জৈষ্ঠ্য মাসকে বলা হয় মধুমাস, প্রধান কারন বাজারে প্রিয় ফল আমের আগমন। বলার অপেক্ষা রাখে না স্বাদের কারনে আম অনেকেরই বিশেষ প্রিয়। আর আমাদের দেশে আম এবং রাজশাহী দুটো সমার্থক শব্দ।

সে অঞ্চলটি যে পাখি সম্পদেও এমন মধুময় তা আমার জানা ছিল না। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য খেয়াল করে আসছি প্রথম যেদিন সেখানে গিয়েছি তখন থেকেই, সেটি ছিল ১৯৭৪ সাল। তার পর যতবার গিয়েছি এর রুপের প্রতি মুগ্ধতা বেড়েছে। পাখির প্রতি ভালোবাসা জন্মানোর পর এ বিষয়টি চিন্তা এড়িয়ে গেছে, যে স্থানটির নৈসর্গিক শোভা এতো মনোমুগ্ধকর এবং পদ্মা সহ কয়েকটি চমৎকার নদী-বেষ্টিত, সেটি মনোরম পাখির রাজ্য হওয়াই স্বাভাবিক।

এবার এপ্রিলের রাজশাহী ভ্রমন সেই অজানা জগৎকেই উন্মোচিত করেছে। নদীর চর এবং তার উপরের বনাঞ্চলে রকমারি পাখিতো রয়েছেই, শহরেও আছে হরেক রকম পাখি। বিভাগীয় শহরটি বেশ বড়, গোছানো এবং অঞ্চলটি জনবহুল নয়, হয়তো সে কারনেই পাখিরা শান্তিতে বসবাস করতে পারছে।

গিয়েছিলাম মূলত: অনূজ-প্রতিম অপু-অণুর আলোকচিত্র প্রদর্শনী উপভোগ করার আমন্ত্রনে। গোপনে পাখি দেখার লোভও ছিল। ২১ এপ্রিল,২০১৬ সকাল ৬টায় কমলাপুর ষ্টেশন থেকে ছেড়ে আসা ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে বসি বিমানবন্দর ষ্টেশন থেকে। মাত্র ৬ ঘন্টায় রাজশাহী পৌঁছে যাই!

পরদিন খুব ভোরে আমরা নৌকায় করে দূরবর্তী একটি চরে যাই। পথে নদীতে দেখা হয় একজোড়া বড়-খোঁপাডুবুরীর সঙ্গে, এদেরকে এপ্রিলের শেষে দেখে একটু অবাক হই। এছাড়াও দেখলাম খয়রা-চকাচকি ও দেশি-মেটেহাঁস। চরে বেশ কিছু নীললেজ- সুইচোরার সঙ্গে সামনাসামনি সাক্ষাত ঘটে। দেখা হয় কিছু ধলালেজ-শিলাফিদ্দার সঙ্গেও। হট-টিটি বারবার মাথার উপর দিয়ে উড়ে জানান দিয়ে গেল এখন তাদের প্রজনন মৌসুম চলছে কাজেই আমরা যেন তার বাসার কাছে না ঘেষি। ফিরে আসার পথে চরের উপর দেখলাম অনেকগুলো ছোট-বাবুবাটান।

ঐদিন বিকেলে বড় কুঠি, পদ্মা গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হলো বেশ জমজমাট প্রদর্শনীর উদ্বোধন যাতে ছিল অপু-অণু দুই ভাইয়ের বিশ্ব ভ্রমনের এবং নিশাত মজুমদারের কিছু এভারেষ্টের আলোকচিত্র। সন্ধ্যাটি বেশ উপভোগ্য ছিলো। প্রসঙ্গত: উল্লেখযোগ্য, প্রদর্শনীর প্রাক-উদ্বোধন আলোচনায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পায় রাজশাহী শহরের কাছাকাছি চরগুলি পাখির অভয়ারন্য হিসেবে সংরক্ষণ করার। প্রধান অতিথি ছিলেন ঐ অঞ্চলের বিশিষ্ট স্বনামধন্য ব্যক্তি ও প্রাক্তন মেয়র জনাব খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহন করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেয়ার।

রাজশাহী বার্ড ক্লাবের চালিকা শক্তি কয়েকজন সদস্যর সঙ্গে পরিচয় হলো ঐ অনুষ্ঠানেই। পাখি দেখা ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের ব্যাপারে তাঁদের কমিটমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে। হয়তো এ ধরনের কিছু নিবেদিতপ্রাণ মানুষের জন্যই প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীগুলো টিকে থাকবে আরো কিছুদিন।

রাজশাহীর পাখিরাজশাহীর পাখি

পরদিন সকালে যাওয়া হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উদ্দেশ্য, বামুনি- কাঠশালিক ও নীলগলা-বসন্ত দেখা। প্রথমটি সেখানে নিয়মিত দেখতে পাওয়ার খবর থাকলেও ঐদিন পেলাম না। দ্বিতীয়টি দেখা গেছে বেশ কয়েকটি কিন্তু ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। এদের কুটুরুক কুটুরুক ডাকটি আমার বড্ড প্রিয় যা শৈশব থেকে শুনে আসছি। সেদিনও তারা নিরাশ করেনি।

