আমাদের একটা বাঁশবাগান ছিল। সাথে একটা আমবাগান। আম পাহারা না দিলে চলে না। গ্রামে অপু-দুর্গার অভাব নেই। সে তুলনায় আমবাগান হাতে গুণে কয়েকটা। সুতরাং সার্বক্ষণিক একজন না থকলে চলে না। আমি থাকতাম। থাকতে ভালো লাগত। পাশেই মস্তবড় বাঁশবাগান। বাঁশবাগানের শুকনো পাতার ভেতর একটা রাতচরা পাখি প্রায়ই দেখি ঝিম মেরে বসে থাকে।

আমের ডালে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে কাঁচা আম খাই। দুপুরটা তেঁতে ওঠে। বৈশাখের লেলিহান শিখা খাঁ খাঁ করে খোলা মাঠে। বাগানের প্রশান্তির বাতাস। নির্জন দুপুর। জনবিরল মাঠ। দূরে কোথায় যেন চোখগ্যালো পাখি আর্তনাদ করে ওঠে। বউ কথা কও করুণ সুরে ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়। দূরে বহু দূরে। বেনে বউ হলুদ দূত্যি ছড়িয়ে আমপাতার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। তখনই হঠাৎ চোখে পড়ে এক ঝলক সাদা স্বপ্ন! বাঁশঝাড়ে সেই এক নজর দেখা শাহ-বুলবুলের। গাঁয়ের লোকেরা একে বলে সাহেব বুলবুলি। 

গাছ থেকে নেমে পিছু নিই পাখিটার। বড্ড চঞ্চল পাখি। আমার কৌতুহল মেটাতে তার বয়েই গেছে। আমিও ছাড়বার পাত্র নই। দুরন্ত ছেলেবেলা বলে কথা! পাখির পিছু পিছু সেধিয়ে যায় বাঁশঝাড়ের ভেতর। বৈঁচি আর বুনোকুলের কাঁটায় ছড়ে যায় গায়ের-পায়ের চামড়া। সেদিকে তাকাবার ফুরসৎ নেই। মন-প্রাণ-সত্ত্বাজুড়ে তখন সেই সাদা পাখিটা।

এসময় আকাশজুড়ে ঘুড়ি ওড়ে। বাতাসের ধ্বাক্কায় ঢেউ খেলে যাই ঘুড়ির লেজে। কীসের যেন একটা ভাললাগার অনুভূতি ভর করে বুকের গহীণ কোণে। বাঁশবাগানে সাহেব বুলবুলির লেজেও যেন ঘুড়ির লেজের ঢেউ। তবে আরও সাদা আরও মোহনীয় শাহ-বুলবুলের লেজ-তরঙ্গ। বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে। ভাললাগার ঢেউ। সুখ-স্বপ্নের মতো সেই অনুভূতি। 
সাহেব বুলবুলির লম্বা দুধের মতো সাদা লেজ। কালো মাথা, তারওপর  নীলের প্রলেপ। নীলচে কালো রাজকীয় ঝুঁটি। চোখটা আকাশের মতো নীল! পাখিটা যখন এক পলক দেখা দিয়েই হারিয়ে যায তখন মনে হয় এক ঝলক সুখ-স্বপ্ন বুঝি উড়ে গেল। নাকি এক টুকরো সাদা স্বর্গ?

মাঝে মাঝে খয়রা লেজের পাখিও দেখা যায়। একই চেহারা। শুধু পিঠ আর লেজের রঙ খয়রা। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন, সাদাটা যদি সাহেব বুলবুলি হয়, খয়রাটা তাহলে কী?

মা বলেছিলেন, ওটাও সাহেব। দুজতের সাহেব বুলবুলি আছে বনে। পরে কোনো এক বইয়ে পড়েছিলাম, কোনো কোনো পাখির স্ত্রী-পুরুষে রংয়ের তফাৎ দেখা যায়। আমি নিজের মতো করে ভেবে নিলাম, সাদাটা বোধহয় পুরুষ আর খয়রাটা স্ত্রী। একেবারে ভুল ধারণা। কারণ দুটোই পুরুষ। স্ত্রী পাখির লেজ লম্বা হয় না।  পুরুষ শাহ-বুলবুলের দুুটি পর্ব। খয়র ও সাদা পর্ব। চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত পুরুষ পাখি খয়রা পর্বে জীবন কাটায়। তারপর অনেক পুরুষের গায়ের খয়রা রংটা সম্পুর্ণ সাদা হয়ে যায়। কিন্তু কেন এমন হয় তা নিয়ে একাধিক মতামত থাকলেও সম্পূর্ণভাবে জানা সম্ভব হয় নি।

পাখির ছবি তুলছি দুবছর ধরে। এর আগে পাাখি সেভাবে দেখা হত না। তাই কৈশোর মাতানো পাখিগুলোর কোনো হদিসই জানতাম না। ঝিনাইদহের একেবারে সীমন্তবর্তী শ্যামকুড় গ্রামে আমার পৈত্রিক নিবাস। ছেলেবলাটা সেখানেই কেটেছে। পাখির ছবি তোলার নেশায় পরিণত হয়েছে এই গ্রামেই। প্রায় ষাট প্রজাতির ছবি তুলেছি এখান থেকে। কিন্তু শাবুলবুলির দেখা মিলছিল না। গতবছরের সেপ্টেম্বর থেকে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু ভুল সময়ে পাখি খুঁজলে তার দেখা পাওয়া ভার। তবুও কয়েকটার দেখা পেয়েছিলাম। কিন্তু সবগুলোর লেজ ছোট। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী আর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ উভয়েরই লেজ ছোটÑ একই চেহারা। তাই বার বার ছোট লেজের পাখি দেখে হতাশই হচ্ছিলাম। অবেশেষে নভেম্বরে খয়রা পর্বের পুরষ পাখির দেখা পেলাম। অনেক কসরৎ করে একটা ছবিও তুললাম। কিন্তু মনঃপুত হলো না। তাই প্রজনন ঋতুর অপেক্ষায় ছিলাম।

