১৮৭৬ সালে প্রকাশিত W W Hunter-এর A Statistical Account of Bengal এর মালদহ, রংপুর এবং দিনাজপুরের ভলিউম থেকে রংপুরের বন্যপ্রাণী অংশটি অনুবাদ করা হল।

স্তন্যপায়ী প্রাণী-

বাঘ এবং চিতাবাঘের সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বেশ বেশি বলেই মনে হয়। বুকানন হ্যামিল্টনের ভাষ্যমতে তিনি যখন এই অঞ্চলে ছিলেন তখন বাঘ এবং চিতাবাঘের দর্শন পাওয়া বেশ বিরল ছিল। বত্রিশহাজারি নামের এক জায়গায় এই প্রাণীদের কারণে প্রতি ২-৩ বছরে অন্তত একজন মানুষ এবং প্রতি বছর ১৫-২০টা গরু মারা যেত। ১৮৭১ সালে এই জেলার কালেক্টর জানিয়েছিলেন যে অত্র অঞ্চলের নানা জায়গায় এদের সংখ্যা ভালই বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের চরগুলোতে। বুনোমহিষ এবং হরিণের প্রাচুর্য অনেক বেশি। বুকানন হ্যামিল্টনের মতে স্থানীয় শিকারিরা এই পশুদের ফাঁদ পেতে শিকার করত, এবং কিছু বাচ্চাকে জীবন্ত আটকাতেও সমর্থ হত। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে, যখন জল বেড়ে যাবার কারণে প্রাণীর পাল একটু উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিত। এই সময়ে শিকারিরা নৌকা নিয়ে যেয়ে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করে বুড়ো প্রাণীদের হত্যা করত, এবং মাঝে মাঝে শাবকদের জীবন্ত আটকাতে সমর্থ হত। মহিষ শিকার করা হত এর শিং এবং চামড়ার জন্য। শিকারিরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে রাখত। সাধারণত ২-৩ জন একসাথে, লুকাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বুনো মহিষের কাছে যেয়ে বিষ মাখা তীর দিয়ে আক্রমণ করত। সেই তীরের সামান্য আঘাতও কয়েক ঘন্টার মধ্যে ভয়াবহ বিপদ হিসেবে দেখা দিত, যে সময়ে নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে শিকারিরা অপেক্ষা করত প্রাণীটির মৃত্যুর জন্য।

কালো ভালুকও দেখা যেত, তবে অপেক্ষাকৃত দুর্লভ। যদিও সিনহেশ্বর বনে অনেক ভালুক আছে, এবং তাদের হাতে অতি উৎসাহী বনগামী মানুষ মাঝে মাঝে খুন হয়। তারা আম, কাঁঠাল, কলা, মধু খায়, তবে অন্য শস্য বা গবাদি পশুর ক্ষতি করে না। এই শতাব্দীর শুরুর দিকে রংপুরের পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে অনেক হাতি দেখা যেত, এখন মাঝে মাঝে মানব বসতি থেকে দূরে দেখা যায়। তবে এরা শস্যক্ষেত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। হামিল্টনের মতে ধান পাকার মৌসুমে হাতির হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য নিয়মিত পাহারার দিতে হত। সাধারণত ১২-১৪ ফিট উপরে মাচা বেধে তাতে অন্তত দুইজন লোক সবসময় থাকত, যাদের অন্যতম কাজ ছিল পালাক্রমে মাচার উপরেই আগুন জ্বালিয়ে রাখা। হাতি, হরিণ বা বন্য শুকর আক্রমণ করলে দুই পাহারাদার মিলে চিৎকার করে, ঢোল বাজিয়ে তাদের তাড়াবার চেষ্টা করত। কিন্তু কখনোই প্রাণীগুলোকে আক্রমণ করত না।

