বর্ষা মৌসুম স্থানীয় পাখিদের প্রজনন মৌসুম আর এই সময়টাতে পাখিদের বিচরন অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে বিধায়, বাংলাদেশের ১৫ টি সংরক্ষিত বনে ক্রেল- এর সহযোগিতায় বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব প্রতি বছর পাখিদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে গত মে ২০১৬ তে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমন পিপাসু অনুভাইকে সঙ্গে নিয়ে রওনা করলাম টেকনাফের উদ্দ্যেশে। কক্সবাজার অঞ্চলের পাঁচটি বনাঞ্চলে আমরা পাখিদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবো।

মে মাসের ১৪ তারিখ রাতের বাসে চরলাম পরদিন ভোরে পৌঁছুলাম ফাসিয়াখালী বন্যপ্রানী অভয়ারন্যে। কাজ শেষে গেলাম পাশেই মেধা-কচ্ছপিয়া  জাতীয় উদ্যানে। ধলাটুপি পেঙ্গা, সবুজ ঠোঁট মালকোয়া, গলাফোলা ছাতারে সহ বেশ কিছু পাখির দেখা পেলাম। খুব ভোরে কাজ শুরু করাতে ১১ টার মধ্যেই কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়েছি বিধায় চকরিয়ায় অবস্থিত ডুলাহাজরা সাফারী পার্কে প্রবেশ করলাম। বাডিং এর জন্য খুব চমৎকার জায়গা এটি। পার্কের ভিতরে খাঁচায় আবদ্ধ “পাখিশালায়” গিয়ে এক খাচায় দেশী সারস, ধলাগলা মানিক জোড়, রঙ্গিলা বক, কালামাথা কস্তেচড়া, ধূপনি বক মিলে মিশে খাচ্ছে। পাশের খাঁচাতেই ছোট মদনটাক। অন্য খাঁচায় রাজ ধনেশ, পাকরা ধনেশ এক খাঁচায় দেখে রাজ ধনেশ বনে না দেখার আক্ষেপ বাড়িয়ে দিলো।

যাই হোক, ডুলহাজরা পার্ক থেকে বেড়িয়ে কক্সবাজার হোটেলে অবস্থান করলাম। দুপুরের খাবার ও কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে গেলাম হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানে। প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু ৪৫ ডিগ্রি কোনে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে হয়। স্থানীয়রা বলে কাদা-ভাঙ্গা। তারপর চার হতে পাঁচ কিলোমিটার যেতে হয় উঁচু-নিচু পাহাড় পাড়ি দিয়ে। খয়ড়া টুপি ছাতারে, গলাফোলা ছাতারে, ধলা ভ্রু কাস্তে ছাতারে, ছোট কুবো, বনমোরগ, দাগি নাটাবটের দেখতে দেখতে এগুতে লাগলাম। পথিমধ্যে বন্য হতীর গোবর দেখতে পেলাম, মনে হল আজ সকালে হয়তো হাতী এই পথেই চলাচল করেছিল। বেশ কিছুদুর এগুনোর পর পেছন থেকে অনুভাই বলে উঠলো হাতী, দৌড়ান। আমার আর হাতীর দূরত্ব ছিলো ১০ হাতেরও চাইতেও কম। ঝোঁপের কারনে দেখতেই পাইনি। বুঝে না বুঝে দৌড় দিতে লাগলাম। আধা কিলোমিটার অতিক্রম করার পর পিছু ফিরে দেখলাম হাতী তাড়া করছে কিনা। বিপদমুক্ত মনে হলেও বাকীটা পথ না গিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।

পরদিন ভোরে সি.এন.জি করে রওনা করলাম ইনানী জাতীয় উদ্যানে। উুঁচু-নিচু পাহাড়, জরা-জীর্ণ বাঁশের সাঁকো পাড় হয়ে এগিয়ে চললাম। ঝোঁপ-ঝার গাছপালা কেটে, আগুনে পুড়িয়ে পাহাড়গুলো ন্যাড়া করে ফেলেছে অতি লোভী স্থানীয় লোকজন। ন্যাড়া আর সরু পাহাড়ের উপর  হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো, বড় কোন গাছপালা না থাকায় সূর্যেও প্রখরতাও একটু বেশী অনুভূত হয়। কষ্টে সমস্যা নেই, সমস্যা তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পাখিই এখানে নেই। পাহাড় থেকে নিচে নেমে এসে পাহাড়ে বসবাসকারী একটি পরিবারের বাড়িতে জলপানের বিরতি নিলাম। ভদ্রলোক এনে দিলেন শরবত আর সাথে গাছের মিষ্টি পাকা আম। খেয়ে বিদায় নিয়ে ফিরে গেলাম। দুপুরে গেলাম টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। হোয়াইকোং ক্রেল কর্মকর্তা  নাজমুল আবেদীন ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নিলাম। কাজের স্বার্থে এইখানে থাকলে সুবিধা হয়  (ভোরে সাইটে পৌঁছানো যায়)। আর এখানে ব্যবসায়িক কোন হোটেল নেই, খাবারেরও তেমন ব্যবস্থা নেই। বিকেলে গেলাম কদুম গুহা। কাজ শেষ করে পরদিন গেলাম টোংগা পাহাড়। টেকনাফের কাজ শেষ করে কক্সবাজার হয়ে ঢাকা ফিরলাম ১৮ মে  রাতে।     