ভ্রমনের কয়দিন আমার থাকার জায়গা ছিল শালবাগানে অবস্থিত ছোট ভাই‘র বাসা। একদিন ভোরে বুলবুলের ডাক শুনে বেশ কৌতুহল হলো কেননা ডাকটি একটু ভিন্ন রকম। দৌড়ে বারান্দায় এসে দেখলাম সিপাহী বুলবুল, যাকে সামনাসামনি দেখার শখ আমার বহুদিনের। পরপর তিনদিন দেখলাম খুব ভোরে এবং ধারনা হলো ওরা বারান্দার সামনের পরের গাছটিতেই বাসা করেছে। ছবিও তুলতে পারা গেল তবে ভোরের আবছা আলোয় সেগুলো খুব পরিস্কার হয়নি।

বিকেলে আবারো একটি চরে যাওয়া হলো শুধু দুজনের একটি দল, ইনাম ভাই এবং আমি। প্রথমেই দর্শন পেলাম প্রায় ৫০০ সদস্যের এশীয়-শামখোলের বিশাল এক ঝাঁকের। এই পাখিটি বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং সংখ্যাও বাড়ছে। তবে মানুষের উপদ্রবের কারনে নতুন নতুন অঞ্চলে এদের বিস্তৃতি ঘটছে বলে জানা যায়। আমাদের এবেলার যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শতদাগি-ঘাসপাখি দেখা। পাওয়াও গেল চরটিতে সহজেই কারন ওর সম্মোহনী সঙ্গীত যেকোন মানুষকে কাছে টেনে নিতে বাধ্য। নিকটে গিয়ে ছবি তুলতেও সে অনুমতি দিল নিঃশর্তে । ১৩৫ বছর পর এদেশে এই পাখিটি ইনাম আল হক ও তারেক অণু ফের আবিস্কার করেন এপ্রিল ২০১৪ সালে টাঙ্গুয়া হাওড়ে। ধারনা করা হয়েছিল ওরা হয়তো শুধু ওখানেই প্রজনন কাজে উপস্থিত আছে। এবারে রাজশাহীতে এদের সাক্ষাত সে ধারনা পাল্টে দেয়। আমরাও আশাবাদী হই যে হয়তো আরো কিছুদিন এরা টিকে থাকবে। এছাড়াও নদীতে দেখা পাওয়া গেল এক ঝাঁক তিলা-লালপার অথচ এপ্রিলে ওদের এদেশে থাকার কথা নয়। তবে প্রজনন মৌসুম চলাতে রং একেবারে গাঢ় হয়ে গেছে, হয়তো তার দুচারদিন পরেই ওরা ফিরতি পরিযায়ন উড্ডয়ন শুরু করেছে।

পরদিন ২৪ এপ্রিল ২০১৬ আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এ মৌসুমের প্রিমিয়াম ট্যুর। স্থানটি ছিল চাঁপাই-নবাবগঞ্জ। যাদের সৌজন্যে সেটা সম্ভব হয়েছিল তাঁদেরকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমি কখনো দেখিনি এমন তিনটি অনিন্দ সুন্দর পাখি এই ভ্রমনে দেখা সম্ভব হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে কালা-কাস্তেচরা, ধলাগলা-মানিকজোড় ও বড়-মোটাহাঁটু। প্রথম দুটি উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে প্রাক্তন পরিযায়ী বলে বর্ণনা করা আছে যে কারনে এদের দর্শন ছিল প্রধান প্রাপ্তি। দুটিই বড় আকৃতির পাখি এবং বেশ কাছ থেকে দেখা গেছে। তার মধ্যে মানিকজোড় গুলোকে ছোট-পানচিলের ধাওয়া করার দৃশ্য যেমনি কৌতুক পূর্ণ তেমনি নয়ন-মনোহর। বড়-মোটাহাঁটু আমাদেরকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে বেশ কাছে যেতে দিয়েছে। এছাড়াও একই এলাকায় দেখা

গেছে বেশ কয়েকটি কালামাথা-কাস্তেচরা। নদীর পাড়ে ছিল নীললেজ-সুইচোরাদের একটি কলোনী যেখানে তাদের কার্যকলাপ দেখে বোঝা গেছে যে প্রজনন মৌসুম চলছে।

আমাদের আরো একটি স্বপ্ন ছিল কালাপেট-পানচিলের দেখা পাওয়া। সেটি না পেলেও হরেক রকম পানচিলের দর্শন পাওয়া গেছে। ছোট-পানচিল, জুলফি-পানচিল ও নদীয়া-পানচিল তার মধ্যে অন্যতম। শেষেরটি আমাদেরকে তাদের মিলন দৃশ্যও উপহার দিয়েছে।

সব ভ্রমণেই নদীর পানি ছিল হৃদয় ও জীবন জুড়ানো। বাস্তবে পরীক্ষা করেই একথা বলছি কেননা প্রচন্ড পিপাসার কারনে চাঁপাই-নবাবগঞ্জে টলটলে নদীর পানি পান করে আসলেই জীবন জুড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীর পরিস্কার পানি ঢাকাবাসীদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে যার কারন সবার জানা। স্বচ্ছ নদী, সবুজ বালুচর, স্বল্প বসতি এসবই পাখির শান্তিপূর্ণ আবাসের জন্য উপযোগী। মধুময় রাজশাহীতে সবকটি উপকরণই উপস্থীত আছে। শুভকামনা রইলো সেগুলো অবিকৃত থাক আরো বহুদিন।