লেখাঃ আজিম উদ্দিন 

আমরা সাজেক গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম থেকে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা সত্ত্বেও দলের অন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ৮:৩০ বেজে গেছে যায়, ফলাফল দেরিতে রওনা দেয়া।
৯ জনের দলবল নিয়ে শহরের ২নং গেট থেকে অক্সিজেন পৌছলাম।
অক্সিজেন থেকে মূলত দুই ধরনের বাস খাগড়াছড়ি শহরে যায়। শান্তি পরিবহন, ভাড়া ১৯০/=, টিকেট কেটে উঠতে হয়, বেশ দ্রুতই যায়, ভিড় ছাড়াই আরামসে যেতে পারবেন। অন্যদিকে লোকাল বাসের ভাড়া ১৫০/=, টিকেট কেটে উঠালেও মাঝপথে যাত্রী নেয়, ভিড়ের মাঝে বেশ হেলেদুলে যায় এ বাস অর্থাৎ খাগড়াছড়ি পৌছাতে বেশ সময় লেগে যাবে আপনার। শান্তি পরিবহণে সিট না পাওয়াতে আমাদের নিরুপায় হয়ে লোকাল বাসটাই বেছে নিতে হলো।

৪ ঘন্টার ভ্রমণ শেষে দুপুর দেড়টায় খাগড়াছড়ি বাস স্টেশনে পৌছালাম। বাস স্টেশন থেকে টমটম করে (ভাড়া ১০/=) শাপলা চত্বরে যেতে হয়। মূলত: সাজেক যাবার জন্য শাপলা চত্বর থেকে চান্দের গাড়ি / জিপগাড়ি ভাড়া করতে হয়। এখানে গাড়ির ছড়াছড়ি তবে আপনি চাইলে বাস স্টেশন থেকেও গাড়ি ভাড়া করতে পারেন সেক্ষেত্রে ভাড়া ১ বা ২ হাজার টাকা বেশি গুণতে হবে। শাপলা চত্বরে চান্দের গাড়ি সমিতি (যোগাযোগ -01884 20 85 20) থেকে গাড়ি ভাড়া করতে পারবেন। ভাড়া ৭১০০/=, এ দামের নিচে গাড়ি পাওয়া যায় না। সাথে ড্রাইভারের খরচ ৬০০/= তবে চাইলে ড্রাইভারের খাওয়া, থাকার খরচ নিজেরা বহন করতে পারেন। জিপগাড়ি নিলে( সমিতির বাইরে) ভাড়া আরো ১ হাজার কমে পাবেন। যদিও আমার দেখামতে (সমিতির বাইরে) এ গাড়িগুলো বেশ লক্কর-ঝক্কর অবস্থার। গাড়ি ভাড়া নেবার সময় খাগড়ছড়ি কোথায় কোথায় ঘুরবেন( যেমন- আলুটিলা গুহা, রিসাং ঝর্না, হাজাছড়া ঝর্না, দেবতা পুকুর, পানছড়ি বৌদ্ধ বিহার ) তা আগে থেকে বলে নিবেন, নতুবা পরে সেসব স্থানে যাওয়ার জন্য আলাদা ভাড়া দাবি করবে। 

 

মেঘের খেলা (ছবি-helloeventz.com) মেঘের খেলা (ছবি-helloeventz.com)

 

এখানে বলে রাখি, খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেক বেশ লম্বা রাস্তা। পথিমধ্যে ক্ষুধা লাগতে পারে, তখন বিরতি নিয়ে পাশের যেকোন হোটেলে খেতে পারেন। তবে ব্যবসায়ীরা খাবারের গলাকাটা দাম রেখে এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।

পাশাপাশি খাবারের দোকানগুলো প্যাকেজ সিস্টেম যেমন --
১. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+দেশি মুরগী দাম ১৮০/=

২. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+ফার্মের মুরগী দাম ১৪০/=

৩.ভাত+ডাল+আলুভর্তা দাম ১০০/=

পানি কিনে খেতে হয়। আমাদের ৯জনের দুপুরের খাবারের দাম প্রায় ১৪০০/= টাকার মত এসেছিলো। আমার কাছে এটা বেশ ব্যয়বহুল মনে হয়েছে।
সুতরাং খাওয়া দাওয়া যদি গাড়িতে উঠার আগে সেরে ফেলেন, সেটা সবথেকে ভালো। শাপলা চত্বরের "মনটানা হোটেল" এ সেরে ফেলতে পারেন দুপুরের খাবার।সুন্দর পরিবেশ +হরেক রকমের ভর্তাসহ দামও ঠিকঠাক। অন্তত প্যাকেজ সিস্টেম খাবারের চেয়ে জন প্রতি ৫০-৮০ টাকা খরচ বেচে যাবে আপনার।

