সাপ একটি সরিসৃপ প্রাণী। এরা খুবই বিষাক্ত হয়ে থাকে। সাপ বিষধরদের জন্য বিখ্যাত হলেও সাপ প্রকৃতপক্ষে মানুষ শিকার করে না এবং সাপকে কোনো কারণে উত্তেজিত করা না হলে বা সাপ আঘাতগ্রস্থ না হলে তারা মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। কিছু মারাত্মক বিষধর সাপের বিষ মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুকি বা মৃত্যুর কারণ ঘটায়।অনেক সময় সাপের বিষ মানুষের উপকারে আসে।যা বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সকল মহাদেশেই সাপের উপস্থিতি দেখা যায়। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপের তালিকা সংগ্রহ করেছি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

 কিং কোবরা বা শঙ্খচূড় বা রাজ গোখরা 

dailyforest.comdailyforest.com

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে আতঙ্কগুলোর মধ্যে একটি হলো সাপ। এর মধ্যে কিং কোবরা অন্যতম। এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিষধর সাপ। এটি ভারত এবং সমগ্র এশিয়ার জঙ্গলে বেশি পরিমাণে দেখা যায়। এটি ঘন জঙ্গল ও উঁচুভূমিতে বিশেষ করে হ্রদ ও স্রোতস্বিনী পরিবেশে থাকতে বেশি পছন্দ করে। এই সাপের বিষ মূলত নিউরোটক্সিক এবং এতো পরিমাণে থাকে যে একটি হাতি হত্যা করার জন্য যথেষ্ট। অর্থাৎ এটির বিষ আক্রান্ত প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। এর কামড়ের ফলে সৃষ্ট মৃত্যু হার প্রায় ৭৫%।

ডেথ এডার

dailyforest.comdailyforest.com

ডেথ এডার নামক সাপটি তার নামের মতোই মারাত্মক। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউগিনির সবচেয়ে বিষাক্ত সাপের মধ্যে একটি, সেইসাথে পৃথিবীর যেকোন বিষাক্ত সাপের মধ্যে অন্যতম। এরা অতিদ্রুত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কামড় দিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। এক ছোবলে এই সাপ ৪০-১০০ মিলিগ্রামের মতো বিষ ঢালতে পারে এবং এর কারণে মানব দেহ প্যারালাইসিস হতে পারে অথবা মানুষের শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে সর্বোচ্চ ছয় ঘন্টার মধ্যে মারা যেতে পারে।

 কালো মাম্বা বা ব্ল্যাক মাম্বা

dailyforest.comdailyforest.com

এটি আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর সাপ। আফ্রিকার একটি বড় অঞ্চলজুড়ে এই সাপের বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যায়। এই সাপের বিষ মূলত নিউরোটক্সিন যা সরাসরি শিকারের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর আঘাত করে। এরা একবার ছোবল মেরেই ক্ষান্ত হয়না বরং শত্রুকে ঘায়েল করতে বার বার ছোবল মেরে বিষ ঢেলে দেয়। এই নিরবচ্ছিন্ন ছোবলের কারণে পনের মিনিট বা তার কম সময়ের মধ্যে মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।

কালো ডোরাকাটা সামুদ্রিক ক্রেইট

dailyforest.comdailyforest.com

ভূমিতে থাকা সাপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী বিষাক্ত এই সাপ। বিশ্বের সবচেয়ে বিষধর সাপের কয়েকটি পানিতে বাস করে। কালো ডোরাকাটা সামুদ্রিক ক্রেইট পশ্চিম প্রশান্ত মহাসগরের উষ্ণ জলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। এরা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই সাপটি কোবরার চেয়ে দশগুণ মারাত্মক। সৌভাগ্যবশত, এরা মানুষকে ভয় পায় এবং আপনি এদেরকে আক্রমণ না করলে তারা দংশন করে না।   

