আরেকজনকে দেখিয়ে দেয়, এই চক্করেই চলছি, বাহির হয়ে বসন্তে আমেজে মজার কোন অবকাশ তো চোখে পড়ে না! বন্ধু জোসেফিনা এক অফিসারের খবর নিয়ে এল যার মাধ্যমে কাজ এগোতেও পারে, আমার ১ম প্রশ্ন ছিল- তার নাম কি গার্সিয়া

উত্তর- না না, উনার নাম দান্তে।

যাক, এই ফাজিল কুঁড়ে গার্সিয়া ভিড়ে কিছু করতে পারলে দান্তের মত জমকালো নামধারী কেউই হয়ত পারবে।ক

এর মাঝে এক ছোট্ট মুশকিল হয়ে গেছে, হোটেল থেকে জানিয়েছে আমার সংগৃহীত দুষ্টু মিষ্টি তাপিরটি তারা ছাদে রাখতে দিবে না! কি করি এখন এই পোড়া দেশে? শুনেই জোসেফিনা জিজ্ঞেস করল- তাপির কি? জানালাম, একটি প্রাণী যা একটি টাট্টু ঘোড়ার মত বড় কিন্তু বিশাল লম্বা নাক আছে, হঠাৎ দেখলে মনে হয় শারীরিক সমস্যাযুক্ত ছোট হাতি একটা! কিন্তু আমার তাপির খুবই ছোট, শুয়োরের আকৃতির।

মেরীর সাথে ফোনে কথা হল, তার মা নাকি তাপিরটি বাগানে রাখার অনুমতি দিয়েছেন! ইয়াহু! কিন্ত এটা শুনেই একটা চিকন সন্দেহ দেখা দিল মনের কোণে, আচ্ছা মেরী- তোমার মা কি জানেন তাপির কি ধরনের প্রাণী? মেরীর সপ্রতিভ উত্তর- আমি বলেছি লোমশ এক ক্ষুদে প্রাণী!

এটা প্রাণিবিদ্যা অনুসারে প্রাণীটির নিখুত বর্ণনা ছিল না বটে, কিন্তু তার আশ্রয়ের দরকার ছিল খুব বেশী। তাই সেই সন্ধ্যাতেই ক্লডিয়াসকে( হ্যাঁ, ওর নাম দিলাম ক্লডিয়াস, ঝুলে থাকা বেঢপ নাকটি কেন যেন রোমান সম্রাটদের কথাই মনে করিয়ে দিত) একরত্তি বাগানটিতে রেখে আসা হল। সেই সাথে তার খাবারের জন্য উৎকৃষ্ট তাজা সবজি ঝুলে থাকা নাকের নিচেই রেখে ডাইনোসর বেঁধে রাখা যায় এমন এক দড়ি গলায় গলিয়ে তবেই নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরলাম বাসাতে।

পরদিন সকালেই মেরীর ফোন! ক্লডিয়াস বাঁধন ছিঁড়ে সারা বাগান তছনছ করার সাথে সাথে তার মায়ের প্রিয় ফুল Begoniaর ঝাড়ের অর্ধেক ইতিমধ্যেই খেয়ে হজম করে ফেলেছে! সাথে সাথেই তাবৎ প্রাণীকুলকে বিশেষ করে তাপিরদের গালি দিতে দিতে গাড়ী নিয়ে মেরীর বাড়ীর দিকে যেতে যেতে থেমে থেমে ১৪টা বেগোনিয়ার গাছ কিনে নিলাম মেরীর মাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য।

সেই সাথে এবার ক্লডিয়াসের গলায় যে রশি দিলাম তা দিয়ে কুইন মেরী জাহাজ পর্যন্ত আঁটকে রাখা যায়। কিন্তু কোন লাভ নেই, পরের দিন সকালেই শুনি সে আবার হেসেখেলে সেই বাঁধন খুলে বের হয়ে হৈহল্লা করেছে বাগানময়! শুধু তাই নয় গতরাতে মেরীর মায়ের বিশেষ নৈশ ভোজে অনেক অতিথি ছিল, তাদের চক্ষুচড়কগাছ করে ক্লডিয়াস কাঁচের জানালা ভেঙ্গে সেই বিশাল রশি দিয়ে ঘোরা ফেরা করে পুরো ভোজ পণ্ড করে দিয়েছে, হা ভগবান!

