মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (উচ্চতা ৬১৮৬ মি./ ২০২৯৫ ফুট)
মাউন্ট কেয়াজো-রি নামচে বাজারের দক্ষিনে সলো খুম্বু অঞ্চলে হিমালয়ের সারিবদ্ধ পর্বতমালা চলে গেছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের চৌ উ পর্যন্ত। পশ্চিমে থামে ভ্যালী আর পূবে গোকো ভ্যালী রেখে দক্ষিন রিজের সবচেয়ে উঁচু শীর্ষবিন্দুটিই হচ্ছে মাউন্ড কেয়াজু-রি। ৬,১৮৬ মিটার/ ২০,২৯৫ ফুট। পর্বতটি বেশ আকর্ষণীয়, খাড়া চূড়া। যেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে পর্বতারোহীদের সামনে দিগন্ত জুড়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে। এর সামিট থেকে হিমালয়ের দীর্ঘ পর্বতমালার দারুণ দৃশ্য নজরে আসে।

মাউন্ট কেয়াজো-রি মাউন্ট কেয়াজো-রি

দেখা যায় ৮০০০-মিটার গ্রুপের অনেকগুলো পর্বতচূড়া। খুব বেশি পর্বতারোহীরা এখনো এখানে ভিড় করেনি। ফলে যারা এই পর্বত সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তারা পর্বতের সেই কাঙ্খিত নিস্তব্ধতা উপভোগ করার দারুণ সুযোগ পেয়ে যান। নিঃসঙ্গ বিশাল বিস্তৃত ভ্যালীতে অপূর্ব সুন্দর এর বেসক্যাম্প। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও পর্বতারোহীদের টেকনিক্যাল দক্ষতা কতটা সেটা ভালোই পরখ করে নেয় মাউন্ট কেয়াজু-রি। নেপাল পর্যটন মন্ত্রনালয় ২০০২ সালে মাউন্ট কেয়াজু-রিকে পর্বতারোহীদের আরহণের জন্য খুলে দেয়। সেই বছরই একটি ফ্রাঙ্কো-বৃটিশ টিম প্রথম মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট করে। তারা মাচ্ছেরমো হয়ে এগিয়ে গিয়ে কেয়াজো গ্লেসিয়ার ট্রাভার্স করে দক্ষিন-পশ্চিম রিজ ধরে সামিট করে। এরপর ফ্রান্স, আমেরিকা, ডাচ, অস্ট্রেলিয়া নানা দেশের পর্বতারোহীরা মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট করেছেন। আর বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বারের প্রচেস্টায় প্রথম সামিট সম্পন্ন হলো ২০১৫ সালে।

টাইম লাইন:
১ম দিন-২৭/১০/১৫- আকাশ পথে ঢাকা থেকে নেপাল। থামেলে অ্যাকোমোডেশন।
২য় দিন- ২৮/১০/১৫- থামেল। পর্বতারোহণের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা। 
৩য় দিন- ২৯/১০/১৫- থামেল। পর্বতারোহণের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা। 
৪র্থ দিন- ৩০/১০/১৫- আকাশ পথে থামেল থেকে লুকলা। লুকলা থেকে ট্রেকিং শুরু। মনজো রাত্রিবাস।
৫ম দিন- ৩১/১০/১৫- মনজো থেকে নামচে বাজার। 
৬ষ্ঠ দিন- ০১/১১/১৫- নামচে বাজার থেকে খুমজুং গ্রাম হাইকিং এবং নামচে বাজার ফিরে আসা।
৭ম দিন- ০২/১১/১৫- নামচেবাজার থেকে মেনদে। 
৮ম দিন- ০৩/১১/১৫- এক্লামাটাইজের জন্য হাইকিং এবং মেনদে রাত্রিবাস।
৯ম দিন- ০৪/১১/১৫- মেনদে থেকে বেসক্যাম্প।
১০ম দিন- ০৫/১১/১৫- এক্লামাটাইজের জন্য হাইকিং এবং বেসক্যাম্প রাত্রিবাস।
১১তম দিন-০৬/১১/১৫- বেসক্যাম্প থেকে হাইক্যাম্প।
১২তম দিন- ০৭/১১/১৫- রাত ১ টার সময় সামিটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। সকাল ১১.২৯ মি. মাউন্ট কেয়াজো-রি সামিট। সন্ধ্যায় হাইক্যাম্পে ফিরে আসা। 
১৩তম দিন- ০৮/১১/১৫- হাইক্যাম্প থেকে বেসক্যাম্পে নেমে আসা।
১৪তম দিন- ০৯/১১/১৫- বেসক্যাম্প থেকে মেনদে।
১৫তম দিন- ১০/১১/১৫- মেনদে থেকে নামচে বাজার। 
১৬তম তিন- ১১/১১/১৫- নামচে বাজার থেকে ফাকদিন।
১৭তম দিন- ১২/১১/১৫- ফাকদিন থেকে লুকলা।
১৮তম দিন- ১৩/১১/১৫- আকাশ পথে লুকলা থেকে থামেল।
১৯তম দিন- ১৪/১১/১৫- থামেল থেকে ঢাকা।