হাতিরা বর্ষাকালে শালবনেই থাকত আর শুকনো মৌসুমে নল-বনে। সাধারণত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াতের জন্য হাতিরা নিজেদের জন্য একটি নিয়মিত পথ করে নেয়। অনেকেই সেখানে পোষা মেয়ে-হাতি রেখে বুনোহাতি ধরার চেষ্টা করে। পোষা হাতিটি লম্বা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, যে দড়ির এক প্রান্তে আবার একটি ফাঁস থাকে, যা পোষা হাতির মাহুত বুনো হাতিটির গলায় পরিয়ে দেবার চেষ্টা করে। সেটি পরানো হয়ে গেলেই পোষা হাতিটিকে সরিয়ে নেওয়া হয়, আর বুনো হাতিটিকে পায়েও দড়ি বেঁধে গাছের সাথে আটকে রাখা হয় কিছুটা পোষ না মানা পর্যন্ত। এই উপায়ে ধরা হাতিরা সাধারণ ছোট আকারের হয়, উচ্চতা সাড়ে ছয় ফিটের মত, এবং এদের মৃত্যুহার খেদার মাধ্যমে ধরা হাতিদের চেয়ে অনেক বেশি। মেছপাড়া এবং হাওড়াঘাটে ফাঁদে আটকে হাতি ধরা হয়। হাতি চলাচলের পথে গর্ত করে ডালপালা দিয়ে ঢেকে ফাঁদ পাতা হয়। ফাঁদে একটি হাতি পড়া মাত্রই কাছে থাকা মানুষেরা যথাসম্ভব হট্টগোল করে, আলো দেখিয়ে হাতির পালকে অন্যদিকে ভাগিয়ে দেয়, নতুবা তারা আবার সেই আটকে পড়া হাতিকে উদ্ধার করে আনতেও পারে! হাতির পাল দূরে যেতেই ফাঁদে আটক হাতির সাথে দড়ি বেঁধে গর্তের এক দিক কিছুটা ঢালে পরিণত করে গাছে বেঁধে তাকে তুলে আনা হত। এটাও হাতি ধরার জন্য খুবই বাজে একটা পদ্ধতি, প্রায়ই গর্তে পড়া হাতিটি এত বাজে ভাবে আহত হত যে আর বাঁচত না। মাঝে মাঝে দাঁতের জন্যও হাতি শিকার করা হত। বন এবং নলবনে গণ্ডারদের দেখা নিয়মিত মিলে, বিশেষ করে গোলাপাড়া অঞ্চলে। তারা মানুষ বা শস্য কারো জন্যই মোটেও ক্ষতিকর প্রাণী নয়। যদিও অনেকেই তাদের শিং এবং চামড়ার জন্য গণ্ডার শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করে। মুখে প্রচলিত কিছু ঔষধি গুণের জন্য এদের শিং এর ব্যপক চাহিদা। এছাড়া শিং দিয়ে বালা এবং হিন্দু পূজায় ব্যবহার করার জন্য পেয়ালা বানানো হয়। চামড়া দিয়ে ঢাল এবং নিশানা পরীক্ষার মডেল বানানো হয়।

বুনোপ্রাণীদের (মূলত বাঘ এবং চিতাবাঘ) কারণে মানুষ মারা যাবার যে সংখ্যা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া গেছে তা হল ১৮৬৬-৬৭ সালে ৪৯ জন, ১৮৬৭-৬৮ সালে ৩৫ জন, ১৮৬৮-৬৯ সালে ৩৮ জন। প্রতি বছর গড়ে ৪১ জন। সরকার কতৃক এই ৩ বছরে বুনোপশু মারার জন্য যে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তা হল- ১৮৬৬-৬৭ সালে ২ পাউন্ড ৮ শিলিং ১টি বাঘ ও ৯টি চিতাবাঘের জন্য।, ১৮৬৭-৬৮ সালে ১৪ পাউন্ড ১৬টি বাঘ এবং ১টি চিতাবাঘের জন্য, এবং ১৮৬৮-৬৯ সালে ১ পাউন্ড ১৫ শিলিং ১টি বাঘ এবং ৫টি চিতাবাঘের জন্য।

অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীরা –

এই জেলার সর্বত্রই বন্য শূকরের দেখা মেলে। তবে সিনহেশ্বর বং এবং পাঙ্গা বনের গুলো বিশেষ ধরনের হিংস্র। এই অঞ্চলের হিন্দু কৃষকেরা জাল পেতে বন্য শূকর ধরে এবং এদের মাংস খায়। কিন্তু এদের যথেচ্ছ শিকার করে নির্মূল করার কোন চেষ্টা চালানো হয় না, কেবল মাঝে মাঝে খাবার জন্যই শিকার করা হয়। নানা জাতের অসংখ্য হরিণ আছে যারা ফসলের জন্য ক্ষতিকর। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় Gaoj (Bhalangi) হরিণ, এছাড়াও আছে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, পারা হরিণ, মাস্ক ডিয়ার, কমন অ্যান্টিলোপ ইত্যাদি। কোন জাতের মানুষই হরিণ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে না, তাদের চামড়ারও কোন চাহিদা নাই। যদিও অনেক কৃষক অবসর সময়ে হরিণ শিকার করে মাংসের জন্য, যা টাটকা ভাবে খাওয়া হয় কিংবা ধোঁয়ার মাধ্যমে শুঁটকি করে। সাধারণত গর্ত, ফাঁদ বা জাল দিয়ে হরিণ ধরা হয়। অনেক সময় একজন শিকারি মাথায় হারিকেন বনে রাতের বেলা বনে গেলে আলোতে আকৃষ্ট হয়ে হরিণেরা কাছে আসে, এবং তীরের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

