পাখি দেখার ও ছবি তোলার নেশা জেঁকে বসার প্রথম থেকেই মুনিয়াদের প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করত, কেমন চঞ্চল সুন্দর ক্ষুদে পাখিগুলো, কিন্তু দুঃখজনক ভাবে তাদের সাথে পরিচয়ই হয়েছিল খাঁচায় দেখে দেখে! তারপর এখন তাদের খোঁজে আমার পথচলা প্রকৃতির মাঝে, নদীর চরে, ঘাস বনে।

তিলা মুনিয়াঃ  ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে রাজশাহীর  সিমলা পার্কে প্রথম বুনো অবস্থায়  তিলা মুনিয়ার দেখা পাই, এর আগে বিভিন্ন স্থানে খাঁচার ভিতরে বন্দি অবস্থায় এদের দেখেছি, উন্মুক্ত অবস্থায় পাখিটির চঞ্চলতা আমাকে এতোটাই মুগ্ধ করে যে, আমি ছবি তোলার কথা ভুলে গিয়ে তাদের দুরন্তপনা উপভোগ করতে থাকি। প্রায় ৩০মিনিট পর পাখিটি যখন স্থির হয়ে একটা ডালে বসে, তখন পাশ থেকে কে যেনো আমাকে বলে ,” ভাই, কি হলো? ছবি তুলছেন না কেনো!”, এরপর পাখিটির কিছু ছবি তুলি, ততক্ষনে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।

পরবর্তিতে সিমলা পার্ক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর আসে পাসে তিলা মুনিয়ার  সাথে অনেক বার সাক্ষাত হয়েছে ,আর প্রতিবার তাদের চঞ্চলতা আগে উপভোগ করেছি তারপর চেষ্টা করেছি তাদের চঞ্চলতাকে মুহুর্তকে ক্যামেরা বন্দি করতে।

তিলা মুনিয়াতিলা মুনিয়া

 

দেশি-চাঁদিঠোঁট - রাজশাহী শহরের অদুরে প্রেমতলিতে একটি ধানক্ষেতে ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর প্রথম এই পাখিটির সন্ধান পাই, ধানক্ষেতে এদের ছুটোছুটি  ডাকাডাকি সাথে হালকা বাতাসে এক মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করেছিলো। এই পাখিটিও অনেক চঞ্চল হলেও তবে এক সাথে অনেক গুলো থাকায় ক্যামেরা বন্ধি করতে তেমন একটা বেগ পেতে হয় নাই, এই বছরের জুন মাসে সিমলা পার্কের দক্ষিণে কাউনের ক্ষেতে আবারো দেশি-চাঁদিঠোঁটের দেখা পাই তবে অন্যান্য পাখিদের সাথে থাকায় চঞ্চলতার পরিমাণ অনেক বেশি ছিলো ।

দেশি চাঁদিঠোঁট দেশি চাঁদিঠোঁট

 

লাল-মামুনিয়াঃ  লাল-মামুনিয়ার দেখা পাওয়া  অনেকটা স্বপ্নের মতো ছিলো, ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর  পদ্মানদীর দক্ষিণে চর মাঝারদিয়ারে হঠাৎ করে চোখের সামনে লাল রঙ এর একটা পাখির দেখা মেলে, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে এক পলক দেখা দিয়ে উধাও হয়ে গেলো সে! অনেক সন্ধানের পর ঘাসের রাজ্যে আবার এক পলক দেখা পেলাম এবং বুঝতে পারলাম এটা বিরল লাল-মামুনিয়া কিন্তু আলো কমে যাওয়াতে ক্যামেরা বন্দি করতে পারলাম না, আফসোস আর মনের ক্ষুধা মেটাতে দুই দিন পর ১৮ নভেম্বর দুপুরে আবার চর মাঝারদিয়ারে গেলাম এবং বেশ কয়েকবার দেখা পেলেও মাত্র দুই বার ক্যামেরা বন্দি করতে সক্ষম হই এই লাল সুন্দরকে।

লাল মামুনিয়া লাল মামুনিয়া

কালামাথা-মুনিয়া ও খয়রা-মুনিয়াঃ  রাজশাহী পদ্মা নদী সংলগ্ন সিমলা পার্কের পশ্চিম দিকে কাউনের ক্ষেতে এই বছরের মে মাসে প্রথম কালামাথা ও খয়রা মুনিয়ার বড় একটা ঝাকের দেখা পাই, এতগুলো মুনিয়া এক সাথে এর আগে কোনোদিন দেখি নাই।

