সারদীয়া পূর্ণিমার সন্ধ্যে। চাঁদের হাসি বাধ ভেঙেছে। উছলে পড়া আলোর বন্যায় ভেসে যেতে চায় মন। ভ্যাপসা গরম। সনাতনধর্মীদের বড় উৎসব। ঢাক বাজছে মন্দিরে। ড্যাডাং ড্যাডাং ঢাকের শব্দ আর উছলে পড়া জোসনার জোয়ার মনকে করে ঘর ছাড়া। গাঁয়ের এক ছোটভাইকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাঠেপানে। গাঁয়ের পথ ছেড়ে প্রশ্বস্ত মেঠোপথে উঠে পড়লাম। দুপাশে ঘনঝোপের বেড়া। চাপ চাপ অন্ধকার জাপটে ধরে বসে আছে ঝোপগুলোকে। চাঁদের আলোর সাহস নেই দুর্ভেদ্য লতা-পাতার-কাঁটার গহীন কোণে ঢুকে পড়ে। তাতে বরং ভালোই হয়েছে। জোনাকিরা ভিড় করেছে সেই অন্ধকারে। এসব দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি মাঠের আরও গহীনে। সেখানে পথের পাশেই একটা আমবাগান। রাস্তার কোলঘেঁষে সেই বাগানের ভেতর একটা বাঁশের মাচা করে রেখেছেন বাগান মালিক। ক্লান্ত পথিকের দু- জিরিয়ে নেওয়ার জন্য। সেখানে বসলাম আয়েস করে।

তক্ষকের ডাক শুনি। ঝিঁঝি পোকার ঐক্যতান অবিরাম। মাচায় শুয়ে গল্প করি। রাত তখনও গভীর হয়নি। কান খাড়া করে শুনি অন্ধকারের শব্দ। বহুদূরের লোকালয়ের মৃদু কোলাহাল কানে আসে। কানে দূরে কোনো তেপান্তরের মাঠ থেকে আসা শেয়ালের হাঁক। রাতজাগা পাখিরা ডানা ঝাপটায়। ক্রার-র-র ক্রার-র-র করে অন্ধকারের কোন অন্তরাল থেকে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় কয়েকটা খুঁড়লে পেঁচা। ঠিক তখনই এলো অন্য এক ডাক! রাতচরা পাখির ডাক। পাশের ঝোপের পাশ থেকে ডেকে ওঠে একবার...দুবার...তিনবার...একটানা...। ট্রাউউ..ট্রাউউ..ট্রাউউ..! কত বছর পরে এই ডাক শুনছি, ঠিকঠাক সময়ের হিসাব দিতে পারব না।

আমাদের গ্রামে মানুষের ঠাঁসাঠাঁসি। ঢাকার মতোই ঘন ঘরবাড়ি। লোকালয়ে এক টুকরো জমি পড়ে নেই। আগে ছিল, আমাদের ছেলেবেলাতে। আমাদের বাড়ির পেছনে-পশ্চিমে ছিল নিকষ কালো কালো সব ঝোপ-জঙ্গল। তার ভেতরে ছিল শেয়াল, বনবিড়াল, বেজি আর গুইসাপের ডেরা। আর ছিল রাতচরা পাখিরা। এত এত শত্তুরের চোখে ধুলো দিয়ে কীভাবে যে বাস করত এরা আজও ভেবে পাই না। সন্ধ্যায় ও শেষরাতে ডেকে উঠত রাতচরা পাখি। কখনও একটা, কখনও একাধীকা। ট্রাউউ..ট্রাউউ..ট্রাউউ..! রাতের নৈঃশব্দ বিদীর্ণ করে এ ডাক ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে।

গ্রামের লোক একে বলে আতস পাখি। রাতে ওদের চোখ দিয়ে নাকি আগুন বেরোয়। এই ধারণা থেকে জন্মেছে ভয় ধরানো কত গল্প, কত কাল্পনিক কাহিনি! মাঝে মাঝে, নানা কারণে মাঠে চাষীদের কাজ থাকে রাতে। কেউ কেউ অন্ধকারে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন দুটো আলোর বিন্দু। আসলে রাতচরা পাখির চোখ। অন্ধকারে চোখে আলো পড়লে সব রাতচরা প্রাণীরই চোখ জ্বলে। রাতে মাঠে ঘুরে বেড়ানো চাষি টর্চের আলোয় হয়তো সেই চোখই দেখে।

