ঢাকা বিশ্ব-বিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ভবনের নিচতলায় দাঁড়িয়েছিলাম, ধাতব গ্রিল দিয়ে চোখ যায় সবুজ এক চিলতে বাগানে, সেখানে লাইন ধরে কিছু গাছ- ফুলের, ফলের, পাতাবাহারের। এক গাছের নিচে বৃষ্টির জল বিলুপ্ত হবার অপেক্ষায়। চারপাশের বিরল সবুজের মাঝে টলটল মরূদ্যান, যেখানে উঁকি দিলে দেখা যাবে এক টুকরো আকাশ, হয়ত সমান্তরাল কোন মহাবিশ্বের প্রবেশ পথ, অন্তত মানসিক ভাবে তো বটেই।

ইট-কাঠের এই পাঁশুটে শহরটা আপন করে নেই না আমাকে কোনদিনই, আমিও হৃদয়ের মণিকোঠায় তার জন্য হাহাকার বোধ করি না আজ পর্যন্ত। মানুষ ভাল লাগে, তাই বলে এত্ত মানুষ মানুষ, যেখানে তাদের ভিড়ে মানবতা উধাও হয়ে যায় , সেখানে স্বস্তি বোধ করি না। যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা ধূসর দালানের ভিড়ে উম্মুক্ত আকাশ ঢেকে গেলে হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায়, শৈশব থেকে নদীর প্রশস্ততা আর সবুজ দেখে চোখের অভ্যাস, এই শহরে কেন যেন খাবি খাওয়া মাছের মত মনে হয়। বিশেষ করে ঘাম চিটচিটে অবস্থায় ট্র্যাফিক জ্যামের মাঝে বেপরোয়া অসভ্য হর্ণের জ্বালায়।

তাই বিশ্ব-বিদ্যালয়ের সবুজ মহীরুহগুলো আসলে প্রশান্তি এনে দেয় দেহ-মনে। যদিও ঐ এক টুকরো ভূমির আকাশের কথা গোপনই ছিল, বোঝা যায় মনের মানুষের মতই মাঝে মাঝে তব দেখা দেয়, চিরদিন না। সেটার দিকে মূলত দৃষ্টি আকর্ষিত হল এক মেয়ে পাতি চড়ুই (House Sparrow) দেখে,

এক মেয়ে পাতি চড়ুই (House Sparrow)এক মেয়ে পাতি চড়ুই (House Sparrow)

সে সাবধানে ইতিউতি দেখে পানির কিনার অপেক্ষা করছিল হয়ত তৃষ্ণা পেয়েছে অনেক, যে গরম আর কাঠফাটা রোদ ! একাধিক চুমুকও দিল আলতো করে, তার পরপরই তিড়িং করে লাফ দিয়ে ঝপাং করে পড়ল জলের মাঝে! ব্যস, শুরু হয়ে গেল তার স্নানপর্ব! সে কী উচ্ছাস!

 স্নানপর্ব! সে কী উচ্ছাস! স্নানপর্ব! সে কী উচ্ছাস!

 

জলের নিচে মাথা নিয়ে যায়, এপাশ ওপাশ করে, আবার মাথা তুলে ঝাঁকুনি দেয়, চারিদিকে তাকায়, আবার ঝুপ ডুব! দেখে আমারই মনে হচ্ছিল কোন সবুজ পুকুরে যেয়ে ঝপাং দিই! ফুড়ুৎ করে উড়ে পাখিটা উঠে বসল দেড় হাত উঁচুতে এক গাছের ডালে, সেখানে কিচিরমিচির করতে করতে , ডানা ঝাড়তে ঝাড়তে চেষ্টা করল জলমুক্ত হবার যাতে ভারহীন হয়ে উড়ে যেতে পারে নীল গ্রহের অন্য কোন প্রান্তের।

সে যেতে না জাতেই হাজির এক বাংলা বুলবুল ( Red-vented Bulbul), চড়ুইয়ের তুলনায় বেশ বড়ই পাখিটা, কিন্তু হাপুস-হুপুস করে সেই ইঞ্চিখানেক গভীরতার জলে স্নান করতে কোন বাঁধা তৈরি করতে পারল না আগ্রহী পথিকের সামনে।

এক বাংলা বুলবুলএক বাংলা বুলবুল

ইঞ্চিখানেক গভীরতার জলে স্নানইঞ্চিখানেক গভীরতার জলে স্নান

হাপুস-হুপুসহাপুস-হুপুস

দুই ডানা উচিয়ে লেজ নামিয়ে ঝুপঝুপ ডুব দিয়ে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে চলল সে একইভাবে, তার সাথে যোগ দিল এক মেয়ে উদয়ী দোয়েল, আমাদের জাতীয় পাখি!

মেয়ে উদয়ী দোয়েলমেয়ে উদয়ী দোয়েল

মিলেমিশেমিলেমিশে

মিলেমিশে দুই ভিন্ন জাতের পাখি আরামে অবগাহন করে চলল চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকা এই অজানা মরূদ্যানে। বুলবুল উড়ে যাবার পরও মেয়ে দোয়েলটা স্বর্গসুখ উপভোগ করেই চলল কিছুক্ষণ,

স্বর্গসুখ উপভোগস্বর্গসুখ উপভোগ

সেই সময়ে কাছের ঝোপে উপস্থিত হল পাতি টুনটুনি (Common Tailorbird) , দেখে মন খুশী হয়ে গেল! এক রত্তি এই জায়গাতে, যেখানের কয়েক ফুটের মধ্যে লাখো লাখো মানুষ হট্টগোল করে বেড়াচ্ছে সারাদিন, সেইখানেও এই মিনিট পনেরর মাঝে উপস্থিত হল চার ভিন্ন ভিন্ন জাতের পাখি! স্নানের সন্ধানে, জল পানের সন্ধানে। আহা , এই শহর যেন এক বিশাল ধু ধু মরুভূমি, তাই-ই একরত্তি এক জায়গাতে খবর পেয়ে হাজির হয়েছে বিহঙ্গকূল।

স্নানের সন্ধানেস্নানের সন্ধানে

যদিও টুনটুনিটি কোন অজানা কারণে স্নানে মত্ত হল না আপাতত, উড়ে গেল কোন সঙ্গীর আহবানে বা অজানা শত্রুর ভয়ে। যদিও প্রকৃতিতে কোন জায়গায় ফাঁকা থাকে না, সেখানে হাজির হল এক ছেলে পাতি চড়ুই,

এক ছেলে পাতি চড়ুই,এক ছেলে পাতি চড়ুই,

তারই স্নানের নানা ভঙ্গিমার ছবি ফ্রেমবন্দী করতে করতে মনে হল- কতই বা বিস্ময় আমাদের চারপাশে, কতই না সুন্দর আমাদের বাসগৃহ এই পৃথিবীটা, কত স্নিগ্ধতা, কত ভাল লাগা, কত ভালবাসা ছড়ানো পথে পথে। কতই না সুন্দর এই নিস্ফল মানবজীবন, কেবল খুঁজে নেবার, উপলব্ধি করার অপেক্ষা।।

স্নানের নানা ভঙ্গিমাস্নানের নানা ভঙ্গিমা