৩১ অক্টোবর। নামচে বাজার। ১১৩০০ ফুট

সকাল সাতটার মধ্যেই সবাই রেডি হয়ে ডাইনিং এ চলে এলাম। প্রথমেই জিঞ্জার চা তারপর সকালের নাস্তা। রাতে বৃষ্টি ছিলো। তাই অনেকটা ভয়ে ছিলাম। সকালের আবহাওয়া খারাপ হতে পারে ভেবে। তবে ভয়ের কপালে লাথি মেরে সূর্য হেসে উঠেছে।  সন্ধ্যায় এসেছিলাম বলে চারপাশের কিছুই দেখা হয়নি। তাই এখন দেখছি পাহাড় পর্বত ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্য। ছ’হাজারি পর্বত কুসুমকাংরু ও খুমডিলা দাঁড়িয়ে আছে মাথা তুলে। সূর্যের আলোতে চিকচিক করছে। খুমডিলা পর্বতটি একটি পবিত্র পর্বত স্থানীয়দের কাছে। তাই এটি আরোহণ নিষিদ্ধ। সেই কারণে এখনো এটি আনসামিট রয়েছে। 

আটটার সময় আমরা এখান থেকে নামচের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। এখনো আমার মাথা ব্যথাটা রয়ে গেছে। মুহিত ভাইকে জানালাম মাথা ব্যাথার কথা। রাতে শুনেছি শামীম ভাইয়েরও মাথা ব্যাথা। মুহিত ভাই বললেন একাই ভালো হবে। উচ্চতাজনিত কারণে মাথা ব্যাথা করছে। 

দুর্ঘটনা প্রবণ রকফল এলাকা  দুর্ঘটনা প্রবণ রকফল এলাকা

পাহাড়ের গা বেয়ে আস্তে আস্তে নেমে এলাম দুধকোশির পাড়ে। দুধকোশির কলকল শীতল শব্দ আর মেঘের খেলা চলছেই যুগ যুগ ধরে। সেই খেলার দর্শক হয়ে দেখছি আর পাহাড়ি উচু নিচু পথে হেঁটে চলছি। দুধকোশি নদীর উপরে ঝুলন্ত ব্রিজ দিয়ে পাড় হচ্ছি। ব্রিজের উপর দিয়ে হাঁটার সময় ব্রিজটি একটি তালে ঝুলে। ব্রিজে নানান রঙের পার্থনা পতাকা আর কাথা বাতাসে পত্পত্ করে উড়ছে। নূর ভাই ব্রিজের নিচ থেকে আমাদের ভিডিও করলেন। 

 ঝুলন্ত ব্রীজঝুলন্ত ব্রীজ

ব্রিজ থেকে নেমে এসে দুধকোশির পাড়ে পানি পানের বিরতি। বড় একটি পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তোললাম। পাশে একটি একটু উঁচু পাথরের উপরে উঠে বিপ্লব ভাই ছবি তোলার জন্য দাঁড়ালেন। পাথরটি শেওলাযুক্ত ছিলো। স্টাইল করে পোজ দিতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান। কপাল জোড়ে পেছনের দিকে না পড়ে সামনের দিকেই পড়লেন। পেছনের দিকে পড়লে একদম সোজা কমপক্ষে একশত ফুট নিচে দুধকোশি নদীতে পড়তেন। এ যাত্রায় কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই বেঁচে গেলেন। 

এখান থেকে উপর দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম একত্রে দু’টি ঝুলন্ত ব্রিজ। ব্রিজ দু’টি আমাদের থেকে অনেক উঁচুতে। একটি উপরে আর একটি একটু নিচে। আমাদের উপরেরটা দিয়েই যেতে হবে। ব্রিজের উপর দিয়ে হেঁটে চলা মানুষগুলো খুব ছোট ছোট দেখাচ্ছে। বাহারি রঙের প্রার্থনা পতাকার জন্য ব্রিজ দু’টি রঙিন দেখাচ্ছে। খাড়া চড়াই পার করে ব্রিজের উপরে উঠে এলাম। ব্রিজে দাঁড়িয়ে একদম উপর থেকে দুধকোশী নদীর স্রোত দেখছি। এই ব্রিজটি আগেও দেখেছি। তবে বাস্তবে না। হলিউডের এভারেস্ট (২০১৫) মুভিতে। 