গ্রামে আমার কিছু সাগরেদ আছে। চাচাতো-খালাতো ভাইয়েরা আর ওদের পাখিপ্রেমী বন্ধু-বান্ধব। আমার সাথে ঘুরে ঘুরে ওদের পাখি দেখার নেশাটা জমে গেছে বেশ। আমি ঢাকায় থাকি বছরের বেশিরভাগ সময়। তখন ওরাই গাঁয়ের মাঠে, ইছামতী নদীর ধারে, ঝোপে-জঙ্গলে সাবধানে নজর রাখে। যখন যেখানে যে পাখির হদিস পায়, ফোন বা ফেসবুকের মাধ্যমে আমাকে জানায়। 

গত মে মাসে ওরা একটা শাহ-বুলবলের বাসার হদিস পেয়েছিল ইছামতী কোল ঘেঁষে। আমি কালক্ষেপণ না করে গ্রামে ফিরে গেলাম। ছোট্ট একটা কাঁঠাল গাছে বাসা বেঁধেছে একজোড়া শাহ বুলবুল। মাটি থেকে মাত্র সাড়ে সাত ফুট উঁচুতে। পাশেই একটা আম বাগান। সেখানে বসেই দূর থেকে নজর রাখলাম বাসাটার ওপর। বাসার খুব কাছে গিয়ে ওদের বিরক্ত করতে চাই না।

ছোট্ট বাটির মতো বাসা। এর চেয়ে ছোট বাসা এদেশে বোধহয় টুনটুনিরই আছে। এতটুকু বাসায় এতবড় পাখির ছানা আঁটবে কী করে? আসলে পাখির লেজটাই বড়। শরীরটা নিতান্তই ক্ষুদ্র। ছানাদের তো লেজ থাকে না। তখন ওদের অতি সামান্য দেহ। দিব্যি দুটো ছানা এঁটে যাবে বাসায়।

স্ত্রী পাখিটা তা’ দিচ্ছিল। ক্যামেরা জুম করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বাসাসহ পাখিটার ছবি নিলাম। তারপর পুরুষ পাখির জন্য অপেক্ষা। ওটা আশপাশে ছিল না তখন। কতক্ষণে আসবে কে জানে।

একটা হাঁড়িচাঁচার ডাক শুনলাম। গাছে গাছে সাড়া পড়ে গেল। বুঝলাম আশপাশে  অনেকগুলো পাখির বাসা আছে। অবশ্য শাহ-বুলবুলের বাসা একটাই দেখলাম। তখন পুরুষ বুলবুলিটাও বেরিয়ে এলো কোত্থেকে। লম্বা বাহারী খয়রা লেজে ঢেউ খেলিয়ে তেড়ে গেল হাঁড়িচাঁচার পানে। একজোড়া কমলা দামা, একটা বেনেবউ আর একজোড়া বাংলা বুলবুলও যোগ দিয়েছে হাঁড়িচাঁচার সাথে যুদ্ধে। শেষমেষ সকলে মিলে সেটাকে বাগান থেকে তাড়িয়ে ছাড়ল।

যুদ্ধজয়ের পর পুরুষ বুলবুলিটা ফিরে এলো বাসায়। স্ত্রীটা তখন সরে গেল। পরের দশ মিনিট লম্বালেজি পুরুষটা তা’ দিতে শুরু করল। পূরণ হলো আমার আশা। সাধ মিটিয়ে ছবি তুললাম পুরুষটার। কিন্তু তখনও একটা আক্ষেপ রয়ে গেল। সাদাটার দেখা কি পাব? সেটা তো বিশ বছর দেখিনি!

পরদিন মা বললেন, সাদা সাহেবকে দেখা গেছে নদীর ধারে। মনে একটু বল পেলাম। দুপুর পেরোনোর সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়লাম ক্যামেরা নিয়ে। নদীর ধার পর্যন্ত আর যেতে হলো না। বাড়ি থেকেই বেরিয়েই একটা আমবাগান আছে। সাথে কিছু সেগুন, শীরিষ, মেহগনি গাছ আর একটা বাঁশঝাড় আছে। হঠাৎ একট সাদা বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে বেরিয়ে এলো সেগুন পাতার আড়াল থেকে। কতদিনের না দেখা সাধের সাদা সাহেব! বুকের ভেতর আনন্দের হিল্লোল উঠল। স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনও পাখি বসে আছে। নাকি এক টুকরো সাদা স্বপ্ন! ক্যামেরা তাক করে যেন-তেনভাবে একটা ক্লিক! দ্বিতীয় ক্লিকের আর সুযোগ পেলাম না। উড়ে চলে গেল ইছামতীর ঠিকানায়। আন্দাজের ওপর ভর করে অনেকদূর পর্যন্ত গেলাম। কিন্তু পাখিটাকে আর পেলাম না। তবে স্থির বিশ্বাস আশেপাশেই থাকে পাখিটা।

পরদিন একই সময়ে একই বাঁশঝাড়ে আবার দেখলাম পাখিটাকে। সাহেবি কেতায় বসে আছে কঞ্চির ওপর। লেজের আগাটা বসে আছে আরেকটা কঞ্চির ওপর। সে এক নৈস্বর্গিক দৃশ্য! পর পর দুটো ক্লিক। তারপর একটু সরে গিয়ে আরেকটা কঞ্চিতে বসল। সেখানেও দুবার ক্লিক শব্দ উঠল ক্যামেরায়।