১ নভেম্বর। খুমজুং

মুহিত ভাই আমাদের পাশের রুমেই আছেন। তার টুনটুনে (এমপি-থ্রি) মৃদু সুরে রবিন্দ্র সংগীত বাজছে। গানের অমৃত সুরে ঘুম ভাঙলো। উষ্ণ কম্বলের ভেতর থেকেই গান শুনছি। সাতটার সময় সকালের খাবার খেলাম। আজ আমরা শুধু হাইকিং করবো। তাই কোনো তারা নেই।

সাড়ে আটটার সময় আমরা খুমজুং এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। নামচে বাজার থেকেই খাড়া চড়াই। চড়াই শেষে উঠে এলাম ৩৭৫৫ মিটার উচ্চতায়। এখানে স্যাংবুচে এয়ারপোর্ট। ছোট এই জায়গায় ছোট রানওয়ে। জরুরি প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করা হয়।

এখানে একটা বড় পাথরের বোল্ডার আছে। মুহিত ভাই আমাদের এই পাথরে ফ্রি-হ্যান্ড ক্লাইম্বিং প্র্যাকটিস করান কিছু সময়। ফ্রি-হ্যান্ড ক্লাইম্বিং হলো দড়ি, জুমার, ক্যারাবিনার, পিটন, ফ্রেঞ্চ, চোখ নাট, হারনেস ব্যবহার না করে ক্লাইম্বিং করা। রিনি আপু ও ছায়াবিথী আপু একদম নতুন। তাই তাদের কিভাবে ক্লাইম্বিং করতে হয়, হোলগুলোতে কিভাবে ধরতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন মুহিত ভাই।

পানি আর চকলেট খেয়ে আবার উপরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কিছু সময় হাঁটার পর আমরা চলে এলাম ১২,৬৬৫ ফুট উচ্চতায় এভারেস্ট ভিউ হোটেলের কাছে। আবহাওয়া অনেক ভালো। রোদ আছে। মেঘও নেই। প্রথমেই দেখতে পেলাম রাজসিংহাসনের মতো দু’হাত প্রসারিত করে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মাউন্ট আমা-দাব্লাম। আমরা যে দু’টি পর্বত অভিযানে এসেছি মাউন্ট আমা-দাবলাম একটি। পেছনেই সবার উপর দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শ্বেত-শুভ্র পবিত্র সাগরমাতা। পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট এভারেস্ট।

 

 পেছনে মাউন্ট এভারেস্ট ও মাউন্ট আমা-দাবলাম নিয়ে লেখক পেছনে মাউন্ট এভারেস্ট ও মাউন্ট আমা-দাবলাম নিয়ে লেখক

 

এভারেস্ট ভিউ হোটেলের পাশ থেকে কেয়াজো-রি টিমএভারেস্ট ভিউ হোটেলের পাশ থেকে কেয়াজো-রি টিম

পৃথিবীর সর্বোচ্চতায় সব থেকে বড় মন্দির থায়াংবুচে মুনাস্ট্রিও দেখতে পেলাম এখান থেকে। দূর থেকে মুনাস্ট্রিকে ছোট দেখাচ্ছিল। এভারেস্ট ও আমা-দাব্লামকে পেছনের দৃশ্য করে আমরা সবাই ছবি তুললাম।

এভারেস্ট ভিউ হোটেলের পাশ ঘেঁসে সমনের দিকে নামতে শুরু করলাম। উপর থেকেই খুমজুং গ্রামটি দেখতে পেলাম। দূরের উপর থেকে গ্রামগুলো দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগে। চারদিকে উঁচু পাহাড় ঘেরা মাঝখানে মানুষের ঘরবাড়ি। খুম্বু অঞ্চলে এই গ্রামটিই সব থেকে বড় গ্রাম। আর এই গ্রামটি এডমুন্ড হিলারীরর স্মৃতি বহন করছে। হিলারী পৃথিবীর অন্যতম প্রথম ব্যক্তি যিনি এভারেসেটর চূড়ায় পা রাখেন। তাঁর প্রিয় একটি জায়গা ছিলো এটি। এখানকার মানুষদের উন্নয়ন নিয়ে তিনি কাজ করেছেন।

