লেখা ও ছবি- অপু চন্দ্র দাস 

সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের অবস্থান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত । ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের বলে ২৪৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে "সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান" প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই উদ্যানে সাতটি পাহাড়ি ছড়া আছে, সেই থেকে এর নামকরণ সাতছড়ি (অর্থ: সাতটি ছড়াবিশিষ্ট) উল্লেখ্য সাতছড়ির আগের নাম ছিলো “রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট” ।


এটি এমন একটা যায়গা যেখানে গহীন বনের ছোঁয়া একবিন্দু হলেও পাওয়া যাবে । প্রথমবার গিয়ে থাকলে আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এই যায়গাটি আপনার কাছে যেমন রোমাঞ্চকর লাগবে, পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমী হলে অন্যরকম আনন্দ অনুভূত হবে । 


আসুন এবার আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করি – প্রথমত আমরা একটা গ্রুপ রিজার্ভ বাস নিয়ে যাই । তবে আপনার বাস রিসার্ভ নেয়া লাগবে না , কিভাবে যাবেন কোত্থেকে যাবেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিচে আছে । সাতছড়ি পৌছাতে ৩.৫ ঘন্টার মত সময় লাগে । হাইওয়ে টুকু ভালো না লাগলেও আপনি যেই সাতছড়ি যাওয়ার রাস্তায় প্রবেশ করবেন তখন থেকে শুরু হবে আসল ভ্রমন ।গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রথমে পৌছাবেন তেলিয়াপাড়া । রেললাইন ক্রস হবার পর প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার ভিতরে যাওয়া লাগে বনের মূল ফটক এ যাওয়ার জন্য । বাকী পথটা আপনি টেরই পাবেন না, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর দু’পাশে চা বাগান আপনাকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিত । সাতছড়ি যাওয়ার পর আপনি টং এর মত বানানো দোকানে দু মুঠ ঝালমুড়ি খেয়ে নিতে পারেন ।

আমি ধারনা করে গিয়েছিলাম বনে ঢুকলে হাটতে হাটতে ক্ষুদা লাগবে, আর সকালের নাস্তাও তেমন পেট ভরেনি,তাই নিজেই ৪ প্লেট ঝালমুড়ি খেয়ে ফেলি । এরকম মূল ফটক থেকে টিকেট নিয়ে প্রবেশ করি হারিয়ে যেতে । পর্যটকদের জন্য নিসর্গ কর্মসূচীর আওতায় বনের মাঝে ৩টি ট্রেইল তৈরি করে দেয়া হয়েছে।
 আধা ঘন্টার ট্রেইল: ১ কি.মি দৈর্ঘ্যের এই ট্রেইল ধরে বনের মধ্যে অবস্হিত একমাত্র গ্রাম টিপরা পাড়াতে যাওয়া যায় ।


 এক ঘন্টার ট্রেইল: বৈচিত্রময় বনের বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী/উদ্ভিদ দেখতে চাইলে এই ট্রেইল ধরে এগিয়ে যাওয়া উচিত ( এটাতেই গিয়েছিলাম, কিন্তু রাস্তা বিভিন্ন দিকে মোড় নেয়ায় হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে আর ভিতরে যাইনি ,পরে দেখি ১ ঘন্টার ট্রেইলে ঘুরেফিরে ২০ মিনিটেই সড়কে চলে আসি)


 তিন ঘন্টার ট্রেইল: ৬ কি.মি দৈর্ঘ্যের এই ট্রেইল ধরে এগুলে পেয়ে যাবেন আগরের বন।বলা হয় পাখি প্রেমীদের জন্য এই ট্রেইল আদর্শ।


