১৮৭৬ সালে প্রকাশিত W W Hunter-এর A Statistical Account of Bengal এর মালদহ, রংপুর এবং দিনাজপুরের ভলিউম থেকে রংপুরের বন্যপ্রাণী অংশটি অনুবাদ করা হল।

পাখি-

রংপুরের পাখিরা খাদ্য এবং ব্যবসা কোনটারই খুব একটা কাজে আসে না। হরিয়াল, বটেরা, ময়ূর, বাতাই, ডাহর, বগলা, চ্যাগা, হাঁস সবখানেই অনেক বেশি সংখ্যায় পাওয়া যায়। যদিও স্থানীয়দের মাঝে খাদ্য হিসেবে এদের চাহিদা নেই, বরং পাখির মাংস হিসেবে এরা মাঝে মাঝে বক, চড়ুইই খেয়ে থাকে। বনমুরগি সবখানেই আছে, কিন্তু নোংরা ঘেঁটে খায় বলে একে কেউ খেতে চায় না। নুলিয়া এবং তেলিংগা নামের দুই দলিত জাতের মানুষেরা পাখি ধরে পোষ মানিয়ে বিক্রি করে, যাদের অধিকাংশই টিয়া। আবার অনেক সময়ই ধরা পাখি অনেকগুলো তারা খেয়ে ফেলে যেহেতু কেনার মত ক্রেতা পাওয়া যায় না। কৃষকেরা মূলত পাতি-ময়না, টিয়া। এছাড়া ভিমরাজ (বড় র্যাংকেট-ফিঙ্গে) যা বুলফিঞ্চের মত সুরেলা কণ্ঠে আরো জোরালো ভাবে ডাকতে পারে, নিয়মিত বিক্রি হয়। দক্ষিণের মাঝিরা এই পাখিগুলো আগ্রহ নিয়ে কেনে। টিয়া এবং বাবুই কৃষকদের শত্রু, এবং ক্ষেত থেকে তাদের দূরে রাখতে সার্বক্ষণিক পাহারার দরকার হয়। ডোবা এবং পুকুরে বেগুনী-কালেমের ছড়াছড়ি। পাখিটি অনেক শস্য নষ্ট করে। শীতকালে রংপুরে দুই ধরনের সারস সবখানে দেখা যায়, পাতি-সারস এবং দেশি-সারস। এরা প্রত্যেকেই ধান খায়। শীতের শুরুতে উত্তর থেকে পাখিগুলো আসে, আবার তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে যাত্রা শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের চরে গগনবেড়দের খুব দেখা যায়। বর্ষাকালে এরা গারো পাহাড়ে চলে যায়, যা তাদের প্রজনন কেন্দ্র।

সরীসৃপ-

রংপুরে নানা ধরনের সরীসৃপ দেখা যায়। ব্রহ্মপুত্রের কিনারে বসবাসকারী মানুষদের কাছে কাছিম এবং কচ্ছপ খাবারের অন্যতম অংশ, কিন্তু জেলার পশ্চিমাঞ্চলে আবার খাদ্য হিসেবে এর কদর নেই। “গাঙরা” নামে ব্রহ্মপুত্রের এক মানব সম্প্রদায়ের কচ্ছপ ধরা নিয়মিত পেশা, যদিও সকল জেলেই এদের ধরে থাকে। গাঙরারা কোঁচ দিয়েই কচ্ছপ শিকার করে, তারপর পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে মাংস বিক্রি করে দেয় যারা সারা দেশে এর সরবরাহ করে, বিশেষ করে গারোদের কাছে যারা কচ্ছপের মাংসের ভীষণ ভক্ত। নদীর কাছিম নানা ধরনের হয়, সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ছিম না পানিমেছ কাছিম যেগুলো ৫-৬ ফুট লম্বা এবং যাদের খোলা ১৪ ইঞ্চি পুরু হয়। এরা মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য সেপ্টেম্বরের মধ্যে ডিম পাড়ে। অনেক সময়ই জেলেরা একটি গর্ত থেকে ২০০টি ডিমও পায়।। আরেক কাছিমের নাম ডানাইল, যে লম্বায় ৫ ফুট এবং পুরুত্বে ২ ফুট হয়! এটি অপেক্ষাকৃত বিরল এবং ছিম কাছিমের চেয়ে সুস্বাদু বলা হয়। আর জাট কাছিম সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যদিও খেতে ছিম কাছিমের চেয়ে ভাল কিন্তু এরা ১৮ ইঞ্চির চেয়ে লম্বা হয় না। পিঠে চারটা গোলাকার হলুদ বৃত্ত থেকে একে সহজেই আলাদা করা যায়। উল্লেখিত সব কাছিমই নদীতে থাকে, কিন্তু স্থলের কচ্ছপদের মত তীরে বা বাদাতে খুব একটা দেখা যায় না। ডুরা আরেক ধরনের নদীর কাছিম, কিন্তু এই নামে স্থল কচ্ছপও আছে! এটি ২ ফুট লম্বা হয়ে থাকে, এবং এর মাংসের স্বাদ উপরের সবগুলোর চেয়ে উত্তম বলে দাবী করা হয়। যে ৬ ধরনের স্থল কচ্ছপ মূলত দেখা যায় তারা হচ্ছে- ৬ ইঞ্চি লম্বা সালিডুরা, কুজি কাটুয়া, পাংচুতি, খাগড়াকাটা এবং কড়ি কাইট্টা। সবাই এক ফুট মতো লম্বা হয়। স্থল কচ্ছপদের কালে ভদ্রে নদীতে দেখা গেলেও মূলত বাদায় দেখা যায়, এবং এরা মাটির নিচে গর্ত করে। (কাছিমের নামগুলো যেভাবে মূল বইতে আছে সেইভাবেই দেওয়া হল।)