একটা  ঝোপের পাশে চুপ করে বসে পড়ি এবং পাখিগুলোর উপরে নজর রাখতে থাকি, পুরো কাউনের ক্ষেতটা যেনো তাদের স্বর্গরাজ্য, এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, কেউ কাউনের থোকা ধরে ঝুলছে কেউবা আবার ঝগড়াতে মেতে উঠেছে, নিজের চোখে না দেখলে সেই মুহুর্তকে বলে বোঝানো সম্ভব না।

নতুন পাখি পেলে আনন্দের পরিমানটা অনেক গুণে বেড়ে যায় কিন্তু এবার এক সাথে দুই প্রজাতির পাখি পেয়েছি, তাই আনন্দের পরিমাণটা অনেক অনেক গুণ বেশি ছিলো। পাখিদের সংখ্যা এতই বেশি ছিলো যে অল্প সময়ে ভালো ভাবেই তাদের মজার মজার সব মুহুর্ত গুলোকে বন্দি করতে সক্ষম হই । এই বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বরেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাসে এবং চর মাঝারদিয়ারে অনেকগুলো কালামাথা ও খয়রা মুনিয়ার দেখা পেয়েছি ।

কালামাথা মুনিয়া কালামাথা মুনিয়া

ধলাকোমর- মুনিয়াঃ  কাঙ্ক্ষিত ছয় মুনিয়ার ৫টি যখন রাজশাহীতে পেয়ে গেছি  দরকার ছিলো এর একটির আর সেটি হলো ধলাকোমর-মুনিয়া।

এই বছরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে জানতে পারি কুষ্টিয়া জেলার অদুরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ধলাকোমর- মুনিয়া দেখা গেছে । সপ্তাহ খানিক পরেই ২১ জুলায় সকালে ট্রেনে করে কুষ্টিয়াতে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে পৌছানোর আগে থেকেই তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়, যখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছালাম তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছে আর আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত পাখীপ্রেমী ছোট ভাই সব-ই-মেহের।

মেহের এর মাধ্যমে জানতে পারি মূল ফটক থেকে সামান্য একটু দূরে রাস্তার দুই পাশে ঝাউ গাছের ঝোপের ভিতরে ধলাকোমর-মুনিয়া বাসা করেছে , অপেক্ষার পালা শুরু হলো দুয়েকটা ধলাকোমর-মুনিয়ার দেখা পেলাম কিন্তু পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় ক্যামেরা বন্দি করার সুযোগ পেলাম না, কিছুক্ষণ পরেই বুঝতে পারলাম আজ কপাল আসলেই, আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ৩ টা বৃষ্টি থামার কোনো নাম নেই !

ভাবছি ফিরে যাবো, বাসে উঠবো উঠবো ঠিক তখন বিধি মুখ তুলে চাইলেন, বিকাল সোয়া চারটা নাগাদ হঠাৎ করে বৃষ্টি থেমে গেলো, রোদের দেখা মিললো তার কিছুক্ষন পরেই কাকতালীয় ভাবে দুইটি ধলাকোমর-মুনিয়া আমার সামনে ১৫ থেকে ২০ ফিট দূরের এক ডালে এসে বসলো , আর আমিও দেরি না করে কাঙ্খিত পাখিটিকে ক্যামেরা বন্দি করতে শুরু করলাম, প্রায় ১৫ মিনিট ধরে পাখী দুইটি গাছের ডালে ও মাটিতে ওঠা নামা করতে থাকলো আর সেই সাথে আমার ছয় মুনিয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিলো।

ধলাকোমর মুনিয়া ধলাকোমর মুনিয়া

আনন্দের সংবাদ এই যে এখন আর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হবে না এই বছরের আগস্ট মাসেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ধলাকোমর-মুনিয়া দেখা গেছে , রাজশাহীর পাখীপ্রেমীরা সোভাগ্যবান কারণ বাংলাদেশের ছয় মুনিয়ায় এখন রাজশাহীতে  দেখা যায়।