 আতস পাখি আতস পাখি

গত সাড়ে তিন বছরে এদের কম খুঁজিনি। একবার দিনেই এ পাখি ডেকেছিল আমাদের বাঁশবাগান থেকে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে বের করেছিলাম তাকে। সেদিন থেকেই চিনি পাখিটিকে। এর পোশাকি নাম ল্যাঞ্জা-রাতচরা; গাঁয়ের লোকের কাছে আতস পাখি।

মা আর দাদি বলেছিলেন যে পাখির নাম দিনকানা, রাতে চরে বেড়ায় আর দিনে চোখে দেখে না। সে তথ্যেও অর্ধেকটা ভুল; রাতে চরে বেড়ালেও দিনে এ পাখি চোখে দেখে ভালোই। দিনে এরা শুকনো পাতার ওপর পড়ে পড়ে ঘুমোয়। এরা হলো বাংলাদেশের পাখির জগতে সবচেয়ে বড় ছদ্মবেশি। আমাদের নাকের ডগায় বসে থাকলেও চোখে পড়ে না এরা। শুধু আমাদেরই নয়, মানুষের চেয়ে বড় শত্রু আমাদের পুহপালিত কুকুর-বিড়ালেরও চোখ এড়িয়ে যায় ল্যাঞ্জা-রাতচরা পাখি।

 ল্যাঞ্জা-রাতচরা পাখি ল্যাঞ্জা-রাতচরা পাখি

গত বছর ভাগ্যক্রমে এক রাতচরার ছবি তুলতে পেরেছিলাম। গ্রামের গোরস্থানের পাশে একটা আমবাগান। গোরস্থানটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। হারিয়ে যাওয়া একটা শাবুলবুলের খোঁজে পাঁচিলে উঠেছিলাম; কিন্তু পাইনি। হতাশ মনে যখন পাঁচিল থেকে নামছি; চোখের কোণে ধরা পড়ল ক্ষীণ একটা নড়াচড়া। চোখ নামালাম নিচের দিকে। শুকনো আম আর বাঁশপাতার ওপর কী যেন নড়ছে! কিন্তু কী সেটা? চোখের সামনে দেখেও বুঝতে পারছি না! মাথাটা খারাপ হলো নাকি। হঠাৎ গায়ের লোমে শিহরণ উঠল। সাপ দেখলে ভয়ের যেমন শিহরণ ওঠে মেরুদন্ডে এটা তেমন অনুভূতি! মনে হলো একটা অজগর সাপ বুঝি কু-লি পাকিয়ে শুয়ে আছে। নড়াচড়া তো করল কয়েক সেকেন্ড। আবার চুপচাপ। সাপ কিনা তাও বুঝতে পারছি না। তবে কিছু একটা তো বটেই। ঝাড়া তিন মিনিট লাগল বুঝতে। অজগর নয়; ল্যাঞ্জা রাতচরা পাখি। শুকনো পাতার মাঝে মিশে থাকতে ওস্তাদ।

 ল্যাঞ্জা-রাতচরা পাখি ল্যাঞ্জা-রাতচরা পাখি

ভালো করে দেখে বুঝলাম, দুটি ছানা নিয়ে শুয়ে আছে মা পাখি। হঠাৎ আরামে ব্যাঘাত ঘটায় বোধহয় একটা ছানা নড়ে উঠছিল। ভাগ্যিস নড়েছিল। তা না হলে শত আরাধ্য এ পাখির পারিবারিক ছবি তুলতে কত বছর লাগতে কে জানে! প্রাণভরে ছবি তুললাম। পাঁচিল ঘুরে গেট পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম গোরস্থানে। ছবি নিতে নিতে এগোলাম পাখিগুলোর দিকে। ওদের কোনো হেলদোল নেই; পরোয়াই করছে না আমাকে। আসলে আমি যে ওদের দেখতে পেয়েছি, এটা ওরা বোঝেনি।

আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। হাত দুয়েকের ব্যবধান মোটে। চেষ্টা করছিলাম গ্রাউন্ড লেভেলে ক্যামেরা রেখে ছবি তুলতে। মা পাখিটা টের পেয়ে গেল। বুঝে গেল, আমার মতলব খারাপ। তাই ফুড়ুৎ করে উড়ে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে পড়ল। ছানা দুটো দু’দিকে পালাতে শুরু করল। ওদের আর না জ্বালিয়ে সরে এলাম সেখান থেকে।