ব্রহ্মপুত্রে ২ ধরনের কুমির দেখা যায়, মেছোকুমির বা ঘড়িয়াল এবং স্বাদু পানির কুমির। গাংরারা দুই কুমিরকেই শিকার করে থাকে। জেলেদের সাক্ষ্যে জানা গেছে তাদের শিকার করা ১৫ ফিট লম্বা কুমিরের ওজন ১৮ ফিট লম্বা ঘড়িয়ালের ওজনের চেয়ে ঢের বেশি। পানিতে কুমির মানুষ এবং গবাদিপশু দুইকেই আক্রমণ করলেও সে শান্ত, লাজুক প্রাণী। এমনিতেই চরে শুয়ে থাকা অবস্থায় তার কাছে গেলে সে বিপুল বিক্রমে জলের ভিতরে পালিয়ে যায়। এর জলাভূমি, পুকুর সবকিছুতেই থাকে। একমাত্র খরার সময় নদীতে চলে আসে। এরা নদীর তীরে গর্ত খুড়ে সেখানেই বাস করে। ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চের মধ্যে এরা সেই গর্তে ২০ – ৩০টি ডিম দেয়। সাধারণত ১ মাস বয়স পর্যন্ত এরা বাচ্চার লালনপালন করে, মাছ ধরে খাওয়ায়, তারপর ছানারা নিজেই নিজের দেখভাল করতে পারে।

ঘড়িয়াল কোন সময় বদ্ধ পানি বা গর্তে থাকে না। এটা মানুষ বা গবাদিপশু কাউকেই আক্রমণ করে না এবং শুধু মাছ খেয়েই বেঁচে থাকে। কুমিরের মতই এই মৌসুমে এরা ডিম পাড়ে। নদীর কিনারে খাদ করে ১০-১২টি ডিমে দিয়ে বালি দিয়ে ঢেকে রাখে। স্ত্রী ঘড়িয়াল সারাদিন ডিমগুলোকে দেখে দেখে রাখে, রাতে নদীতে যায়। মধ্য মে থেকে মধ্য জুনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এরপর মা তাদের ১ মাস লালন করে। ঘড়িয়ালের ডিমকে স্মল পক্স এবং বসন্ত রোগের প্রতিষেধক হিসেবে মনে করা হয়!

জেলেরা যখন যে কোন ধরনের কুমির দেখে, তারা বিশেষ ধরনের কোঁচ দিয়ে শিকারের চেষ্টা করে। বিশেষ ধরনের হালকা ভেলায় কাঠের টুকরোর সাথে দড়ি দিয়ে ধাতব অস্ত্রটি বাধা থাকে। গাঙরারা ১৫-২০ গজ দূরত্বে অতি নিখুঁত ভাবে কোঁচ ছুড়তে পারে। কোঁচ কুমিরের দেহে গেঁথে যাবার পর সে ডুব দিলেও কাঠ এবং দড়ির সাহায্যে বোঝা যায় প্রাণীটি কোথায় আছে। সম্ভব হলে দ্রুতগতির হাল্ক নৌকা নিয়ে কাছে যেয়ে সরীসৃপটিকে তারা আরেকবার আঘাত করে এবং তীরে টেনে তোলে। এদের দেহ থেকে পাওয়া তেল পোড়া ত্বকের উপশমের জন্য ব্যবহার করা হয়, কিন্তু ঘড়িয়ালের তেলের দাম কুমিরের তেলের চেয়ে ৩-৫ গুণ বেশি।

দুই ধরনের গুইসাপের দেখা মিলে এখানে, কিন্তু অপেক্ষাকৃত বিরল।

এখানে বিশাল সব সাপ পাওয়া যায়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সবকিছু জলের নিচে চলে গেলে ভেসে থাকা অল্প কয়েকটা দ্বীপে এবং মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিতে তারা চলে আসে, অনেক সময়ই সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যুও হয়। বিগত ৩ বছরে রংপুরে সাপের কামড়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখযা ১৮৬৬-৬৭সালে ৫৭ জন, ১৮৬৭-৬৮ সালে ৫৫ জন এবং ১৮৬৮-৬৯ সালে ৯২ জন। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৮ জন। সাপ মারার জন্য সরকার থেকে কোন পুরষ্কারের ঘোষণা নেই।

মাছ- এই জেলায় অন্তত ১২৬ ধরনের মাছ পাওয়া যায়। (এর পরে তাদের বিশাল তালিকা আছে সেটা আর দিলাম না। )

(আমরা চাই এভাবেই দেশের প্রতিটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া কাহিনী উঠে আসুক নতুন প্রজন্মের কাছে। আপনি কি দায়িত্ব নেবেন যে অঞ্চলে আছেন অন্তত সেখানের গল্প শোনানোর? তাহলে খুব দ্রুত আমাদের অজানা অতীত জানা হয়ে উঠবে শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নয়, আমাদের প্রজন্মের কাছেও!!!)

গত দেড়শ বছরে রংপুরের বন্যপ্রাণী (পর্ব-১)