২৯ অক্টোবর। থামেল
আজকের সকালের নাস্তাটা একটু দেরি করেই সাড়ে আটটার সময় করলাম আমরা। রাতেই সুমন শ্রেষ্ঠা ফোনে জানিয়েছেন যে আজ সকালে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডে যেতে হবে। সেখানে আমাদের পর্বতারোহণের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। আগে নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনে রেজিস্ট্রেশন করতে হতো। কিন্তু এখন নতুন নিয়মে ট্যুরিজম বোর্ডে করতে হয়। 

আমাদের সকালের খাবার শেষ হতে না হতেই আমাদের শেরপা গাইড দাকিপা চলে এলেন। তার সাথে আমরা ট্যুরিজম বোর্ডে যাবো। নর্থ ফেসের সামনে থেকে দু’টা ট্যাক্সি করে চলে এলাম ট্যুরিজম বোর্ডে। এখানে আমাদের আগেই চলে এসেছে সুমন ও পুরবা। তারা সকল কাগজপত্র প্রস্তুত করছে। ভবনের ছাদে আমাদের একটি তাবুর নিচে বসতে দিয়েছেন। ছাদেই একটি ছোট টি-স্টল আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জন্য মাসালা চা ও পাকা পেঁপে এলো। ছাদটা বেশ গোছানো। নানান রঙের ফুল ফুটে আছে। অপেক্ষার সময়টা ভালই কাটলো।  

দুপুর একটার দিকে আমাদের ডাকা হ’লো। এক অফিসার আমাদের সকলের সই নিলেন রেজিস্ট্রেশন ফরমে। তারপর আমাদের কাথা (উত্তরীয়) দিয়ে স্বাগতম জানান। 
দুপুর দু’টার সময় আমরা দুপুুরের খাবার খেলাম। খাবার শেষ করে আবার আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা শুরু করলাম। গলি পথের ভেতর দিয়ে মাউন্টেন হার্ডওয়্যার এর কারখানায় এলাম। এই কারখানার মালিকের সাথে মুহিত ভাইর খুব ভালো সম্পর্ক। তাই শো-রুমে না গিয়ে সোজা কারখানায়। এখান থেকেই আমাদের স্লিপিং ব্যাগ, ডাউন জ্যাকেট ইত্যাদি কেনা হলো। 

কেনাকাটার ফাঁকে ফাঁকে আমরা থামেলের রাস্তায়, দোকানে ছবিও তুলছি। অবশ্য দুই আপু ছবি একটু বেশিই তুলছেন। ছবি বেশি তোলার কারনও আছে। রাস্তার পাশে নানান রঙের জিনিস সাজিয়ে বিক্রি করছে দোকানিরা। যেমন হাজারো রকমের শোপিস, পোশাক, পুতুল, মালা, কানের দুল, মুখোশ ইত্যাদি।  
যদিও এসবের কিছুই আমরা কিনছি না। শুধু দেখছি আর সুযোগ পেলেই ক্লিক করে ছবি তুলছি। সন্ধ্যায় একটি দোকান থেকে আমার, বিপ্লব ভাই ও শামীম ভাইর জন্য আইস বুট, ক্র্যাম্পন, ও আইস এক্স ভাড়া নিয়ে হোটেলে চলে এলাম। 

আজ রাতে নিশু আপু ও সাদিয়া আপু আমাদের সাথে খাবার খাবেন। সাতটার দিকে তারা আমাদের হোটেলে চলে এলেন। তারপর আমরা একটি রেস্টুরেন্টে খেতে এলাম। হোটেলটির দোতলায় আমরা খেতে বসলাম। সেখানে অনেক গল্প আর খাওয়া হলো। 

আমাদের রুমটি জিনিসপত্রে ভরে গেছে। সকাল ৮টার সময় লুকলার উদ্দেশ্যে ফ্লাইট। তাই জিনিসপত্র রাতেই গুছিয়ে ফেলতে হবে। রাত ২টা বেজে গেলো ৩টি ডাফল ব্যাগ গুছাতে। তারপর সবাই নিজ নিজ বিছানায় গিয়ে ঘুমের সমুদ্রে কিছু সময় সাঁতার কাটলাম। 

