বাঁশবনের নিচে শুকনো পাতার জঞ্জাল। তার ওপর খসখস করে খাদ্য খোজে ছাতারে পাখির দল। ওদের ক্যাঁচম্যাচানিতে বিরক্ত হয়ে পাখি গুলোকে তাড়িয়ে আবার ছুটতাম শাহবুলবুলির পেছনে। আনমনে ওপরের দিকে মাথা উঁচু করে খুঁজছি। হঠাৎ আবার খসখস করে উঠলো শুকনো বাঁশপাতা। এবার আর ছাতারের দল নয়। কমলা-কালচে রঙের মেশানো একটা পাখি। দ্রুত পায়ে চলে গেল। তখন শাহ বুলবুলিকে বাদ দিয়ে এর পিছু নিলাম। কিন্তু না, কোথাই হাওয়া হয়ে গেছে।

গ্রীষ্ণে প্রায় এক মাস স্কুল ছুটি থাকত। আম খাওয়ার ছুটি। পোড়া শুকনো ঝালবাঁটা আর লবণ মিশিয়ে তৈরি মসলা নিয়ে ছুটতাম ভর দুপুরে মাঠ পানে। বাগান পাহারা দেওয়া আর আম খাওয়া দুই-ই চলত সমানে।

আপন মনে আমের ছায়ায় বসে গুনগুন করে গাইতাম। কিংবা ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করতাম। নির্জন মাঠে গায়ক আমি একা নই। নানা রকম পাখির কলতানে মুখর আমবাগান। পাশেই আমাদের বাঁশবাগানটা--হাজার পাখির আশ্রয়দাতা সে। বাগানের সবচেয়ে সুন্দর পাখি শাহবুলবুলি। সাদা ও কমলা--দুই রকমের। কমলাটা স্ত্রী সাদাটা পুরুষ। লাজুক এই পাখিটা তাদের লম্বা লেজের বাহার এক ঝলক দেখিয়েই কোথায় হারিয়ে যায়। আমি পিছু নিতাম। বাঁশঝাড়ের এ ডাল-ওডালে গিয়ে বসে শাহ বুলবুলি। আমার চোখ ফাঁকি দিতে পারে না।

বাঁশবনের নিচে শুকনো পাতার জঞ্জাল। তার ওপর খসখস করে খাদ্য খোজে ছাতারে পাখির দল। ওদের ক্যাঁচম্যাচানিতে বিরক্ত হয়ে পাখি গুলোকে তাড়িয়ে আবার ছুটতাম শাহবুলবুলির পেছনে। আনমনে ওপরের দিকে মাথা উঁচু করে খুঁজছি। হঠাৎ আবার খসখস করে উঠলো শুকনো বাঁশপাতা। এবার আর ছাতারের দল নয়। কমলা-কালচে রঙের মেশানো একটা পাখি। দ্রুত পায়ে চলে গেল। তখন শাহ বুলবুলিকে বাদ দিয়ে এর পিছু নিলাম। কিন্তু না, কোথাই হাওয়া হয়ে গেছে।

তারপরও খুব কাছ থেকে কানাকোয়া দেখার সৌভাগ্য হয়েছে বহুবার। অদ্ভুত পাখি। কখনও উড়তে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সারাদিন শুকনো পাতার ওপর ঘুরে ঘুরে পোকা খুঁজে বেড়ায়। ডাকটা কেমন? কোনওদিন খোয়াল করে শুনেছিলাম বলে মনে হয় না। এবার বাড়ি গিয়ে পেয়েছিলাম গোটা দশেকের দেখা। একবারে দুটোর বেশি দেখিনি। একা-পাখিই দেখেছি বেশি।

১ এপ্রিল। বিগত দশদিনে গ্রামে যেসব মেঠো পাখি দেখা যায়, সবগুলোরই ছবি প্রায় তুলে ফেলেছি। বাকি আছে কেবল হরিয়াল, শাহবুলবুলি আর কানকোয়া।

সকালে উঠেই শাহেদকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের নতুন আমবাগানে। কৈশরের সেই আম বাগানটা আর নেই। নেই বাঁশ বাগানটাও। সেখানে নতুন করে করা হয়েছে হিমসাগর আর আম্রপলির সম্বন্বিত বাগান। এই নতুন বাগানটাতে যেতে ইচ্ছে করে না। শৈশবের অজস্র স্মৃতিমাখা আম আর বাঁশবাগানটার জন্য বুকটা খাঁ খাঁ করে। নতুন আরেকটা আমবাগান লাগানো হয়েছিল উত্তর মাঠে। পুরোনো বাগানটা থাকা অবস্থায়। এই নতুন বাগানে বসেই কলেজ জীবনে পড়েছি পথের-পাচালী। পড়েছি আর চোখের জল ফেলেছি। তাই এই বাগানটার প্রতিও বাড়তি আকর্ষণ আছে।