ইন্ডিয়ান কোবরা

dailyforest.comdailyforest.com

ইন্ডিয়ান কোবরা ভারতে বসবাসকারী চতুর্থ বিষাক্ত সাপের মধ্যে একটি। সমগ্র ভারত এলাকায় মানুষকে সাপে দংশনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি মনে করা হয়। এরা সাংস্কৃতিকভাবে সুপরিচিত- বিশেষ করে পশ্চিমে, সম্ভবত সাপুড়ের কবজের জন্য বিখ্যাত। একটি ইন্ডিয়ান কোবরার এক ছোবলে গুরুতর ব্যাপার ঘটতে পারে। এর কারণে মানব দেহ প্যারালাইসিস হতে পারে অথবা মানুষের শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি হার্ট অ্যাটাকেরও কারণ হতে পারে।

 শ্য স্কেলড ভাইপার

dailyforest.comdailyforest.com

এই সুন্দর বিষধর সাপটি ভারত, চীন এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বেশী দেখতে পাওয়া যায়। এরা খুব দ্রুত আক্রমণ করে এবং প্রধানত রাতের বেলা শিকারে বের হয়। এই সাপের ছোবলে প্রচন্ড ব্যথা হয়, রক্ত জমাট বেঁধে যায়। পড়ে শ্বাসকষ্টের সাথে প্যারালাইসিস দেখা দেয় এবং হৃদস্পন্দন আস্তে আস্তে কমে যায়। যদি কোন চিকিৎসা করানো না হয় তাহলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুও হতে পারে।

সাধারণ ক্রেইট

dailyforest.comdailyforest.com

সাধারণ ক্রেইট ভারতে বসবাসকারী চতুর্থ বিষাক্ত সাপের মধ্যে একটি। এটি অত্যন্ত বিষাক্ত এবং পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এই সাপটি দিনে দেখা যায় না কিন্তু রাতে খুব দ্রুত এবং আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। এরা বেশিভাগই যেগুলো চলাচল করে এমন কিছুতে দংশন করে। এই সাপ দ্বারা দংশিত হওয়ার পর চিকিৎসা না করালে প্যারালাইসিস, স্নায়ু ক্ষতি এমনকি মস্তিষ্কেরও ক্ষতি হতে পারে।

ইনল্যান্ড তাইপান

dailyforest.comdailyforest.com

ইনল্যান্ড তাইপান সবচেয়ে বেশী বিষাক্ত এবং সবচেয়ে ভয়ংকর প্রজাতির সাপ। এই সাপের বিষ নিউরোটক্সিন এবং টাইপক্সিনের সংমিশ্রণ। এই বিষ মাংস পেশীকে প্যারালাইসড করে, শ্বাস নিতে বাঁধা প্রদান করে, রক্ত নালীতে রক্তক্ষরণ ঘটায় এবং টিস্যু ও মাংস পেশীর ক্ষতি করে। এই সাপের এক ছোবলে কয়েক মিলিগ্রাম বিষই ১০০ জন লোক বা প্রায় ২.৫ লক্ষ ইঁদুর মারার জন্য যথেষ্ট। এই সাপকে কোন কারণে বিরক্ত করা হলে শিকার জায়গা থেকে নড়ার আগেই এটি প্রচন্ড বেগে কয়েক বার ছোবল দিয়ে দিতে পারে।

রাসেলস ভাইপার

dailyforest.comdailyforest.com

রাসেলস ভাইপার সাপটি ‘ডাবোয়া’ নামে পরিচিত। এটিও ভারতে বসবাসকারী চতুর্থ বিষাক্ত সাপের মধ্যে একটি। এই সাপটি খুবই আক্রমণাত্মক প্রকৃতির এবং সম্ভবত অন্য কোন বিষাক্ত সাপের তুলনায় এ সাপই মানুষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। এরা ঘনবসতি এলাকা থেকে শুরু করে গভীর বন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করে।