দুপুর দেড়টায় রওনা হয়ে বেলা ৫টায় সাজেক ভ্যালিতে। পথে তিনটি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে থামতে হয়েছে আর রাস্তায় রোলার কোস্টারের মজা শুরু হয় বাঘাইছড়া সেনাবাহিনী ক্যাম্প থেকে। রোলার কোস্টারের মজা নিতে গিয়ে গাড়িতে সাবধান থাকতে ভুলবেন না। কিছুদূর পর পর আদিবাসীদের বাড়িঘর, বাড়ির উঠোনে আদা-মেটে আলুর স্তুপ, শূকর পালন, নারী-পুরুষ বসে বসে হুক্কা টানা আর তাস-লুডু খেলায় মগ্ন। ছোট ছোট বাচ্চারা যখন আপনার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়বে মনে হবে যেন আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে সাজেকে। সাজেক ভ্যালির প্রবেশের মুখেই রয়েছে আদিবাসীরা গ্রাম রুইলুই পাড়া। সাজেকে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০/= ও গাড়ি রাখার ভাড়া ১০০/=। যখন পৌছলাম, সূর্য তখন ডুবু ডুবু।  তড়িঘড়ি করে হেলিপ্যাডে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখা আর সবার মাঝে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেলো। রিসোর্টে ব্যাগ ফেলে যখন অনেকে রেস্টে আবার তখন অনেকে বারান্দায় বসে রিসোর্টের বাইরে অন্ধকার হয়ে যাওয়া বিছিয়ে রাখা সাড়ি সাড়ি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে। আমাদের রিসোর্টের টানা বারান্দা থেকে অনেক নিচে পাহাড়ের সারি দেখার দৃশ্যটা অন্যরকম। রিসোর্ট নিয়েছিলাম "স্বপ্নচূড়া" (যোগাযোগ : 01857 567 510) বর্ষাকালে জানালায় নাকি মেঘ ঢুকে পড়ে। ৬জনের থাকার জন্য ৩৫০০/= টাকায় আগে থেকে একটা বড় রুম বুক করে নিলেও সদস্য বেড়ে যাওয়ায় আরেকটা রুম না নিয়ে (পড়ুন কিপ্টামি করে) ফ্লোরিং করে একিরুমে ৯জন ৪০০০/= টাকায় ম্যানেজ করে নিয়েছি। এতে টাকা যেমন কম লাগলো, হৈ হৈল্লুড়ে সবাই রাত কাটিয়েছি।

ছবি-fineartamerica.comছবি-fineartamerica.com

 

সাজেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় সোলারে চলে এবং পানি অনেক দূর থেকে সংগ্রহ করা হয়। তাই বিদ্যুৎ ও পানি অপচয় করবেন না। আমাদের রিসোর্টে সন্ধ্যা ৭ থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত জেনারেটর সুবিধা পেয়েছি বাকীটা সময় শুধু লাইট।ইচ্ছেমত ছবি তুলতে চাইলে সাথে পাওয়ার ব্যাংক নিতে ভুলবেন না। খরচ কমাতে চাইলে আশপাশে আদিবাসীদের বাসায় ঢু মেরে কম খরচে রাত কাটাতে পারবেন কিংবা ক্যাম্পিং করে ঘুমাতে পারেন।

রাতে ডিনার হিসেবে খাবারের ঐ( উপরে উল্লেখিত) প্যাকেজ সিস্টেম মেন্যুটা এখানের দোকানে দোকানে পাবেন কিংবা বারবিকিউ খেতে পারেন। সেক্ষেএে জনপ্রতি ১পিস চিকেন বারবিকিউ + ২পিস পরোটা + সালাদ দাম ২২০/= করে গুণতে হবে। ঘুরেফিরে সবগুলো দোকানেই দাম একি।