এই ট্রেইলে বেশ কয়েকটি বিষয় ছিলো উল্লেখ করার মতো। ট্রেইলের মাঝে মাঝে ডাস্টবিন বানানো আছে। তিনটি নির্দ্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে হয়। প্লাস্টিক, কাঁচ ও অন্যান্য। মাঝে মাঝে টয়লেটও আছে। যেখানে টাকা দিয়ে ও টাকা ছাড়াও ব্যবহার করা যায়। 

পথের মাঝে মাঝে অনেকগুলো বড় বড় পাথর আছে। এই পাথরের গায়ে খোদাই করা ধর্মীয় বিষয়ে লেখা আছে। এই পাথরগুলো হাঁটার সময় হাতের ডান পাশে রেখে হাঁটতে হয়। প্রার্থনা হুইলও আছে উল্লেখ করার মতো। হাঁটার সময় এগুলো ঘুরিয়ে যেতে হয়।

চলার পথে একটু বিশ্রাম   চলার পথে একটু বিশ্রাম

নামচে বাজারের আগে একটি চেকপোস্টে এন্ট্রি করতে হয়ে। এখানে এসে দেখি সেই পাসাং লামু শেরপা। এখানে কিছু সময় পাসাং লামু আমাদের সাথে গল্প করেন। ছায়াবিথী আপুর হাতে একটি মৌমাছি শোল ফুটায়। তিনি চিৎকার করে উঠেন। নূর ভাই শোলটি সাথে সাথে বের করে ফেলেন। পাসাং লামু তার ব্যাগ থেকে এন্টিসেপটিক বের করে ছায়াবিথী আপুর হাতে লাগিয়ে দিলেন। 

পর্বতারোহী পাসাং লামুর সাথেপর্বতারোহী পাসাং লামুর সাথে

১.১৫ মিনিটে আমরা নামচে বাজারে এসে পৌঁছালাম। অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা। ১১৩০০ ফুট উচ্চতার মানব বসতি। এই নামচে বাজারকে শেরপাদের রাজধানী ও এভারেস্টের প্রবেশ দ্বার বলা হয়। নামচে বাজারের পশ্চিমে মাউন্ট খুয়ামদে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। 

আমরা এ.ডি. ফ্রেন্ডশীপ লজ এন্ড রেস্টুরেন্টে উঠেছি। লজের দ্বিতীয় তলার ডাইনিং-এ বসে মাসালা চা পান করে শরীরের ক্লান্তি দূর করলাম। তৃতীয় তলার চারটি রুমে আমারা থাকবো দু’টি রাত। আজ আমার রুমমেট বিপ্লব ভাই। সবাই হাত মুখ ধুয়ে দুপুরের খাবারের জন্য ডাইনিং-এ চলে এলাম। 

নামচে বাজার, সলোখুম্বুনামচে বাজার, সলোখুম্বু

ভাত, ডাল, মুরগির মাংস দিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। এখানে খাবারের আগে হাত মুখ মোছার জন্য মেনথল যুক্ত গরম পানির স্টিম দিয়ে গরম তোয়ালে দেয়। আমরা সেই তোয়ালে দিয়ে হাত মুখ মুছে নিলাম। মুখটা মুছার পর অনেক আরাম লেগেছে। খাবার শেষে সবাই কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। 

দু’দিন ধরে দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে দেখচ্ছি। আজও মেঘে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে । শীতটাও অনেক বেড়ে গেছে। আমরা শীতের পোশাক পড়ে হাইকিং-এ বের হলাম। নামচে বাজারের উপরে একটি পার্থনা হুইল আছে। সেই পর্যন্ত আমরা উঠে আবার নেমে আসি। উচ্চতায় হাইকিং করতে হয় উচ্চতার আবহাওয়ার সাথে শরীরকে এক্লামাটাইজ করার জন্য। তাই আমরা ঘন্টা খানেক হাইকিং করি।

