ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন প্ল্যানেট নাকি প্লাস্টিক নামে একটি তথ্যবহুল এবং চমৎকার প্রচারণা চালু করেছে। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেখে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এবং এখান থেকে কিছু শিখার চেষ্টা করতে হবে।   

আমরা সবাই জানি যে, আমাদের পরিবেশে অসংখ্য প্লাস্টিক রয়েছে এবং এটি পরিবেশকে দূষিত করছে। এর জন্য আমরা সবাই কম বেশ দায়ী। আমরা যখন প্লাস্টিক বোতল বা পলিথিন ব্যাগ অবহেলায় যেখানে সেখানে ফেলি তখন কি কারো মনে প্রশ্ন জাগে যে, আমি বা আমরা নিজেরাই পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী?

এটা মনে হতে পারে যে, একটি প্লাস্টিক ফেললে কী আর হবে? কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখুন, পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে প্রত্যেকেই যদি এভাবে মনে করে তাহলে এর পরিণতি কি দাঁড়াতে পারে? আমরা যা কিছু ফেলি না কেন, এই সব প্লাস্টিক সামগ্রীর শেষ গন্তব্য হচ্ছে সমুদ্র। প্লাস্টিক আবর্জনার কারণে সামুদ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হচ্ছে এবং প্রতিবছর অসংখ্য সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণীগুলো করুণভাবে মৃত্যুবরণ করছে।  

বিশ্বব্যাপী মানুষ যে পরিমাণে প্লাস্টিক সামগ্রি ব্যবহার করছে তাতে ২০৫০ সালের দিকে নাকি সমুদ্রে মাছের থেকে প্লাস্টিকের বোতল এবং অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য বেশী থাকবে। ধারণা করা হয়, প্রতিবছর পঞ্চাশ থেকে এক কোটি ত্রিশ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে প্রবেশ করে। এসব প্লাস্টিকের একটি বড় অংশ মাছ এবং পাখির দেহে প্রবেশ করে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক বার্তায় বলছেন, প্লাস্টিক যেহেতু সহজে ধ্বংস হয়না তাই এর ব্যবহার একসময় বিশ্বের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।  

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন প্রচারাভিযানের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি হল, তারা প্লাস্টিক ব্যবহারের উপায় পরিবর্তন করতে চায়। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনতে গ্রাহক এবং অন্যান্য সংগঠন একসাথে কাজ করতে সমর্থ হয়, তাহলে কর্পোরেশন জনগণের মতামতকে সাড়া দেবে এবং তাদের পণ্যগুলোতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পরিমাণ কমাবে। পত্রিকা নিজেই নিজেদের উদাহরণ দিয়ে এই ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করছে, তারা তাদের প্রকাশন প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাগজের ব্যাগে ভরে পাঠানো শুরু করেছে। কারণ প্রতিটি পরিবর্তন যেভাবেই হোক ব্যর্থ হবে মনে হতে পারে, কিন্তু কিছু লক্ষ্যসন্ধানে এটি সহায়তা করে। প্রচারাভিযানটি প্ল্যাস্টিকের ব্যাগ, বোতল এবং স্ট্রোগুলোকে অনিশ্চিত দ্রব্য সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ভোক্তাদেরকে সাধারণ সচেতন বিকল্প তৈরি করে প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাস করার জন্য অঙ্গীকার নিতে অনুপ্রাণিত করছে। আপনি কি প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার কমানোর জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ?

