চা বাগান- পাহাড় - ঝর্না এই তিনের অপূর্ণ মিশেল চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। বাংলাদেশের চা- শ্রমিকদের উপর একটি গবেষণার অংশ হিসেবে গত এক মাস যাবত ফটিকছড়ির সবকটি চা বাগানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। যারা অল্প সময়ে চা বাগান এবং এর আশেপাশের পাহাড়ের বুনো সৌন্দর্য একসাথে উপভোগ করতে চান তাদের জন্য এই উপজেলাটি আদর্শ।

এখানকার ১৮ টি চা বাগানের সবকটি যেমন সমান সুন্দর নয়, একিভাবে নিরাপদ ও নয়। আর যে বাগানেই যান না কেনো বাগানের গেইট থেকে অনুমতি নিয়ে যাবেন, প্রয়োজনে অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে আসবেন। সৌন্দর্য এবং নিরাপত্তার বিষয়কে মাথায় রেখে কয়েকটি চা বাগানের বিস্তারিত র‍্যুট দেয়া হলো:

১. কর্ণফুলী চা বাগান:

৬৫৬৪ একরের এই চা বাগান এই অঞ্চলের সবচেয়ে বৃহত্তম।

যেভাবে যাবেন: চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে খাগড়াছড়ি, হেয়াকো বা ফটিকছড়িগামী যেকোনো বাসে উঠে ফটিকছড়ির বিবিরহাট বাস স্ট্যান্ডে নামুন। ভাড়া জনপ্রতি ৪০/- টাকা। যাত্রীছাউনির ডান দিকের রোড ধরে হেটে সামনে যেতে থাকুন। একটু সামনে সিএনজি পাবেন, জনপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা, রিজার্ভ নিলে ১৫০ টাকা।

২. হালদাভ্যালী চা বাগান:

এটা আমার দৃষ্টিতে এই অঞ্চলের সবচাইতে সুন্দর এবং গোছালো চা বাগান। বিভিন্ন নাটক সিনেমার শুটিং ও হয় শুনেছি এ বাগানে।

যেভাবে যাবেন: অক্সিজেন মোড় থেকে হেয়াকোগামী যেকোনো বাসে উঠে পড়ুন, হেল্পারকে বলুন নারায়ণহাটের 'টেগোর দোয়ান' নামবেন, নামিয়ে দিবে। ভাড়া জনপ্রতি ৭০/- টাকা। নেমে হাতের বা পাশে সিএনজি পাবেন। ভাড়া জনপ্রতি ২৫/৩০ টাকা। আসার পথে সিএনজি নাও পেতে পারেন, সেক্ষেত্রে রিজার্ভ নিতে পারেন।

৩. কৈয়াছড়া চা বাগান:

এ বাগানের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এর সাথে কথা বলে জেনেছি, এ বাগানেই নাকি দেশের সবচেয়ে মানসম্মত চা তৈরি হয়। চা এর কোয়ালিটি নিয়ে দেশের বাগানগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা হয় সেখানে নাকি প্রতিবছরই ১/২ স্থানে এ বাগান থাকে। বাগানে ঢুকবার আগেই হালদা নদী এবং রাবারড্যাম দেখতে পাবেন। সবমিলিয়ে দারুন।

আর হ্যা পাশেই 'আছিয়া চা বাগান' নামে আরেকটি বাগান আছে।। দেখে আসতে পারেন। অক্সিজেন মোড় থেকে হেয়াকোগামী বাসে উঠে হেল্পারকে বলে রাখুন কাজিরহাট বাজার নামবেন। ভাড়া ৫০/৫৫ টাকা নিবে। সেখান থেকে রাবারড্যাম গামী সিএনজি কোথেকে ছাড়ে জিজ্ঞেস করুন, দেখিয়ে দিবে। ভাড়া ১০/- টাকা। রাবারড্যাম নামলে সামনেই চা বাগান।

৪. রাঙাপানি চা বাগান:

