একটা দিন যেন স্মৃতির পটে লেখা হয়ে গেল। যখনই পাখি দেখি তখনই যেন মনে হয় আহা কাছে যেতে পারলে হাত দিয়ে আলতো পরশে আদর করে দিতাম। বলতাম “যা এবার অনেক দূরে , যেখানে তোদের কেউ জ্বালাবে না, শিকার করবে না। যখন এদেশ তোদের নিরাপদ মনে হবে তখনই ফিরিস। অপেক্ষায় থাকব আবার একদল ডানা মেলা পাখি দেখার’’। মনের গহিনের আকুতিটি পূরণ হয়েই গেল। বুনো হাঁসের ডানায় ভর করেই যেন ইচ্ছেটা  চলে এল আমার কাছে। তাও আবার নাকি প্রথমবারের মত হাঁসের পায়ে রিং পরানোর মত বেপার হয়ে। কি সৌভাগ্য!! ছুটে চললাম সব ফেলে শুধু এই নেশায় যে ওদের পর্শ করব। সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আনুসাঙ্গিক সবকিছু নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। 

দিনটা ছিল ৫ জানুয়ারী, মঙ্গলবার । যেতে হবে টাংগুয়ার হাওড়ে। শীতের পাখি সবথেকে বেশি দেখা যায় যেখানে। পথে আমাদের চারবার গাড়ির চাকা পাংচার হল। সে কি দুর্গতি। গাড়ির অবস্থাও বেহাল। মনে হচ্ছিল যেন উড়ে চলে যাই। কোনোরকম সারাদিন পর আমরা যেয়ে রাত ১০ টায় পৌঁছলাম সুনামগঞ্জ।  পরদিন ভোরে চলে গেলাম নির্দিষ্ট স্থানে যেখানে আমরা পাখিদের থেকে নানা তথ্য ও উপাত্ত সংরাহ করব। এবারে সেই মোহময় ক্ষণ এসে উপস্থিত হল। প্রথমেই যে হাঁসটি হাতে এল তা হল আমাদের দেশি হাঁস  বালি হাঁস। হাতে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখা হল, রিং পরানো হল, মাপজোক করা হল এবং এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পরীক্ষার জন্য স্যা¤পল নেয়া হল। সব ধরনের পর্যবেক্ষণ করা শেষে হাঁসটিকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করে দেয়া হল। একে একে আরও কিছু বালিহাঁস , লালঝুটি ভূতিহাঁস, মরচেরং ভূতিহাঁস, পাতি-কুট, পিয়াং-হাঁস, গিরিয়া হাঁস, পাতি তিলি হাঁসের থেকে সকল উপাত্ত নিলাম। 

বালিহাঁসের চঞ্চূ  যে একবার দেখেছে সে কখনই ভুলবেনা তার রঙের বাহার, চঞ্চূর মাথায় হলুদের শেড, আর গোঁড়ায় কমলা। পুরুষে কমলাটা গাড় হয়। লালঝুটি ভূতিহাঁসের পুরুষটিকে আমার ভীষণ লেগেছে। তার মধ্যে যেন এক রাজা রাজা ভাব আছে। গোলাপি ঠোঁট আর লাল রঙ্গা মাথা অন্য রকম আভিজাত্য। পিয়াং-হাঁসের গায়ের নকশা গভীর ভাবে দেখে বুঝলাম যে এই নকশা দিয়ে মেয়েদের জামায় করা নকশার সাথে সহজেই টেক্কা দেয়া যাবে। সবচেয়ে যে কথাটি উল্লেখ না করলেই নয়- পাতি কুটের পায়ের আঁচড়ের কথা। বাপরে তার আঁচড়ে চামড়া খুবলে যাবার মত। সেই সাথে তার ঠোকর।  

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বা তার থেকেও বেশি সময় লেগে গিয়েছিল মাত্র ২০ টি হাঁস থেকে সমস্ত উপাত্ত সংগ্রহ করতে। রোদে, গরমে আর ক্ষুধায় আমাদের একাকার অবস্থা। অবশেষে কাজ সুষ্ঠু মত শেষ করে আবার ধাকার পথে চললাম। আমরা ছিলাম ৫ জন- আমি, দিপু ভাই, সাকিব, আশিষ আর অনিক। ফিরে আসার পথে আবার সেই গাড়ি নিয়েই বিড়ম্বনা। অবশ্য সব কিছুর কথা ঢাকা পড়েছিল সেই হাঁসেদের হাতে নিয়ে থাকা সুখময় ক্ষণের আড়ালে।