৩০ অক্টোবর। লুকলা। ৯৩০০ ফুট
ভোর ৫টা। ঘুম ভরা চোখে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হলাম। ছ’টার সময় দাকিপা গাড়ি নিয়ে চলে এলেন। আমরা আমাদের ডাফল ব্যাগ ও ব্যাক প্যাক উঠিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই এয়ারপোর্টে চলে এলাম। এখানে সুমনও চলে এসেছেন। তিনি আমাদের এখানে বিদায় জানাতে এসেছেন। সকাল ৮টার সময় আমরা তারা এয়ার লাইনস্ এ উঠে বসলাম। ছোট বিমান। ১৮/২০ জন যাত্রি বহন করতে পারে। 

ত্রিভুবন অভ্যন্তরীন বিমান বন্দর থেকে লুকলার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠছি  ত্রিভুবন অভ্যন্তরীন বিমান বন্দর থেকে লুকলার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠছি  

৪৮ মিনিটের আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে লুকলা এয়ারপোর্টে অবতরণ করে। ছোট্ট একটি এয়ারপোর্ট। ছোট রানওয়ে। বিমান নেমেই দৌড়ে ইউটার্ন নেয় ছোট এই জায়গার মধ্যেই। 

লুকলা বিমান বন্দর লুকলা বিমান বন্দর

এই এয়ারপোর্টটি বিশ্বের বিপদজনক এয়ারপোর্টের মধ্যে অন্যতম। বিমান উপরে উড়ার সময় উপর থেকে নেপালের পাহাড়ী এলাকা খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। একসময় বিমানটি মেঘের ভেতরে ঢুকে গেলো। চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু  মেঘ আর মেঘ। এ যেন সাদা মেঘের অন্ধকার। কিছুটা ভয়ও পেলাম। মনে হচ্ছিলো সামনের দৈত্যকার বিশাল পাহাড়ে গিয়ে বিমানটি মুখথুবরে পড়বে। 


বিমান থেকে নেমেই টের পেলাম যে আমরা কঠিন শীতের দেশে চলে এসেছি। শীতে কাঁপতে শুরু করলাম। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমরা নম্বুর হোটেলে ঢুকলাম। ডাইনিং রুম হিটারের তাপে গরম হয়ে আছে। কাচের জানালা দিয়ে বিমানের ওঠা নামা দেখা যাচ্ছে। 


গরম গরম মাসালা চা খেয়ে শরীরটা চাঙ্গা হয়ে গেলো।  ডাইনিং রুমটি বেশ বড়।  দেয়ালে ও উপরে পর্বতারোহীদের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। অটোগ্রাফসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা, টি-শার্ট, শার্ট, রুমাল, ফুল প্যান্ট, শর্ট প্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি, হেলমেট, আইস এক্স, ক্লাব লোগো-স্টিকার রুমটিকে রঙিন করে তুলেছে। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ও বিএমটিসির লগোও আছে । দেখে মনটা ভরে গেলো। 


সাড়ে দশটার সময় লুকলা থেকে আমরা আমাদের মূল ট্রেকিং শুরু করলাম। আমাদের ডাফল ব্যাগগুলো আমাদের আগেই ইয়াকে করে চলে গেছে। লুকলা বাজারের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলছি। ছোট্ট বাজার। এই বাজার শেষে পাহাড়ের গা বেয়ে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম। 
 

লুকলা থেকে ট্রেকিং শুরুর আগ মূহুর্ত  লুকলা থেকে ট্রেকিং শুরুর আগ মূহুর্ত

লুকলা বাজরের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলছিলুকলা বাজরের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলছি

যেহেতু এই রাস্তা দিয়েই নামচে বাজার ও এভারেস্টসহ খুম্বু রিজনের সকল পর্বতারোহণে যেতে হয় তাই এই রাস্তাটি কেন্দ্র করেই গ্রাম, বাজার, গেস্টহাউজ ও হোটেল গড়ে উঠেছে। এই রাস্তাতেই প্রতিদিন হাজারো দেশী-বিদেশী ট্রেকার পদচিহ্ন ফেলে হেঁটে যায়। আর মেঘেরাও ট্রেকারদের সাথে আলিঙ্গন করে প্রতিমুহূর্তে। 


ট্রেইলের দু’পাশে পাহাড়ের গায়ে নানান রঙের ফুল পাতা দেখতে দেখতে দুপুর বারোটা বেজে গেলো। চাউরিখারকা-৩ নামের একটি জায়গায় আমরা চা পানের বিরতি নিলাম। শেরপা গেস্ট হাউজ এন্ড রেস্টুরেন্ট এ বসে আমরা চা পান করছি। 