১৯ মে রাতের বাসেই রওনা করলাম বাংলাদেশের স্থানীয় মহা বিপন্ন পাখি কালা তিতিরের শেষ আবাসস্থল পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়ায়।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য সৌরভ ভাইয়ের আর্থিক সহায়তায় কালা তিতিরের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষনে স্থানীয় জনগনকে সচেতন করাই লক্ষ্য। এবারের সঙ্গী  ঘনিষ্ট বন্ধূ ফ্যালকন ফয়সাল। ঐ দিন ঢাকা ছিল যানবাহনে ঠাসা। এক ইঞ্চি নড়চরের জায়গা নেই। তাহের ভাইয়ের মটর সাইকেলের সৌজন্যে চিপ-চাপা, গলি হয়ে কোনরকমে বাস ধরতে সক্ষম হলাম। ভোরে পৌঁছুলাম তেঁতুলিয়া। লাগেজপত্র হোটেলে রেখেই কাজীপাড়া  চা বাগানে চলে এলাম। মূলত আখক্ষেত, চা বাগান ও আশে পাশের জমিতে কালা তিতির বিচরন করে। চা বাগান ও আখ ক্ষেতের আইলে বসে অপেক্ষা করছি হটাৎ চা বাগানের ভিতর থেকে লাফিয়ে আইলে এসে বসল দেশী  খরগোশ (Indian Hare)।

আমি  জীবনে প্রথম বুনো খরগোশ দেখলাম তাও আবার এতো কাছ থেকে। ছবি তোলার সুযোগ হাতছাড়া করিনি। এখন কালা তিতিরের প্রজনন সময়, পুরুষ পাখি সঙ্গীর খোঁজে অনবরত ডাকতে থাকে আর এতে বড় ঘাসের আড়ালে এদের উপস্থিতি আমরা সহজেই বুজতে পারি। কালা তিতির একসময় সারা বাংলাদেশে বিস্তৃত ছিল কিন্তু এখন শুধুমাত্র তেঁতুলিয়ার সীমান্ত ঘেষা কাজীপাড়া, দজিংপাড়া ও শরিয়ালজুত এলাকাতেই সিমাবদ্ধ। এবারের গননায় আটটি পরুষ ও দুইটি মেয়ে পর্যবেক্ষন করেছি। তেঁতুলিয়ার তিন দিকেই ভারত। একবারতো কালা তিতিরের পিছু  করেতে করতে নো-ম্যানস ল্যান্ড পার হয়ে কাঁটা তারের কাছে গিয়ে ইউরেশীয় মোটা হাটুর দেখা পাই। কৃষকরা সাবধান না করলে ভিসা ছাড়াই ভারত। পরদিন দুপুরে গেলাম জিরো পয়েন্ট বাংলাবান্ধা। তেঁতুলিয়াতে তিনদিন ছিলাম। কালো তিতিরি সহ হলদে চোখ ছাতারে, বউ কথা কও, দাগি বসন্ত, চোখ গেলো, পাকরা পাপিয়া সহ বেশ কিছু  পাখি দেখলাম।