যাক অবশেষে শহরতলীর এক বাড়ীতে আমরা না ফেরা পর্যন্ত হোঁৎকাটাকে রাখার একটা ব্যবস্থা করা গেল।

 

১ম অধ্যায়

The plains of Patagonia are boundless, for they are scarcely passable, and hence unknown; they bear the stamp of having lasted, as they are now, for ages, and there appears no limit to their duration through future time. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

যাত্রা শুরু হল, এক লক্কড় গাড়ী চেপে ডিঁকি নামের এক সদ্য পরিচিত বন্ধুকে নিয়ে যে কি না একাধিক বার প্যাটাগোনিয়া গেছে এবং রাস্তা বেশ ভালই চেনে। ধু ধু প্রান্তর, মাঝে মাঝে দুয়েকটা জনপদ চোখে পড়ল, পাশাপাশি দুটো গ্রামের নাম ছিল মৃত খৃস্টান এবং ধনী ইন্ডিয়ান! মানে নাকি খৃস্টানকে মেরে তার সম্পদ কুক্ষিগত করে ইন্ডিয়ানটি ধনলাভ করেছে! শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এটিকে আসল সত্যের কাছাকাছি বলেও মনে হল না।

পাম্পাসের আমাদের গন্তব্য ছিল রিও নিগ্রোর উত্তর পারে অবস্থিত এক ছোট শহর, যার নাম কারমেন দ্যে পাটাগোনাস, এই শহরে অন্তত একটি রাত কাটাবার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে আছি কারণ বিগলের সেই বিখ্যাত অভিযানের সময় ডারউইন এই শহরে বেশ কিছু দিন ছিলেন। আমি জানতে চাই, তার সেই সময় থেকে কি কি পরিবর্তন হয়েছে শহরটির এবং কেন তিনি এখানে ছিলেন।

দ্য হুইসপারিং ল্যান্ডদ্য হুইসপারিং ল্যান্ড

 

কিন্তু শহরে পৌঁছে দেখি সব বাড়িঘরই এক ধরনের দেখতে! কি জ্বালাতন- কি করে বুঝি কোনটা হোটেল আর কোনটা বাড়ী? যা হোক, আস্তে ধীরে সব সমস্যার সমাধান মিলল, এবং খুব ভাল মত বুঝতে পারলাম একমাত্র বিদ্যুতের আগমন বাদে ডারউইনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত শহরটির এমন কোন পরিবর্তনই হয় নি!

এখান থেকে ডিঁকি ফিরে যাবে তার বাড়ীতে , আমরা যাত্রা অব্যাহত রাখব। একচিলতে রানওয়েতে দাড়িয়ে হঠাৎ ডিঁকি আবেগ ঘনকণ্ঠে বলে উঠল- গ্যারি, আমার একটা কথা রাখবে? অবশ্যই ডিঁকি, যে কোন কিছু, শুধু বলেই দেখে!

আচ্ছা, শুধু খেয়াল রেখ বিমান যখন চলতে শুরু করবে তখন যেন কোন বদের বদ পাজির পা ঝাড়া ঘোড়া রানওয়েতে দৌড়াতে না শুরু করে!

তাকে বিদায় দিয়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর দিয়ে আবার যাত্রা শুরু হল, প্যাটাগোনিয়ার খরগোশদের সাথে প্রায়ই দেখা হত, তারা থাকত জোড়ায় জোড়ায়। কি যে চমৎকার এক জোড়া মায়াময় চোখের মালিক এই বিশাল কানের প্রাণীগুলি, দেখে মনে হয় জন্মকাজল পরানো।

খরগোশদের সাথে প্রায়ই দেখা হতখরগোশদের সাথে প্রায়ই দেখা হত

 

কিন্তু আমার মন এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে পেঙ্গুইনদের আবাস দেখার জন্য।

অধ্যায়- ২

It was a brave bird; and till reaching the sea, it regularly fought and drove me backwards. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

সেখানে হুইচি নামের এক অসাধারণ মানুষের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছিল, যে আমার থাকার ব্যবস্থা করে বলেছিল কোন চিন্তা করো না, গ্যারি-কাল আমরা পেঙ্গুইন দেখতে যাব। কতগুলো পেঙ্গুইন? কতই হবে, খুব বেশী না, এই দশ লক্ষ!

দশ লক্ষ! হ্যাঁ, এক মিলিয়নের মতই। এটা কি তোমার ভিডিও করার জন্য যথেষ্ট না? অবশ্যই যথেষ্ট, তারও বেশী!

