ওয়েটিং রুমে বসে বসে স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে ছোট বড় বিমান দেখছি। দেখেতে দেখতে বোর্ডি-এর সময় হয়ে গেল। প্রথমে একটি বাংলাদেশ বিমানের বাসে করে বিমানের কাছে আমাদের নিয়ে এলো। খুব কাছ থেকে বিমান দেখছি। আনন্দে গা শিউরে উঠছে। বিমানের সিড়ির একটি দু’টি তিনটি করে ধাপ পেরিয়ে উঠে এলাম বিমানের ভিতরে। বিপ্লব ভাই, শামীম ভাই ও আমি একত্রে বসেছি। মুহিত ভাই, রিনি আপু ও ছায়াবিথী আপু একত্রে আমাদের সামনে বসেছেন। নূর ভাই আমাদের পেছনে।  আমার সিটটি জানালার পাশে হওয়ায় বাইরের সব কিছু দেখতে পাচ্ছি। 

বিমান তার পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চিত করে রানওয়ে ধরে দৌড়াতে শুরু করল। একসময় ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে বিমান শূন্যে উড়াল দিলো। আমি জানালা দিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও করতে লাগলাম। এই প্রথম যান্ত্রিক শহর ঢাকাকে উপর থেকে দেখছি। একসময় অনেক উঁচুতে মেঘের উপরে চলে এলাম।  ভাসছি। মেঘের উপরে ভাসছি। শরৎ শেষের মেঘ থোকায় থোকায় তুলার মতো ভাসছে। কী অপরূপ তার সৌন্দর্য? এমন আবেগি মুহুর্ত এই প্রথম। ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। শুধু দু’চোখ ভরে দেখে যেতে হয়। মেঘগুলোও যেন তাদের রূপের অস্তিত্ব জাহির করছে। থোকায় থোকায় মেঘ তুলার মতো ভাসছে। উপর থেকে সেই মেঘগুলো দেখছি। 
ঐদেখা যাচ্ছে মেঘের উপর দিয়ে কাঞ্চনজংঘার শিখর! কী সুন্দর! যেন মেঘের সাথে ভাসছে। এই প্রথম কাঞ্চনজংঘা দেখছি। যদিও বিমানের ভেতর থেকে। আস্তে আস্তে হিমালয়ের সারিবদ্ধ পর্বতমালা চোখের সীমানায়। অইতো দেখা যাচ্ছে এভারেস্ট। নেপালিরা এভারেস্টকে সাগরমাতা বলে। সেই সাগরমাতাকেই দেখছি। মেঘের সাগরে ভাসছে। চোখ আজ তৃপ্তিতে ভরে গেলো। 

আমাদের বহন করা বাংলাদেশ বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে এক ঘন্টা দশ মিনিটের আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে দুপুর ১.৪৮ মিনিট নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করল।  নেপালের শীতল হাওয়া আমাদের গায়ে এসে স্বাগত জানালো। বিমান বন্দরে ইমিগ্রেশন সেরে আমাদের ডাফল ব্যাগ সংগ্রহ করে বাইরে এলাম। আমাদের এজেন্সী ‘ড্রিমার্স ডেসটিনেশন’ এর পক্ষ থেকে শেরপা গাইড দাকিপা শেরপা, ম্যানেজার সুমন শ্রেষ্ঠা ও পুরবা শেরপা গলায় কাথা (উত্তরীয়) পরিয়ে রিসিভ করল। সবাই একত্রে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। 

ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, নেপালত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, নেপাল

তারপর গাড়ি করে হোটেলে চলে এলাম। হোটেল ব্লু হরাইজন বেশ পরিপাটি গুছানো। নানান রঙের ফুল ফুটে আছে। দেখতে অনেকটা বাংলোবাড়ির মতো। হোটেল ম্যানেজার আমাদের রুম বুঝিয়ে দিলেন। কে কোন রুমে থাকবো তা মুহিত ভাই ঠিক করে দিলেন। দ্বিতীয় তলায় মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই এক রুমে এবং পাশের অন্য রুমে রিনি আপু ও শয়লা আপু। নূর ভাই, শামীম ভাই ও আমার জায়গা হলো নিচ তলার একটি রুমে। 

থামেলের একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘মম’তে আজকের দুপুরের খাবার খাচ্ছি। নেপালের জনপ্রিয় খাবার মম এই প্রথম খাচ্ছি। মম দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের পুলি পিঠার মতো। ভেতরে মাংস থাকে। খেতে অনেক সুস্বাদু। খাবার শেষ করে আমাদের পর্বতারোহণের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র  কেনাকাটা করতে একটি দোকানে এলাম। এই এক দোকান থেকেই আমাদের প্রায় অর্ধেক জিনিস কিনে ফেললাম। কেনাকাটা করতে করতে প্রায় নয়টা বেজে গেলো। 