এ বাগানে গিয়ে আপনি এক ঢিলে ৩ পাখি মারতে পারবেন। চা বাগানেও ঘুরতে পারবেন, ফরেস্ট অফিসের ট্রি এক্টিভিটি করতে পারবেন, যেটি বাংলাদেশে এর বাইরে আর হবিগঞ্জ জেলায় পাবেন, এবং হাজারিখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হয়ে ঝর্ণা থেকেও ট্রেকিং করে আসতে পারবেন। তাছাড়া এই স্পটটি ইদানীং খুবই জনপ্রিয় হওয়ায় নারীদের জন্যও নিরাপদ। হাজারিখিল অভয়ারণ্য হয়ে ২/৩ টি ঝর্নার ট্রেইল পাবেন, গাইড কে বললে তারা নিয়ে যাবে, দূরত্ব হিসেবে তাদের ফি নির্ভর করে। তাছাড়া একটি ট্রেইল ধরে ৭/৮ ঘন্টায় একদম মিরসরাই পর্যন্ত যাওয়া যায়।

যেভাবে যাবেন:

প্রথমে অক্সিজেন থেকে ফটিকছড়িগামী বাসে বিবিরহাট বাস স্ট্যান্ড এ নামুন। রাস্তার বা পাশে থাকা যেকোনো সিএনজি কে বললেই হবে যে হাজারিখিল যাবেন। হাজারিখিল বাজারে নামলে ভাড়া জনপ্রতি ৩৫/- টাকা আর যদি ফরেস্ট অফিসে নামেন তাহলে ৪০/- টাকা। ফরেস্ট অফিসে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ট্রি এক্টিভিটি করার জায়গা দেখিয়ে দিবে। ৫ স্টেপ এর এই চ্যালেঞ্জ এর জন্য জনপ্রতি ফি ১০০/- টাকা।

সেখান থেকে চলে আসুন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, এখানে একটি খাবারের হোটেল আছে, তারাই ট্রেকিং এর জন্য গাইড ভাড়া দেয়, গাইড ফি ৫০০/- টাকা। এছাড়া এখানেই খাবারের অর্ডার করে রাখতে পারেন।। ফেরার সময় হাজারিখিল বাজার পর্যন্ত চা বাগান উপভোগ করতে করতে হেটে আসুন, বাজার থেকে বিবিরহাট পর্যন্ত সিএনজি করে চলে আসুন। সেখান থেকে বাসে করে অক্সিজেন।।

৫. রামগড় চা বাগান:

এই চা বাগানটি অক্সিজেন থেকে গেলে যথেষ্ট দূরে। খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা ঘেঁষা এ চা বাগানে গিয়েও আপনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবেন। চা বাগানেও ঘুরতে পারবেন, রামগড় উপজেলার দর্শনীয় স্থানগুলোও ঘুরতে পারবেন। তাছাড়া ভারত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ফেণী নদীর পাড়েও ঘুরতে পারবেন।

অক্সিজেন থেকে হেয়াকোগামী বাসে উঠে হেয়াকো নামবেন। ভাড়া ৮০/- টাকা, সময় লাগতে পারে ৪.৫ /৫.০০ ঘন্টা। এর বেশিও লাগতে পারে। সেখান থেকে রামগড় যাওয়ার সিএনজি তে উঠুন, ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। ড্রাইভার কে বলুন রামগড় চা বাগানে নামিয়ে দিতে।

এ বাগানের সাথেই আধারমানিক নামে আরেকটি বাগান আছে, তবে রাস্তা যথেষ্ট দূর্গম এবং তেমন ঘুরবার উপর্যুক্ত না। রামগড় চা বাগান ঘুরে বাগানের একটু সামনে বাগানবাজার গিয়ে সেখান থেকে সিএনজিতে ১০/- টাকায় রামগড় উপজেলার বাস স্ট্যান্ডে চলে যান।

রামগড় লেক, ঝুলন্ত ব্রিজ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি সব শহরের কাছেই। ঘুরে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে বাস স্ট্যান্ড থেকে সিএনজি করে পুনরায় হেয়াকো হয়ে অক্সিজেন ফিরতে পারেন অথবা সরাসরি সিএনজি করে মিরসরাই এর বারৈয়ারহাট পর্যন্ত চলে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ১০০/১২০ টাকা।

