৩ নভেম্বর। মেনদে
মেঘের দেশে গভীর ঘুম শেষে জেগে উঠলাম সকাল আটটার সময়। আজ কোনো তারা নেই। কোনো লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে না। কোনো কঠিন চড়াই উঠতে কিংবা নামতে হবে না। আজ শুধুই বিশ্রাম। তাবুর ভেতর থেকেই টের পেলাম আবহাওয়া ভালো। সূর্যও উঠেছে। তাবুর ভেতরটা গরম হয়ে গেছে সূর্যের তাপে। 
স্লিপিং ব্যাগ থেকে বের হয়ে তাবুর জিপার খুলে বাইরে এলাম। এখনো সবাই তাবুর ভেতরেই আছে। শুধু আমিই বাইরে। আমাদের তাবুর কাছেই দুইটা মোনাল ফ্রিজান দেখলাম। মোনাল ফ্রিজান নেপালের জাতীয় পাখি। দেখতে অনেকটা ময়ুরের মতো। এতো সুন্দর রঙিন পাখি এই প্রথম দেখলাম। এই পাখিটিও জীবনের প্রথম দেখলাম। স্ত্রী পাখির থেকে পুরুষ পাখি বেশি কালারফুল। সবাইকে ডাকলাম পাখিটি দেখার জন্য। সবাই বেরিয়ে এলেন। আমি আগে এই পাখিটির নাম জানতাম না। মুহিত ভাইর কাছ থেকে জানতে পারলাম পাখিটির নাম। 
বুসন আমাদের জানালেন ডাইনিং তাবুতে খাবার রেডি। বুসন হলেন আমাদের বাবুর্চি। অনেক হাসিখুশি মজার মানুষ। সাস্থ্য ভালো। রান্নাও চমৎকার। আমরা ডাইনিং-এ এসে সকালের নাস্তা করলাম। 
পর্বতারোহণে বিশ্রাম বলতে হাত পা গুটিয়ে তাবুর ভেতরে বসে থাকা নয়। হাঁটা হাঁটি করতে হয়। কিছু উপরে গিয়ে আবার নেমে আসতে হয়। বেশি বেশি তরল খাবার খেতে হয়। তা হলেই শরীর এক্লামাটাইজ হবে। 
ঘন্টা খানেক হাঁটার পর খাড়া চড়াই পার করে সোয়া এগারোটার সময় লাউদে গোম্পা মুনাস্ট্রিতে উঠে এলাম। মেনদের উপরেই এই মুনাস্ট্রি। বেশ বড় এবং গুছানো। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। নতুন করে আবার বিল্ডিং হয়ে। ক্ষতিগ্রস্থ একটি ঘর এখনো বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো মূহুর্তে ভেঙে পড়তে পারে। আমরা ডাইনিং রুমে বসলাম। গরম গরম এক ফ্লাক্স জিঞ্জার চা এলো। আমরাও শেষ করতে সময় নিলাম না। 

লাউদে গোম্পা মুনাস্ট্রিতে সামুর সাথেলাউদে গোম্পা মুনাস্ট্রিতে সামুর সাথে

 
সামু এলো। সামু ২০/২২ বছর বয়সের মেয়ে। গোলাকার মুখমন্ডল, কপালটা একটু বড়, চোখ দু’টো ডাগর ডাগর। দেখতে একদম নিরিহ স্বভাবের। গায়ের রঙটা ফর্সা, বেশি লম্বা না। পাঁচ ফুটের কমই হবে। তবে দেখতে অনেক মায়াময়। সে এই মুনাস্ট্রিতেই থাকে। মুনাস্ট্রি দেখাভাল করে। সারাদিন নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। 
২০১৪ সালে বিএমটিসির ছয় সদস্যেও একটি দল এই মাউন্ট কেয়াজো রি অভিযানে এসেছিলেন। যদিও তখন আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে সামিট করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। শামীম ভাই ও সম্পা আপু বেসক্যাম্প থেকে দু’দিন আগে মেনদে নেমে আসেন। ওই সময় তারা এই মুনাস্ট্রিতেই থাকে। তখন সামুর সাথে সম্পা আপু ও শামীম ভাইর ভালো বন্ধুত্ত্ব হয়। তারা একত্রে বেশকিছু ছবি তুলেন। 
ঢাকা থেকে সম্পা আপু শামীম ভাইর কাছে সেই ছবির প্রিন্ট কপি দিয়ে দেন। সেই ছবি আজ শামীম ভাই সামুকে দিয়েছেন। ছবিগুলো পেয়ে সামু অনেক খুশি হয়েছে। 
আমরা মুনাস্ট্রি ঘুরে দেখছি। ভূমিকম্পে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তার চিহ্ন এখনো আছে। একটি ঘরের দেয়াল ফেঁটে হেলে গেছে। খুঁটি দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ঘরটির ভেতরে একটি বড় পার্থনা হুইল আছে। আর একটি ঘর একদম ধ্বসে গেছে। এসব দেখে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা উপলব্ধি করলাম। নতুন করে আবার তারা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। 
এখানে একটি লাইব্রেরী আছে। জুতা খুলে লাল কার্পেট বিছানো কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলাম দোতলায় লাইব্রেরীতে। রুমের চারপাশে বুকসেল্ফ। নানান ধরনে ধর্মীয় বই সাজানো। বইগুলো দেখছি যাদিও লেখা বুঝি নাই। প্রায় সব বই নেপালি ভায়ায় লেখা। 
 