রাতের খাবার, আনাতলিয়া, থামেল  রাতের খাবার, আনাতলিয়া, থামেল

আনাতলিয়া রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেতে গেলাম। এখানে নান রুটি, তন্দুরী চিকেন ও খাসির মাংস দিয়ে রাতের খাবার সেরে নিলাম। 

হোটেলে ফিরে সবাই ফ্রেশ হয়ে হোটেলের ছাদে চলে এলাম। আকাশে পূর্ণচাঁদ। চাঁদের আলোয় থামেল এক স্বর্গিয় রূপ পেয়েছে। সারা রাত কেটে যাবে তবু যেন রাতের সৌন্দর্য দেখা শেষ হবে না। গান গেয়ে, গান শুনে, অনেক হাসাহাসি করে, চন্দ্রবিলাস করে, গল্প করে সময় কাটিয়ে দিলাম। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সবাই সবার রুমে চলে এলাম। প্রত্যেক রুমেই ফ্রিজ, টিভি, সোফা, টেলিফোন ও আলমারি আছে। এসিও আছে। তবে শীতের কারণে তা আর চালু করতে হল না।

অসনবাজার, থামেল অসনবাজার, থামেল

২৮ অক্টোবর। থামেল 
ভোর ৬টা। মুহিত ভাইর কথা মতো সবাই ঘুম থেকে উঠে হোটেলের রিসিপশনে চলে এলাম। সকালের শীতল আবহাওয়ায় থামেলের রাস্তায় হেঁটে চলছি। উদ্দেশ্য অসনবাজার। সেখানে আমরা চা খাবো। থামেলের রাস্তা ও গলি পথে নানান ধরনের মানুষ হাঁটছে। অসনবাজার ছোট একটি বাজার। সকালে আশপাশের মানুষজন কেনাকাটা করে। আমরা সেখানে গাভীর দুধের চা খেলাম। দু’জন নারী সেই চা বিক্রি করছে। 

অসনবাজার, থামেলঅসনবাজার, থামেল

আমরা ঘুরে বাজারটি দেখছি। বাজারে একটি জিনিস বেশি চোখে পড়ল। তা হলো মাসরুম। ছোট বড় নানান ধরনের মাসরুম। ফুলও বিক্রি হচ্ছে বেশ। মন্দিরে মন্দিরে পুজো হচ্ছে। এই অসনবাজার থেকে আমরা পাকা পেঁপে, পেয়ারা কিনে নিলাম। থামেলের পথে হাঁটার সময় চোখে পড়লো ভূমিকম্পের রেখে যাওয়া স্মৃতি। পুরোনো দালানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই দালানগুলোও বয়সের ভারে দাঁড়িয়ে থাকার অক্ষমতা প্রকাশ করছে। 


হোটেলের সামনে বাগানের ভেতরে টেবিল চেয়ার রাখা আছে। সেখানে আমাদের সকালের খাবার দেয়া হয়েছে। খাবারের শেষে পেঁপে ও পেয়ারাও খেলাম। তারপর সবাই কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে গোসল করে আবার বেরিয়ে পরলাম কেনাকাটা করতে। পর্বতারোহণ সংশ্লিষ্ট বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নর্থ ফেসের শো-রুমটি আমাদের হোটেলের কাছেই। সেখানেই প্রথম এলাম। নর্থ ফেস, মাউন্টেন হার্ডওয়্যার ও অন্যান্য বেশ কিছু শো-রুম ঘুরে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করলাম। দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে। আনাতলিয়াতেই খাবার সেরে নিলাম। তারপর আবার কেনাকাটা। এভাবেই কেনাকাটা করেই দিন ফুরিয়ে গেলো। 


রাত ৮টা। আমরা লোটাস নামের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেতে এলাম। এখানে আমাদের সাথে যোগ দিলেন নিশু (নিশত মজুমদার) আপু ও সাদিয়া আপু (সাদিয়া চৌধুরী)। নিশু আপু হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী এভারেস্টার। তারা আমাদের আগেই নেপালে এসেছেন। মাউন্ট পিসাং (৬০৯১ মি.) নামের একটি পর্বত অভিযানে। নিশু আপুর এটি একটি সফল অভিযান। আমরা নিশু আপুদের অভিযানের গল্প শুনলাম আর রাতের খাবার সেরে নিলাম। খাবার শেষে আমরা সবাই নিশু আপুদের হোটেলে এলাম। তারা থামেল হোটেলে উঠেছেন। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আমাদের হোটেলে চলে এলাম। 


আমাদের সাথে অবশ্য নিশু আপুরাও আমাদের হোটেলে এসেছেন। রাত প্রায় ১১টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে নিশু আপু ও সাদিয়া আপু চলে গেলেন। নূর ভাই, বিপ্লব ভাই, শামীম ভাই, রিনি আপু ও আমি তাদের হোটেল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। 

(চলবে)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (১ম কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)