এই শক্তিশালী এবং মর্মান্তিক ছবিগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, প্রতি বছর প্রায় ৯ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে আমাদের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী কত মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে এটি কমাতে বহু বছরের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ন্যাশনাল ম্যাগাজিনের বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা প্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা তোলার আশা ব্যক্ত করেছেন, কারণ এটি অণুবীক্ষণিক কণার মধ্যে দ্রবীভূত হয়ে অবশেষে আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পার্টনারশিপের সিইও গ্যারি ই নীল ডেইলি মেইলে বলেছেন, ‘১৩০ বছর জন্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আমাদের গ্রহের গল্পগুলোকে তুলে ধরেছে, পৃথিবীর দর্শনীয় সৌন্দর্যের প্রদর্শনের পাশাপাশি এটি বিশ্বব্যাপী মানুষদের পরিবেশ সম্পর্কিত হুমকির ব্যাপারেও সাবধান করছে’।

‘প্রত্যেক দিন, আমাদের অনুসন্ধানকারী, গবেষক এবং ফটোগ্রাফাররা আমাদের মহাসাগরের একক প্লাস্টিক ব্যবহারের বিধ্বংসী প্রভাবের প্রামান্য সাক্ষ্য তুলে ধরছে এবং পরিস্থিতি ক্রমবর্ধমান হারে ভয়াবহ হয়ে উঠছে’।

প্ল্যানেট অর প্লাস্টিক (পৃথিবী নাকি প্লাস্টিক)? কোনটা আপনি চান? ন্যাশনাল জিওগাফিক ম্যাগাজিন গৃহীত এই উদ্যোগটা অনেক ভালো হয়েছে এবং প্রত্যেকেই এটার জন্য তাদেরকে প্রশংসা করছেন। তারা এখানে ক্রমবর্ধমান সংকটের গল্পগুলো শেয়ার করেছেন, বিজ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে তা মোকাবেলা করার উপায়, কিভাবে একক প্লাস্টিক ব্যবহার বাদ দেয়া যায় এবং সমুদ্রে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ প্রতিরোধ করা যায় তা বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দেয়ার জন্য কাজ করবে।

১. ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের নতুন ইস্যুটি প্লাস্টিকের বর্জ্য সম্পর্কে প্রচারণা চালাবে।

National GeographicNational Geographic

 

২. আমরা সবাই জানি যে, আমাদের পরিবেশে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশী। এসব প্লাস্টিকের একটি বড় অংশ মাছ এবং পাখির দেহে প্রবেশ করে।

John Cancalosi/ National GeographicJohn Cancalosi/ National Geographic

ফটোগ্রাফার স্পেনের ল্যান্ডফিলে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে এই সারস পাখিটিকে মুক্ত করেছেন। একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ একাধিকবার মারতে পারেঃ মৃতদেহ ক্ষয় হয় কিন্তু প্লাস্টিক দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এবং এটি পুনরায় ফাঁদ বা শ্বাসরোধ করতে পারে।

 

৩. বাংলাদেশে বুড়িগঙ্গা নদীর একটি ব্রিজের আওতায়, একটি পরিবার প্লাস্টিকের বোতল থেকে লেবেলগুলো সরিয়ে বাছাই করছে, পরে এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবে। বর্জ্য টোকাইয়েরা প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০০ ডলার আয় করেন।

Randy Olson / National GeographicRandy Olson / National Geographic

 

৪. বর্তমানে প্লাস্টিকের বৃহত্তম বাজার হচ্ছে প্যাকেজিংয়ের উপকরণ। প্লাস্টিক বর্জ্যের অধিকাংশই পুনর্ব্যবহৃত হয় না বা পুড়ানো হয় না।

Jayed Hasen/ National GeographicJayed Hasen/ National Geographic

 

৫. বিশ্বব্যাপী মানুষ যে পরিমাণে প্লাস্টিক সামগ্রি ব্যবহার করছে তাতে ২০৫০ সালের দিকে নাকি সমুদ্রে মাছের থেকে প্লাস্টিকের বোতল এবং অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্য বেশী থাকবে।

Randy Olson/ National GeographicRandy Olson/ National Geographic

 

৬. স্পেনের ভূমধ্যসাগরে একটি পুরানো প্লাস্টিকের মাছ ধরার জালে একটি বড় কচ্ছপ আটকে গেছে।

Jordi Chias/ National GeographicJordi Chias/ National Geographic

 

৭. জাপানের ওকিনাওয়াতে একটি প্লাস্টিকের বোতলের ঢাকনাতে একটি কাঁকড়া আটকে গেছে এবং সে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