পরের দিন বালিয়াড়ি পার হয়ে দেখা মিলল পিগমি ওয়েটারদের বিশাল পালের, দূর থেকে আসলেই মনে হয় সাদা-কালো কোট পড়ে খর্বাকৃতির ওয়েটাররা দাড়িয়ে আছে, আর সারা জীবন বেশী ভারী বোঝা বওয়ার কারণে সামনে দিকে ঝুকে রয়েছে তারা অভ্যাসমত। আসলে এটি আমার দেখা সবচেয়ে বড় পেঙ্গুইন বসতি, কি অসাধারণ সেই মুহূর্ত! ছানাদের পাকনামি, বড়দের খুনসুটি দেখতে দেখতে অনেক ঘটনা চলে গেল ।এবং আক্ষরিক অর্থেই দেখলাম দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হয়ে খাবারের সন্ধানের অতল সমুদ্র থেকে কি করে তারা ফিরে আসে ছানাদের জন্য খাবার নিয়ে, আর সেই বিশাল বালির স্তুপ তারা অনেকটা স্কি করার ভঙ্গিতে কি ভাবে খুব দ্রুত গতিতে পার হয়।

ছানাদের পাকনামিছানাদের পাকনামি

 

ডারউইন যখন এখানে এসেছিলেন তখনো প্যাটাগোনিয়ার আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের বসতির চিহ্ন ছিল অনেকখানেই। যদিও সবসময়ই উপনিবেশিকরা ইন্ডিয়ানদের চিত্রিত করেছে বর্বর, নিষ্ঠুর, অসভ্য বলে। তাই তাদের হারিয়ে যাওয়াতে কাউকেই শোকগ্রস্ত হতে দেখা যায় না। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে যে কোন জাদুঘরে এখানে ইন্ডিয়ানদের সবসময় একই ভাবে চিত্রিত করা হয়- বুনো বুনো চেহারার লম্বা চুলো কিছু পুরুষ দাড়িয়ে আছে, এবং তাদের সর্দারের কাছে একজন শ্বেতাঙ্গিনী বন্ধি হয়ে আছে। কিন্তু এর উল্টোচিত্র কখনোই চোখে পড়ে না, ইন্ডিয়ান রমণী যে শ্বেতাঙ্গ সেটেলারদের হাতে ধর্ষিত হত প্রায়ই, কালো সেই সময়ের কথা যেন ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সবাইকে।

দ্য হুইসপারিং ল্যান্ডদ্য হুইসপারিং ল্যান্ড

 

এক সন্ধ্যায় সিনর হুইচির সাথে গল্পের সময় আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সবাইকে অবাক করে তিনি তার গোপন ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা দেখান, সেখানে ইন্ডিয়ান্ডের তীরের, বর্শার, হারপুনের ফলা থেকে শুরু করে অপূর্ব সুন্দর নকশা করা কিছু পাথর- হাড়ের গয়না ছিল। এই দেশে এমন জিনিস বানাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন মেধা, পরিশ্রম এবং ভালোবাসা। কত যত্ন নিয়েই না অপরিসীম ধৈর্যের সাথে পালিশ করা হয়েছে প্রতি ক্ষুদের পাথর, এখনো তা হাসছে এক ঝলমলে অলঙ্কার হয়ে। ধন্য সেই আদি মানুষের জ্ঞান।

হুইচি দীর্ঘ দিনের গবেষণায় প্রাপ্ত জিনিসগুলোর সাহায্যে মত প্রকাশ করলেন যে কাছের একটি জায়াগ ছিল বিশেষ গোত্রের ইন্ডিয়ানদের কাছে ছুটি কাটাবার স্থান, অনেকটা হলিডে রিসোর্টের মত। সেখানেই নেশাগ্রস্তের পর পরের কয়দিন সমানে ইন্ডিয়ানদের তীরের ফলা এবং অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে ফিরলাম খ্যাপার মত। কিছু পেলাম তো বটেই, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে মিলেছিল একজন রেড ইন্ডিয়ান খুলি।

একজন রেড ইন্ডিয়ান খুলিএকজন রেড ইন্ডিয়ান খুলি

 

অধ্যায় -৩

They appeared to be of a loving disposition, and lay huddled together, fast asleep, like so many pigs. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H. M. S . Beagle

ফার সিলদের আস্তানাফার সিলদের আস্তানা

 

পরবর্তী গন্তব্য ছিল ফার সিলদের আস্তানা এবং আর্জেন্টিনার এলিফেন্ট সিলদের একমাত্র বসতির খোঁজে। স্থানীয়রা ভেবে ভেবে প্রায়ই অবাক হতে যে আমি সেই ইংল্যান্ড থেকে এখানে উড়ে এসেছি কেবলমাত্র জন্তুদের ভিডিও করার জন্য! যদিও তাদের কাছে থেকে স্থানীয় প্রাণীদের খবর মিলত মাঝেসাঝেই।

গাড়ী থেকেই গুয়ানাকার পাল দেখা যায়, দক্ষিণ আমেরিকার উট জাতীয় এই প্রাণী বড়ই নয়ন মনোহর, আরামে খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারপর যেই হঠাৎ মনে হয়েছে আমরা বেশী কাছে চলে গেছি অমনি খুরের আঘাতে ধুলোর মেঘ তুলে পগার পার নিমিষের মাঝে !