এথেরিস হিসপিডা

dailyforest.comdailyforest.com

এই সাপটি দেখতে সুন্দর সেইসাথে খুবই বিষাক্ত। এটি সাধারণত আফ্রিকান রেইনফরেস্টের কেন্দ্রে দেখতে পাওয়া যায়। রেইনফরেস্ট অবশ্য কোন ফুটফুটে কোমল প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত নয়। এথেরিস হিসপিডাও এর ব্যতিক্রম নয়।

ভয়ংকর বিষধর এই সাপটির বিষের কোন প্রতিষেধক আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

বিষধর সাপ দংশনের লক্ষণঃ

বমি, মাথাঘোরা, কামড়ানোর স্থানে ফোলা, রক্তচাপ কমে যাওয়া, চোখে ডাবল দেখা, ঘাড়ের মাংসপেশী অবশ হয়ে ঘাড় পেছনের দিকে হেলে পড়া। 

বিষধর সাপ দংশনে করণীয়ঃ

 হাত বা পায়ে কামড় দিলে হাতের পেছনের দিকে কাঠ বা বাঁশের চটা বা শক্ত জাতীয় কিছু জিনিস রেখে শাড়ির পাড় বা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে স্প্লিন্ট তৈরি করে বেঁধে দিতে হবে।

আক্রান্ত জায়গা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে। লক্ষ রাখবেন বেশি টাইট করে বাঁধা যাবে না। বাঁধলে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়ে গ্যাংগ্রিন হতে পারে। বিষ শিরা দিয়ে নয়, লসিকাগ্রন্থি দিয়ে শরীরে ছড়ায়।

আক্রান্ত জায়গায় কাচা ডিম, চুন, গোবর কিছুই লাগাবেন না। এতে সেল্যুলাইটিস বা ইনফেকশন হয়ে রোগীর জীবনহানি ঘটতে পারে।

সাপে কাটা রোগীকে ওঝা-বৈদ্য বা কবিরাজ না দেখিয়ে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেয়ার আগে আক্রান্ত জায়গা নাড়াচাড়া করা যাবে না।  

বিষাক্ত সাপের কামড় থেকে রক্ষা পেতে করণীয়ঃ

বড় ঝোপ, ঘাস, পাথর বা বড় গাছের পাশে ঘুমানো উচিৎ নয়। কারণ এসব জায়গায় সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে।

স্লিপিং ব্যাগ অন্ধকারে না রেখে বাতাসযুক্ত খোলা জায়গায় রাখা উচিৎ। মশারি শক্তভাবে বেঁধে ব্যাগের নিচে চাপা দিয়ে রাখতে হবে।

অন্ধকার জায়গা, পাথরের ফাঁকা জায়গা বা গাছের ছিদ্র পরীক্ষা না করে হাত দেওয়া উচিৎ নয়।

নিচের দিকে লক্ষ্য না করে কোন বড় ঝোপ বা ঘাসের মধ্য দিয়ে হাঁটা উচিৎ নয়।

ফেলে রাখা কোন গাছের অপর পাশে নজর না দিয়ে পা রাখা উচিৎ নয়। কারণ   অপর পাশে ছায়ায় কোন সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে।

বিষাক্ত নয় এটা নিশ্চিত না হয়ে কোন সাপ ধরা উচিৎ নয়।

কখনো কোন বিষাক্ত সাপ দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে কোন নড়াচড়া বা শব্দ করা উচিৎ নয় এবং এটিকে তার পথে চলে যেতে কোন বাঁধা দেয়া উচিৎ নয়।

সবসময় বনেজঙ্গলে ঘুরার সময় শক্ত এবং উচু বুট পরা উচিৎ যা সাপের কামড় হতে আপনাকে রক্ষা করবে।

কোথাও বেড়াতে গেলে আগে ঐ এলাকায় হাসপাতাল কোথায় তা জেনে রাখা উচিৎ।

চলবে..................

পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত সাপের বাকী তথ্য সম্পর্কে জানার জন্য পরবর্তী পর্বে চোখ রাখুন!

দ্য ব্রোফ্যাশনাল এবং ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।