লেখক শ্যামসুন্দর বসু একবার ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার অফিসে গেছেন বিশেষ কাজে সে সময় সহকারি সম্পাদক দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে বলেন রামনাথের উপরে একটি বিশেষ ফিচার করে দেওয়ার জন্য যা প্রচ্ছদকাহিনী করা হবে! আশ্চর্য হয়ে তিনি - প্রশ্ন রাখেন রামনাথ কে?

ঃরামনাথ বিশ্বাস

-নাহ, আমি চিনতে পারলাম না

ঃ দ্যার মশাই অ্যাতো ঘোরেন-ফিরেন, লেখালেখি করছেন, আর রামনাথের নাম শোনেন নি ?বাজে কথা বলছেন।

  • আরেহ! ভাবে বাজে কথা বলব কেন? সত্যিই এই নাম প্রথম শুনলাম। কে লোকটা? কোথায় থাকে?  কী করেন? আর আপনার ঘাড়ের চাপল কেন?

উনি মুচকি হেঁসে বললেন, ‘খোঁজপত্র করে দেখুন না’।

যে কারণে এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই।

তার পরপরই তা শুরু হলো রামনাথের জীবনে তথ্য সংগ্রহের জন্য সমস্ত অভিযান, দেশে ও বিদেশে।  সিলেটের হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গে জন্ম নেওয়া, ও বেড়ে ওঠা ভূ-পর্যটক রামনাথ বিশ্বাসকে (যিনি রমানাথ নামেও পরিচিত)নিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেছেন শ্যামসুন্দর বসু,  তথ্য সাজিয়েছেন অতীত খুঁড়ে খুঁড়ে তবে রামনাথের গল্প এবং অভিযানগুলোর মত তাঁর এই বইটি খুব একটা ঝরঝরে গতিশীল ভাষার হয় নি। তারপরও প্রায় এক লক্ষ মাইল ভ্রমণ করে আসা এক পর্যটককে জানার জন্য এটি এক মূল্যবান বই হিসেবেই বিবেচিত হবে।

বইটি ছাপিয়েছে কোলকাতার সজনী প্রকাশন, ২০০২ এর আগস্টে,  দাম ৬০ টাকা।

যৌবনে রামনাথেযৌবনে রামনাথে

 

সাইকেলে ৫৩ হাজার, পায়ে হেঁটে ৭ হাজার, রেলগাড়িতে ২ হাজার এবং জাহাজে ২৫ হাজার, মোট ৮৭ হাজার মাইল (১ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটার) ভ্রমণ করা মানুষটি ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক, মুক্তমনা, সর্বভুক, ভীষণ সাহসী, নির্লোভ। বলতেন- “ অর্থের প্রতি লোভ করলেই আর পর্যটন হয় না, লোভীরা কখনও ভ্রমণ করতে পারে না”।

৫ ফুট ৪ ইঞ্চির 'চিরকুমার' মানুষটাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার জাত আছে কি নেই? উনি উত্তর দিয়েছিলেন - 'আমার জাত চলে গেছে, শুধু আছে বাঙালিত্ব। এটাই শুধু যায় নি।

সাইকেলে মাঝখানে ঝোলানো বোর্ডে লেখা থাকত round the world তার নিচে সরলরেখায় জ্বলজ্বল করতো Hindu Traveler। হিন্দু শব্দটি লেখার পক্ষপাতে না হলেও লিখতেন নিরাপত্তার কারণে কেননা সে সময় মালয়েশিয়া, তুরস্ক ইত্যাদি দেশে হিন্দু কথাটির গুরুত্ব ও প্রচলন ছিল অত্যধিক। উপরন্তু শেষ সময় indian শব্দটি পৃথিবীতে নেটিভ শব্দের মতই অবহেলিত ছিল।

রামনাথের পৃথিবীরামনাথের পৃথিবী

 

দেশভাগের পরও তিনি সিলেটের বানিয়াচঙ্গেই অবস্থানের চেষ্টা করেছিলেন, পরে নানা পরিস্থিতিতে একেবারেই কোলকাতা চলে যেতে বাধ্য হন, সেখানে একটি প্রকাশনা সংস্থা দিয়ে নিজের বই প্রকাশ করেছিলেন বেশ কয়েকটা। ১৯৫৫ সালে মাত্র ৬১ বছর বয়সে অন্য জগতে ভ্রমণে চলে যান।