গুয়ানাকার পালগুয়ানাকার পাল

 

ফার সিলদের আস্তানায় সবার আগে পুরুষগুলোর আকৃতি চোখে পড়ে, মুষ্টিযোদ্ধার মত পেশল শরীর একেকটার, অন্য দিকে নারী ফার সিলেরা আসলেই চিকন, আবেদনময়ী গড়নের অধিকারী, সেই সাথে আছে সুদর্শন মুখ আর ভালোবেসে ফেলার মত একজোড়া চোখ। আমি তো সাথেই সাথেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যদি কোনদিন প্রাণী হবার সুযোগ সামনে আসে- সবার আগে ফার সিল হতে চাইব, এমন আকর্ষণীয় স্ত্রী আর কোন প্রাণীর আছে?

পুরুষদের লড়াই পুরুষদের লড়াই

 

তাদের বিচিত্র এবং জটিল সমাজব্যবস্থা, বাচ্চাদের লালনপালন, পুরুষদের লড়াই ইত্যাদি ভিডিও করতে করতেই চলে গেল অপূর্ব দিনগুলি।

বাচ্চাদের লালনপালনবাচ্চাদের লালনপালন

 

অধ্যায়-৪

They did not remain long under water, but rising, followed us with outstretched necks, expressing great wonder and curiosity. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

একটা এলিফেন্ট সিলএকটা এলিফেন্ট সিল

 

বিশ্বের অনেক মানুষের সারা জীবনের সাধ থাকে মৃত্যুর আগে পিসার হেলানো মিনারের সামনে একবার হলেও দাঁড়াবার, কিংবা ভেনিসে যাবার, অথবা অ্যাক্রোপোলিস দেখার। আমার জীবনের একটাই লক্ষ্য ছিল একটা এলিফেন্ট সিলকে তার প্রাকৃতিক পরিবেশে দেখা। কিন্তু সেটি হচ্ছে কোথায়? অথচ স্বপ্নপূরণের এত কাছে আমি! চষে বেড়াচ্ছি সমস্ত সৈকত, কত বিচিত্র প্রাণীর দেখা মিলল কিন্তু সিলেরা উধাও।

ডারউইনের রিয়াদের সাথে মোলাকাত হল কয়েকবারই, আফ্রিকার উটপাখির জাত ভাই এই পাখীগুলোর বেশ কয়েকটা মিলে এক বাসাতেই ডিম পাড়ে, পড়ে বাচ্চা ফুটে বাহির হলে সেভাবেই লালন চলে। এর উত্তর আর্জেন্টিনার রিয়াদের চেয়ে খানিকটা ক্ষুদ্রাকৃতির। চার্লস ডারউইনই সর্ব প্রথম এই প্রজাতি আলাদা ভাবে সনাক্ত করেন, তার সন্মানেই এদের নামকরণ করা হয় ডারউইনের রিয়া।

ছিলে বিশেষ ধরণের রোমশ আরমাডিল্লো।

বিশেষ ধরণের রোমশ আরমাডিল্লো।বিশেষ ধরণের রোমশ আরমাডিল্লো।

 

একবার সৈকতের বালিয়াড়িতে বসে রাগে –দুঃখে- ক্ষোভে সঙ্গীদের সাথে ওয়াইন বোতলের কর্ক খোলার সময় দেখি কয়েক ফিট দূরে অচল পাথরের বোল্ডারটি যেন নড়ে উঠল, তার পরপরই আমাদের দিকে চোখ মেলে তাকাল! অবাক দৃষ্টিতে দেখলাম আমরা নিজেদের অজান্তেই ডজন খানেক এলিফেণ্ট সিলের কলোনিতে অনুপ্রবেশ করেছি, এবং এত কাছে এসেও তাদের অস্তিত্ব বুঝতে সবাইই হয়েছি চরম অক্ষম! তার মানে কত শত এলিফেন্ট সিল হয়ত আমরা স্রেফ পাথর ভেবেই চলে এসেছি এত দীর্ঘ পথ!