Shawn MillerShawn Miller

 

৮. ইন্দোনেশিয়ার সুম্বা দ্বীপে একটি সীহর্স কটন বাড আঁকড়ে ধরে আছে।

 Justin Hofman/ National Geographic Justin Hofman/ National Geographic

 

৯. সারা পৃথিবীতে, প্রতি মিনিটে প্রায় এক মিলিয়ন পানীয় বোতল বিক্রি হয়।

David Higgins/ National GeographicDavid Higgins/ National Geographic

 

১০. কিছু কিছু প্রাণী বর্তমানে একটি প্লাস্টিকের রাজ্যে বাস করছে- হারারে, ইথিওপিয়ার এই হায়েনাদের মতো।   

 Brian Lehmann/ National Geographic Brian Lehmann/ National Geographic

 

১১. এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীকে প্লাস্টিকের মধ্যে বিজড়িত হতে হচ্ছে।

David Jones/ National GeographicDavid Jones/ National Geographic

 

১২. শুধুমাত্র প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১০০ মিলিয়ন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী মারা যাচ্ছে।

OHN JOHNSONOHN JOHNSON

 

১৩. প্লাস্টিকের বোতল এবং অন্যান্য প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পানি দূষিত হচ্ছে।  

PRAVEEN BALASUBRAMANIAN/NATIONAL GEOGRAPHICPRAVEEN BALASUBRAMANIAN/NATIONAL GEOGRAPHIC

 

১৪. ২০১৫ সালের হিসাব মতে, ৬.৯ বিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত হয়েছিল, ১২ শতাংশ পুড়ানো হয়েছিল এবং ৭৯ শতাংশ ভূমি ও পরিবেশ একত্র হয়েছিল।

ABDUL HAKIM/NATIONAL GEOGRAPHICABDUL HAKIM/NATIONAL GEOGRAPHIC

 

১৫. ভারতের মুম্বাই শহরের বহির্ভাগে কল্যাণ এলাকায় প্লাস্টিকের স্তূপ।

Randy Olson / National GeographicRandy Olson / National Geographic

 

১৬. বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গার নদীর তীরে বর্জ্য প্লাস্টিক ধোয়ার পর শুকাতে দিয়েছে।

Randy Olson/ National GeographicRandy Olson/ National Geographic

 

১৭. বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বুড়িগঙ্গার নদীর তীরে রঙিন প্লাস্টিকের টুকরা সংগ্রহ করে, পরিষ্কার করে সাজিয়ে রাখছে।

Randy Olson/ National GeographicRandy Olson/ National Geographic

 

১৮. রিকোলজির সর্ববৃহৎ সান ফ্রান্সিসকো রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টন বর্জ্য রিসাইক্লিং করে।

RANDY OLSONRANDY OLSON

 

১৯. ফিলিপাইনের ভ্যালেনজুয়েলা শহরে প্লাস্টিক বোতলগুলো ট্রাক ভর্তি করে একটি রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটিতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

Randy Olson/ National GeographicRandy Olson/ National Geographic

 

২০. প্লাস্টিক বোতলের স্তূপ।

Randy Olson/ National GeographicRandy Olson/ National Geographic

 

২১. চীন হল প্লাস্টিকের বৃহত্তম উৎপাদক। এটি বিশ্বব্যাপী সর্বমোট এক চতুর্থাংশের বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হয় এবং এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

আমাদের দায়িত্বহীনতার কারণে সামুদ্রিক পরিবেশ এবং পৃথিবীর অস্তিত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের এই দায়ভার আমাদের প্রত্যেকজনকেই বহন করতে হবে। তাই প্রত্যেকের কাছে একটি প্রশ্নঃ পৃথিবী নাকি প্লাস্টিক? সিদ্ধান্ত আপনার। যদি পৃথিবী চান তাহলে প্রত্যেকেই নিজে থেকে সচেতন হোন। 

 

তথ্যসূত্রঃ বোরডপান্ডা, বিবিসি, ইন্টারনেট।