মানব সমাজে আত্মহত্যার ব্যাপারটা লক্ষণীয় ও বোধগম্য হলেও প্রাণী সমাজে আত্মহত্যার কোন দৃষ্টান্ত নেই। কারণ তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বলে কিছু নেই। কিন্তু প্রায় ১০০ বছর ধরে ভারতের আসামের জাতিঙ্গা গ্রামে হাজার হাজার পাখি বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে উঠে। তারা বছরের ওই নির্দিষ্ট সময়ে বিভ্রান্তের মত উড়তে থাকে এবং গাছপালা বা দেয়ালে বাড়ি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং আর উঠে না। পক্ষীবিশারদবিদ ও পরিবেশবিদরা এই ঘটনাকে বিস্ময়কর বলে ব্যাখা করেছেন।

Charismatic PlanetCharismatic Planet

 

এই বিস্ময়কর ঘটনার সময়ঃ

ভারতের আসাম রাজ্যের ডিমা হাসাউ জেলার একটি ছোট্ট গ্রাম জাতিঙ্গা। এই গ্রামে প্রায় ২৫০০ উপজাতি বাস করে। প্রতি বছর বর্ষার ঠিক পরে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যবর্তী সময়ে জাতিঙ্গার পাখিদের মধ্যে এই অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করা যায়। এই সময়ে কোন এক অমাবস্যার রাতে সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯.৩০ টার মধ্যে প্রায় ৪৪ প্রজাতির হাজার হাজার পাখি মাতালের মত এদিক সেদিকে ওড়াউড়ি শুরু করে। ফলে গাছের ডালপালা, বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা কংক্রিটে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে আঁচরে পরে। এরপর আর উঠতে পারে না। এই সময় গ্রামবাসীরা মাংসের জন্য অনেক পাখি মেরে ফেলে আর কিছু পাখি না খেয়ে আহত অবস্থায় মারা যায়।

HOT LEISURESHOT LEISURES

 

সন্ধ্যার পর সাধারণত পাখিরা তাদের বাসায় ফিরে যায় কিংবা বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু ওই নির্দিষ্ট সময়ে পাখিরা কেন এমন প্রাণঘাতী আচরণ করতে থাকে তার সঠিক কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস কোন এক অপদেবতার নির্দেশে পাখিরা ওইদিন অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে এবং তাদের জ্বালাতনের জন্য আসে। এই যুক্তিতে তারা মাটিতে লুটিয়ে পড়া অধিকাংশ পাখি মেরে ফেলে।

 

বিস্ময়কর এই ঘটনার ইতিহাসঃ

World AtlasWorld Atlas

জাতিঙ্গার পাখিদের এই বিস্ময়কর গণআত্মহত্যার ব্যাপারটি প্রায় দীর্ঘ ১০০ বছর আগে থেকে ঘটে আসছে। ১৯০৫ সালে প্রথম এই বিস্ময়কর ঘটনাটি গ্রামবাসী দ্বারা উন্মোচিত হয়। গ্রামবাসীরা তাদের বাঘে টেনে নিয়ে যাওয়া মহিষকে খুঁজতে গিয়ে দেখে পাখিরা তাদের হাতে থাকা মশালের চারপাশে অদ্ভুতভাবে ওড়াউড়ি শুরু করেছে। এরপর প্রতি বছর ওই নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন ইলেকট্রিক বাতি বা মশালের আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পাখিরা ছুটে যেতে থাকে। বিশ্ববাসীর কাছে ঘটনাটি প্রথম নজরে আসে ১৯৬০ সালে। বিখ্যাত প্রাকৃতিকবিদ এডওয়ার্ড পি গে ও ভারতের বিশিষ্ট পক্ষীবিশারদ সেলিম আলী এই ঘটনাটি বিশ্ববাসীর নজরে আনেন। তারা এটা নিয়ে দীর্ঘদিন পরীক্ষা চালিয়ে যান।

 

বিস্ময়কর এই ঘটনার কারনঃ

blognameblogname

বিজ্ঞানীরা পাখিদের এই অদ্ভুত আচরণের সম্ভাব্য কিছু কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। বছরের ওই সময়ে শুধুমাত্র অমাবস্যায় পাখিরা এই আচরণ করে। বিজ্ঞানীদের মতে ওই সময় দক্ষিণ দিক থেকে একটা তীব্র বায়ুপ্রবাহ শুরু হয়। হালকা বৃষ্টিপাত দেখা যায়। ওই সময় মানব সৃষ্ট আলোর ফলে একটা ভোর হবে হবে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই পরিবেশে পাখিরা নীড় ছেড়ে বেরিয়ে আসে এবং প্রায় ১ কিলোমিটারের মধ্যবর্তী একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল জুড়ে ওড়াউড়ি শুরু করে। বাতাসের ঝাপটার ফলে তারা ঠিকমত উড়তে পারে না এবং বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কিছু পাখি গ্রামবাসী মেরে ফেলে আর কিছু পাখি অনাহার ও আঘাতে মারা যায়।

আর ওই নির্দিষ্ট সময়ে এই ব্যাপারটি ঘটার প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য দুটি কারণ দাড় করিয়েছেন। প্রথমত ওই সময় একটি নির্দিষ্ট আবহাওয়া ও পরিবেশ বিরাজ করে যা পাখিদের প্রাণঘাতী করে তোলে। অপর কারণটি হল, ওই সময় ওই জায়গার ভূগর্ভস্থ পানির চুম্বকীয় শক্তির পরিবর্তনের ফলে এই ঘটনা ঘটতে পারে।

the Paradise Unexplored the Paradise Unexplored

বিজ্ঞানীরা এখনও এই বিস্ময়কর ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধান করে চলেছেন। জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে মানুষ দ্বারা আহত পাখির মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আসাম সরকার এই বিস্ময়কর ঘটনাকে পর্যটন খাতে প্রচারণার জন্য কাজে লাগিয়েছেন। ফলে এখন জাতিঙ্গায় ওই সময় প্রচুর পর্যটক ভীড় জমায়।