এলিফেন্ট সিলএলিফেন্ট সিল

 

২য় খণ্ড

 

১ম পর্ব

The elegance of the grasses, the novelty of the parasitical plants, the beauty of the flowers, the glossy green of the foliage, but above all the general luxuriance of the vegetation, filled me with admiration. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

এবারের যাত্রা ক্রান্তীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে Jujuyতে। দুনিয়ার নানা প্রান্তে প্রাণী সংগ্রহ করতে যেয়ে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে সবসময় স্থানীয় অধিবাসীদের বিশেষ করে আদিবাসীদের দারস্থ হবার, তারা যে কেবল প্রাণী সম্পর্কে ধারণা রাখে তাই নয়, অনেকক্ষেত্রেই নানা পশু-পাখি তারা বাড়ীতেও পেলে থাকে, কিন্তু আর্জেন্টিনায় এই কথা বলতেই বন্ধুরা হেসে উড়িয়ে দিল! বলে এখানের ইন্ডিয়ানরা এগুলো করে না, তারপরও খোঁজ নিতে তো কোন সমস্যা নেই! তাই শুরু হল আমাদের অনুসন্ধান-

হেলম্যুট নামের এক স্থানীয় আমার গাইড এবং অনুবাদক হিসেবে চলল ইন্ডিয়ান পল্লীতে, সেখানে এক মহিলার খবর পাওয়া গেল যার কাছে নাকি কথা বলা তোতা আছে। দেখতে যেয়ে অপার আনন্দে ভেসে দেখি সেটি একটি Red- fronted Tucuman Amazon, যা বিরল তো বটেই, ইউরোপে এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে! এখানে দিচ্ছি হেলমুটের সাথে সেই তোতার মালিকের দামদরের নমুনা-

হেলমুট- শুনলাম তোমার কাছে একটা পাখি আছে। এই বিদেশী নানা পশুপাখি সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছেন, তবে বিরল হলে তবেই। তোমার এই কুৎসিত বাজারে তোতা অবশ্য তিনি কিনবেন বলে মনে হয় না, তারপরও দেখাতে নিয়ে এলাম।

মালিক- এটি খুবই সুন্দর একটি পাখি, তারচেয়েও বড় কথা খুবই বিরল। দূরের পর্বতে থাকে এই জাতের পাখিরা।

হেলমুট- এক্কেবারে বাজে কথা! এমন অনেক পাখি আমি বাজারে বিকোতে দেখি, এটা এতই বেশী দেখা যায় যে অনেক সময় মানুষ বিনামূল্যেই দিয়ে দেয়।

মহিলা- তোমরা ভুল তথ্য পেয়েছ। আমার পাখি খুবই সুন্দর, এবং নরম স্বভাবের।

হেলমুট- তোমার পাখি নরম স্বভাবের না পুমার মত হিংস্র সেটি কোন বিবেচ্য বিষয় না। কিন্তু আমার মনে হয় এটি এমন কোন সুন্দর কিছু না।

যা হোক, পাখিটি দেখার পরপরই হেলমুটকে জানালাম এটি বিরল একটি পাখি এবং এটি আমার চাই-ই চাই। সাথে সাথেই আবার শুরু হয়ে গেল-

হেলমুট- যা ভেবেছি, খুবই সাধারণ একটা পাখি। এই বিদেশীর এর মাঝেই ৬টা এমন পাখি পেয়ে গেছেন ( ইস, যদি পেতাম!)

মলিক- কিন্তু আমারটা কথা বলে!

হেলমুট- কোথায়? কথা বলে দেখাক তাহলে! আচ্ছা, আমরা ৩০ পেসো দিব এর জন্য।

মালিক- না না, ২০০ পেসো । কথা বলা পাখির জন্য ২০০ পেসো দাম ঠিক আছে। এর পরে সে পাখিটিকে কথা বলার জন্য নানা অনুরোধ করতে থাকল।

অবশেষে পাখিটি উড়ে এসে কাছে বসল, এবং আমার দিকে তাকিয়ে স্প্যানিশে বলল- নোংরা কুত্তীর বাচ্চা!

পাখিটি উড়ে এসে কাছে বসলপাখিটি উড়ে এসে কাছে বসল

 

সাথে সাথে হেলমুট বেঁকে বসল- যাও তোমার পাখি কিনব না, এই ভদ্রলোক তোমাকে সাহায্য করার জন্য পাখি কিনতে এলেন, আর তোমার বজ্জাত পাখি তাকে তো বাদ, তার জন্মদাত্রী মাকে গালি দিল! তাকে বেশ্যার ছেলে বলল- অথচ উনি কত বড় খানদানের মানুষ! আচ্ছা, ৫০ পেসো! এই বেয়াদব পাখির জন্য আর এক পেসোও বেশী নয়। তবে যদি সাহেব রাজি হন তবেই, শত হলেও পাখিটা তার মাকে অপমান করেছে!

