ঢাকা থেকে তেঁতুলিয়ার পথ প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার। এ পথেই আমাদের পুরোটা দিন কাটল। সারা পথে লোকালয় আর মাঠ দেখলাম। সব মাঠেই ধান চাষ করা হয়। ক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতে যেতে সারা দিন কোনো পাখির দেখা নেই। ফসলে কীটনাশক দেবার ফলে ক্ষেতে আর পোকা জন্মায় না। ফলে পোকাখেকো পাখিদের আর মাঠে পাওয়া যায় না। তবু আমরা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলাম পাখি দেখার আশাতেই। আশা আছে আমরা তেঁতুলিয়া গিয়ে শেখ ফরিদের দেখা পাব। পঞ্চগড়ে রাত কাটিয়ে সাত-সকালে আমরা তেঁতুলিয়া হাজির হলাম।

বর্ষার চকচকে সবুজ চা বাগান, শেষ রাতের বৃষ্টির পর এখন আকাশ ঝরঝরে। তেঁতুলিয়ার সীমান্ত গ্রাম কাজীপাড়া। ভারতীয় সীমানার বাতিগুলো তখনও জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সমতলের এই চা-বাগানটি প্রায় জনমানবশূন্য। হঠাৎ করেই ‘পান-বিড়ি-সিগেরেট’ ডাক কানে ভেসে আসলো। না, এটা আসলে কোন হকারের আওয়াজ নয়। একটি পাখির ডাক। নাম তার কালা-তিতির। স্থানীয় মানুষ বলে ‘শেখ ফরিদ’। আমারও প্রিয় নাম শেখ ফরিদ। অনেকবার শেখ ফরিদের খোঁজে কাজীপাড়ার চা-বাগানে ঘুরেছি। এর অদ্ভুত ডাক ‘পান-বিড়ি-সিগেরেট’ বার বার কানে ভেসে এসেছে; কিন্তু চোখে দেখা কখনও হয়নি। এবার আবার এসেছি তাকে পাবার আশায়। এবার সে আমাকে ধরা দিল, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য।

কাজীপাড়ার অনীল বাবুর সাথে কথা হল। তিনি সত্তর বছর আগে কাজীপাড়া এসেছেন। কেমন ছিল সে সময়ের কাজীপাড়া! তার কথা আর চোখ-মুখের ভাষা পড়ে বোঝা যায় কী অদ্ভুত সুন্দর একটি জঙ্গল ছিল এ এলাকায়। সন্ধ্যা দূরের কথা, বিকেলেই মানুষ গৃহে আশ্রয় নিত। রাতে এলাকাটি থাকত বাঘের দখলে। চিতা-বাঘের বড় আস্তানা ছিল এখানে। সে জনপদে এখন শুধু মানুষেরই বাস। অনীল বাবুর চোখের সামনেই সব হারিয়ে গেছে। জঙ্গল কেটে হয়েছে বসতবাড়ি আর বাজার; তারপর চা বাগান। সে প্রজন্মের সেই গভীর জঙ্গলটি এখন বড় বড় আঁখ-ক্ষেত আর চা-বাগানে পরিণত হয়েছে। সেই চা-বাগানেই কাজ করে দিন কাটান অনীল বাবু।

বাংলাদেশে বিরল পাখি শেখ ফরিদেরও শেষ আশ্রয় এই কাজীপাড়া। মাত্র ২০ জোড়া হয়তো কোন রকমে টিকে আছে এ গ্রামে। যে কোন মূহুর্তে হারিয়ে যেতে পারে এরা। এভাবে বললে হয়তো প্রিয় পাখিটিকে অসম্মান করা হয়। কিন্তু বলার তো আর কোন ভাষা নেই। একটা প্রাণী বাংলার মাটি থেকে চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে আর তা বলার কেউ নেই। সামান্য এক চিলতে জায়গাও তাদের জন্য আমরা ছেড়ে দিতে পারলাম না!