কৈশোর থেকেই অত্যন্ত প্রতিবাদী ছিলেন, চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলে মুখ চালিয়ে চোখা চোখা যুক্তি দেখানো, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে হাত-পা চালাতে দ্বিধা করতেন না। এমনকি সেই উপনিবেশিক আমলে মিলিটারী অফিসারদের সাথেও বেশ সংঘর্ষ হয়েছে তাঁর।  দক্ষিণ আফ্রিকার স্মোকিং রুমে ঢোকার ফলে এক শ্বেতাঙ্গ তাঁকে বের করে দিতে চাইলে তিনি প্রবল প্রতিবাদ করেন এবং হাতাহাতিতে লিপ্ত হন।

একবার হল্যান্ডে পরিচিত এক পণ্ডিতের অফিসের যেয়ে চেয়ারে বসলে সেই অফিসের কেরানি-দারোয়ান  যখন বলেছিল “ কালো লোকে চেয়ারে বসে না” তখন সরাসরি বলেছিলেন “চুপ থাক সাদা কুকুরের বাচ্চা আরেকটি কথা বলবি তো খবর আছে, এটা দক্ষিণ আফ্রিকা না, এটা আমস্টারডাম। তাঁর দাপট দেখে দারোয়ান আর পালাবার পথ খুঁজে পায় না।

বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশবইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ

 

তিনি নিগ্রো সেজে আমেরিকার দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পল্লীগুলোতে রাতের বেলাও ঘুরেছেন, একাধিক বই লিখেছেন আমেরিকার বর্ণবাদ, নিগ্রোদের সত্যিকারের অবস্থা নিয়ে। নিউইয়র্ক থেকে নায়াগ্রা চলেছিলেন,  বাসে একা কারণ কালাআদমীর সঙ্গে একসাথে যাওয়ার চেয়ে পরে বাসে যাওয়ায় সঠিক মনে করছে অনেকে। পর্যটক চিন্তিত, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কিনা! কিন্তু রাস্তায় নানা জায়গায় লোক উঠে বাস ভর্তি হলেও তার পাশের সীট খালি পড়ে রইল।

উনি মনে মনে বললেন,’ বর্বরের সঙ্গে বর্বর হয়ে লাভ নেই, বলে দাঁড়াতেই দুটো বর্বর আমার স্থান দখল করলো।  একজনকে বললাম যে কোন একটা সিট আমার, যে কোন একজনকে দাঁড়াতে হবে, তখন দুইজনই নীরবে দাঁড়িয়ে গেল।‘

ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়ায় চীনের সাংহাই -এ সৈন্যদের হাতে প্রবল প্রহারের শিকার হয়েছেন কিন্তু কোন কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেননি সেরে ওঠে আবার পথে নেমেছেন।

ইউরোপ ভ্রমণের সময় ইতালির মুসলোনি, জার্মানের হিটলার লোক মারফৎ আমন্ত্রণ জানায় সাক্ষাতের জন্য।কিন্তু শুধুমাত্র নীতির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করে বলিষ্ঠ কলমে জানান “আমি আপনাদের দেশ দেখতে ও জনসাধারণের সঙ্গে মিলতে এসেছি, নেতৃবৃন্দের সহিত সাক্ষাৎ করতে আসি নাই।”

এবং মানুষের কথা চট করে বিশ্বাস করতেন না,  যেমন দেশে গুজব ছিল চিনেরা আরশোলা খায় বা চীনের প্রাচীর এতই চওড়া যে পাশাপাশি সাতটি ঘোড়া ছুটতে পারে, কিন্তু চীনের প্রাচীরে উঠে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে প্রাচীর মেপে দেখলেন সেটা কোন ভাবেই সম্ভব না!

বই সংক্রান্ত তথ্যবই সংক্রান্ত তথ্য

 

এক পর্যায়ে তিনি বহু প্রদক্ষিণ শেষে চললেন শান্তিনিকেতনে, উদ্দেশ্য বিশ্বজয়ী সাইকেলটি বিশ্বকবিকে উপহার দিয়ে নিজে ধন্য হবেন।

কিছুক্ষণ কথার পরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, “ রামনাথ। তোমার লেখা আমি পড়ি।“

উনি লজ্জায় মাথা নিচু করে অনেক চেষ্টা করে বললেন, ‘গুরুদেব, অধমের কাছে মিথ্যা বলে লজ্জা দেন কেন?’

