কোনো পাখির উড়ে যাওয়ার দৃশ্য যে এত সুন্দর হতে পারে এটা আমি কখনোই বুঝিনি। চোখ বন্ধ করলেই এখনো আমি সহজেই দেখতে পাই সবুজ ক্যানভাসে ঢেউ খেলা একটুকরো সাদা মেঘ। কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে, আপনি কি পরী দেখেছেন? আমার উত্তর হবে, দেখেছি! বাঁশঝাড়ের মাঝ থেকে উড়ে যাওয়া সাদা রঙের পরী দেখেছি।  

পাখি দেখা তখনো নেশা হয়ে উঠে নি। ফেসবুকে বার্ডস বাংলাদেশ গ্রুপ ও পেইজে একটা পাখির ছবি দেখে অবাক হলাম। ছোট্ট একটা পাখি- ঝুটিয়াল ব্রোঞ্জ নীল রঙের মাথা, দুধ সাদা রঙের দেহের সাথে মানানসই লম্বা লেজ। এত সুন্দর পাখি আমাদের দেশে আছে ভাবতেই আরো ভাল লাগল। পাখিটির নাম জানলাম দুধরাজ বা সাহেব বুলবুলি। ইংরেজি নামটা দেখে বিস্মিত হলাম  Asian Paradise flycatcher। আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘স্বর্গের চুটকি”। কল্পনার সাথে মিলে গেল যেন পুরো বিষয়টি। আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম এই সাদা রঙ ধারণ করে শুধুমাত্র পুরুষ পাখিটি, তাও সবসময় নয়। জন্ম থেকে এরা হয় ইট লাল রঙের। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর ছেলে পাখিটি লাল পালক ছেড়ে সাদা পালকে নিজের সৌন্দর্য বাড়ায়। 

স্বর্গের চুটকিস্বর্গের চুটকি

 বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব এর কয়েকজন সদস্যের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম খুব সহজে এদের দেখতে হলে মে-জুন মাসে দেশের উত্তরবঙ্গে ভ্রমণই সর্বোত্তম পন্থা। এদের দেখার প্রবল আগ্রহেই বগুড়ার বিপ্লব ভাইয়ের শরণাপন্ন হতে হল। মে মাসের এক বৃহস্পতিবার রওনা হলাম বগুড়ার উদ্দেশ্যে। ভোর ৫টার সময় পৌঁছে গেলাম সাতমাথা। বাধ সাধল তুমুল বৃষ্টি। বিপ্লব ভাইয়ের সাথে যখন দেখা হল তখন ঘড়ির কাঁটা ৭টা ছুঁই ছুঁই। নয় মাইলের ছোট একটা গ্রামে বিস্তীর্ণ ভুট্টা ক্ষেত এর পাশে বাঁশঝাড়ের আড়ালে সকাল সকাল অবস্থান নিলাম। দুধরাজের উপস্থিতি চোখে পড়ল তৎক্ষণাৎ। অসম্ভব চঞ্চল পাখি, নিজেদের বাসা রক্ষায় খুব সচেতন। বাসার সীমানা নিয়ে একটির সাথে আর একটির বিরোধ দেখে খুব মজা পাচ্ছিলাম। আরো চলছিল অল্প বয়স্ক ছেলে পাখিগুলোর সঙ্গী নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ। সদ্য কেনা নতুন লেন্স ও ক্যামেরাটা তখনো আয়ত্ত্বে আসে নি। তাই ছবি তোলার চেষ্টার পাশাপাশি মন ভরে দেখছিলামও। গ্রামবাংলার চিরন্তন অকৃত্রিম রূপ যেন  আকণ্ঠ পান করছি। বাঁশবাগানে বাতাসের শনশন শব্দ, ভুট্টা ক্ষেত এ বাতাসের দোলা, সঙ্গে দুধরাজ, চোখগ্যালো, করুণ পাপিয়ার সুরের মায়াজাল - এ যেন জীবনানন্দের জীবন্ত কবিতা! সকাল পেরিয়ে কখন যে দুপুর হয়ে গেল টেরই পেলাম না। কিন্তু একটু মন খারাপ কাজ করছিল তখনো, কারণ সবগুলোই লাল পর্যায়ের দুধরাজ। স্বর্গের সেই দুধসাদা পরী কোথায়? ক্ষিধেটাও জানান দিচ্ছে সাথে সাথে। তবুও মনের টানেই যেন আশপাশটা আরো একটু ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঘুরতে ঘুরতে প্রায় ৮-১০টা বাঁশঝাড় পেরিয়ে আসলাম। তারপর হঠাৎ করেই চোখে পড়ল সেই অপরূপ দৃশ্য। বাঁশঝাড়ের মাঝ থেকে লম্বা লেজ নাড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে সাদা পর্যায়ের একটি পুরুষ পাখি। উড়ন্ত অবস্থায় তার বিশাল লেজ যেন সাদা রঙের একটা ছোট্ট ঢেউ- নিজের চোখে না দেখলে এই দৃশ্য বর্ণনা করা অসম্ভব। পুরোদিনের ক্ষিধে, কষ্ট যেন মুহূর্তেই গায়েব। কয়েকটা ছবি পাওয়ার লোভও সামলাতে পারছিলাম না। কিন্তু পাখিটা মনে হল তার রূপ এর ব্যাপারে খুবই সচেতন। এ-ডাল থেকে ও-ডালে, কয়েক মিলিসেকেন্ডও পাচ্ছিলাম না ফোকাস করার জন্য। অবশেষে পাখিটি একটু শান্ত হয়ে বসল একটা কচি বাঁশের কঞ্চিতে। দুই তিনটি ক্লিক করতেই আবার উড়ল। ২-৩টা ছবিও তখন হাতে  চাঁদ পাওয়ার মতো মনে হল।