আমরা বন থেকে বের হয়ে রাস্তায় শুয়ে-বসে ফটোসেশন করে বন বিভাগের অফিস এরিয়ায় এসে খোলা যায়গায় একত্র হয়ে আগে থেকে অর্ডারকৃত দুপুরের খাবার (পানশী হাইওয়ে হোটেল,৪০ জনের ১২০ টাকা করে পড়ে ) গ্রহন করি । এবং সেখান থেকে যেদিক দিয়ে এসেছি তার বিপরীতমুখী রাস্তা ধরে শায়েস্তাগঞ্জ দিয়ে বের হই । সেই পথেও দেখতে পাই অসম্ভব সুন্দর চা বাগানের সারি ।চা-বাগানে নেমেও ভালোই ফটোসেশন চলে ।

সেখান থেকে শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ঢাকা পৌছাতে আমাদের ৪.৫ ঘন্টা সময় লাগে । রাত ১১ টার মধ্যে সবাই যার যার বাসায় । 


আসুন দেখি আপনারা যদি যেতে চান তাহলে কিভাবে যাবেন –
ঢাকা থেকে সিলেটগামী যে কোন বাসে উঠে পড়ুন, অবশ্যই ফার্স্ট ট্রিপ ধরার চেস্টা করবেন,কারন আপনি যত আগে পৌছাবেন,তত ওখানে সময় দিতে পারবেন । ঢাকা-সিলেটগামী বাসগুলো হচ্ছে লন্ডন,গ্রীন লাইন,হানিফ,শ্যামলী,এনা,মামুন,মিতালী,দিগন্ত,আল মোবারাকা, অগ্রদূত, মডার্ন, বিসমিল্লাহ্‌ । ভাড়া ৪৭০-১২০০ টাকা । আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোন বাসে চলে যান । কিন্তু আমি যেহেতু গরিব ট্রাভেলার অতএব আমি সস্তাটাই খুজবো 
আসুন সস্তার রুট বলি – 
সায়দাবাদ থেকে মামুন/মিতালী/আল-মোবারাকা তে চড়ে বসুন, মামুন/মিতালী/অগ্রদূত লোকাল বাস,ভাড়া ২০০ টাকার বেশী হবে না । দিগন্ত হবিগঞ্জের বাস, ওটায় গেলে ৩০০ টাকা দেয়া লাগবে । দিগন্ত এসি আছে,৪০০ টাকা ভাড়া ।বাসে উঠে সুপারভাইজার/হেলপার কে বলে রাখবেন যেন মাধবপুরের পর তেলিয়াপাড়া বিশ্বরোড (স্থানীয়ভাবে তেইল্লাপাড়া) মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নামিয়ে দেয়। নেমে সেখান থেকে ডানে সিএনজি কিংবা ম্যাক্সিতে সাতছড়ি । ফেরত আসার সময়ও একইভাবে সিএনজি/অটো যেটা পান সেটায় করে হাইওয়ে তে আসবেন । সেখান থেকে ঢাকাগামী যেকোন বাসে উঠে পড়ুন । 
অনেকে যেই রুটটার কথা বলে সেটি হচ্ছে তেলিয়াপাড়া বিশ্বরোড না নেমে সেখান থেকে আরো দূরে শায়েস্তাগঞ্জ নেমে সিএনজি তে চুনারুঘাট, আবার এরপর সেখান থেকে সাতছড়ি । আপনি ম্যাপ ওপেন করলে দেখতে পাবেন আমি যেই রাস্তাটা বলেছি এটা আপনার জন্যে শর্টকাট আর যথেস্ট সময় বাচাবে । যদি চান তাহলে ঢাকায় ফেরত আসার সময় চুনারুঘাট-শায়েস্তাগঞ্জ রুট ফলো করতে পারেন,সেখান থেকেও ঢাকায় আসার বাস পাবেন । 
ট্রেনে গেলে – সকাল ৬.৩০ টার সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেসের টিকেট নিয়ে রাখুন ( কমপক্ষে ৭ দিন আগেই,নাহলে সিলেটের টিকেট নেয়া লাগবে,ভাড়াও বেশী) শায়েস্তাগঞ্জ এর টিকেট নিন ( ২১৫ টাকা ভাড়া শোভন চেয়ার) । ট্রেন থেকে নেমে শায়েস্তাগঞ্জ চৌরাস্তা – চুনারুঘাট –সাতছড়ি । 
আসার টাইমে চাইলে শায়েস্তাগঞ্জ এসে ঢাকাগামী ট্রেন ধরতে পারেন,যদি এরকম প্ল্যান থাকে তাহলে রিটার্ন টিকেটও ঢাকা থেকে সংগ্রহ করবেন নাহলে দাঁড়িয়ে আসা লাগবে , শায়েস্তাগঞ্জ থেকে ৫.৫৭ তে সেই পারাবত এক্সপ্রেসই ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় । রাত ১০ টার মধ্যে পৌছে যাবে ।


থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ঃ
সাতছড়ি উদ্যানের আশেপাশে কোন খাবার হোটেল নেই, এমনিতে মুদি দোকান আছে । কাজেই সাথে করে হালকা খাবার রাখা নিয়ে যাওয়া হবে বুদ্ধিমানের কাজ । ওয়াশরুম ব্যবহার করতে পারবেন সেখানে ।থাকার জন্যে একটা ডরমিটরী দেখেছি, আর আপনি চাইলে সাতছড়িতে ক্যাম্পিং ও করতে পারবেন, কিন্তু কি উপায়ে থাকা/ক্যাম্পিং করা যাবে তার জন্যে রেঞ্জ অফিসারের সাথে কথা বলতে পারিনি দুপুর হয়ে যাওয়ায় , কিন্তু আপনি চাইলে থাকতে পারবেন যার জন্যে তার নিকট আবেদন করতে হবে ।


 সতর্ক থাকবেন যে বিষয়ে – 
১. সাতছড়ি উদ্যান এ যাওয়া মাত্রই আপনি মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন । রবি নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় তাও ওই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পর্যন্তই ।অতএব প্রিয়জনকে জানাতে ভুলবেন না আপনি কিছু সময়ের জন্যে নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবেন ।

 
২. বনে প্রবেশের আগে আপনাকে গাইড না খুঁজে পেলেও আপনি লাগলে কাউন্টারে জিজ্ঞেস করে একজন গাইড খুঁজে নিন যদি বনের গহীনে প্রবেশ করতে চান । ওইসময় আশেপাশে গাইড ছিল না বলে আমাদের ঘোরাঘুরিতে তৃপ্তি পাইনি । সাথে গাইড থাকলে ভিতরে ভয় লাগবে না আর রাস্তা হারানোর চান্স নেই। গাইড একজন ২/৪০০ টাকায় পেয়ে যাবেন ।


৩. সবথেকে গুরুত্বপূর্ন যে বিষয়টা সেটি হচ্ছে বনের মধ্যে / বন্যপ্রানী দেখলে হাউকাউ করবেন না, আপনি নিশ্চয় কারো বাসায় বেড়াতে গেলে ওই বাসায় গিয়ে হৈচৈ শুরু করে দেন না । সোজা কথা তাদেরকে উত্যক্ত করবেন না । 


৪. এত্ত সুন্দর পরিবেশে আপনার ফেলে দেয়া পলিথিন,বোতল,টিস্যু বা খাবারের প্যাকেট যাই ফেলেন না কেন,দৃষ্টিকটু দেখাবে । সেগুলো সাথে করে নিয়ে এসে একযায়গায় জড়ো করে রাখবেন যেহেতু ডাস্টবিনের অভাব ।


৫. ১ জন ২ জন না গিয়ে ৫/১০ জনের গ্রুপ নিয়ে যান । ভ্রমন আনন্দদায়ক ও স্মরনীয় হয়ে থাকবে ।
বাসভাড়া / ট্রেনভাড়া ( ৩০০+৩০০ / ২১৫+২১৫ ),খাবার ( ১৫০,টুকটাক নাস্তাসহ ধরলাম ), সিএনজিতে (২/৩০০), বনে প্রবেশ ২০ আর গাইডকে যা দিয়ে পারেন ।
বলা যেতেই পারে ৫/১০ জনের গ্রুপ গেলে ১০০০/১২০০ এর মধ্যে একদিনের একটা সুন্দর ট্যুর দেয়া যাবে ।