এক পলক অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাঁর মুখে চোখ বুলিয়ে মুচকি হেসে কবি বললেন, “ অনিল, দেশ পত্রিকাগুলো নিয়ে এসে দেখাও তো পর্যটক মশাইকে।“

কবির প্রিয় পাত্র অনিল চন্দ সাথেসাথে বেশ কয়েকটি পত্রিকা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলে রামনাথ লক্ষ্য করলেন তাঁরই লেখা পাতার পর পাতা ভ্রমণকাহিনীগুলোতে বিশেষ বিশেষ জায়গায় কবিগুরু নিজের হাতে দাগ দিয়ে আন্ডারলাইন করে রেখেছেন।

মনের ভিতর চমকে চমকে ভাবছেন,’ এও কি সম্ভব? আমার মত অধম লেখকের লেখা বিশ্বকবি ভাবে পড়েন!’ত

লেখক শ্যামসুন্দর বসু আমাদের প্রায় অজানা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ানো রামনাথকে নিয়ে রচনা করেছেন এই পরিশ্রমলব্ধ বই। যার জন্য এসেছিলেন রামনাথের ভিটেমাটি বাংলাদেশের সিলেটের বানিয়াচঙ্গে ও কথা বলে দেখেছেন রামনাথের বন্ধুদের সাথে, তাঁর সমস্ত কাছের লোকজনের সাথে। জানার চেষ্টা করেছিলেন কেমন ছিল মানুষটা, কিসের নেশায় উনি এমন ভাবে নিয়ে ছিলেন জীবনকে।

সেই সাথে তার প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা এবং বৈঠকের অনেক উদ্ধৃতি দিয়ে আমাদের জানানোর চেষ্টা করছেন সেই মানুষটি আদর্শকে।

একবার ইংল্যান্ডে দুই দিন না খেয়ে আছেন, ক্ষুধায় মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তারপর এক মুদি দোকানদার (সিলেটি  মুসলমান)  সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন,  চললেন  এক জমজমাট রেস্তোরাঁয়, সেখানের ব্যক্তিদের সামনে সিলেটি ভঙ্গি ও ভাঙা ইংরেজিতে বলে চলেছেন তাঁর ভ্রাম্যমান জীবনের অনবদ্য সব কথা, শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন সেসব,  পর্যটকও হারিয়ে ফেলেছিলেন তাঁর সময়জ্ঞান! শেষে চিন্তিত রেস্তোরাঁর মালিক ছুটে এসে বললেন,” এবার দয়া করে থামুন, এক ঘণ্টার বেশি বলে্‌ আমি তোমাকে আধাঘন্টার চুক্তি হিসেবে ১০ পাউন্ডের বেশি দিব না কিন্তু!

১৯৩৪ সালে বার্মা আসার পর তার মনে হয় ভারতবর্ষই বা কেন বাকি থাকে! তারপরে তিনি মনিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি ঘুরে সিলেটে নিজ গ্রামে যে যাবার পথে শিলংয়ের পাহাড়ি ঢালু পথে সাইকেল থেকে পড়ে পায়ের হাড় ভেঙ্গে ফেলেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন।

সিলেটে নিজ জেলাবাসী এবং আত্মীয়রা তার কাছে আসেননি দুটো কারণে,  এক - সাগর পাড়ের বিদেশ ফেরা কত কি অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়া ম্লেচ্ছের সাথে দেখা করে জাত যায় যদি! আর ২য় কারণ - ছোটবেলা থেকে গায়ে বিপ্লবী বন্ধ থাকায় পুলিশের নজরে আসার ভীতি!

তারপর তিনি সেরে ওঠে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জামালপুর-রাজশাহী-মুর্শিদাবাদ-কৃষ্ণনগর-কুচবিহার- শিলিগুড়ি-দার্জিলিং পর্যন্ত ভ্রমণ করে ফিরে এসে ঘাঁটি গাড়েন কোলকাতার হ্যারিসন রোডের শান্তি ভবনের ৩৬ নম্বর ঘরটিতে , ৪০ বছর বয়সে! আরও পরে বিশ্ব পর্যটন শেষে হাজার ১৯৪০ সালে কলকাতায় থীতু হয়ে মন দিলেন বই লেখায়, তখন তাঁর বয়স সাতচল্লিশ। ৩২টি বই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ভবঘুরে জীবন নিয়ে।

এভাবে দিনের পর দিন বক্তৃতা করেন এটা তো হয়েছে অর্থের প্রয়োজন এবং সে প্রয়োজন মেটাবে কত রকম যে কাজের দায়িত্ব নিতে হয়েছে যাত্রাপথে তার ইয়ত্তা নেই এবং কোন কাজকেই কখনও ছোট মনে করেন নি তিনি।

