এই গ্রীষ্মে মাঝে যে কদিন স্বেচ্ছা বনবাসে যেয়ে নিঝুম বনের মাঝে কুঁড়েতে ছিলাম, সেখানে প্রায় ২৪ ঘণ্টায় কোন না কোন পাখি ডাকত, উত্তরের গ্রীষ্মের রাত তো আর আঁধার ঢাকা হয় না, তারপরও একটু আবছায়া মত আসলেই প্যাঁচার ডাক শোনা যেত, আর এক মাথা খারাপ কোকিল দিন নেই -রাত নেই কুক্কু কুক্কু করেই যেত। এদের সবার মাঝে আলাদা করে নজর কেড়েছিল এক জোড়া ইউরেশীয় পাকরাচুটকি , ( European Pied Flycatcher, Ficedula hypoleuca)কাঠের বাড়ীতে তারা থাকত, নিয়মিত মিয়াঁ-বিবি মিলে খানিক পরপরই রসালো পুষ্ট সব পোকা নিয়ে আসত সদ্য ডিম ভেঙ্গে বেরোনো ছানাদের জন্য, ভেবেছিলাম- বাহ, আদর্শ সংসার জীবন বোধ হয় একেই বলে, পরিশ্রমী দম্পতি! দুজনেই সমানে খেটে যাচ্ছে ছানাদের মানুষ থুড়ি পাখি করার জন্য।

সাধারণত বসন্তকালে ছেলে পাকরাচুটকি মেয়েটির ১ বা ২ সপ্তাহ আগেই প্রজননের উপযুক্ত স্থান বাছাই করে, নিজের এলাকা চিহ্নিত করে গান গেয়ে গেয়ে সেটিকে রক্ষা করে। সব ঠিক মত চললে সঙ্গিনীর দেখা মেলে, শুরু হয় বংশবৃদ্ধির পালা। বিবি পাখি ৪ থেকে ৭ টি ডিম পাড়ে, এবং অধিকাংশ ক্ষুদে পাখির মতই মেয়েপাখি একাই ডিমে তা দিয়ে থাকে। ১৩-১৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বাহির হয়। ছানা ভূমিষ্ঠ হবার পর থেকেই বাবা-মা দুইজন মিলেই খাবার যোগায়।

বাড়ী ফিরে এই চমৎকার গায়ক দম্পতিদের নিয়ে একটু পড়াশোনা করতে যেয়েই জানা গেল চাঞ্চল্যকর তথ্য, যার প্রেক্ষিতে এই পোস্ট

মেয়ে পাকরাচুটকি যখন দুই সপ্তাহ ধরে ডিমে তা দিতে থাকে, তখন পুরুষপ্রবরটি অন্য মেয়ে পাকরাচুটকির সাথে প্রেমঘন সম্পর্ক পাতিয়ে বসে! সেই খানেও আগমন ঘটে বংশবিস্তারের প্রতীক ডিমের! এবং যখনই প্রথম বিবির বাচ্চা ডিম ফুটে বাহির হয়, ছেলে পাকরাচুটকি তার পরের প্রেমিকাটিকে ছানাসহ সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে ১ম পরিবারের দায়িত্ব নিতে চলে আসে!

পাখিদের মাঝে দ্বিগামিতা বা বহুগামিতা বিরল কিছু নয়, অনেক প্রজাতির পাখিদের মাঝেই এই জিনিসটি দেখা যায়। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুই পাখিই এটি জেনে থাকে, একই এলাকাতে ২টি মেয়ে পাখি এভাবেই বাস করে এবং পরস্পরের উপস্থিতি এবং বাসা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।

কিন্তু পাকরাচুটকির ব্যতিক্রমী ব্যাপারটি হচ্ছে- ছেলেপাখি সবসময়ই তার পরের প্রেমিকা বনের অন্য অঞ্চলে খুঁজে বাহির করে, যা সাধারণত তার আসল বাড়ী থেকে ২ কিলোমিটার দূরে হয়ে থাকে, যা এই পাখিদের জন্য বিশাল এক দূরত্ব! ফলে যেটি হয়ে থাকে, প্রথম স্ত্রী পাকরাচুটকি যেমন পরের মেয়েটি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে না, তেমন প্রেমিকা পাকরাচুটকিটিরও তার পুরুষপুঙ্গবের পরকীয়াময় সংসার জীবন সম্পর্কে কোন ধারণাই থাকে না !

তথ্যসূত্র- Extreme Birds