আমাদের গাড়ি চলছে লাদাখের আঁকা বাঁকা পথে। লক্ষ বছরের জমাট বাঁধা পাথর-রাজ্যের বুক চিরে এই পথ চলে গেছে জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখের নানা জনপদে। বিপজ্জনক বাঁকগুলো ঘোরার সময় ড্রাইভার তেনজিং এর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। দক্ষ চালক সে। দিগন্তে উঁচু উঁচু পাহাড় সারি অটল দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে সেখানে হলুদ ঠোঁটওয়ালা হিমালয়ান চ্যাফ উড়াউড়ি করতে দেখা যাচ্ছে। আমরা পাঁচ বন্ধু সো মোরিরি হ্রদ থেকে লে ফিরছি।

পাখিপাখি

তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা সিন্ধু নদ মাঝে মাঝেই আমাদের দেখা দিয়ে আবার গিরিখাদের রহস্যময় আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। আমরা প্রায় ১৪ হাজার ফুট উপরের পার্বত্য পথ দিয়ে চলছি। ‘মনে বড় আশা, যদি একটা তুষার চিতা (লেপার্ড) বা একটা কালাঘাড়-সারসের দেখা পাওয়া যেতো!’ তারেক অণুর অবিরাম এই যপ শুনতে শুনতে আমরা বাকিরাও এই দুর্লভতম প্রাণী দুটোর দেখা পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। যদিও জানি, এই সেপ্টেম্বর মাসে তুষার চিতা দেখতে চাওয়া আর আকাশ কুসুম কল্পনা করা একই কথা। আর কালাঘাড়-সারস পৃথিবীর অতি দুর্লভ পাখিদের একটি। এই উড়ন্ত বিস্ময়কে দেখা রাজদর্শনের মতই দূর্লভ। বাইরের আকাশ আকাশ অস্বাভাবিক নীল। এমন গাঢ় নীল রঙ সমতলে সহসা চোখে পড়ে না। গাড়িতে জেমসের গান বাজছে। ভর দুপুরে বাইরের কড়া রোদ আর গান দুই-ই উপক্ষো করে আমরা প্রায় সবাই ঘুমে ঢুলছি।

গাড়ি সো-কার লেকের কাছাকাছি আসতেই সবার ঘুম ভাঙতে শুরু করল। প্যাংগং বা সোমোরিরির মতো বিখ্যাত না হলেও পাখির জন্য এই লেকেরও বেশ নাম-ডাক আছে। কিন্তু এই মৌসুমে লেকের পানি শুকিয়ে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। শুষ্ক লেক আর চারপাশের রুক্ষ পার্বত্য মরুভূমি দেখতে দেখতে আমরা চলতে থাকি। হঠাৎ অণু চিৎকা করে আমাদের মগ্নতা ভাঙায়, ‘গাড়ি থামাও, গাড়ি থামাও!’। তেনজিং চকিতে গাড়ির গতি রোধ করে এবং বাঁ-দিকে থামায়। অণু আঙুল তুলে সো-কার লেকের মাঝখানের দূরের সবুজ জলাশয়ে কিছু একটার দিকে আমাদের দৃষ্টি কাড়ে। আমাদের কারো কাছে বাইনোকুলার বা ৩০০ মি.মি. লেন্স নেই। তবুও ১৩৫ আর ২০০ মি.মি. লেন্স জুম করে যতটুকু দেখা যায় তাতেই পাখিটার ছবি তুলতে থাকি অনবরত। তারপর ছবিটা জুম করে দেখতেই অণু চিৎকার করে ওঠে, ‘ব্ল্যাক নেকড ক্রেন! ব্ল্যাক নেকড ক্রেন!’

পাখিআকাশ-কুসুম কল্পনাও কখনো কখনো বাস্তব হয়! একটা নয়, দুটো নয়, আমরা কালাঘাড়-সারসের একটা পরিবার সেখানে দেখতে পাই। আহা সে কী আনন্দ! মিনিট দশেক সময় ধরে দূর থেকে এই মহাবিপন্ন মহাদূর্লভ পাখিদের দেখে আমরা আবার লে শহরের পথে গাড়ি চালাতে থাকি।পাখি

হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। কিন্তু মনে যেন কোনো ক্লান্তি নেই। একটু বিশ্রাম নিয়ে লে শহরের তিব্বতীয় হেরিটেজ মার্কেটের দিকে হাঁটতে শুরু করি। উদ্দেশ্য বইয়ের দোকানে হানা দেয়া আর কিছু যদি স্যুভেন্যির পাওয়া যায়। ঘুরতে ঘুরতে লাদাখ বুক স্টোরের সামনে দাঁড়াতেই একটা পোস্টার চোখে পড়ল, ‘অ্যা ফটোগ্রাফি এক্সিবিশন অন মামলস অ্যান্ড বার্ডস অব লাদাখ বাই লোকাল ফটোগ্রাফার্স’। লে গ্যালারিতে ১৫ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। ওয়াইল্ড লাইফ কনসারভেশন এন্ড বার্ডস ক্লাব অব লাদাখের উদ্যোগে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম আটটা বেজে গেছে। সেদিন আর হলো না। হোটেলে ফিরেই তারেক অণুকে জানালাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম নুব্রা ভ্যালি থেকে ফিরেই প্রদর্শনীটি দেখতে যাব।