হাসি চেপে রাখতে রাখতে গাল-পেট ফুলিয়ে কোনমতে বললাম, আমি খুবই অপমানিত বোধ করেছি, কিন্ত ৫০ পেসো দিয়ে এখনও পাখিটি কিনতে আগ্রহী।

ব্যস, বিরল পাখিটি আমার কাঁধে, সে এবার ধুমসে কথা বলা শুরু করল- নোংরা কুত্তীর বাচ্চারা তোমার কেমন আছ? কোথা থেকে এসেছ?

এভাবেই আমার প্রাণী সংগ্রহ বাড়তেই থাকল, তবে বিশেষ সদস্য ছিল ক্ষুদে এক বনবিড়াল , Geoffrey Cat, যাকে আমরা পেলে পুষে বড় করেছিলাম এবং আমাদের মন সে অনায়াসে জিতে নিয়েছিল।

ক্ষুদে এক বনবিড়ালক্ষুদে এক বনবিড়াল

 

২য় পর্ব

The excitement from the novelty of objects, and the chance of success, stimulate him to increased activity. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

বনবিড়ালবনবিড়াল

 

একটি বিরল Yellow-naped Macawএর খোঁজ মিলল, এক মহিলা বলল তার ছেলে পাখিটি কিনে এনেছে, সে কোন কথা বলে না, খামোখা অন্ন ধ্বংস করে, বিদায় করতে পারলেই সে খুশী।

আমরা ২৫ পেসো দাম বলতেই সে খুব খুশী হয়ে দিয়ে দিল। এবার সাথে অনুবাদল লুনার মত খারাপ! আমিতো অবাক- আরে ২৫ পেসোতে এমন বিরল পাখি, এতো দারুণ সৌভাগ্য।

কিন্তু লুনার কথা- দেশটার হচ্ছে টা কি দেখেছ! মহিলা কোন দামাদামিই করল না! আমরা যা বললাম তাতেই রাজি হয়ে গেল! এভাবে পৃথিবী চলতে পারে?

আরো মিলে গেল অ্যাগুতি নামের ইঁদুর জাতীয় এক অসাধারণ প্রাণী, যে দেখতে ঘোড়া আর খরগোশের সংকরের মত! পিছনের পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পথ চলে।

অ্যাগুতি নামের ইঁদুর জাতীয় এক অসাধারণ প্রাণীঅ্যাগুতি নামের ইঁদুর জাতীয় এক অসাধারণ প্রাণী

 

এর মাঝে ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা হল এক বদ লোকের বাড়ি গিয়ে , এক পুঁতিগন্ধময় খাঁচায় মুমূর্ষু অসেলটকে দেখে মাথায় আগুন ধরে গেছিল, শুধু বললাম- বজ্জাতটাকে বল, এই প্রাণীটা মারে যাবে যেকোন সময়, আমি ৫০ পেসো দেব, এর বেশী একটা সিকিও নয়। অক্ষম ক্রোধে ফুলতে ফুলতে যেয়ে সমস্ত রাগ ঝাড়লাম গাড়ীর দরজার উপরে।

বুনো বেড়ালটির মালিক প্রথমে অবাক, সে ভেবেছিল ৩০০ পেসো দাম পাবে। কোন মতে তাকে শারীরিক আঘাত না করে, থুথু ছিটিয়ে চলে আসায় সে বুঝে ছিল কোন কিছু ভুল হয়ে গেছে। ভুল তো বটেই, সেই চমৎকার প্রাণীটি যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারত।

যাই হোক, তাকে আমার মানব শিশুর মতই যত্ন করে দুধ, মাংস ধীরে ধীরে খাইয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি।

মানব শিশুর মতই যত্ন করে দুধ, মাংস ধীরে ধীরে খাইয়েমানব শিশুর মতই যত্ন করে দুধ, মাংস ধীরে ধীরে খাইয়ে

 

এবং অবাক করা ভাবে স্থানীয় একটি সার্কাসের দল চমৎকার স্বাস্থ্যের এক পুমার আমাদের কাছে বিক্রি করে দেয়, যা ছিল সেরা সংগ্রহের একটি!

৩য় পর্ব

The vampire bat is often the cause of much trouble, by biting the horses on their withers.- CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

একটা বিদঘুটে দর্শন বাদুড় একটা বিদঘুটে দর্শন বাদুড়

 

তখন পর্যন্ত ইউরোপে রক্তচোষা বাদুর নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি, ভেবেছিলাম জীবিত ধরতে পারলে দরকার হলে মুরগীর বা নিজের রক্ত খাইয়ে হলেও একটাতে জীবিত নিয়ে ফিরতেই হবে, সেই লক্ষ্যেই অভিযান শুরু হয়েছিল, তার আগে পেকারি ( শুয়োরজাতীয় প্রাণী), নানা ধরনের পাখি ইত্যাদি যুক্ত হয়ে আমাদের সংগ্রহকে আসলেই এক বর্ণীল রূপ দিয়েছিল, এখন যেন সেখানে একটা বিদঘুটে দর্শন বাদুড় হলেই ষোল কলা পূর্ণ হয়।