ট্রাইপডে ক্যামেরা নিয়ে চললাম উত্তর মাঠের দিকে। আমাদের আমবাগানের পাশেই সাবেক চেয়ারম্যানের বিরাট এক আমবাগান। তার পাশে শাহেদদের আমবাগান। দুই আমবাগানের আইলে আমাদের এই নতুন আমবাগানটা। শৈশবে এখানো কার্পাস তুলার চাষ হতো। বৈশাখ-জ্যেষ্ঠ মুগ কিংবা পাট। চেয়ারম্যানের বাগানের পাশেই ছিল বিরাট একটা দেশি কুল গাছ। কুলের লোভেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই মাঠে পড়ে থাকতাম। তখন দেখেছি কানকোয়া আর ছাতারের অবাধ বিচরণ এই বাগানগুলোতে। তা-ই নয়, প্রায় ৪৪ প্রজাতির মেঠো পাাখির দেখা পেয়েছি এবার গাঁয়ে এসে। শুধু সরালি, বক আর জলকবুতর ছাড়া বাকি সব পাখিই এই তিন যৌথ বাগানে দেখেছি গত দশটা দিনে।

সুতরাং আমার বিশ্বাস ছিল কানকোয়ার দেখা এই বাগানেই পাবো। সকাল সাড়ে আটটার সময় বেরুলাম। পনেরো মিনিটের মধ্যে পেয়ে গেলাম আরাধ্য কানকোয়ার দেখা। ঠিক ছোটবেলায় যে জায়গায় দেখেছি একে, আজও তার উত্তর প্রজাতি এখানেই চরে বেড়াচ্ছে। শাহেদদের বাগানের ভেতর। আমাদের বাগানের আল ঘেঁষে।

এ কদিনে একটা বিষয় বুঝে গেছি। পাখিদের যদি বোঝানো যায় আমরা তার শত্রু নই, তবে সে আর উড়ে পালাবে না। সে বোঝানোটার ছাপ থাকবে আচরণে।

দূর থেকে কয়েকটা ছবি নিলাম। কিন্তু ছবিগুলো ভালো হয়নি। মাটিতে চরা পাখি। তাই ট্রাইপডের স্ট্যান্ড গোটানো ছিল। শাহেদকে বাগানের মাঝখানে দাঁড়াতে বললাম। নিজে নিজে ট্রাইপড সহকারে গুঁড়ি মেরে এগুচ্ছি। বাগানে মাটিতে কাটা নটেই ভরা। তাই পায়ে অসংখ্য কাঁটা ফোটার যন্ত্রণা সহ্য করতে হলো। কিন্তু ভালো ছবি আর তোলা হলো না। যে-ই ভাবছি এবার শটটা নিতে পারলে ভালো একটা ছবি পাওয়া যাবে তখনই কানকোয়া আমার আচরণে বিপদের গন্ধ পেল বোধহয়। জোর পায়ে ঢুকে পড়ল আমাদের আমবাগানের ভেতর।

আমাদের বাগানটা কাগুজে লেবুর গাছ দিয়ে ঘেরা। তাই ইচ্ছে করলেই যেখান-সেখান দিয়ে বাগানে ঢোকা যাবে না। তখনই বাগানের ভেতর থেকে ‘কুপ কুপ...কুপ’ শব্দ এলো। বেশ গুরু গম্ভীর ডাক। এতো দিনে স্পষ্ট হলাম কানকোয়ার ডাক কেমন। একটা ডাকতেই বাগানের পশ্চিম পাশ থেকে জবাব এলো আরেকটার। ওদিকটায় চেয়ারম্যানের বাগান। খোলা বাগান। তাই সেখানে দাঁড়িয়েই ছবি তোলা যেতে পারে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে খালি পায়ে চললাম। কোনও রকম শব্দ না করেই। এই কায়দাটা আমায় বেশ জানা আছে।

একটু এগুতেই দেখি আমগাছের ঢালু একটা ডাল বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে একটা বড় কানকোয়া। এটা ওদের স্বভাব। অন্য পাখিদের চেয়ে ব্যতিক্রম। অন্য পাখিরা সাধারণত এক গাছের এক ডাল থেকে আরেক ডালে যায় ছোট্ট একটা উড়াল দিয়ে। কানকোয়ারা বেশি ওপরে উড়তে পারে না। উড়ে বেশিদূর যেতেও পারে না বলে ওড়ার চেষ্টাও করে না তেমন। ওরা মাটি থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে গাছে ওঠে। তারপর লাফ দিয়ে এক ডাল থেকে আরেক ডালে যায়। শত্রু কাছাকাছি না থাকলে গাছের নীচু ডালেই চরে বেড়ায়। একান্তু প্রয়োজন হলে তবেই মগডালে ওঠে।

আমাকে দেখে মগডালে ওঠার পথেই বেশ কয়েকটা ছবি নিলাম। গত দশদিনে তোলা সবচেয়ে বড় ভূচর পাখি। আকারে ছোটখাটো একটা মুরগির মতো। তবে লেজ অনেক লম্বা। ৪২-৪৩ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এই পাখিগুলো। পাখিটা যখন তার পাখা এলোমেলো করে মাথা ঘুরিয়ে দাঁড়ার তখন যেন মনে হয়, সুকুমারের বই থেকে উঠে এসেছে বিখ্যাত হুকোমুখো।

পরম প্রার্থীত কিছু ছবি নিয়ে খোশ মেজাজে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন।
স্থানীয় নাম : আমাদের এলাকায় একে কুক্কো পাখি নামে চেনে লোকে। এর বেশ কিছু বাংলা নাম আছে। কুবো, বড় কুবো, কানকোয়া ইত্যাদি। টাঙ্গাইল এলাকায় একে আপাইকুতি নামে ডাকে।
ইংরেজি নাম : Greater Coucal
বৈজ্ঞানিক নাম : Centropus sinesis