পরিকল্পনা অনুযায়ী যথা সময়ে প্রদর্শনী হলে পৌঁছে গেলাম। সাথে বন্ধু তান্নিও যোগ দিলেন। হলেই ঢুকতেই এক তরুণ এগিয়ে এসে আমাদের সাথে পরিচিত হলেন, কনচুক ডগমো, বার্ডস ক্লাব অফ লাদাখের সদস্য। যখন জানতে পারলেন আমরা বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব থেকে এসেছি তখনই ছুটে গিয়ে ক্লাব সভাপতিকে খবর দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রদর্শনী হলে এসে ঢুকলেন মি. লবজাং বিশুদ্ধা, ক্লাব সভাপতি। কুশল বিনিময়ের পর তিনি আমাদের পুরো প্রদর্শনী ঘুরিয়ে দেখান। আলাপ হয় লাদাখের পাখি আর নানা প্রাণী নিয়ে। অল্প সময়েই লবজাং আমাদের অনেক আপন করে নেন। তাঁর তোলা ছবির পোস্টকার্ড আমাদের উপহার দেন। প্রদর্শনীতে প্রায় ৩০টি পাখি ও বন্যপ্রাণীর ছবি স্থান পায়। এরমধ্যে আইবিস বিল, ইউরেশিয়ান গোল্ডফিন্চ, গুলিন্দা, প্যারট্রিজ, উলি খরগোশ, কিয়াং, হিমালয়ান নেকড়ে, তুষার চিতা ইত্যাদি দেখেছি। তুষার চিতার অসাধারণ কয়েকটি ছবি এখনো চোখের সামনে ভাসছে। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম আমাদের দেখা সেই কালাঘাড়-সারস পরিবারটির ছবিও এখানে স্থান পেয়েছে। আলোকচিত্রীর সাথে আলাপ করে নিশ্চিত হলাম, সপ্তাহ দুয়েক আগে সো-কার লেকের ঐ এলাকা থেকেই তিনি এই ছবিটি তোলেন।

লেকের পাখিলেকের পাখি

প্রদর্শনীতে কনচুক ডগমো, লোবজাং বিশুদ্ধা ছাড়াও দর্জে চিত্ত, দর্জে দায়া, টাশি চোতাক লঞ্চে, টি. নামগিয়াল, রিগজিন ওয়াংতাক এবং শেরিং ফুনসগ এর ছবি স্থান পেয়েছে। তারা সামনের বছরে প্রথমবারের মত পাখিমেলা আয়োজন করতে চলেছেন, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যদের আগাম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন বার বার করে।

প্রদর্শনীতে আমাদের দেখা পাখিগুলোর সাথেও আরেকবার দেখা হয়ে গেল। লাদাখের পুরো ভ্রমণে নানা সময়ে আমরা হুদহুদ, ম্যাগপাই, কয়েক রকমের বুনোহাঁস, মাছরাঙা, খঞ্জন, শকুন, গাঙচিল, প্যাট্রিজ, চকোর, হলুদ ঠোঁটের চ্যাফ এমন কি একবার লাল ঠোঁটের চ্যাফ ও তিব্বতীয় স্নো-ককও দেখতে পেয়েছি। পথে পথে কত যে মারমট দেখলাম! আর নুব্রা ভ্যালিতে মহাবিপন্ন প্রাণী দুই কুঁজওয়ালা উটের পোষমানা সদস্যদের দেখা পেয়ে আমরা যার পর নাই খুশি হয়েছিলাম এবং অস্তগামী সূর্য ঘাড়ের উপরে রেখে এই উটের সাফারিতেও অংশ নিয়েছি।

প্রদর্শনীতে আমরাপ্রদর্শনী দেখে লোবজাং ও তাঁর ক্লাবের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমার আবার লে শহরের পাহাড়ি রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লাম। জমিয়ে শীত পড়েছে। এদিকে গরম গরম রুটি আর লাদাখীয় (গৃহপালিত) ভেড়ার বারবিকিউয়ের সুঘ্রাণে পুরো মার্কেট এলাকা ম ম করছে তখন। আশা করি ২০১৭ এর লাদাখের পাখিমেলাতে এই সদ্য পরিচিত কিন্তু চিরচেনা পাখিপ্রেমী বন্ধুদের সাথে আবার দেখা হবে।প্রদর্শনীতে আমরা