হালকা কিছু খেয়ে রাতটা কাটিয়ে ভোর পাঁচটায় যখন তড়িঘড়ি করে উঠি তখনো সাজেক ঘুমে আচ্ছন্ন। আমরা ছ'টা বাজে বের হয়ে গাড়ি করে একদম উপরের চূড়ায় চলে যাই।  সেখান থেকে পায়ে হেটে পাহাড়ে আরো উপরে উঠি। আপনি চাইলে নিচের হেলিপ্যাড থেকেও সূর্যোদয় উপভোগ করতে পারবেন। সূর্যের প্রথম কিরণ যখন চুমু দিচ্ছিলো পাহাড়কে আমরা তখন নিচের কুয়াশায় চাদর জড়িয়ে থাকা ঘুমন্ত পাহাড়ের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ। যেন বিশাল এক সমুদ্রের পাড়ে দাড়িয়ে এই আমরা। ইচ্ছেমত ছবি তুলতে তুলতে যখন বেলা আটটা ততক্ষণে পেটের ছুচো বুকডন দেয়া শুরু করেছে। ফেরার পথে আপনি ছোট ছোট আরো দুচারটা স্পট দেখতে পাবেন। টিকেট ২০/= সেখান থেকেও ছবি তোলার ভিউ অসাধারণ। ডাল+পরোটা+চা (দাম ৭০/= দিয়ে নাস্তা সেরে আমরা ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ি। বারটার মধ্যে রিসোর্ট চেকআউট করবার নিয়ম। আর সেনাবাহিনীর গাড়ি প্রতিদিন সকাল সাড়ে দশটা আর বিকাল সাড়ে তিনটা ট্রাভেলারদের সিকিউরিটি দিয়ে এগিয়ে দেয়। এটাই শেষসময় এরপর দেরি করে বের হলে গাড়ি একা যেতে দেয় না বরং কয়েকটা ট্রাভেল গাড়ি একসাথে হলে তারপর যাবার অনুমতি মিলে। পথে আদিবাসীদের বাজারে ডাব,পেপে,আখ অবশ্যই ট্রাই করবেন। এখানকার আখ প্রচুর মিস্টি আর ডাবে প্রচুর পানি হয়। পথিমধ্যে হাজাছড়া ঝর্নাতে নামলাম। যারা নাফাকুম, খৈয়াছড়া ঝর্না গিয়েছেন তাদের কাছে এ ঝর্না তেমন আহামরি কিছু মনে হবে না। দুপুর আড়াইটায় খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বরে নেমে মনটানা হোটেলে লাঞ্চ সেরে বাস স্টেশন থেকে লোকাল বাসে চট্রগ্রাম শহরের উদ্দেশ্য রওনা হয়েছি। বাসের ঝাকুনির তালে ভ্রমণসঙ্গীরা যখন ঘুমে ঢুলুঢুলু তখন বাসে শেষ সিটে বসে মোবাইলের স্ক্রিনে আলোড়ন তুলে ভ্রমণের গল্পটা আপনাদের জন্য টাইপ করছি।

খরচ ২১৩০/= টাকা(জনপ্রতি)

ছবি-লেখক ছবি-লেখক

সংক্ষেপে আমাদের ভ্রমণের চুম্বক অংশ-

গন্তব্যঃ চট্টগ্রাম থেকে সাজেক, খাগড়াছড়ি

সময়ঃ  ১ রাত, ২ দিন

জনপ্রতি খরচঃ 

১. চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি শহর বাস ভাড়া--১৫০/=

২.চান্দের গাড়ি--৮৬৭/=

৩.দুপুরের খাবার--১৪৯/=

৪.রিসোর্ট--৪৪৪/=

৫.রাতের খাবার হালকা--৬৫/=

৬.সকালের নাস্তা--৭০/=

৭.দুপুরের খাবার--৯৬/=

৮.টমটম (শহরে আসা +যাওয়া)--২০/=

৯.খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম ১৫০/=

১০.বিবিধ নাস্তা --১২২/=

মোট --২১৩০/=

একটু হিসেব করে খরচ করলে ২০০০ এও সেরে ফেলতে পারবেন এই ভ্রমণটি!

পুনশ্চ: খরচ যেভাবে কমাতে পারেন 
১. নিজেরা বাইরে থেকে গাড়ি (হায়েস,নোহা) ভাড়া করে (অবশ্যই চালক খুবই দক্ষ  এবং পাহাড়ি রাস্তায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হতে হবে)
২. বাইরে ক্যাম্পিং করে
৩. বারবিকিউ জন্য মুরগী কিনে, কেটেকুটে নিয়ে গেলে।

৪. সাজেকে উপস্থিত হয়ে দরদাম করে রিসোর্ট নিলে বা আদিবাসীদের বাড়িতে থাকলে।