মোটরবাইক চালিয়ে তালবাড়িয়া ঘাট থেকে ফিরে যাচ্ছি কুষ্টিয়া শহরের দিকে। বেশ কিছুটা পথ পেরিয়ে ত্রিমোহনী পার হয়ে কদমতলা মোড় ছেড়ে এগিয়ে যেতেই দেখি বেশ কিছু মানুষের জটলা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু জটলা, গোল হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে নিচের দিকে কী যেন দেখছে। একটু থেমে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম: ‘এখানে ভিড় কিসের, কী দেখছে সবাই?’ উত্তরে একজন আঞ্চলিক ভাষায় বলল: ‘মিঠু পাখির ছাও ব্যাচ’চে, কেনবেন?’ বাইকটি রাস্তার পাশে রেখে জটলার দিকে এগিয়ে গেলাম। বেলা বেশ বেড়েছে, চৈত্র মাসের কাক-মরা রোদে রাস্তা তেঁতে আছে। এত রোদেও মানুষের জটলা ভাঙছে না। ঠেলাঠেলি করে কোন রকমে জটলার মধ্যে মাথা গুঁজে দিতেই দেখি খাঁচার মধ্যে বেশ কিছু টিয়া পাখির ছানা। সবে পালক গজাতে শুরু করেছে, কোন কোনটির আবার পালক সম্পূর্ণ গজিয়ে গেছে। যে ছানাগুলো একটু বড় তাদের সবুজ ডানায় রক্তজমা লালচে আভা দেখা যাচ্ছে। বুঝতে বাকী রইল না আসলে এগুলো সবুজ-টিয়ার ছানা নয়। ছোট বালকেরা দর-দাম করছে। পাখি বিক্রেতা পাঁচশ টাকা দাম হাঁকাচ্ছে। এরই মাঝে তিনশ এমনকি দুইশ টাকাতেও বেশ কয়েকটি ছানা বিক্রি করেছে বিক্রেতা। আমি যখন খাঁচার মধ্যে থাকা ছানার কাছাকাছি যেতে পারলাম তখন পেলাম মাত্র দশটি।


ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে চিনতে কষ্ট হলো না চন্দনা-টিয়ার ছানাগুলোকে। চন্দনা-টিয়া বর্তমানে বাংলাদেশে বিরল আবাসিক পাখি বলে বিবেচিত। তাহলে ছানাগুলো কোথায় পাওয়া গেল! পাখি বিক্রেতাকে প্রশ্ন করতেই জানালো, মেহেরপুরের আমঝুপির আশ-পাশের কড়ই ও নারকেল গাছের গর্ত বা ফোঁকর থেকে এদের ধরে আনা হয়েছে।

কুষ্টিয়াতে পাখি-শিকারি ও শীতের পরিযায়ী পাখি বিক্রেতাদেরকে আমরা প্রতিরোধ করছি প্রায় দশ বছর ধরে। এরই মধ্যে অনেক শিকারিকে বোঝাতে পেরেছি যে পাখি শিকার ও বিক্রয় বেআইনি। যারা শোনেনি তাদের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়েছি।


চন্দনা-টিয়ার ছানা বিক্রেতা বলল, ‘এসব পাখি আমি ধরিনি। গ্রামের ছেলেরা পুরোনো নারকেল ও কড়ই গাছের ফোঁকর থেকে ছানাগুলো ধরে এনে আমার কাছে বিক্রি করেছে।’ বাড়ি কোথায়? জানতে চাইলে বলল, ‘মেহেরপুর। কুষ্টিয়াতে এর চাহিদা আছে বলে এখানে বিক্রি করি।’ আমরা বললাম, ‘এটা বিরল প্রজাতির পাখি। এই পাখি যার কাছে থাকবে তাকেই জেলে যেতে হবে।’ সে বলল, ‘ভাই, আমি আর পাখির ব্যবসা করব না।’

পাখির ছানাগুলো আমার প্রতিবেশীর কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি প্রায় দেড় মাসের মধ্যে ১০টি ছানাকেই বড় করে তোলেন। তখন ছানাগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয়। আশা করি পাখিগুলো প্রকৃতিতে বেঁচে থাকবে।