 পেকারি পেকারি

 

ঘোড়ায় চেপে আমরা কয়েকজন প্রয়োজনীয় রসদপত্র নিয়ে বাদুড়ের বাসস্থান সেই গুহা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। এর মাঝে বাজে ঘটনায় একটা ঘোড়া উল্টে পড়ে গেল। হেলমুথ গালাগালি করতে করতে বলল- হারামজাদা ঘোড়া, পিঠের যে দিকে মাংস আছে সে দিকে পড়তে পারল না, বেঁছে বেঁছে যে দিকে ওয়াইনের বোতল আছে দিকেই পড়েছে! সব বোতল ভেঙ্গে চুরমার! তারপর আমার দিকে অভিযোগের দৃষ্টি হেনে বলল- আর মাত্র ২৫টা বোতল আছে, এই দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে!

সে যাত্রা রক্তচোষা বাদুড় এসে প্রতি রাতেই আমাদের ঘোড়ার কাঁধ থেকে রক্ত চুষে যেতে, পরদিন রক্তাক্ত কাঁধ দেখেই তা বুঝতাম, কিন্তু আমাকে শত প্রলোভন দেখানো স্বত্বেও কামড়াতে আসল না, ফলে তাদের ধরাও গেল না।

যদিও প্রাণী সংগ্রহ অব্যাহত ছিল, বিশেষ করে একটি ক্ষুদে পেঁচা ( Pygmy Owl) সবার মন জয় করে নিল আমাদের দলে ভিড়বার পরপরই, আর্জেন্টিনার লোকেদের বিশ্বাস- এই পেঁচা দেখলে নাকি প্রেমে সফল হওয়া যায়, তাই এর এত কদর!

একটি ক্ষুদে পেঁচা ( Pygmy Owl) একটি ক্ষুদে পেঁচা ( Pygmy Owl)

 

৪র্থ পর্ব

 

In conclusion, it appears to me that nothing can be more improving to a young naturalist than a journey in distant countries. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle

ভ্রমণের মাঝে কত চিত্রবিচিত্র মানুষের সাথে দেখা হয়, সখ্য গড়ে ওঠে, রুচি-অরুচির মিল হলে প্রাণের বন্ধু পর্যন্ত মিলে যায়।

স্থানীয় লোকেরা ক্যাপোরাল নামের এক মানুষের কথা বলত, তার বাড়ী যেয়ে রূপার তৈজসপত্র এবং অন্যান্য সুক্ষ শিল্পকর্ম দেখে রীতিমত অবাক হয়েছিলাম। পরে শুনি, তার বাবা হাঙ্গেরির এক নামী মন্ত্রী ছিলেন, যুদ্ধের পরে কম্যুনিস্টরা ক্ষমতায় আসলে তিনি নিহত হন এবং ক্যাপোরাল তার স্ত্রী এবং তিন সন্তান নিয়ে পালিয়ে আর্জেন্টিনা চলে আসেন। হাঙ্গেরির সেই বিলাসবহুল জীবনের কিছু ছবি তিনি আমাকে দেখালেন – সুইডেনের রাজার সাথে শিকাররত অবস্থায়, কোথাও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। অথচ এখন তিনি খুবই কষ্টসাধ্য এবং অল্প বেতনের চাকরি করে সংসার চালাচ্ছেন, কিন্তু জীবন নিয়ে অভিযোগ নেই তার কোন। বললেন, আমি সুখী মানুষ, আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠাবার মত পয়সা উপার্জন করে ফেলেছি, একদিন হয়ত ছোট একটা বাড়িও কিনে ফেলব। আর আর্জেন্টিনায় এসে যে কাজ আমি শুরু করেছিলাম, তার চেয়ে এখনকার কাজ কোটি গুণে শ্রেয়। কি ছিল তার প্রথম পেশা? ষাঁড়কে খোঁজা ( নিবীর্য) করা!