মেছপাড়া বনে দুই ধরনের এপের দেখা মেলে, স্থানীয়রা দুইটিকেই উল্লুক বলে ডাকে। একটার বর্ণ ধূসর, অন্যটির কুচকুচে কালো, সাথে চওড়া সাদা ভ্রূ। দুই জাতেরই আকৃতি, চিৎকার, ব্যবহার একই ধরনের। (বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে পুরুষ এবং নারী উল্লুকের কথা বলা হয়েছে!)। উল্লুকেরা বেশ বড় দলের থাকে, চিৎকার চেঁচামেচি করলেও বেশ লাজুক স্বভাবের। শুকনো মৌসুমে পানির অভাবের জন্য যখন এরা বনের নিরাপদ আশ্র্য থেকে বেরোয়, তখন দুর্বল ভঙ্গীর হাঁটার জন্য প্রায়ই মানুষের হাতের ধরা পড়ে। প্রাপ্তবয়স্ক উল্লুকেরা ধরা পড়ার পর বেশি দিন বাঁচে না কিন্তু শিশু উল্লুকেরা বেশ পোষ মেনে যায়। মাকড়সা এবং গঙ্গাফড়িং এদের প্রিয় খাবার হলেও এরা বুনো ফল, মাছ, পাতা ইত্যাদি খেয়ে থাকে। বনের খাটো-লেজী বানর থাকে, যাকে স্থানীয়রা মর্কট বলে। লম্বা লেজের হনুমানেরাও এই বনে বিচরণ করে। এই দুই প্রাণীই নিরামিষাশী, এবং বাগান ও ফসলের ক্ষেতের জন্য অতি ক্ষতিকর।

মেছপাড়ার লোকেরা মাঝে মাঝে লজ্জাবতী বানরও ধরে। এই নিশাচর শিকারি প্রাণীটি মূলত ছোট ছোট পাখি খেয়ে থাকে, যা সে রাতের বেলা ধরে। এদের স্বভাবের সাথে বাদুড়ের অনেক মিল, আলোতে চমকে যায়, দিনের বেলা গাছের ডালে ঝুলে বিশ্রাম নেয়, ভারতের বড় বাদুড়দের মতই।

রংপুরের সবখানেই শেয়াল আর খেঁকশেয়াল দেখা যায়, মাঝে মাঝে হায়েনাও। সজারুও আছে, তবে খুব বেশি সংখ্যায় নয়। এদেরও মাংসের জন্য শিকার করা হয়। খরগোশ এখানের সর্বত্র আছে। উদবিড়াল বেশ দেখা যায়, এবং জেলার উত্তরাঞ্চলে উদবিড়ালের চামড়া বিক্রি হয় ভুটানি বাজারের জন্য, তবে এর চামড়া সংগ্রহের চল খুব একটা নেই। ঢাকার কয়েকজন শিকারি এবং ব্রহ্মপুত্র তীরের গানরার জাতির লোকেরা ঢাকায় রপ্তানির জন্য উদবিড়াল মেরে থাকে। সাধারণত মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বরের মধ্যে তারা একটি তরুণ উদবিড়ালকে জ্যান্ত ধরে আনে। ঐ দুই মাসই হচ্ছে শিকারের মৌসুম। শিকারিরা প্রথমে একটি জায়গা খুঁজে বের করে যেখানে অনেক উদবিড়াল আছে, তারপর সেখানে তরুণ উদবিড়ালকে সেখানে বাঁশ না নলের সাথে বেঁধে নিজে লুকিয়ে থাকে। তার চিৎকারে শীঘ্রই অন্যান্য ভোঁদড়েরা এগিয়ে আসে, এবং বর্শার আঘাতে মারা যায়। নাক থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত এরা সাড়ে তিন ফিট হয়ে থাকে।

ব্রহ্মপুত্র নদী ভর্তি শুশুক। গাংরার নামের এক জাতের জেলেরা তেলের জন্য শুশুক শিকার করে থাকে। জেলেদের মতে ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ এপ্রিলের মধ্যে এরা সন্তান প্রসব করে, প্রতিবার একটি করে। এরা বাচ্চাকে সাধারণত এক মাসের বেশি দুধ খাওয়ায় না, এর মাঝেই শুশুকছানার দাঁত গজিয়ে যায় এবং তারা নিজেদের খাবার জোগাড় করে নিতে পারে। সারা বছরই শুশুক শিকার চলে, কিন্তু মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চে মূল শিকারের মৌসুম। দ্রুতগামী নৌকায় বসে জেলেরা সতর্ক দৃষ্টি রাখে যে কোন সময় শুশুক নিঃশ্বাস নেবার জন্য উপরে আসবে, তখনই বিশেষ ধরনের কোঁচ ( যাতে ১ ফুট দীর্ঘ ৩টি লোহার শিক থাকে) নিক্ষেপ করে শুশুক মারা হয়। হাড়-চামড়া ফেলে দেবার পর এর মাংস টুকরো টুকরো করা হয়, তারপর দেড় ঘণ্টা একটি মাটির পাত্রে জ্বাল দেওয়া হয়। এরপরে সেখানে মাংস থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া তেল ছেকে নেওয়া হয়। একটি শুশুক থেকে ১০ থেকে ১৫ সের তেল পাওয়া যায়।

(আমরা চাই এভাবেই দেশের প্রতিটি জনপদের হারিয়ে যাওয়া কাহিনী উঠে আসুক নতুন প্রজন্মের কাছে। আপনি কি দায়িত্ব নেবেন যে অঞ্চলে আছেন অন্তত সেখানের গল্প শোনানোর? তাহলে খুব দ্রুত আমাদের অজানা অতীত জানা হয়ে উঠবে শুধু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নয়, আমাদের প্রজন্মের কাছেও!!!)

চলবে.....................।।