আমাদের একটু পরেই এলেন পাসাং লামু শেরপা। তিনি নেপালের একজন নামকরা নারী পর্বতারোহী। এভারেস্ট আরোহণ করেছেন। ২০১৪ সালে পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বত কে-২ সামিট করেছেন। তার সাথে ফেসবুকে সেই সময় থেকেই ফ্রেন্ড হয়ে আছি। তার সকল পোস্ট ফলো করেছি, লাইক দিয়েছি। আজ তাকে সামনে থেকে দেখছি। ভালো লাগা আরও এক ধাপ যুক্ত হলো। মুহিত ভাইর সাথে তার কথা হলো। তিনি আমাদের আগেই চলে গেলেন। 


২০ মিনিটের বিরতি শেষে আবার ব্যাগপ্যাগ কাঁধে নিয়ে হাঁটা শুরু। কিছু সময় হাঁটার পর নেমে এলাম দুধকুশি নদীর পাড়ে। এই সেই দুধকোশি। যার নাম অনেক শুনেছি। হিমালয়ের বরফ গলা শীতল পানি কঠিন পাথরের গায়ে আঘাত করে করে কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলেছে। নদীর পাশ ধরে আমরা হেঁটে চলছি। কখনো চড়াই আবার কখনো নামা। আঁকাবাঁকা পথে ছোট বড় পাথরের পাশ ঘেঁসে বার্জ, পাইন গাছ পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছি। চলার ফাঁকে ফাঁকে মুহিত ভাই আমাদের গ্রুপ ছবি তুলছেন। নূর ভাই ভিডিও ক্যামেরায় আমাদের ভিডিও করছেন। আর শামীম ভাই মোবাইল ফোনে সেলফি তুলছেন। 

সামিট টিমের শামীম ভাইর সেলফিসামিট টিমের শামীম ভাইর সেলফি

৮৬৩৫ ফুট উচ্চতায় চাউরিখারকা-৫, ফাকদিন, সলোখুম্বু নেমে এলাম। এখন সময় দুপুর ২.১৭ মিনিট। এখানেই আজকের দুপুরের খাবারের বিরতি। নমস্তে গেস্ট হাউস এন্ড রেস্টুরেন্টে খাবারের অপেক্ষায় বসে আছি। খাবার তৈরি হচ্ছে। খাবার অর্ডার করার পরেই খাবার তৈরি করা হয় এসব রেস্টুরেন্টে। তাই অপেক্ষা করতে হয়। 


পৌনে চারটের সময় খাবার শেষে আবার হাঁটা শুরু। কখনো দুধকোশির পাড় ঘেসে কখনো পাহাড়ের চূড়া পার হয়ে দম ফাটা পরিশ্রমে কচ্ছপের মতো আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছি। নানান দেশের ট্রেকাররাও হেঁটে চলছে একই তালে। আবার কেউ উপর থেকে নেমে আসছেন। ইয়াকে করে মালামাল আনানেয়া করছে ইয়াক চালক। ইয়াকের গলার ঘন্টার টুং টাং শব্দ শুনতে বেশ ভালই

লাগে চলার পথে।লাগে চলার পথে।

সন্ধ্যা ছ’টার সময় আমরা ৯২৮০ ফুট উচ্চতায় একটি গ্রামে এসে পৌঁছালাম। এখানে মনজো গেস্ট হাউজ নামের একটি তিব্বতি রেস্টুরেন্টে উঠলাম। ডাইনিং রুমে বসে গরম গরম জিঞ্জার চা সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে বেশি সময় নিলো না। সন্ধ্যা থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। তাই শীতটাও একটু বেশিই। 
আজ আমার রুমমেট শামীম ভাই। মুহিত ভাই এক রুমে, নূর ভাই ও বিপ্লব ভাই এক রুমে এবং রিনি আপু ও ছায়াবিথী আপু এক রুমে। আজ থেকে আমাদের গোসল খতম। তাই হাত মুখ ধুয়েই রাতের খাবার খেতে ডাইনিং রুমে চলে এলাম সবাই। গিজারের পাশে বসে গা একটু গরম করে নিলাম। টেবিলে খাবার চলে এলো। খাবার শেষে করে আবার সবাই রুমে চলে এলাম। আজ থেকে আমার মাথাটি একটু একটু ব্যথা করছে। রাতে ঘুম হলে হয়তো ব্যাথাটা সেরে যেতে পারে তাই আর মুহিত ভাইকে কিছু জানালাম না। শরীরটাও ব্যাথায় টনটন করছে। ব্যথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঘুমিয়ে পড়লাম। 
 

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)