আরেকবার একজন মানুষের খোঁজ পাওয়া গেল যার নাম ছিল কোকো, যে প্রাণী সম্পর্কে উৎসাহী এবং মাঝে মাঝে পোষ মানানোর জন্য প্রাণী সে বাড়ীতেও পালে। কোকোর বাড়ী যেতেই তার স্ত্রী বলল, তাকে খবর দেওয়া হয়েছে, আমরা যেন অবশ্যই অপেক্ষা করি।

সেটি ছিল আমার জীবনের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, কোকো এসে প্রথমেই আমার হাত ধরে আবেগে প্রায় কেঁদে ফেলল! বলল- প্রাণী নিয়ে এই ঘুণে ধরা সমাজে কেউ মাথা ঘামায় না! আমি তাদের পছন্দ করি, তাদের নিয়ে কাজ করি বলে অনেক পিছনে অনেক কটু কথাও বলে। তার কাছে আমি যেন দীর্ঘ কোন প্রার্থনার উত্তর! এমন কেউ যার সাথে যে মন খুলে কথা কইতে পারে।

তার কাজের বিশেষ জায়গা যেখানে পরিবারের সদস্যদেরও যাবার অনুমতি নেই সেখানে আমাকে দিয়ে যেয়ে কোকো তার আঁকা পাখির ছবি দেখাল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম তার হাতের অবিস্মরণীয় কাজ! কি আবেগপূর্ণ তুলির টান, কি জীবন্ত প্রতিটি ছবি! অধিকাংশ বইয়ের চেয়ে অনেক গুণে উত্তম। কিন্তু তার নিজের এই গুণ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, কেবল বলল স্থানীয় জাদুঘরের একজন বলেছে ভবিষ্যতে অনেক ছবি আঁকা হলে সেটা নিয়ে একটা বই করা যেতে পারে।

কোকো করে কাঠ চেরাইয়ের কাজ, কঠোর পরিশ্রমের সময় সাপেক্ষ কাজ। বললাম- কোকো ভাল লাগে এই কাজ করতে? কোকো উত্তর দিল- সাহেব, এই কাজ আমার আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, কিন্তু এর মাধ্যমেই আবার পেটের খাবার জুটছে, একটু পয়সা জমলে রঙ কিনতে পারছি ছবি আঁকার জন্য।

অসাধারণ এক শিল্পীকে আমি সাহায্য করার যারপরনাই চেষ্টা করে ছিলাম, কিন্তু আত্মগর্বে গরীয়ান মহৎ কোকো ইংল্যান্ড থেকে পাঠানো আমার সামান্য উপহারেই সন্তুষ্ট ছিল, এর বাহিরে সে কিছুই প্রত্যাশা করে নি।

 

বিশ্বের একমাত্র নিশাচর বানর (douroucoulis ) মিলে গেল একজোড়া! তারা মানুষের মত আলিঙ্গন তো করেই, দেখি চুম্বনও করে মানুষের মতই! এদের ভাল না বেসে থাকে সেই সাধ্য কার!

অবশেষে আমাদের ফেরার ঘণ্টা বাজাল। সমস্ত প্রাণীদের নিয়ে ট্রেনে চেপে বুয়েন্স আইরেসে নামতে হবে, কোন পিকনিক ভ্রমণ না, মহা কঠিন এক কাজ! সামান্য ভুলচুক হলেই এতদিনের পরিশ্রমের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। অযাচিত ভাবেই হাত বাড়িয়ে দিল সমস্ত ট্রেনের যাত্রীরা।

যেখানে প্রতিটা বগি বাচ্চা-কাচ্চা, মুরগী, ছাগল, শাশুড়ি, ফলের ঝুড়ি, শুয়োর, ওয়াইনের বোতলে ভরা এর মাঝে দিয়েই ট্রেন থামার পরপরই আমি যাচ্ছি প্রাণীগুলোর তদারকিতে, অল্পক্ষণের মাঝেই ট্রেনের প্রতিটা মানুষ জেনে গেল কোন প্রাণীর কি নাম, কার জন্য কি খাবার লাগবে, তাই ট্রেন থামার পরপরই কেউ আমাকে কলা আগিয়ে দিল কেউ বা রুটি, কেউ তোতার গালাগালি শুনে হাসাহাসি করল। এত ঝামেলার মাঝে আমি এক বৃদ্ধার সাথে ধাক্কা খেয়ে তার ডিমের ঝুড়ির প্রতিটি ডিম ভেঙ্গে ফেললাম, অথচ তিনি আমাকে দাম দিতে দিলেন না! বললেন, এমন প্রাণ খুলে নাকি অনেক দিন হাসেন নি!

এক দল তরুণ ফুটবলার সর্বদাই সাহায্য করে চলল শেষ পর্যন্ত, আরও কত অচেনা অজানা সহৃদয় মানুষ, মনে হয় এদের মুখে চেয়েই চার্লস ডারউইন লিখেছিলেন তরুণ অভিযাত্রীর উদ্দেশ্যে- "He will discover how many truly kind-hearted people there are with whom he had never before had, or ever again will have, any further communication, who yet are ready to offer him most disinterested assistance. - CHARLES DARWIN: The Voyage of H.M.S. Beagle