লাউদে গোম্পা মুনাস্ট্রির ভেতরে দাকিপা শেরপা পার্থনা করছে  ছবি: এমএ মুহিতলাউদে গোম্পা মুনাস্ট্রির ভেতরে দাকিপা শেরপা পার্থনা করছে  ছবি: এমএ মুহিত


বড় একটা পাথরের গুহায় ধর্মীয়গুরু লামা উপসনা করেন। আমরা সেই পাথরের গুহার ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলাম। ভেতরটা অনেক সুন্দর করে সাজানো গুছানো। 

ঘাইকিং থেকে ক্যাম্পে নেমে আসছি ঘাইকিং থেকে ক্যাম্পে নেমে আসছি


দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে আমাদের তাবুর কাছে নেমে এলাম।  এখনো রোদ আছে। আবহাওয়াও ভালো। কাল সকালে আমরা বেসক্যাম্পে উঠে যাবো। তাই এখন কেউ মাথা ধুয়ে কিংবা সেভ করে নিচ্ছে। এই মেঘের দেশে বসে বিপ্লব ভাই ও নূর ভাই সেভ করছেন। ফৌজিয় আপু, ছায়াবিথী আপু ও শামীম ভাই মাথা শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিচ্ছে। আমি কিন্তু আবার বেকার বসে নেই। এই সকল কর্মকান্ড ক্যামেরায় ভিডিও করছি আর ছবি তুলছি। 
ডাইনিং তাবুতে সবাই দুপুরের খাবার খাচ্ছি। খাবার সময় মুহিত ভাই আমাদের বেসক্যাম্পের করনীয় বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন। যেহেতু আমরা তিনজন একদম নতুন। 
 

ডাইনিং তাবুবে খাবার সময় ডাইনিং তাবুবে খাবার সময়

 
বিকেলের সময়টা কেটে গেলো বিপ্লব ভাই ও নূর ভাইর পর্বতারোহণ অভিজ্ঞতার গল্প শুনে। কতো রোমান্স আর ভয়। শুনে গায়ে কাঁটা দেয়। কী ভয়ংকর সুন্দর্যের টানে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে সামনে এগিয়ে যান তারা। শুধুই দেশের লাল সবুজের পতাকার জন্য। আমরা মন্ত্রমুগদ্ধের মতো শুনছি। 
ক্লান্ত সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়লো। একটি উঁচু বড় পর্বতের আড়ালে চলে গেলো। পর্বতের ছায়া আমাদের উপরে এস ছেয়ে গেলো। মেঘও চারদিক অন্ধকার করে দিলো। শীত তার ক্ষমতা জাহির করতে করতে আমাদের জড়িয়ে ধরলো। 
মেনদে আমাদের তাবুর পাশে একটি একটি পরিবার বসবাস করে। যদিও এখানে পাঁচ ছয়টি পরিবারের বসবাস। ছোট দু’টি ছেলে আমাদের সাথে খেলা করে। তারা দুই ভাই। একজনের নাম থাকপা শেরপা ও অন্যজনের নাম প্রাচীদিন শেরপা। থাকপা বড়। সে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। আর প্রাচীদিন শিশু শ্রেণীতে। থাকপা লাজুক প্রকৃতির। তবে আমাদের সাথে বিশেষ করে রিনি ও ছায়াবিথীর সাথে বেশি বন্ধুত্ত্ব হয়েছে। এই উচ্চতায় অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম। এখানে ওদের জন্ম, বেড়ে উঠা। এখন তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে। আধুনিক পৃথিবীর সাথে তারাও এখন পরিচিত হচ্ছে। 

লেখকের সাথে থাকপা শেরপা ও প্রাচীদিন শেরপা, মেনদে লেখকের সাথে থাকপা শেরপা ও প্রাচীদিন শেরপা, মেনদে 

রাতের খাবার শেষ করে কিছু সময় ওনো খেললাম আমরা। এখানেই শেষ মোবাইল, ক্যামেরা চার্জ দেয়া। কারণ বেসক্যাম্পে বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা নেই। তাই এখানেই সবকিছু চার্জ দিয়ে নিলাম। 

 

(চলবে)

 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৬ষ্ঠ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৫ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)