হাইকিং 
   
হাইকিং করার সময় নেপালের একটি ট্রেকার গ্রুপের সাথে দেখা হলো। তারা উপর থেকে নেমে আসছে। তাদের ক্লাবের নাম ন্যাচার লাভার। তাদের সাথে কিছু সময় কথা হলো। মুহিত ভাইর পরিচয় পেয়ে তারা সবাই মুহিত ভাইর সাথে ছবি তুলেছে। আমাদের এক্সপিডিশনের শুভকামনাও করে তারা। হাইকিং

সন্ধ্যায় হাইকিং থেকে ফিরে আসি। লজের ডাইনিং-এ বসে রুমহিটারে শরীর গরম করছি আর গরম গরম জিঞ্জার চা পান করছি। সাথে পর্বতারোহণের ডকুমেন্টারী দেখছি টেলিভিশনে। ডকুমেন্টারীটি ছিলো ১৯২৪ সালে জর্জ ম্যালরীর  অভিযানের উপর। জর্জ ম্যালরী হলেন একটি ইতিহাস। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এভারেস্টের প্রথম পরপর তিনটি অভিযানেই অংশ নেন। ১৯২১,১৯২২ এবং ১৯২৪ সালের অভিযান। ১৯২৪ সালের অভিযানে ম্যালরী ও আরবিন নিখোঁজ হন। ৭৫ বছর পর ১৯৯৯ সালে ম্যালরীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তার সাথে দেশলাই, নাইফ, হাতঘড়ি ও বোনের দেয়া চিঠি পাওয়া যায়। কিন্তু বুকপকেটে রাখা তার স্ত্রীর ছবিটা পাওয়া যায়নি। কথা ছিলো মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় তার স্ত্রীর ছবিটা রেখে আসবেন। তাই ধারণা করা হয় ম্যালরী হয়তো সেদিন আরবিনকে নিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় প্রথম মানব পদচিহ্ন এঁকে ছিলেন। এখন শুধুই আরবিনের অপেক্ষায় পর্বতের ইতিহাস তাকিয়ে আছে। তাকে পেলে তার সাথে থাকা ক্যামেরাটাও পাওয়া যাবে। আর সেই ক্যামেরাই তোলা ছবিই হয়তো বলবে তাদের পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শের ঐতিহাসিক ইতিহাস। 

রাত ৮টার সময় আমাদের রাতের খাবার এলো। আজকের খাবারের মেনুটা একটু পরিবর্তন করেছেন মুহিত ভাই। খাবারের মেনুতে আছে আলুর চিপস্, মুরগির মাংস ও চমিন। খাবার খনেক সু-স্বাদু হয়েছে। খুব মজা করেই খাচ্ছি। আমরা সবাই বাহাদুরী করে কাঁচা মরিচ খেলাম। যা হবার তাই হলো। ঝালে লাল হয়ে গেলাম। চোখের পানি আর নাকের পানি একাকার। শামীম ভাই দুই কান চেপে ধরে জিম ধরে বসে আছেন। মুহিত ভাই, বিপ্লব ভাই, নূর ভাই, রিনি আপু ও ছায়াবিথী আপু সবার ঝালে চেহারাই পরিবর্তন গেছে। আর আমার কথা কী বলবো। কার্টুন ছবির মতো ঝাল যেন কান দিয়ে বের হচ্ছে। 

খাবার পর্বটা খুব আনন্দের হলো। খাবার শেষে গরম গরম হরলিক্স টেবিলে চলে এলো। হরলিক্স খেয়ে আমরা ওনো খেলতে বসে গেলাম গোল হয়ে। রিনি আপুর মোবাইল ফোনে অঞ্জন দত্তের কাঞ্চনজংঘা গানটি শুনছি আর খেলছি। 

রাতে সবাই যখন ঘুমাতে যাবো তখন বিপ্লব ভাই গেছেন সেভ করতে। বেসিনের ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ভিজিয়ে সেভিং ক্রিম লাগাচ্ছেন। আমরা দুষ্টুমি করে চলে এলাম তার কাছ থেকে। কিছুক্ষণ পর দেখি মুখে ক্রিম লাগানো অবস্থায় রুমে এলেন তিনি। রুমে আসার একটা মজার কারণ আছে। মুখে ক্রিম লাগিয়ে যখন তিনি রেজার টানছেন কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। তখন তিনি আবিষ্কার করেন যে রেজারের মাথায় ব্লেড নেই।

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)