 

বলে রাখা ভালো, পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুন্দরতম ৫ টি রোডের মধ্যে রামগড় থেকে বারৈয়ারহাট পর্যন্ত রোডটি থাকবে। প্রায় ৪০ কি.মি. লম্বা এই রোডটি সাইক্লিস্ট বা বাইকারদের জন্যও হতে পারে আদর্শ। বারৈয়ারহাট এসে সেখান থেকে 'চয়েস' এর কাউন্টার থেকে টিকেট কেটে এই বাসে করে অলংকার চলে আসুন। ভাড়া ৮০/- টাকা। চাইলে অলংকার বা এ.কে খান থেকেও এ পথে আপনি রামগড় যেতে পারেন। এতে সময় বাঁঁচবে।

৬. পঞ্চবটী চা বাগান:

অক্সিজেন মোড় থেকে ফটিকছড়িগামী যেকোনো বাসে উঠে পড়ুন। ফটিকছড়ির বিবিরহাট বাস স্ট্যান্ডে নেমে সিএনজি পাবেন। পঞ্চবটী বাগানে যাবেন বললেই হবে।ভাড়া জনপ্রতি ৪০/৫০ টাকা। আসার পথে সিএনজি নাও পেতে পারেন তাই ৪/৫ জন হলে রিজার্ভ নিয়ে নিন। ৩৫০/৪০০ টাকা নিবে। বাগানটি ছোট কিন্তু সুন্দর।

৭। বারমাসিয়া ও এলাহি নূর চা বাগান:

অক্সিজেন থেকে বাসে করে একই ভাবে বিবিরহাট নেমে এরপর সিএনজি ড্রাইভার কে বারমাসিয়া চা বাগান যাবেন বললেই হবে। অথবা নাজিরহাট বাজার হয়েও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে বাসে ঝংকার মোড় নামবেন, সেখান থেকে নাজিরহাট বাজার।

নাজিরহাট বাজার থেকে সিএনজি করে বারমাসিয়া চা বাগান। ভাড়া নিবে ৪০/৫০ টাকা। এ বাগানের সাথেই এলাহি নূর চা বাগান একদম লাগোয়া। বাগানের একদম ভেতর দিকে চলে যান এবং দুটি বাগানই দেখে আসুন, এলাহি নূর বাগানের মাঝ দিয়ে একটি ছড়া চলে গেছে, তাছাড়া সুন্দর জলাশয় ও আছে। সুন্দর এ বাগানটিও। 

৮। উদালিয়া চা বাগান:

দূরত্ব হিসেবে চট্টগ্রাম শহর থেকে সবচেয়ে কাছের বাগান এটি। এবং যথেষ্ট সুন্দর ও। অক্সিজেন থেকে ফটিকছড়ি গামী বাসে যাওয়ার সময় হেল্পারকে বলে রাখবেন 'নূর আলী মিয়ার হাটে' নামিয়ে দেয়ার জন্য। রাস্তার বা পাশ হতে সিএনজি তে করে চলে যান উদালিয়া চা বাগানে। ভাড়া জনপ্রতি ২০/- টাকা। আসার পথেও একইভাবে ফিরে আসুন।

বি.দ্র: চা বাগানের শ্রমিকদের ঘামেই বাংলাদেশের চা শিল্প দাঁড়িয়ে। তাদের ভাষা, ধর্ম, জাতীয়তা বা জীবনাচরণ আপনার সাথে হয়তো মিলবে না। কিন্তু এজন্য তাদেরকে বা তাদের সংস্কৃতিকে অসম্মান করবেন না। অবশ্যই অনুমতি নিয়ে ছবি তুলবেন, যদিও বেশিরভাগ বাগানেই তাদের ছবি তোলা নিষেধ।

এবং অবশ্যই বাগানের পরিবেশকে নোংরা করবেন না, যত্রতত্র ময়লা এবং প্লাস্টিক দ্রব্য ফেলবেন না।