খুমজুং গ্রামখুমজুং গ্রাম

 

ভূমিকম্পের পর ঘরবাড়ি মেরামত করছে ভূমিকম্পের পর ঘরবাড়ি মেরামত করছে

 

খুনদে গ্রামে এক বৃদ্ধের সাথে লেখক     ছবি: রিনিখুনদে গ্রামে এক বৃদ্ধের সাথে লেখক ছবি: রিনি

 

খুনদেখুনদে

 

পৌনে একটার দিকে আমরা খুমজুং গ্রামে এলাম। এই গ্রামটির উচ্চতা ১২,৪০০ ফুট। বেউল লজে আমরা মাসালা চা পান করলাম। খাবারের অর্ডার দিয়ে খুমজুং থেকে খুনদে এলাম। ১২,৬০০ ফুট উচু এই গ্রামটি। এই গ্রামটিই লাকপা চিরি শেরপার গ্রাম। তিনি আমাদের বিএমটিসির সাথে দু’টি পর্বতারোহণ অভিযানে অংশ নেন। তিনি একাধিকবার মাউন্ট এভারেস্ট সামিট করেছেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের সময় তিনি এভারেস্ট অভিযানে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে ছিলেন। সেখানেই তিনি প্রাণঘাতি অ্যাভাল্যাঞ্চের কবলে পরে মৃত্যুবরণ করেন। এই সময় বেসক্যাম্পে আঠারো জন শেরপা ও পর্বতারোহী প্রাণ হারান

পাহাড়ের শিশুপাহাড়ের শিশু

 

পাহাড়ের ভবিষতপাহাড়ের ভবিষত

 

বেউল লজে দুপুরের খাবার খেলাম। খাবার শেষে খুমজুং গ্রামটি ঘুরে দেখতে বের হলাম। হিলারী এই গ্রামের মানুষদের শিক্ষার আলো জ্বালানোর উদ্দেশ্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এখন সেই স্কুলটি কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। হিলারীর নামে স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা স্কুল মাঠে খেলা করছে। আর একদল ছাত্র ছাত্রী স্কুলের চারপাশ পরিস্কার করছে। একজন শিক্ষকের সাথে আমাদের কথা হলো। তিনি বাংলা জানেন। তার বাড়ি দার্জিলিং-এ ছিলো। 
স্কুলের সামনে একটি হিলারীর সোনালী রঙের ভাষ্কর্য আছে। গ্রামের মানুষজনও হিলারীকে রেখেছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। গ্রামের মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। 

 

হিলারী স্কুল মাঠে হিলারীর স্ট্যাচুর সামনে হিলারী স্কুল মাঠে হিলারীর স্ট্যাচুর সামনে

 

বিকেল চারটের সময় আমরা নামচে বাজারের ফেরার পথ ধরলাম। আবহাওয়াও খারাপ হচ্ছে। দেখতে দেখতে চারপাশ মেঘে অন্ধকার হয়ে গেলো। একে হোয়াইট আউট বলে। হোয়াইট আউট হলে চারপাশের কিছু দেখা যায় না। ১৫/২০ ফুট দূরের একজন আর একজনকে দেখা যাচ্ছে না। শীতও আক্কেল জ্ঞানহীন ভাবে হুট করে নেমে এসেছে। শীতের সাথে যুদ্ধ করতে করতে সন্ধ্যার মধ্যে নামচে বাজারের লজে চলে এলাম।

 

হোয়াইট আউটের ভেতর দিয়ে নামচে বাজার নেমে আসছি হোয়াইট আউটের ভেতর দিয়ে নামচে বাজার নেমে আসছি 

 

ডাইনিং-এ বসে জিঞ্জার চা আর রুমহিটারে শরীর গরম করে ওনো খেলতে বসলাম। খেলার সময় শামীম ভাইর পাশে বসলেই হলো। সব কার্ড দেখে ফেলেন। খেলতে খেলতে রাতের খাবারের সময় হয়ে গেলো। টেবিলে খাবার চলে এলো। এখানকার রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করে নারীরা। খাবার পরিবেশনও করে তারা।

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৪র্থ কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)