বিচিত্র সব কোমল-কঠিন অভিজ্ঞতা সারা জীবনে -আফ্রিকায় হায়েনার সাথে একই জলায় জলপান করেছেন, ভাড়াটে খুনের গুলির সামনে পড়েছেন, বিস্তর আঘাত পেয়েছেন শরীরে ও মনে।

একবার ২৯ দিন একটানা কানাডার কারাগারে থাকতে হল কারণ ইমিগ্রেশনের অদ্ভুতুড়ে আইন- সেই সাথে সালটা ১৯৩২, ভারতবর্ষের অধিবাসীদের জন্য দুয়ার খোলা নেই কোথাওই!

ভারত ভ্রমনের সময় কাশিতে জন্য ধর্মশালায় বিশ্রামের সময় চারপাই খাট থেকে অগুনতি ছারপোকার দল বের হয়ে কামড়ানো শুরু করলে তাদের পটাপট মারতেই দারোয়ান ভয়ানক চেঁচামেচি জুড়ে জীবহত্যার জন্য, এমনকি তাঁকে আক্রমণেরও চিন্তা করছিল। রামনাথ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তাকে সপাটে চড় কষিয়ে চারপাইতে আগুন ধরিয়ে দিইয়ে বললেন আশেপাশের সব খাটই ছারপোকাইয় ভর্তি। সে দারোয়ান কেউ সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি কারণ রামনাথের পোশাক দেখে সকলেই তাঁকে দারোগা মনে করেছিল।  সেখান বের হবার সময় তিনি আপন মনে বলে উঠলেন “খাকি প্যান্ট-শার্ট জিন্দাবাদ”।

দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গলে বামনাকৃতি নিগ্রোরা তাঁকে গাছ থেকে পাকা ফল উপহার দিয়েছিল।

এক হুজুর প্রশ্ন করেছিল,  আচ্ছা আপনি কখনো প্রেত এবং জ্বীন দেখেছেন?

রামনাথ বললেন, ‘ এ দেখুন রাত শেষ হতে আর মাত্র দেড় ঘণ্টা বাকি আছে আজ কে বাহিরে একাই ছিলাম, এমন কিছু তো কখনোই দেখি নাই।

আফ্রিকার ডুডুমা গ্রামের মশার সঙ্গে না পেরে টর্চ জ্বেলে বেরিয়ে পড়ল দেখলেন পালে পালে বনপশু চারপাশে চরে বেড়াচ্ছে! কোরিয়া সীমান্তে ছোট ছোট কুমির মরা নদীতে স্নান করেছেন, কোন নির্দিষ্ট স্থানে পৌছানোর জন্য এক দিনে ১৩৭ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে বাধ্য হয়েছেন।

চীনে তাকে চোখ বেঁধে নানা পথ ঘুরে আসা না হলে তিনি জানান চোখ মেলে দেখলেন তার সামনে কুলির পোশাকে প্রাণময় সরল হাসিতে ভরা মাও সে তুং।

ভবিষ্যতের চেয়ারম্যান মাও তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ তুমি কার ইচ্ছেই পৃথিবী ঘুরছ?;

সেই প্রবল ব্যক্তিত্বের সামনে কোনমতে বেসামাল অবস্থায় ঢোক গিলে বলে ফেললেন, ‘আজ্ঞে, ঈশ্বরের ইচ্ছায়!”

সাথে সাথে তার মুখ চেনা আগুনে পরিণত হলো, তিনি জলদ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘ না, তুমি নিজের ইচ্ছায় ঘুরছ,  নিজের হিম্মতে করছ, তুমি যদি পঙ্গু হতে তাহলে ঈশ্বর তোমাকে এই ভাবে সাইকেলে করে বিশ্ব ঘোরাতে পারতো না”।

এরপর থেকে রামনাথ আর কোনোদিনই অলৌকিক কোন কিছুর কথা বলেননি।

ইরানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার মত লোক ভারতে কতজন আছেন?