২৭ অক্টোবর। ফ্লাই
রাতে তেমন ঘুম হ’ল না। ঘুম হবেই বা কেন? জীবনের প্রথমবারের মতো আকাশ পথ বিমানে পাড়ি দেবো। তারচেয়েও বড় কথা প্রথমবারের মতো পর্বতারোহণে যাচ্ছি। স্বপ্নের পথে পা ফেলে হাঁটবো। কত-শত ভাবনা মাথায় ভনভন করে ঘুরছে ? মনে মনে সময় কাউন্ট-ডাউন করছি। রাতের অন্ধকার কেটে যেন ভোর হতেই চাচ্ছে না। বিছানা থেকে উঠে ব্যাগ গুছানো ঠিক আছে কিনা তা দেখছি বারবার। কোনো কিছু নিতে ভুলে গেলাম কিনা তাও দেখছি বারবার। তবু রাত শেষ হচ্ছে না। অপেক্ষার যন্ত্রণা শেষ করে একসময় পুবের আকাশে সূর্য তার অস্তি¡ত জানান দিলো। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করলাম। গোসল সেরে রেডি হয়ে বসে আছি যাওয়ার অপেক্ষায়। আখতার ভাই আমার সাথে ইনাম স্যারের বাসা ও বিমান বন্দর পর্যন্ত যাবেন। তাই আখতার ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি ৮ টার সময় বসুন্ধরা গেটে এসে আমাকে ফোন দিয়ে নিয়ে যাবেন। এখন আখতার ভাইর অপেক্ষায় বসে আছি। আমার রুমমেট আজিজ ভাই মুরগির মাংস রান্না করেছেন। পর্বতারোহণে যাচ্ছি তাই একটু ভালো খাবারের আয়োজন করেছেন তিনি। মুরগির মাংস দিয়েই সকালে পেট পুজো করে নিলাম। আখতার ভাইর ফোন। দৌড়ে চলে এলাম বসুন্ধরার গেইটে। সাথে আজিজ ভাই বিদায় জানাতে এসেছেন। আখতার ভাইর সাথে মোটর বাইকে করে ইনাম স্যারের বাসায় চলে এলাম নয়টা বাজার কয়েক মিনিট আগেই। কলিং বেল চাপার সাথে সাথে তারেক অণু ভাই দরজা খুলে দিলেন। আমরাই সবার আগে এসেছি। তারপর একে একে সবাই এলেন। দলনেতা দু’বার এভারেস্ট জয়ী এম এ মুহিত ভাইর নেতৃত্বে এক্সপিডেশন টিমে নূর মোহাম্মদ, কাজী বাহ্লুল মজনু বিপ্লব, শামীম তালুকদার ও আমি আছি। আররিনি আহম্মেদ ও  ছায়াবিথী পারভীন যাচ্ছে কেয়াজো-রি বেস ক্যাম্প পর্যন্ত। এই মোট সাত জন। বাংলাদেশে পর্বতারোহণের পথিকৃৎ এবং বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) এর প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক স্যারসহ উপস্থিত আরো অনেক শুভাকাঙ্খীর শুভকামনা নিয়ে সাড়ে দশটার দিকে আমরা বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। 


আমাদের এই টিমের সবার সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু জানাই আপনাদের। 

এমএ মুহিত   (দলনেতা) এমএ মুহিত (দলনেতা)

এম এ মুহিত তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র বাঙ্গালী যিনি দু’বার মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন। আট হাজার মিটারের তিনটি পর্বত চার বার এবং ছয় হাজার মিটারের বেশ কয়েকটি পর্বত জয় করেছেন। তিনিই দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। 

নূর মোহাম্মদনূর মোহাম্মদ

শামীম তালুকদারশামীম তালুকদার

কাজী বাহলুল মজনু বিপ্লবকাজী বাহলুল মজনু বিপ্লব

নূর মোহাম্মদ ও কাজী বাহ্লুল মজনু বিপ্লব তারা দু’জনই দেশের প্রথম সারির অভিজ্ঞ পর্বতারোহী। তারা বেশ কয়েকটি ছ’হাজার মিটারের পর্বত আরোহণ করেছেন।  
শামীম তালুকদার ২০১৪ সালের কেয়াজো-রি এক্সপিডিশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেবার খারাপ আবহাওয়ার কারণে ব্যর্থ হয়ে পুরো টিম ফেরৎ আসে। 
আর আমার এটাই প্রথম এক্সপিডিশন। আমি এক বছর আগে ভারতের নেহরু ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং (নিম) থেকে পর্বতারোহনের উপর বেসিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছি। 

শায়লা পারভীন বিথীশায়লা পারভীন বিথী

ফৌজিয়া আহাম্মেদ রিনি   ফৌজিয়া আহাম্মেদ রিনি

কিলি পেম্বা শেরপাকিলি পেম্বা শেরপা

দাকিপা শেরপা     দাকিপা শেরপা

রিনি আহম্মেদ রিনি ও ছায়াবিথী পারভীন ছায়াবীথি দুজনেই উৎসাহ উদ্দীপনায় টইটুম্বর। যদিও তারা পর্বতারোহণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। কিন্তু বিএমটিসি ক্লাবের নানা কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন। পাহাড়-পর্বতে যাওয়ার নাম শুনলেই তারা একপায়ে খাড়া। এটাই হবে তাদের প্রথম হাই অলটিচিউড ট্রেকিং। 


সোয় এগারটার মধ্যে আমরা বিমান বন্দরে পৌঁছালাম। ভেতরে ঢুকে আমরা ইমিগ্রেশন সেরে অপেক্ষা করছি।

(চলবে...)

 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (২য় কিস্তি)

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে বাংলাদেশ (৩য় কিস্তি)