বেশ কিছুদন যাবৎ পাখি দর্শক ও আলোকচিত্রীগনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহী জেলার পদ্মা নদীর বিভিন্ন চর। দূর্লভ ও বিরল  পাখিদের দেখা মিলছিলো প্রতিনিয়তই। ভাবলাম তেঁতুলিয়া যেহেতু আছি একবারে রাজশাহী  ঘূরেই যাই। ২৩ মে রাতের বাসে রওনা করলাম রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনাবাবগঞ্জ পৌঁছাই পরদিন ভোরে। আগেই অপেক্ষা করতে থাকা রাজশাহীর আলোকচিত্রী  তারিক হাসান ও শোভন ভাই  আমাদেও গাইড করে নিয়ে গেলো সেই  কাঙ্খিত চরে। ছোট ইঞ্জিন চালিত বোটে উঠে চরে নামা মাত্রই দেশী গাঙ্গচষার ঝাঁক দেখতে পেলাম। তবে নোয়াখালীর হাতিয়ার মত সংখ্যায় না হলেও রাজশাহীর জন্য অনেক, কারন আগে এখানে এদের তেমন দেখা যায়নি। বালির চরে কিছুটা এগোতেই নদীয়া টিটি ও ছোট পানচিল মাথার উপর উড়ে উড়ে ভয় দেখিয়ে সাবধান করছিলো আর এগাবেনা সামনেই আমাদের ডিম-ছানা পাছে নষ্ট না করে ফেলো।

আমরাও বুঝতে পেরে নদীর কিনারে পানি ঘেষে এগুতে লাগলাম।  দেশী গঙ্গচষার কয়েকটি মাথার উপর দিয়ে চক্কর খাচ্ছিলো দেখে বন্ধু ফয়সাল বললো, আমার ধারনা এদের বাসা আছে। একটু এগাতেই তেখতে পেলাম যে চারটি বালির উপর তা দিচ্ছে। আমাদের থামতে বলে ফয়সাল কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেশী গাঙ্গচষার  ৩ টি বাসায় তিনটি করে ডিম দেখতে পায়, পাশেই ছোট পানচিলের দুটি বাসায়ও তিনটি করে ডিম। কিছুটা দুরে কালোঠোঁট পানচিলের কমপক্ষে দুটো বাসা দেখতে পায়। কি দেখলাম! কিভাবে সম্ভব বুঝে উঠার আগেই দুইটি কালোপেট পানচিল উড়তে দেখলাম কিছুক্ষন পর এদের বাসাও আবিস্কার করলাম তিনটি ডিমসহ।

দেশী গাঙ্গচষা, কালোপেট পানচিল, কালোঠোঁট পানচিলের নিশ্চিত বাসা করার রেকর্ড বাংলাদেশে এই প্রথম। এতাদিন এদের পরিযায়ি গন্য করে এসেছিলাম। যা পরবর্তী গবেষনায় আরো নতুন মাত্রা যোগ করবে। আমাদের উপস্থিতিতে পাখিগুলো উড়ে যাচ্ছিল, ডিমসহ বাসা মা পাখি বেশীক্ষন ঢাকা রাখলে ডিমের ক্ষতি হতে পারে। এজন্য আমরা দ্রুত চর ত্যাগ করলাম। আমাদের দেখে নদী সাঁতরিয়ে ৪-৫ জন কিশোর এগিয়ে এসে বললো এখানে পাখির ডিম আছে। গত সপ্তাহে ঐ পাড়ার কয়েকজন ছেলে এসে অনেক ডিম চুরির করে নিয়ে গেছে। । ভাবলাম এরাই তাহলে প্রধান বাঁধা পাখিদের নিরাপদ ডিম ফুটানোর ক্ষেত্রে। এদেরকে প্রথমে বুঝালাম, যেন অন্যদের বোঝায়  যে, এটা অপরাধ, পুলিশও ধরে নিয়ে যেতে পারে। কয়েকজনের ছবিও তুলে রাখলাম ভয় দেখানোর জন্য। আমরা ফিরে এলাম ২৪-মে কিন্তু কৌতুহলী  কিশোরদের হাত থেকে এদের রক্ষা করাটাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরে অনেকেই নাকি ঐ চরে হন্যে হয়ে খুঁজেছে শুধু কালাপেট পানচিল ও নদীয়া টিটির বাসা ছাড়া অন্য কোন পাখির বাসার অস্তিত্ব পায়নি। জানিনা কোন সে কারন, তবে কি আমাদের আশংকাই সত্য হলো যে দুষ্টু ছেলের দল এস ডিম বাচ্চা নষ্ট করে গেছে নাকি অন্য কোন কারন!

খুশির সংবাদ দিয়ে লিখাটা শেষ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাখিদের এমন করূন পরিনতির কথা শুনে মনটাই খারাপ হয়ে রইল। পরের বছর আবার প্রজনন মৌসুমের জন্য অপেক্ষায় রইলাম আবার হয়তো এরা ফিরে আসবে এই চর সহ আশ-পাশের চরে, আর তদের জন্য কি আমরা পারি না কয়েকটা চর ছেড়ে দিতে বা সংরক্ষিত ঘোষনা করতে?? আর জোড় গলায় বলে উঠতে “পাখিরা সব বেঁচে থাক পৃথিবীটা জুড়ে থাক”।