তিনি সাথে সাথে বললেন,’ আমিতো আমার মত লোক আর একটিও দেখতে পায়নি’।

তিনি ছিলেন সর্বভুক এবং ভোজনরসিক, যদিও বলতেন পথে অনেক সময়ই গুরুভোজন ভালো নয়।

মাংস পছন্দ করতেন খুব বেশি, মাছ পেলেও কথা ছিল না, আর সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন খিচুড়ি।

ইউরোপ ভ্রমণের সময় বুদাপেস্ট থেকে ভিয়েনা যাওয়ার পথে একজন তাঁকে ওটমিল, দুধ দিয়ে তিনি পরিজ বানিয়ে দিয়ে মজা করে বলেছিল তুমি কয় বাটি পরিজ খেতে পারবে?উনি বলেছিলেন ১৬ প্লেট এবং ১৬ প্লেটই খেয়েছিলেন।

বিলেতের জাহাজে একবার সব্জি  খেতে খেতে বিরক্ত হয়ে শূকরের চর্বি খেতে চাইলে জাহাজের বয় প্রশ্ন করেছিল, ‘ আপনি কি খ্রিস্টান?’, উনার উত্তর ছিল- না হে না। আমার ধর্ম জানোয়ার প্রুফ। শুয়োর দূরে থাক, হাতীও থাকে ঘায়েল করতে পারবে না।‘

একবার বুলগেরিয়ায় সংবাদপত্র অফিসে রবীন্দ্রনাথের দেশের মানুষ প্রমাণ চাইলে রামনাথ সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার ভাষায় লিখে দেন, ‘ আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার পরে’! পরের দিন কাগজের হাতের লেখায় ব্লক হয়ে বের হয় ওপরে বড় বড় করে ছাপা লাইন-  ঠাকুরের দেশের লোকের বিশ্বপরিক্রমা, সঙ্গী রবিন্দ্রনাথের গান!

তার বেশকিছু ভ্রমণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা প্রবর্তক, দেশ, বসুমতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা অফিসে জমা দিয়েছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শুধুমাত্র দেশ পত্রিকাতেই সর্বসাকুল্যে ৬০ বারের বেশি ভ্রমণ কাহিনী ছাপা হয়েছে রামনাথের!

চল্লিশের দশকের মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনা ভবনে বসে মিত্র বাবু ও বিশ্বাস মশাই রামনাথ কে নিয়ে বলেছেন

‘রামনাথের সুনীল আকাশ তুল্য মানসিকতার কোন সীমা-পরিসীমা ছিল না, চিরভাস্বর চির উজ্জ্বল ধ্রুবতারার মতো। যুদ্ধে দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়াই তো অনেকেই, করেছে অনেককে সময় বিশেষে করতে হয়, কিন্তু হাসতে হাসতে কজনে পারে বলতে পারো? যে পারে সে তো মহত।

নিজেই লিখেছিলেন, “ আফ্রিকায় আসলাম পার হয়ে এক দেশে বর্ডারে তাঁর সাইকেল দেখে সবাই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যেখানে ভূপর্যটক লেখা, সেই সাইকেলে চড়ে সারা পৃথিবী একজন পাড়ি দিচ্ছে তারা তা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো কিন্তু সীমান্ত পার হতে তাঁকে সাহায্য করছিল না তাই দেখতে উনি ঠোঁটকাটা ভঙ্গিতে বললেন,

 ‘আমিই সেই লোক। সাইকেল দেখে কী হবে, আমাকে দেখুন!”

একজন খাঁটি পর্যটকদের মতো তিনি বলে গিয়েছিলেন-

 ‘নাম জাহির করলে পর্যটন হয় না হয় আরাম ও বিরাম!’

‘ পর্যটক সব কথা শুনে যায় মাত্র, কিন্তু সকল বিষয়ে নিজের কোনো মতামত প্রকাশ করেন না’।

‘পর্যটকদের কাছে রাজনীতি অর্থনীতি সব সময় সুখের বিষয় নয় বরং পথের সংবাদ সবচেয়ে আনন্দের।‘

‘পৃথিবী ভ্রমণের উদ্দেশ্য মাইল গণনা নয়, অহঙ্কার পরিত্যাগ করে সবার সঙ্গে মিশতে হয়। কথা কইতে হয়।‘

‘পর্যটক হল এক ধরনের বেদে, শৃঙ্খলার বন্ধন সহ্য করতে পারে না।‘

‘দেশ দেখার যার একমাত্র কাজ, তার হারিয়ে যাওয়া কি করে সম্ভব হতে পারে!”

‘পর্যটক যদি মিথ্যা বলে তাহলে সে পর্যটক হতে পারবে না, পর্যটকদের পক্ষে দাঁড়ানো সবচেয়ে বড় উপাসনা লোভ ত্যাগ করা।‘