“কত দিন কত রাত গেছে, সেই মায়া হরিণের পিছে
আমি যত ছুটে যাই কাছে, সে রয় বহুদূর”

কৈশোরে শোনা প্রিয় একটি গানের এই দুটি লাইন প্রায় দুই দশক পর নতুন করে আবার গুনগুন করে গাওয়ার ইচ্ছে জেগে উঠার রহস্যটা অবশেষে ধরতে পারলাম সেদিন। মায়া হরিণ আবার পাবো কোথায় এই দূর পরদেশে? উইকিপিডিয়া যতই বলুক না কেন এ হল ছাগল সদৃশ হরিণ, কিন্তু চতুষ্পদী এই প্রাণীর মায়া মাখা ওই দুচোখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে আমি তাকে হরিণ সদৃশ ছাগল মানতেই রাজি।

 ভোরের আলোয় ভোরের আলোয়

কৌতূহলীকৌতূহলী

সূর্যোদয়ের ঠিক আগের প্রহরেই যেন হাজার মিটার উঁচু পাহাড়ি উপত্যকায় বসে আল্পিয় কামোসশোর(Camoscio Alpino; rupicapra rupicapra) মেলা। তাও আবার সমতল তৃণভূমি তাঁদের ঠিক পছন্দ না, খাড়া পাথুরে ঢালেই দলবেঁধে ছুটোছুটি করতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বেশি। একে তো সূর্যমামা তখনও ঠিক মত উদিত হয়নি আর সেই স্বল্প আলোয় পিচ্ছিল পাহাড়ি ঢালে ক্যামেরা নিয়ে বাড়াবাড়ি করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা বিধায় ছবির মান নিয়ে মাথা ঘামাই না। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে হরিণ পালের হুটোপুটি দেখি। মে-জুন মাসে জন্ম নেয়া হরিণ শাবকের নিষ্পাপ সম্মোহনী চাহুনি বারবার মনে করিয়ে দেয় ওয়াল্ট ডিসনির অমর চরিত্র বাম্বির কথা।

ছুটোছুটিছুটোছুটি

বাম্বিবাম্বি

১২০০-২২০০ মিটার উঁচু পাহাড়ে কামোসশো(camoscio alpino) বিচরণ করতে দেখেছি গ্রীষ্মের শুষ্ক দিনগুলিতে। প্রত্যূষের শিশির ভেজা ঢালু উঁচুনিচু তৃণভূমিতে ভেড়ার পালের সাথে মিলেমিশে ভূরিভোজনে ব্যাতিব্যাস্ত থাকতেই যেন পছন্দ তাঁদের। আমার মত একা একা নিজের মত হেঁটে চলা পথিক পানে হয়ত তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে কিছুক্ষণ, দ্বিপদী অভিযাত্রীর হাবভাবেই বুঝে নিবে বিপদের আশঙ্কা কতটুকু। ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলার ক্ষমতার সাথে উল্লম্বভাবে ২ মিটার উচ্চতায় লাফিয়ে ৬ মিটার পর্যন্ত লংজাম্প মারার দক্ষতাও আছে এদের। সময় গড়িয়ে সূর্যমামা চলে আসবে মাথার উপর, ট্র্যাকিংপ্রেমী অভিযাত্রীর আনাগোনাও যাবে অনেক বেড়ে। কামোসশোর দল সূর্যতাপ আর মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এড়াতে চলে যায় পাইনের জঙ্গলে।

লংজাম্পলংজাম্প

পাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়েপাহাড়ি ঢালে দাঁড়িয়ে

নির্ভীকনির্ভীক

পুরুষ আর মাদী কামোসশো খালি চোখে আলাদা করে চেনাটা দুষ্কর। দুজনেইর মাথায় চিরস্থায়ী শিং আছে, আকারে হয়ত সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে। শিঙের মাথা অনেকটা হুকের মত বাঁকানো। প্রজননকাল বাদে বাকি মাসগুলিতে পুরুষ কামোসশো সাধারণত নিঃসঙ্গ একা একা দিন কাটিয়ে দেয়। মাদী হরিণগুলি দলবদ্ধ জীবনযাপনেই অভ্যস্ত। পুনরায় বাচ্চা প্রসবের আগ পর্যন্ত আগের বছরে ভূমিষ্ঠ শাবকের দেখভাল করার পুরো দায়িত্বটা মা হরিণের।

বুড়োগুলিকে তাঁদের ধুসর লোমে আবৃত চামড়া দেখে চেনা যায় সহজেই। প্রাকৃতিক পরিবেশে ২৫ বৎসর পর্যন্ত বাঁচার কথা থাকলেও বেশিরভাগই ১৫/১৬ বৎসরের বেশি টিকে না। দাঁতক্ষয় জনিত কারনে বৃদ্ধ বয়সে খাদ্য আহরণে সঙ্কট দেখা দেয় প্রবলভাবে। অক্টোবর মাসের মধ্যে চর্বির আস্তর জমাতে না পারলে এমন উচ্চতায় প্রবল শীত মৌসুম কাটিয়ে পরবর্তী বসন্ত দেখার আশাটা দুরূহ।

বার্ধক্যবার্ধক্য

এদের ক্ষুর যেমন ঢালু পাথুরে দেয়ালে হেঁটে বেড়াতে কার্যকরী তেমনি তুষারাবৃত বনে-বাদাড়েও সমান উপযোগী। শীতের তীব্রতা থেকে বাঁচতে প্রকৃতির নিয়মেই অক্টোবর মাস থেকে কামোসশোর গ্রীষ্মকালীন বাদামী-খয়েরি চামড়ার রঙ বদলাতে শুরু করে। কালো রঙয়ের পশমে নিজেকে ঢেকে ফেলে পুরোদস্তুর বদলে দেয় অবয়ব।

গ্রীষ্মের বাদামী চামড়াগ্রীষ্মের বাদামী চামড়া

শীতের শেষে কালো পশমশীতের শেষে কালো পশম

চারণভূমিতে এক জোড়াচারণভূমিতে এক জোড়া

ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এক জরিপে আল্পিয় কামোসশোর সংখ্যা ২০,০০০ ছাড়াতে পারেনি। তড়িঘড়ি করে শুরু হয় এদের বাঁচানোর প্রয়াস, আইন করে কামোসশো হত্যা নিষিদ্ধ করে আর সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির মাধ্যমে আজকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫-৬ গুন। সরকারি প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছাড়াও পরোক্ষভাবে মানুষও রেখেছে তাঁর অবদান। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন শিল্পায়নের ধারায় পাহাড়ি মনুষ্য জনপদ হয়েছে বিরান, একে একে সবাই গিয়েছে শহরে ঘড়িবাঁধা জীবনযাপন করতে। বেঁচেছে কামোসশোর চারণভূমি, বিনাশের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে আল্পিয় অরণ্য।

প্রাপ্তবয়স্ক কামোসশোপ্রাপ্তবয়স্ক কামোসশো