কাজীপাড়া থেকে ফেরার পথে গেলাম ‘মারেয়া’। দেবীগঞ্জের করতোয়া পাড়ের মারেয়া গ্রামটি বেশ ছিমছাম। প্রতিটি বাড়ি পরিপাটি। নদীপাড়ের মানুষের বসতবাড়ির পাশে বাঁশঝাড় আর ফলের বাগান। মনে হলো গ্রাম ভর্তি পাখি। বগুড়ায় দেখা মরা করোতোয়া এখানে এসে শান্তির পরশ দিচ্ছে। নদীর পাড়ে ছোট ছোট গর্তের ভেতর শত শত পাখির বাসা। বেশিরভাগ গাঙ-শালিক আর নীললেজ-সুইচোরার বাসা। স্ত্রী-সুইচোরাগুলো গর্তের বাসায় ঢুকে আছে। আর পুরুষ সুইচোরাগুলো মুখে ফড়িং নিয়ে বাসার বাইরে অপেক্ষা করছে। 

ছোট্ট এই গ্রামটিতে পাখির ছোট ছোট শত্রুও আছে। কিশোরের দল হৈ-হুল্লোড় করে নদীতে সাঁতার কাটে। কেউ কেউ আবার গর্তের ভেতর থেকে পাখির ছানা বের করে নিয়ে আসে। তবে তা ঘটে কালেভদ্রে। গ্রামের কিশোরদের কাছেই জানলাম, ‘পাখি মারলে আল্লাহ গুনা দেয়’। হয়ত এ সব বিশ্বাসের বলেই এই পাখিগুলো নদীতীরে আরও কিছুদিন টিকে থাকবে।

বেশিরভাগ পাখিরই প্রজনন ঋতু হলো বর্ষা। সাজ সাজ রব এখন চারপাশে। প্রাণীজগতের মধ্যে পাখিরাই বেশি সাজে। পুরুষ পাখির সাজগোজ স্ত্রীর চেয়ে সবসময়ই বেশি। পুরুষ শাবুলবুলিকে দেখুন। কী লম্বা লেজ তার! দুধের মতো সাদা পাখি। স্ত্রীটি লাল-রঙা। মারেয়া গ্রামে এবার দেখলাম শাবুলবুলির বিচিত্র এক সাজ! পুরুষ পাখির সাদা শরীরে কিছু কিছু সোনালি রং। হয়তো সাদা রং বদলে পুরুষ পাখিরা ক্রমান্বয়ে লাল হচ্ছে।

মারেয়া ছেড়ে আমরা এলাম দিনাজপুরের সিংড়া জাতীয় উদ্যানে। বন বলতে উত্তরবঙ্গে আছে ছোট্ট কয়েকটি শাল-বাগান। আদি শালবন আর নেই; আছে কাটা গাছের গোড়া থেকে গজিয়ে ওঠা তরুণ বৃক্ষের ছোট ছোট বাগান। তারপরও এই বাগানগুলো বর্ষায় হয়ে উঠে পাখিদের বড় আশ্রয়। সূর্যের আলো পড়া সিংড়া বনের সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সোনালি সবুজের এক ভালাবাসার রংয়ে যে কেউ পুলকিত হবেন। সেই সঙ্গে যদি থাকে শালবনে গ্রীষ্মের অতিথি দেশি-শুমচা। শীতের শেষে পাতা-ঝরা এই বনে তাদের আগমন ঘটে। পাপিয়ার মতোই গ্রীষ্মে তিন প্রজাতির শুমচা আসে আমাদের দেশে বাসা বাঁধতে। বর্ষা নামার সাথে সাথেই পচা পাতার নিচে পোকা জন্মায়। পোকা যত বেশি, তত বেশি দেশি-শুমচার বিচরণ। হরহামেশাই এখানে শুমচাকে ডাল থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে নামতে দেখলাম।

সিংড়া শালবাগানটি দেশি-শুমচার বড় আশ্রয়স্থল। মানুষের আনাগোনা কম বলে পাখির শোরগোল বেশি। তারপরও কে জানি বললো, বনটি খালি খালি লাগছে। এ এলাকার মানুষ বাগানের গাছ চুরি না করলেও পাতা চুরি করে। আর তাতেও ক্ষতি কম হয় না। বনের মাটিতে পাতা না পচলে পোকা জন্মায় না; আর পোকা না থাকলে এ বনে বেশি দিন আর শুমচাদের দর্শন মিলবে না।