জীবননান্দ দাশ তাঁর “কুড়ি বছর পরে” কবিতায় লিখেছিলেন--

আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা যদি হয়
আবার বছর কুড়ি পরে--
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে--
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে-- তখন হলুদ নদী
নরম নরম শর কাশ হোগলায়-- মাঠের ভিতরে !
অথবা নাইকো ধান ক্ষেতে আর,
ব্যস্ততা নাই আর,
হাঁসের নীড়ের থেকে খড়
পাখির নীড় থেকে খড়
ছড়াতেছে; মনিয়ার ঘরে রাত, শীত আর শিশিরের জল!
জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি, কুড়ি, বছরের পার,--
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার!

জীবনবাবু কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন জানি না। তবে আমাকে একজনের অপেক্ষায় কুড়ি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনি কোনও তরুণী বা ব্যক্তি নন। বাংলার এক সময়ের অতিসুলভ আর বর্তমানের অতি দুর্লভ হয়ে ওঠা বৈঁচিফল। বৈঁচির কাহন আমি সচলায়তনে আগেই গেয়েছি। কিন্তু সেখানে নিজ হাতে তোলা কোনও ফলের ছবি দিতে পারিনি। কারণ এখন বন-জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও আর বৈঁচিফলের দেখা মেলে না। 

অনেকে বলেছেন, বৈঁচির গাছ পাওয়া যায় তো ফল কেন পাই না?
উত্তর আমি যেটা দিই সেটা ঠিক কিনা জানি না, তবে আমার বিশ্বাস দুটো কারণে এই সমস্যা। প্রথম কারণ বৈঁচি গাছ দুই উপায়ে বংশবিস্তার করে। বীজ থেকে এবং শিকড় থেকে। শিকড় থেকে বংশবিস্তারের এই পদ্ধতিটা না থাকলে হয়তো বৈঁচিে এতদিনে বিলুপ্তই হয়ে যেত। দ্বিতীয় কারণটা বোধহয় ছায়া এবং নদী। ছোটকালেও বহু জায়গায় অনেক অনেক বৈঁচিগাছ দেখেছি। কিন্তু বৈঁচির ফল সব গাছে হতো না। ফল দেখেছি শুধুমাত্র ইছামতী ও এর খালের কিণারে যেসব জায়গায় যেসব গাছ জন্মাত শুধু সেগুলোতে। বড় বড় বাগানে কিংবা উইঢিবিতে যেসব বৈঁচিগাছ দেখেছি তাতে ফল দেখিইনি। তাই আমার ধারণা পানি একটা ফ্যাক্টর। পানির কাছাকাছি যেসব গাছগুলো জন্মায় সেগুলোতে ফল ধরে খুব সহজে। ছায়াময় জায়গার গাছে ফুল এলেও ফল হয় না শেষ পর্যন্ত।

এখন কেন একবারেই দেখা যায় না--সে কথা আগের লেখাতেই লিখেছিলাম। আবারও লিখছি। বৈঁচিকে অনেকে গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ মনে করে। আসলে এখন কেউ একে বাড়তে দেয় না। বার বার ছেঁটে ফেলার কারণে গুল্ম হয়ে পড়ে থাকে। যারা সখ করে বাড়িতে লাগায় সেগুলো রীতিমতো বৃক্ষে পরিণত হয়। তবে বৃদ্ধির হার অন্যান্য বৃক্ষের তুলনায় খুবই কম। বৈঁচির প্রতিটা পাতার গোড়ায় একটা বড় কাঁটা থাকে। কাঁটা ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। বৈঁচির কাঁটা মারাত্মক জিনিস। বেশ সুঁচালো আর বিষাক্ত। শরীরের কোথাও বিঁধলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়। একে তো ঘন ডালপালা তার ওপর বিকটদর্শন কাঁটা, সুতরাং বৈঁচির মতো দুর্ভেদ্য আর কোনো মেঠোঝোপ বাংলাদেশে আছে কিনা সন্দেহ। ভয়ঙ্কর কাঁটার কারণেই বৈঁচি গাছ এখন ছেঁটে ফেলা হয়। আঁচড়টা পড়ে বেশির ভাগই শীতকালে মৌসুমি ফসলের সময়। তাই বৈশাখ মাসে যখন এর ফুল ফুটতে শুরু করে, তখন এতে নতুন ডাল-আর নতুন পাতা থাকে না। ফুল ফুটতে অন্তত একবছরের পুরোনো ডাল থাকা চাই। তাই ফলও একবারেই দুর্লভ হয়ে গেছে।


আগের লেখাতেই বলেছিলাম, ছোটবেলায় দাদি আমাকে হাতে ধরে বৈঁচিগাছ চিনিয়েছেন। এবারও বৈঁচি ফলের দেখা হয়তো দাদির সাহায্য ছাড়া মিলত না। আমার “বাংলার তরু লতা গুল্ম” বইটা আমি উৎসর্গ করেছিলাম দাদিকে। বাড়ি গিয়ে তার হাতে বইটা তুলে দেওয়ার সময়ই তিনি বৈঁচি ফলের সন্ধান দিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হলাম। একটা ফলও নেই অতবড় গাছে। তবে নষ্ট-শুকনো ফুল দেখে আশ্বান্বিত হলাম। একটা গাছে যখন ফুল দেখা গেছে, তখন ফল নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এ কথাটা মাথায় গেঁথে রইল।

এর দুদিন পর ২৫ মার্চ বসন্ত বৌরি আর শামুকখোল পাখির খোঁজে গিয়েছিলাম ইছামতীর তীরে। ছোট্টবেলায় ইছামতীর ধারে যেসব ঝোপের ভেতর থেকে বৈঁচি ফল ছিঁড়তাম, সেসব এলাকায় গিয়ে মনে পড়ল দাদির কথাটা। ঝোপের ভেতর একটা বৈঁচি গাছ দেখে এগিয়ে গেলাম পায়ে পায়ে। সত্যিই কুড়ি বছর পর পেলাম পরম আরাধ্য সেই ফল! গোটা ৫-৬ হবে। ওই ফল দেখে যে সুখটা পেলাম, অনেক বড় বড় সুখের ঘটনায়ও এতটা সুখ পাইনি বোধহয়। সাথে ছিল আমার সহকারী, খালাতো ভাই শাহেদ। সেও আহ্লাদিত। ওকে বললাম হৈ চৈ না করতে। এবছর যখন বৈঁচি ফল দেখা গেছে, তখন ওগুলো পাকুক। তারপর বুলবুলিতে খাক, ঠোঁটে বা পেটে করে বিচিগুলো নিয়ে ফেলুক দূরে, বহুদুরে। আবারও ঝোপঝাড় ভরে উঠুক বৈঁচি কাঁটার ঝোপে, টসটসে ফলের রসালো সৌন্দর্যে।